জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা রথে চড়ে ভক্তদের দর্শন দেন তারপর মাসীর বাড়ী যান এই নিয়েই প্রথাগত রথযাত্রা। কিন্তু উদয়নারায়ণপুরের জমিদার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের রথের দেবতাদের যাত্রার আগেও একটা যাত্রা থাকতো। সে যাত্রা শুরু হতো আগেরদিন থেকে। হাওড়া-চাঁপাডাঙ্গা শাখার মার্টিন রেলে করে দেবতারা এসে নামতেন জাঙ্গিপাড়াস্টেশনে। সেখান থেকে কিছুটা রাস্তা সড়কপথে, তারপর নৌকায় দামোদর পার হয়ে এসে পৌঁছতেন উদয়নারায়ণপুর। ভাবুন তো সেই ছবি — নৌকার উপর ডবল বাঁটের সুসজ্জিত পালকিতে আসীন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা। বাজছে কাঁসর, ঘন্টা সঙ্গে সঙ্খ আর অবিরাম উলুধ্বনি! এই বনর্ময় রেল-নদী যাত্রা চলেছিল প্রায় দীর্ঘ কুড়ি বছর। পথে যে যে স্টেশনে গাড়ী দাঁড়াতো সব যায়গাতেই চলতো প্রভুর আগাম বন্দনা। তারপর নদীর পাড় থেকে পদব্রজে তাঁদের আনা হত উদয়নারায়ণপুর জমিদার বাড়িতে। শুরু হত রথযাত্রার অনুষ্ঠান।

এই বিশেষ ব্যবস্থার পিছনে একটা কারন ছিল। স্বাধীনতার পর সারা রাজ্যের মতোই উদয়নারায়ণপুরেরও জমিদারী বিলুপ্ত হলো। জমিদারী চলে যাওয়ার পর বাবুরা উদয়নারায়ণপুর ছেড়ে থাকা শুরু করলেন শিয়ালদহের বৈঠকখানা বাজারে। সঙ্গে নিয়ে গেলেন প্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা ও পারিবারিক নারায়ন শিলা। সেই থেকে শুরু এই ব্যবস্থা। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার নিয়ম ও নির্ঘন্ট অনুসরণ করেই এই রথের রশিতে টান পড়ে। আজও খোল করতাল, শাঁখ কাঁসর ঘন্টা সহযোগে নাম কীর্তনের মধ্য দিয়ে রথের দিন সকালে “তিনটান” সম্পন্ন করা হয়। অপরাহ্নে আট থেকে আশির হাতের ছোঁয়ায় রথ চলে গরগড়িয়ে। একটা সময় রথ যেত উদয়নারায়ণপুর রথতলা থেকে গজার দেবকালী পর্যন্ত, তারপর যাত্রা সংক্ষিপ্ত হয় শিবপুরের ছড়িপাড়া পর্যন্ত। এখন আর অতদূরও যায় না। বাংলার দারুতক্ষণ শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন এই রথ।

এই রকম আর একটি রথ রাউতারার রায় পরিবারের যেটি আজ ধংসের দিন গুনছে। প্রথাগত রথের গঠন শৈলী মেনে চুড়োয় আনারসী খাঁজ কাটা। শিখর চূড়ায় প্রার্থনারত গড়ুরদেব অন্যচূড়া গুলিতে স্বল্পবসনা বিশিষ্ট মূর্তি গৈরিক পতাকা হাতে দন্ডায়মান। বাঁকানো কার্নিসে কাঠের জালিঝালর, সারথীর হাতে ছুটন্ত বলশালী অশ্বের লাগামরশি, কৌণিক ভাস্কর্যে নানা সংহার মূর্তি, চারদেওয়ালে প্রভু জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার তেলরঙ্গে চিত্রিত প্রতিরূপ-এ নানা পৌরাণিক চিত্র অঙ্কিত। এই রথের উচ্চতা ছিল একসময় ৩৫ ফুট, বর্গাকারে প্রস্থ আনুপাতিক হারে। রথের চাকাগুলিও কাঠের। বর্তমানে রথটি নিম কাঠের। তিরিশ ফুট উঁচু আর কুড়ি ফুট চওড়া। রয়েছে নটি চূড়া। বারোটি আড়াই ফুটের চাকা রথটিকে টেনে নিয়ে চলে। সময়ের সাথে সাথে এটি জীর্ণ হলেও সংস্কার সাধিত হয়েছে বেশ কয়েকবার। তবে সংস্কারের ফলে দারুৎশিল্পের অপূর্ব শিল্পসুষমার অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে।

সেইরকমই সময়ের সাথে সাথে চাকচিক্য ও যৌলুসের পরিমান অনেকটাই কমেছে জানালেন এলাকার প্রবীণরা। এই পরিবারের আরেক কৃতী সন্তান প্রয়াত কবি গীতা চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন “তাঁর পূর্বপুরুষেরা এ দেশে এসেছিলেন কান্যকুব্জ থেকে। হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরের জমিদারি ওনার প্রপিতামহ ঈষাণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পেয়েছিলেন বিবাহসূত্রে যৌতুক হিসেবে।

উদয়নারায়ণপুরের বহু শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন ওনার পিতামহ-প্রপিতামহরা। এই অঞ্চলের প্রায় সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ওনারা জায়গা দান করেছেন। কলকাতায় ছিল ওনাদের ব্যবসা, থাকতেন শিয়ালদহে। রথযাত্রা উপলক্ষে প্রতি বছর বিশাল মেলা বসে স্থানীয় স্কুলের মাঠে। তবে এতকিছু হলেও প্রায় তিনশ বছরের ইতিহাসে কখনও রথের রশিতে টান বন্ধ হয়নি, বন্ধ হয়নি মেলাও।
তথ্য ও ছবি : শুভম নন্দী