আবহমানকাল ধরে মানুষের মনের গভীরে মুদ্রিত হয়ে আছে মাতৃভাবনা। মানবশিশুর মুখের প্রথম অর্থময় শব্দ হলো ‘মা’। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে এই ‘মা’ আমাদের প্রতিপালন করছেন অন্তহীন স্নেহ-মমতায়। তাই মানুষের মন প্রথমে মা-কে পেয়েছে, পরে পিতা-কে।
মানুষ যখন প্রাগৈতিহাসিক যুগের পুরাপ্রস্তর থেকে নব্যপ্রস্তর পর্বে পদার্পণ করল, কৃষির মাধ্যমে শস্য উৎপাদন করতে শিখল, তখন তার গর্ভধারিণী মাতা একাত্ম হয়ে গেলেন পৃথ্বীমাতার—সঙ্গে কারণ মাটি-মা তাঁকে বেঁচে থাকার জন্য শস্য-সম্পদ দিচ্ছেন। বিশ্বপ্রত্নতত্ত্ব অধ্যয়নে জানা গেছে অস্ট্রিয়ার উইলেনডর্ফ-এ এবং ফ্রান্সের লসেল-এর ভাস্কর্য শিল্পের আদিমাতা একাধারে গর্ভধারিণী ও পালয়িত্রী। ভারতীয় উপমহাদেশের সময়-সারণীতেও একই মন, একই চিত্র। প্রাক্-হরপ্পীয় বেলুচিস্তানের নিন্দওয়ারি এবং কুল্লিতে আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তুগুলির মধ্যে পাওয়া গেছে প্রজনন ও পালিকাশক্তির প্রতীক এক বিশ্বজনীন মাতৃশক্তিকে। হরপ্পা যুগে অমূর্ত ও মূর্ত প্রতীকের মধ্যেও মাতৃভাবনার চিহ্ন সুস্পষ্ট। কিছু পরিবর্তন দেখা গেল পরবর্তী বৈদিক যুগে, যেখানে পিতৃ-দেবতার প্রাধান্য লক্ষ করার মতো। কিন্তু বৈদিক আর্যরা স্ত্রী-দেবতার গুরুত্ব সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন এবং কালের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সে যুগেও স্ত্রী-দেবতার প্রাধান্য বেড়ে যায়। প্রথম বৈদিক গ্রন্থ ঋক্বেদে বাক্ নাম্নী দেবীকে জীবন বা সৃষ্টির মূল উৎসরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর যজুর্বেদ এবং বিভিন্ন ব্রাহ্মণ ও উপনিষদ গ্রন্থগুলিতে বৈদিক ও অবৈদিক সাংস্কৃতিক উপাদানের সমন্বয়ে এক কেন্দ্রীয় স্ত্রী-দেবতার ক্রমিক উত্থানের চিহ্ন সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পথেই আরও পরবর্তী সময়ের গুপ্তযুগে, অন্যান্য ভক্তিকেন্দ্রিক ধর্মসম্প্রদায়ের সঙ্গে মাতৃশক্তিকে কেন্দ্র করে এক বিশিষ্ট সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। প্রাণশক্তির আধার হিসাবে তিনি মহাদেব-ভার্যা, শক্তিদেবী ও মহাদেবী নামে সুপরিচিতা। এ ছাড়াও লোকায়ত সংস্কৃতির অসংখ্য স্ত্রী-দেবতা এই মহা মাতৃ-দেবতায় মিশে তাঁর নাম ও রূপের বৈচিত্র্যকে বাড়িয়েছেন। এই মহাদেবীই হলেন দেবী দুর্গা।
জগজ্জননী দেবী দুর্গার আলোচনার ক্ষেত্র সমীক্ষায় এ দেশের বেদাদি শাস্ত্র, পুরাণ, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিল্পশাস্ত্র এবং ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক ভাবনার মিলন ও সংঘাতের এক বিস্তৃত পটভূমি দেবীমাতার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধ্যাত্মিকতার ঊর্ধ্বে উঠে রসজ্ঞ শিল্পীমানসের এক সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি এই প্রদর্শনীর মূল উপজীব্য।
