গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্য–রাজনীতিতে চর্চা চলছিল রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় রাজ্যের তৈরি করা খসড়া বক্তৃতা পড়বেন কিনা তা নিয়ে। কারণ রাজ্যের পাঠানো ভাষণের খসড়াপত্রের কিছু অংশ নিয়ে জগদীপ ধনখড় আপত্তি জানান। কারণ সেখানে যা লেখা আছে তার সঙ্গে রাজ্যপাল সহমত পোষণ করতে পারছেন না। অন্যদিকে রাজ্যের পক্ষ থেকেও তাকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে মন্ত্রিসভায় বাজেট ভাষণ অনুমোদনের পরই তাঁকে লিখিত ভাষণ পাঠানো হয়েছে। এরপরও রাজ্যপাল নিজে লিখিত ভাষণের বেশ কয়েকটি জায়গা রদবদল করে তা নবান্নে পাঠান।তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানান, রাজ্য মন্ত্রিসভায় পাশ হওয়া খসড়া বক্তৃতায় কোনও পরিবর্তন করা হবে না। অতএব রাজ্যপালকে সেটাই পড়তে হবে। তাই আবার রাজভবনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সেই খসড়া বক্তৃতা। এরপরই রাজ্যপালের সঙ্গে রাজ্য সরকারের নতুন করে সংঘাত শুরু হয়।
বাজেট ভাষণ ছাড়াও রাজ্যপালের সঙ্গে রাজ্য সরকারে সংঘাত লেগেই ছিল। গোটা বাজেট ভাষণটি রাজ্যপাল পাঠ করবেন কিনা এ নিয়ে যেমন সংশয় ছিল পাশাপাশি একটা আশঙ্কা ছিল যে বিরোধীরা ওই ভাষণ নিয়ে আপত্তি তুলে বিধানসভায় তুমুল হইহট্টগোল বাধাতে পারে। গতকালই সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ তথা চিফ হুইপ সুখেন্দু শেখর রায় রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের সঙ্গে ভুয়ো ভ্যাক্সিন কাণ্ডে অভিযুক্ত দেবাঞ্জন দেবের যোগ রয়েছে বলে দাবি করেন। রাজভবনের বেশ কয়েকটি ছবি দেখান তিনি। যেখানে দেবাঞ্জন দেবের দেহরক্ষী রাজভবনে রাজ্যপালের পরিবারের সঙ্গে ছবি তুলেছেন। তিনি সাংবাদিকদের সামনে প্রশ্ন তোলেন একজন প্রতারক কীভাবে রাজভবনে প্রবেশ করে। তিনি আরও দাবি করেন দেহরক্ষীর হাত দিয়ে রাজ্যপালের কাছে যেত বিশেষ খাম।
এর আগে দীর্ঘ তিন দশক আগে জাতীয় রাজনীতি তোলপাড় করা জৈন হাওয়ালা মামলায় রাজ্যের রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের নাম জড়িয়ে আছে বলে দাবি করেন তৃণমূল নেত্রী। এরপরই জৈন হাওয়ালা কাণ্ডের সাংবাদিক তথা দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের কর্মী বিনীত নারায়ণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহসী পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। তিনি এও জানান জৈন হাওয়ালা মামলার তদন্তে উদ্ধার জৈনদের ডায়েরি ও নোটবুকের পাতায় লেখা আছে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জগদীপ ধনখড়ের নাম এবং তার পাশেই উল্লেখ রয়েছে ৫.২৫ কোটি টাকা অঙ্ক। ওই মামলায় রাজ্যপাল নিজেকে ক্লিনচিট দিলেও রাজ্যের শাসকদলের আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
এদিন তৃণমূলের পক্ষ থেকে সুখেন্দু শেখর রায় জানান, রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তোলার পরই নাকি মৃত্যু হয়েছে জৈন হাওয়ালা মামলায় অন্যতম অভিযুক্তের। তারপর থেকে ধনকরের আর কোনও মন্তব্য পাওয়া যায় নি। এইসব ঘটনা থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে বিরোধীরা বিধানসভায় এমন হট্টগোল বাধাবে যাতে রাজ্যপাল গোটা ভাষণ না পড়তে পারেন।
