কৃষকদের জন্য বাজার। উৎপাদিত ফসল সরাসরি বিক্রির জন্য বিশেষ বাজার। নাম দেওয়া হয়েছে কিষাণমাণ্ডি। এখানে কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল এনে ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে বর্তমান চিত্রটা একটু অন্যরকম। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলাতেই তা স্পষ্ট। তিনি বাঁকুড়ার এক সভায় স্পষ্ট বলেন, ‘কিষাণমাণ্ডিতে চাষিদের ঠকানো হচ্ছে। বরদাস্ত করব না।’এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। ইন্দপুর ব্লকের হাটগ্রামের বাসিন্দা অশ্বিনী পূজারু ৪০ কুইন্ট্যাল ধান বেচতে গিয়েছিলেন কিষাণমাণ্ডিতে। চার মাস ঘুরেও ধান বেচতে পারেননি। শেষপর্যন্ত আড়তদারের কাছে কম দামে ধান বেচে আসেন। আবার বিষ্ণুপুরের বাবলু হেমব্রম ও দেবাশিস পালুইরা গিয়েছিলেন কিষাণমাণ্ডিতে ধান বেচতে। কিন্তু এখানে ওজন যন্ত্রে গরমিল ধরে ফেলেছিলেন। কিষাণমাণ্ডির এই সমস্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। যারা এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
এখন মানুষের মনে প্রশ্ন গরীব মানুষের পাশে দাঁড়াতে একের পর এক জনমুখী প্রকল্প চালু করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে নিচুতলার কিছু কর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে। এটা ভাবতে অবাক লাগছে।

প্রসঙ্গত, ‘মা মাটি মানুষ’-এর সরকার আসার পর কৃষকদের অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং চাষে উৎসাহ বাড়াতে অভিনব পন্থা সরকার গ্রহণ করেছে। রাজ্যে দালাল বা অসৎ আড়তদারদের হাত থেকে রক্ষা পেতে, এজন্য প্রতি ব্লকে গড়ে তোলা হয়েছে কিষাণমাণ্ডি। এই কিষাণমাণ্ডিতে কৃষকরা চাইলেই ঘর পাবেন। তার বিনিময়ে সামান্য ভাড়া দিয়ে উৎপাদিত পণ্য রোজ বিক্রির সুযোগ পাবেন। সরকারের একটাই লক্ষ্য, কৃষকদের উন্নতি ঘটাতে পারলে রাজ্য তথা সমগ্র দেশের অর্থনৈতিক শিরদাঁড়া মজবুত হবে।রাজ্য সরকার কৃষকদের কথা ভেবে এই বিশেষ বাজার গড়ে তুলেছে। রাজ্য জুড়ে ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে তিনশো কিষাণমাণ্ডি গড়ে তুলেছে সরকার। যাতে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য কৃষকদের উপর বিশেষ নজর দিচ্ছে রাজ্য সরকার। সহায়ক মূল্যে ধান কেনা অনেকদিন আগে থেকেই শুরু হয়েছে। আলু চাষিদের জন্য পরিবহনে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এছাড়াও বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি, খরা, পোকামাকড়ে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হলে চাষিদের এককালীন অর্থ ও কৃষি সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া শস্য বীমাও চালু হয়েছে। এরপরেও চাষিদের ঠকানো হচ্ছে। এসব বরদাস্ত করব না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় স্পষ্ট যে, কিষাণমাণ্ডিগুলো স্বচ্ছতা বজায় রেখে চলুক। এরজন্য চাষিদের সচেতন থাকতে হবে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, কিষাণমাণ্ডিতে চাষিরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল রেখে দাম উঠলে কেনাবেচা করতে পারেন সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন রাখার ফলে ফসল যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য নতুন ৮৮টি কিষাণমাণ্ডিতে হিমঘর তৈরির কাজও চলছে। সবজি যাতে নষ্ট না হয়, দীর্ঘদিন রেখে বিক্রি করতে পারেন কৃষকরা, সেই ব্যবস্থাও থাকছে।

এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, অধিকাংশ কিষাণমাণ্ডিতে রাজনৈতিক নেতাদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ। ঘর নিতে গেলে নেতাদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। এমনকি উৎকোচও গ্রহণ করছে এরা। এটা মেনে নেওয়া যায় না। এটা প্রশাসনকে দেখতে হবে। কৃষকদের আরও অভিযোগ, কিষাণমাণ্ডিতে যে সমস্ত ঘর আছে, সেগুলো যাতে কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদিত পণ্য রেখে বিক্রি করতে পারেন সেটা আগে দেখা দরকার সরকারের। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার উল্টো চিত্র। এখনও নেতা – কর্মীদের দখলদারিতে অনেক কিষাণমাণ্ডি। ফলে কৃষকরাই বঞ্চিত হচ্ছেন। এটা সরাসরি প্রশাসন হস্তক্ষেপ না করলে রাজ্য সরকারের স্বপ্ন বিফলে যাবে।
এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন মানুষের হয়রানি কমাতে প্রতিটি কিষাণমাণ্ডিতে তিনটি করে খাতা রাখতে হবে। যাদের ধান তৎক্ষণাৎ কেনা সম্ভব হয়নি, তাদের নাম থাকবে লাল খাতায়। সবুজ খাতায় থাকবে ধান কেনা হয়েছে এমন চাষিদের নাম। আর আড়তদারদের নাম থাকবে হলুদ খাতায়। প্রতিটি কিষাণমাণ্ডিতে সিসিটিভি, ধান মাপার যন্ত্রের নিয়মিত পরীক্ষা এবং সেই সঙ্গে পুলিশের সারপ্রাইজ ভিজিট। তিনি কিষাণমাণ্ডি নিয়ে এও বলেন,’ আমি কথা শুনতে চাই না। অ্যাকশন চাই। এরমধ্যে দুর্নীতির সঙ্গে কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে হবে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই সদর্থক ভূমিকায় যারপরনাই খুশি কৃষকরা। এ থেকেই স্পষ্ট রাজ্যে কৃষি সচেতনতায় এগিয়ে আসতে হবে কৃষকদের। তাই বলতেই হয় ‘জাগো কিষাণ জাগো ‘।