রাজ্যপালের সঙ্গে সরকার ও শাসকদলের সংঘাত এ রাজ্যে একটি ট্র্যাডিশন বলা যায়। বাম জমানায় গোপালকৃষ্ণ গাঁধী থেকেই সেই ট্র্যাডিশনের শুরু বলা যায়। তার পর এম কে নারায়ণন হয়ে কেশরীনাথ ত্রিপাঠী— রাজভবনের অধিকার নিয়ে সমানে বিতর্ক চলছে। সংঘাত প্রকাশ্যে এসে পড়ে তখনই যখন রাজ্যপাল সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে রাজ্যের প্রশাসনিক কাজে ‘নাক গলান’।
প্রসঙ্গত ২০২০ জুলাই মাসে বাংলায় নতুন রাজ্যপাল হয়ে আসার পর থেকেই জগদীপ ধনখড় রাজ্য সরকার, সাধারণ প্রশাসন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে তিনি একটার পর একটা অভিযোগ তুলে আসছেন যা মোটের ওপর ভিত্তিহীন। এছাড়াও শুরু থেকেই তাঁর কার্যকলাপ কখনই ভাল চোখে দেখেনি শাসক শিবির। গোড়া থেকেই তাঁর একের পর এক পদক্ষেপে রাজ্য রাজনীতিতে বিস্তর জলঘোলা হয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে উদ্ধারে যাওয়া, জিয়াগঞ্জে সপরিবারে শিক্ষক খুনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ, রেড রোডে পুজো কার্নিভালে তাঁকে অপমান করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করলে শোরগোল পড়ে যায় রাজ্য রাজনীতিতে। এইভাবে রাজ্যের বর্তমান রাজ্যপাল জগদীপ ধনখরের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত চলেই আসছে।
লক্ষ্যনীয় সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনের আগেই প্রকাশ্যে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখর। অবশ্য ভোটের ফলাফল তাঁকে হতাশ করে। তৃণমূল তৃতীয় বারের জন্য রাজ্যে ক্ষমতায় ফেরে। আর তারপর থেকেই রাজ্যপাল জেলা সফর শুরু করেন ভোট-পরবর্তী হিংসার কথা সামনে রেখে। এ নিয়েও রাজ্য সরকারের সঙ্গে সংঘাত চরমে পৌঁছোয়। রাজ্যপাল তাতে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে। তিনি সংবিধানে ১৫৯ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে জানান, রাজ্যবাসীকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন এবং তাঁদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন।
প্রসঙ্গত বীরেন জে শাহ রাজ্যপাল থাকাকালীন যখন জেলায় জেলায় ঘুরে প্রশাসনিক বৈঠক শুরু করেছিলেন, তা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিল তৎকালীন বাম সরকার। নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর পর্বেও গোপালকৃষ্ণ গাঁধী প্রায়ই মুখ্যসচিব, পুলিশ প্রধানকে ডেকে পাঠাতেন। এম কে নারায়ণন মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিবকে ডেকেও রিপোর্ট নিতেন।
কিন্তু ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে যখন তলব করলেন, কিংবা টুইট করে লিখছেন, ‘রাজ্যে ভোট পরবর্তী হিংসা ও বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট দিতে ব্যর্থ, তাই অতিরিক্ত মুখ্যসচিব, মুখ্যসচিবকে তলব। এমনকি রাজ্যের ডিজি ও কলকাতার পুলিশ কমিশনার যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন, সেই রিপোর্টও কেন তাঁকে পাঠানো হয়নি। আবার সরকারের সমালোচনা করে লিখছেন, ‘সরকার নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে সরে আসছে। যখন রাজ্যে ভোটের পড়ে সবচেয়ে বেশি হিংসার ঘটনা ঘটছে, তখন রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানকে কোনও তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। এটা মেনে নেওয়া যায় না’। এসব থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি কেবল নিজের কর্তব্য থেকেই বিচ্যুত হন নি। তিনি এসব করছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবেই।
শপথবাক্য পাঠ করে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে যখন বললেন, অগ্রাধিকার কোভিডকে নিয়ন্ত্রণ করা। সব রাজনৈতিক দলের কাছে আবেদন, শান্তি, শৃঙ্খলা, সংহতি বজায় রাখা। যে কোনও অশান্তিতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তারপরও রাজ্যপাল কেন বলেন, ‘ভোট-পরবর্তী ভয়ানক হিংসার ঘটনা নিয়ন্ত্রণ প্রথম কর্তব্য। আশা করব, জরুরি ভিত্তিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে মুখ্যমন্ত্রী সব ধরনের পদক্ষেপ করবেন। এবং মুখ্যমন্ত্রী রাজভবন ছাড়ার পরেই ফের টুইট করে রাজ্যপাল বলছেন, ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনায় তিনি উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলার এ ভাবে ভেঙে পড়া এড়িয়ে যাওয়া চলবে না।
তাঁর এই আচরণের মধ্যেই তো বিতর্কের বীজ লুকিয়ে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যখন নিজে থেকেই কঠোর হাতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কথা জানালেন, তারপরও রাজ্যপালের ওই মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে নিছকই খোঁচাছাড়া আর কি হতে পারে। নির্বাচনের আগেও রাজ্যের এই সাংবিধানিক প্রধানকে দেখা গিয়েছে একাধিকবার সাংবিধানিক লক্ষণরেখা অতিক্রম করতে। তিনি প্রকাশ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করেন, মুখ্যমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রী ‘আগুন নিয়ে খেলছেন’ বলেও হুঁশিয়ারি দেন। এসব দেখেশুনে কি এটাই মনে হয় না যে, তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নির্বাচিত সরকারকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তিনি তাদের অসুবিধায় ফেলতে, তাদের বিরুদ্ধাচারণ করতে এবং পক্ষান্তরে কেন্দ্রে যারা ক্ষমতায় রয়েছে, তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতেই মোদি-শাহের নির্দেশ মেনে কাজ করছেন।