আশঙ্কাকে সত্যি প্রমান করেছে বিজেপি বিধায়করা। তারা শুরুর দিনই নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ঘটায় রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে। শুরুতেই তারা ভারত মাতার নামে স্লোগান তুলে বুঝিয়ে দেন যে তারা তাদের অবস্থানে অটল। একই সঙ্গে পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, মাঝ পথেই ভাষণ বন্ধ করে দেন রাজ্যপাল। এদিন রাজ্যপাল বিধানসভার অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের আগে থাকতেই তারা কক্ষের মধ্যে প্রবল চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। এরপর রাজ্যপালের ভাষণ শুরু হতেই তারা ওয়ালে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। রাজ্যপাল মাত্র চার মিনিট ভাষণ পড়েই বন্ধ করে দেন। উঠে পড়েন অধ্যক্ষের চেয়ার ছেড়ে। এরপর বিধানসভা ছেড়ে বেরিয়ে যান তিনি। মাত্র ৭৪ জন বিধায়ককে নিয়ে এদিন যেভাবে বিধানসভায় বিক্ষোভ সংগঠিত করলো বিজেপি তা কার্যত নজিরবিহীন।
রাজনৈতিক বিশেষঞ্জদের মতে এদিনের গোটা ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত। এদিন যাতে রাজ্যপালের ভাষন শোনা না যায়, এবং তিনি যাতে রাজ্য সরকারের ভাষণ শেষ করতে না পারেন তার জন্য আগেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এবং সেই মাফিক বিজেপি বিধায়করা হইহট্টগোলের ঘটনা ঘটিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে এদিন যদি রাজ্যপাল রাজ্য সরকারের লিখে দেওয়া খসড়া ভাষণ পড়তেন তাহলে তা রেকর্ড হয়ে যেত। কিন্তু বিধানসভার রেকর্ড বুকে রাজ্যপালের ভাষণ স্থান পাবে কিনা তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে বিধানসভার স্পিকারের ওপর। তবে ভাষণের প্রথম এবং শেষটুকু পড়ার ফলে রাজ্যপালের ভাষণ যে বিধানসভায় পাশ হয়ে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে পরবর্তী সময়ে রাজ্যপাল রাজ্যের হিংসা বা রাজ্যের বিরুদ্ধে একেধিক ইস্যু নিয়ে অভিযোগ করলে যে প্রশ্ন উঠবে না তা ভাবার কারন নেই। যদিও রাজ্যপাল পারেন যে কোনও সময়ে বক্তৃতা থামিয়ে দিয়ে চলে যেতে। তিনি সেটাই করেছেন।
করেছেন, কারণ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে তো আর ভাষণ দেওয়া যায় না। অনেকেই মনে করছেন এই গোটা পরিকল্পনাটি তৈরি হয় রাজ্যপাল এবং বিরোধী দলনেতার আলাপ আলোচনার মধ্যেই। তারপর তাতে চূড়ান্ত সিলমোহর দেয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। যে কারণে শুভেন্দু অধিকারীকে সাত তাড়াতাড়ি দিল্লিতে ছুটে যেতে হয়েছিল।
বিজেপি বিধায়কদের তুমুল হট্টগোল শুরু হওয়ার চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাজেট ভাষণ শেষ করে দিতে বাধ্য হন রাজ্যপাল। এরপর বাজেট ভাষণ অসমাপ্ত রেখেই বিধানসভা ছেড়ে চলে যান জগদীপ ধনখড়। এদিক থেকে পূর্বপরিকল্পিত পরিকল্পনা সফল করা গেল। অন্যদিকে রাজ্যের তৈরি খসড়া ভাষণ পুরোটা তাঁকে পড়তে হল না। আবার এটাও দেখানো গেল যে তিনি পড়তে রাজি ছিলেন। কিন্তু আসলে তো যে সেটা নয়, সেটা বুঝতেও বাকি থাকলো না।
গোটা ঘটনাটি যে পূর্বপরিকল্পিত এতে কোনও সন্দেহ নেই। যাতে রাজ্যপালের ভাষন শোনা না যায়, যাতে রাজ্য সরকারের
ভাষণ শেষ করতে না পারেন তার জন্যই পরিকল্পনা করা হয়েছিল।