বিলেতের কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট’স কলেজ থেকে ন্যাচারাল সায়েন্সে বিএ এবং লন্ডন ইউনিভার্সিটির ইউনিভার্সিটি কলেজ, লন্ডন থেকে বিএসসি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরলেন জগদীশ চন্দ্র বসু, ১৮৮৪তে।
জগদীশচন্দ্র বসুর প্রেসিডেন্সী কলেজের অধ্যাপক হওয়ার শুরুতেই ঘটেছিল বর্ণবৈষম্যের ঘটনা। হেনরি ফসেট তাঁকে বড়লাট রিপনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। রিপনসাহেব তাঁকে অধ্যাপনার চাকরি দিতে সুপারিশ করে ডিরেকটর অফ পাবলিক ইন্সসট্রাকশনকে নির্দেশ দেন। কিন্তু ইম্পেরিয়াল এডুকেশন বোর্ডের অধীনে পদার্থবিদ্যার যে অধ্যাপকপদটি খালি ছিল প্রেসিডেন্সী কলেজে, তা ছিল ইউরোপিয়ানদের জন্যে সংরক্ষিত। ফলে প্রেসিডেন্সী কলেজের তদানীন্তন অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনি ও ডিরেকটর অফ ইন্সট্রাকশন আলফ্রেড উডলি ক্রফট তাঁকে নিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। অবশেষে লালফিতের ফাঁস কাটিয়ে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপকের পদে তিনি যোগদান করলেন ১৮৮৫তে। তবে তাঁকে টেম্পোরারি পোস্ট দেওয়া হল আইন বাঁচিয়ে। মাইনে ইউরোপিয়ান অধ্যাপকের এক তৃতীয়াংশ।
যোগ দিলেন বটে, জগদীশচন্দ্র প্রতিবাদস্বরূপ মাইনে নিলেন না। তিন বছর পর তাঁর বিরাট যোগ্যতার পরিচয় পেয়ে অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে রাজি করিয়ে তাঁর পদ স্থায়ী করলেন। তিন বছরের মাইনেও তাঁকে প্রকৃতহারে দিয়ে দেওয়া হল।
চার্লস হেনরি টনি যে কতটা নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, তা এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়।
শুধু জগদীশচন্দ্রই নন, চার্লস হেনরি টনির সহানুভূতি ও আনুকূল্য পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও।
এই চার্লস হেনরি টনির জন্ম ইংল্যান্ডে। কেম্ব্রিজ ট্রিনিটি কলেজ থেকে ফেলো টিউটরের পদ ছেড়ে দিয়ে ১৮৬৫কে ভারতে তথা বাংলায় আসেন। তাঁর ঠান্ডা লাগার ধাত ছিল। তাই কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ট্রপিক্যাল কান্ট্রি ইন্ডিয়ায় আসা সাব্যস্ত করেন। ১৮৬৫ তে প্রেসিডেন্সী কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপকের পদ খালি ছিল। সদ্য অবসর নিয়েছেন অধ্যাপক ই বাইলস কাউয়েল। সেই পদেই যোগ দিলেন টনি। তাঁর পদবি কেউ কেউ টাউনি উচ্চারণও করতেন।
১৮৬৬ থেকে ১৮৭২ পর্যন্ত তিনি ইতিহাসের অধ্যাপকের পদে বহাল ছিলেন। ১৮৭৩ থেকে তিনি ইংরেজির অধ্যাপক হন। ১৮৭৫এ প্রেসিডেন্সীর অধ্যক্ষ জেমস সাটক্লিফের মৃত্যু হলে তিনি অধ্যক্ষের পদে যোগ দিলেন। ১৮৭৬ থেকে ১৮৯২ পর্যন্ত একটানা তিনি অধ্যক্ষ ছিলেন। মাঝে কিছুদিনের জন্যে ছুটিতে বিলেতে পরিবারের কাছে আর কিছুদিনের জন্যে ডিরেক্টর অফ পাবলিক ইন্সসট্রাকশনের কার্যনির্বাহী পদে ছিলেন।
শুধু অধ্যক্ষই নয়, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের দায়িত্বও সামলেছেন একসঙ্গে। ১৮৭৭ থেকে ১৮৮১, ১৮৮৪ থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত তিনি রেজিস্ট্রার ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের। পরে ১৮৮৬ ও ১৮৮৯এও তাঁকে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তিনি C I E উপাধি পান ১৮৯২য়ে।
সাহিত্যমনস্ক চার্লস হেনরি টনি ১৮৭৫য়ে ইংরেজি অনুবাদে বার করেন জার্মান সাহেব লোথের লেখা বই। টনিসাহেবের বইটির নাম ‘English people and their language’। তিনি ছিলেন এক বিদগ্ধ শেকসপিয়ার বিশেষজ্ঞ। তবে Richard (III)-র সম্পাদনার কাজ ছাড়া তাঁর শেকসপিয়ার-সত্তার কোনও লিখিত দলিল নেই। এটাই আপসোসের। প্রফুল্লকুমার ঘোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শেকসপিয়ার-বিশেষজ্ঞ ছিলেন বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। তাঁর কিছু কাজে কি আছে চার্লস হেনরি টনির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ?
