গত মঙ্গলবার গিয়েছিলেন দিল্লি। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। রাজধানীতে অমিত শাহের সঙ্গে দু-বার দেখা করেন তিনি। বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশ হয়েছে গত ২ মে। বিজেপির বাংলা দখলের স্বপ্ন ঘুচিয়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তৃতীয়বারের জন্য বাংলার শাসন ক্ষমতায় ফেরার ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে বিরোধীদের পাশাপাশি সরগরম রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়। এমনকি দিল্লীতে রাজ্যে ভোট পরবর্তী হিংসা ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে রাজ্যপাল শাহের কাছে রিপোর্টও জমা দিয়েছেন।
দিল্লি থেকে ফিরেই রাজ্যপাল গিয়েছেন উত্তরবঙ্গ সফরে। দার্জিলিঙে এক সপ্তাহ থাকবেন তিনি। প্রসঙ্গত, ২০২০ তেও উত্তরবঙ্গ গিয়েছিলেন ধনখড়। সেবার ১ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত একমাস দার্জিলিং-এ ছিলেন। তার আগে কোনও রাজ্যপালের এতদিন দার্জিলিং-এ থাকার ইতিহাস ছিল না। দার্জিলিং-এর রাজভবনে জগদীপ ধনখড় ২০২০-র দীপাবলি কাটিয়েছিলেন, একাধিক বৈঠকও সেরেছিলেন। সেই সফরেও রাজ্যপাল অভিযোগ করেছিলেন, জেলাপ্রশাসন রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানকে কার্যত বয়কট করেছে। পাশাপাশি জিটিএ-র অডিট না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। উল্লেখ্য তাঁর সেবারের উত্তরবঙ্গ সফরের আগেও রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। স্বভাবতই তাঁর এবারের উত্তরবঙ্গ সফর ঘিরে জল্পনা শুরু হয়েছে।
রাজ্যপাল ধনখড় যখন উত্তরবঙ্গ সফরে ঠিক তার আগেই পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্যের দাবি তুলে সরব হয়েছিলেন আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ জন বার্লা। পাশাপাশি তাঁর সুরে সুর মিলিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গের আরও ২ বিজেপি বিধায়ক। যদিও রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্য বিজেপি বঙ্গভঙ্গ চায় না। কিন্তু তারপরও যে আলিপুরদুয়ারের সাংসদ ওই বিষয়ে চুপ করেছিলেন তেমনটা বলা যায় না। বুধবার দিনই তিনি বাংলা ভাগের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন এই সময় উত্তরবঙ্গ সফরে রয়েছেন রাজ্যপাল, তিনি বৃহস্পতিবার দিনই তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন।
এদিকে সোমবার রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছেই ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে ফের সুর চড়িয়ে রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ করলেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ২ মে’র পরবর্তীতে রাজ্যে যে ঘটনা ঘটে চলেছে তা নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত। তিনি নাকি স্বাধীনতার পর এমন অশান্তির কথা মনে করতে পারছেন না। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার এই অবস্থার পরও প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে তিনি জানান। উল্লেখ্য; এ রাজ্যের দায়িত্বে আসার পর থেকেই একাধিকবার রাজ্য সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়। তিনি বারবার রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিধানসভা নির্বাচন এবং ফলাফল প্রকাশের পরও তিনি সেই একই বিষয় নিয়ে রাজ্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেই চলেছেন। দিল্লি থেকে ফিরে উত্তরবঙ্গে পা রেখেও তিনি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। যাতে সেখানকার পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে আলিপুরদুয়ারের সাংসদ জন বার্লা মঙ্গলবার সন্ধেয় সাংবাদিক বৈঠক করেন দাবি করেন, অসম-বাংলা সীমানার কুমারগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের ৯ জন পঞ্চায়েত সদস্য ও কুমারগ্রামের একজন জেলা পরিষদ সদস্য স্ত্রী, সন্তান-সহ তাঁর জলপাইগুড়ির লক্ষ্মীপাড়া চা বাগানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, কুমারগ্রাম থানার আইসি ও স্থানীয় তৃণমূল নেতারা জোর করে তাঁদের দলে যোগদান করার জন্য চাপ দিচ্ছে। হুমকি দিচ্ছে। সাংসদ এও দাবি করেন, ওই ৯ জন পঞ্চায়েত সদস্য ও জেলা পরিষদ সদস্যরা অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতেই সাংসদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কেবল তাই নয়, দলের কর্মীরা অত্যাচারিত, এমনই কিছু কর্মীদের পাশে দাঁড় করিয়ে ভিডিয়ো বার্তায় বিজেপি সাংসদ জন বার্লা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত তিনি তখন রাজ্যপালের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও বলেছিলেন। ইতিমধ্যে রাজ্যপাল উত্তরবঙ্গে পৌঁছানোর পর বৃহস্পতিবারই আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। যদিওরাজ্যপালের সনবগে তিনি ঠিক কি বিষয়ে আলোচনা করেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানান নি।তবে তিনি বলেন, ‘যা বলার দিল্লিতে গিয়ে বলব।’
এইসব ঘটনাক্রম থেকেই রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের উত্তরবঙ্গ সফরকে উদ্দেশ্যমূলক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের বক্তব্য, একদিকে বিজেপি প্রকাশ্যে বলছে, বঙ্গভঙ্গকে তারা সমর্থন করছে না, অথচ যে বিজেপি সাংসদ উত্তরবঙ্গকে বাংলা থেকে আলাদা করার দাবি করেছেন তাঁর সঙ্গে রাজ্যপাল শলাপরামর্শ করছেন৷ রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধনের পক্ষে উত্তরবঙ্গে ঘাঁটি গেরে বিজেপির ওই সাংসদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালানোটা তাঁরা কোনওভাবেই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছেন না। তাঁরা বলছেন এই সময় রাজ্যপাল ওই সাংসদের সঙ্গে আলোচনায় বসে বাংলার মানুষের কাছে ভুল বার্তা প্রেরণব করলেন। কিছুকাল আগে পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিক অশান্তি লেগেই থাকত। পরবর্তীতে সার্বিক উন্নয়নের ওপর আস্থা রেখে এখন পাহাড়, তরাই এবং ডুয়ার্স অনেকটাই শান্ত। তার মানে নির্বাচনের শোচনীয় পরাজয় মেনে নিতে না পেরে এখন উত্তরবঙ্গের মাটি থেকে অশান্তি ছড়ানোর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে৷ আর তাতে সক্রিয়ভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছেন স্বয়ং রাজ্যপাল৷
ধনখড়ের আচমকা উত্তরবঙ্গ সফর যে অশান্তির ষড়যন্ত্র সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।