সোমবার নারদ কাণ্ডে তৃণমূলের দুই মন্ত্রী ও এক বিধায়ক গ্রেফতারের পর শহর কার্যত উত্তাল হয়ে ওঠে, বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ শুরু হয়, এমনকি নিজাম প্যালেসের সামনেও তৃণমূলের কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে পুলিশ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে রাজ্যপাল পরপর তিনটি টুইটে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মুখ্যমন্ত্রীর। ‘রাজ্যের এই পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন, মুখ্যমন্ত্রীকে আমি বলব, দয়া করে সংবিধান এবং আইন মেনে চলুন। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনুরোধ করব পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরকেও। এটা খুবই দুঃখজনক বিষয় যে, পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে দেখেও প্রশাসন এখনও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি’। পরেরটায় রাজ্যপাল লিখেছেন, ‘প্রতি মিনিটে অবনতি হচ্ছে পরিস্থিতির। অথচ পুলিশ এবং প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে, আশা করি এই ধরনের আইন-শৃঙ্খলাহীন পরিস্থিতির পরিণতি কি তা আপনি বোঝেন। এটি আসলে সাংবিধানিক পরিকাঠামোর ব্যর্থতা’। তৃতীয় টুইটে তিনি লেখেন, ‘টিভিতে এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনা দেখে আমি তাজ্জব। আমি এ ব্যাপারে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তিনি দেখুন, কী ভাবে এই সব ঘটনা ঘটতে দেখেও রাজ্য এবং কলকাতা পুলিশ স্রেফ দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। আমার অনুরোধ, রাজ্যে দ্রুত আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যবস্থা করুন’। ধনখড়ের এই টুইট কার্যত আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে।
এছাড়া সিবিআইকে অনুমতি দেওয়া কতটা যে ভুল তা এখানে উল্লেখ করার চেষ্টা করলাম। ভারতীয় সংবিধানের ১০৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ রাজ্যসভা/লোকসভার সাংসদ কিম্বা বিধানসভার বিধায়ক কিছু বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করে। সংবিধান তাদের জন্য এই ব্যবস্থা রেখেছে। এই ক্ষমতার নাম হলো, ‘ইমিউনিটি অ্যাগেনষ্ট ডিটেনশন’ বা ‘স্পেশাল প্রিভিলেজ’। কি বলে এই ১০৫ নং ধারা? এই ধারা অনুযায়ী, ‘রাজ্যসভা/লোকসভা/ বিধানসভা থেকে কোন মন্ত্রী বা সাংসদ বা বিধায়ক কে গ্রেপ্তার করা যাবে না, যতক্ষন না পর্যন্ত লোকসভা/রাজ্যসভা/বিধানসভার, চেয়ারম্যান/স্পিকার সেই অনুমতি দেন। এবং অবশ্যই গ্রেপ্তার এর ক্ষেত্রে দেওয়ানি মামলা চললে এটি বলবৎ, কিন্তু ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে নয়। এছাড়া সেশন শুরু হওয়ার বা শেষ হওয়ার ৪০ দিন আগে অথবা পরে, সেই জনপ্রতিনিধি কে গ্রেপ্তার করা যাবে না। না কক্ষের বাইরে থেকে না কক্ষের ভেতর থেকে। এ বিষয়ে স্পীকার/চেয়ারম্যান কে সবার আগে জানাতে হবে।’ (উল্লেখ্য যোগ্য ঘটনা: অংশুমালী এবং অন্যান্য বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার মামলা, ১৯৫২; শেখর তিওয়ারি বনাম উত্তর প্রদেশ সরকার মামলা, ২০০৯)
অন্যদিকে রাজ্যপালের অনুমোদনেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ১৬৩ ও ১৬৪ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে সিবিআইকে প্রয়োজনে গ্রেফতারির সম্মতি দিয়েছেন রাজ্যপাল। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে বিজেপি নির্বাচনে হেরে যাওয়াতেই প্রতিহিংসামূলক এই কাজ। বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ভিত মজবুত করার চেষ্টা চালাছে বিজেপির পেটোয়া ধনখড়।
খুব সঠিক বক্তব্য
বাংলাকে তছনছ করার জন্য মোদি-শাহরা ওকে লাগিয়ে রেখেছে, পদ্মপাল বাবু কথা না শুনলে চাকরি হারাবেন, কিন্তু উনি
তো পুরোপুরি ব্যর্থ।
পদ্মপালের উদ্দেশ্য খুব সুন্দর করেই যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন,এবার এঁকে রাজ্যছাড়া করার ব্যবস্থাটা করা দরকার।
তিনি যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে মেনে নিতে পারছেন না সেটাই আসল কথা, তার জন্যই দিল্লির নির্দেশে
সংবিধানের অপব্যবহার করছেন।
প্রথমদিকে নিজেকে জোকার বানিয়েছিলেন, তারপর বোঝা গেল উনি বিজেপির পেটোয়া লোক, তাদের নির্দেশেইকাজ
করছেন। তাঁকে আর রাজ্যপাল ভাবা যাচ্ছেনা। ঠাট্টা বিদ্রুপ অনেক হয়েছে এবার রাজ্যছাড়া করার ব্যবস্থা নিতে হবে।