টনিসাহেবের ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষায় পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ। কিন্তু কলকাতায় তাঁর সময়ে এই দুটি ভাষায় বিদ্যাচর্চার সুযোগ ছিল না। তাই তিনি সংস্কৃত ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হন। সংস্কৃত ভাষা শিক্ষায় আত্মনিবেদিত প্রাণ ছিলেন তিনি। এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল কর্তৃক প্রকাশিত দুই খণ্ডে কথাসরিৎসাগরের (মূল সোমদেব ভট্টের সংস্কৃত রচনা) ইংরেজি অনুবাদ তাঁর জীবনের সেরা কীর্তি। Ocean of Story বিদগ্ধমহলে সাড়া ফেলেছিল দারুণভাবে। তাঁর প্রথম প্রকাশনা দু’টি বিখ্যাত নাটকের ইংরেজি গদ্যানুবাদ, ভবভূতির উত্তর-রামচরিত এবং কালিদাসের মালবিকাগ্নিমিত্র, যথাক্রমে ১৮৭৪ ও ১৮৭৫ সালে। ১৮৭৭-এ ইংরেজি পদ্যে তিনি অনুবাদ করেন Two Centuries of Bhartrihari. পরবর্তীকালে স্বদেশে ফিরে গিয়ে টনি জৈনধর্মবিষয়ক সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। জৈন গ্রন্থ ‘কথাকোষ’-এর টনি-কৃত অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৯৫-এ, আর ‘প্রবন্ধচিন্তামণি’-র অনুবাদ মুদ্রিত হয় ১৮৯৯-১৯০১ পর্বে।
গ্রিক, ল্যাটিন, জার্মান, সংস্কৃত ছাড়া তিনি হিন্দি, উর্দু ও ফারসি ভাষাও রপ্ত করেছিলেন। বাংলাভাষাও অল্পবিস্তর জানতেন।
সর্বোপরি তাঁর ন্যায়বিচার দেওয়ার চারিত্রিক দৃঢ়তার কথা বলতেই হয়। তিনি প্রশাসক হিসেবে ছিলেন পক্ষপাতহীন ও ছাত্রদরদী। ছাত্রদের যেমন অন্যায় সুবিধা পাইয়ে দিতেন না, তেমনি সত্যিকারের প্রতিভাকে চিনতেও তাঁর ভুল হত না। তাঁর জনপ্রিয়তা অর্জনের কোনও মোহ ছিল না। অনেক অযোগ্য শিক্ষক ও প্রশাসককে বিরাট যোগ্য হিসেবে প্রচার করে বশংবদ ভক্তকুল। যেহেতু তিনি কোনও ভক্তকুল সৃষ্টি করে যাননি, তাঁর নামও চাপা পড়ে গেছে সময়ের স্রোতে।
রেজিস্ট্রার ও অধ্যক্ষ থাকাকালীন তিনি অভিভাবকদের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম নথিভুক্তিকরণ করেন প্রেসিডেন্সী কলেজের ছাত্র হিসেবে। যাতে তিনি আই সি এস পরীক্ষায় বসার জন্যে প্রয়োজনীয় বয়সের শংসাপত্র পান, তার ব্যবস্থা তিনি করে দিয়েছিলেন। এত কথা ইতিহাস জানাবে না। রবীন্দ্রভক্তরা বলেন, তিনি একদিনের জন্যে প্রেসিডেন্সী কলেজের ছাত্র ছিলেন। কোন দিন, সেটার কথা উহ্য রাখেন। জানেন না, জানার চেষ্টাও করেন না। চার্লস হেনরি টনি বশংবদ, তল্পিবাহক ভক্তকুল রেখে যাননি। ডিরোজিওর মত উন্নাসিক ‘ডিরোজিয়ান’ রেখে যাননি। তাই তাঁর হয়ে কেউ কলম ধরেননি অতীতে। এখনও ধরেন না।
জগদীশচন্দ্র বসুর ন্যায়বিচার পাওয়ার মূলে যে তিনি, সেটাও বাঙালি ভুলে গেছে। অথচ তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে জগদীশচন্দ্রের সঠিক মূল্যায়ন না করলে, তাঁর অধ্যাপকপদ স্থায়ী হত না, তিনি যোগ্য স্বীকৃতিও পেতেন না।
প্রেসিডেন্সী কলেজ এখন কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। ছদ্ম-রবীন্দ্রভক্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে প্রাক্তনীদের নামের তালিকায় রবীন্দ্রনাথের নামও লিখে রেখেছেন। অথচ ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত রেজিস্টার ঘেঁটে তাঁর নাম বার করার দায়িত্বটুকু কেউ নেননি।