দেবী দুর্গার দুই প্রধান রূপ : অমূর্ত ও মূর্ত। আদিরূপ হিসাবে দেবীর অমূর্ত প্রতীকের নিদর্শন পাওয়া গেছে মহেঞ্জোদড়োয়। সুদূরবর্তী সেই সময় থেকে আজও কোনও কোনও স্থানে তিনি প্রতীকের মাধ্যমে পূজিতা হন। সাহিত্যগত সাক্ষ্য (লিঙ্গপুরাণ) এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও সপ্তম শতাব্দীতে চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙ তার ভ্রমণবৃত্তান্ত সি-ইউ-কি-তে প্রাচীন গান্ধার প্রদেশের কেন্দ্রস্থলে মহেশ্বর-পত্নী ভীমাদেবীর (দেবী দুর্গা) মন্দিরের উল্লেখ করেছেন। মহাভারতেও প্রাচীন ভীমাস্থান বলে এক পীঠের উল্লেখ আছে। এই মন্দিরে দেবীর কোনও প্রতিমা বা মূর্তি ছিল না, ছিল প্রকৃতিসম্ভূত শিলাময় এক অমূর্ত প্রতীক। হিউয়েন সাঙ আরও জানিয়েছেন যে এই শক্তিপীঠ ছিল সারা ভারতের দেবী-উপাসকদের অবশ্য দ্রষ্টব্য একটি তীর্থস্থান। অনুমান করা হয়, সপ্তম শতকের এই প্রসিদ্ধ শক্তিপীঠের অন্তত দু-তিনশো বছর আগে থেকেই ভারতবর্ষে পীঠপূজার প্রচলন হয়।
দেবী দুর্গার মূর্ত রূপের সংখ্যা অগণ্য। সাহিত্য ও শিল্পসূত্র অনুযায়ী এর দুটি প্রধান ভাগ—সৌম্য বা শান্ত রূপ এবং উগ্রা বা করালবদনা রূপ। শান্ত রূপেরশিল্পিত নিদর্শন হলেন দুর্গা, চণ্ডী, গৌরী, পার্বতী, উমা, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রমুখ দেবী। উগ্রা করালবদনা হলেন মহিষমর্দিনী, চামুণ্ডা ও তাঁর বিভিন্ন রূপ এবং চৌষট্টি যোগিনী শ্রেণির অধিকাংশ যোগিনী। ঠিক কোন সময় থেকে দেবী দুর্গার রূপভেদের সূচনা হয়েছিল তা বলা কঠিন। কিন্তু একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, গুপ্তযুগের সূচনা থেকে দেবীর মূর্তিভেদের প্রবণতা বেড়ে চলে এবং দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে এই ভেদের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি দাঁড়ায়। সংখ্যাবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো উচ্চবর্গীয় সমাজে প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় দেবীর সঙ্গে তাদের বিভিন্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপাস্যা মাতৃদেবতার একাত্ম হয়ে যাওয়া।
মহাদেবীর প্রধানতম রূপ পার্বতী (নামান্তরে গৌরী, উমা, দুর্গা ও চণ্ডী), যিনি মহাদেবের পত্নী ও সৃষ্টিশক্তির আধার। প্রতিমা শিল্পে তিনি নানাভাবে চিত্রিতা—কখনও স্বতন্ত্রা, কখনও পতির সঙ্গে, কখনও সৌম্যমনা, কখনও-বা উগ্রমূর্তি। আবার অনেক সময় তিনি অম্বা বা জগন্মাতারূপেও বর্ণিত হয়েছেন। দেবীর আবার ভিন্ন ভিন্ন বাহন—সিংহ, গোধা ও মৃগ। বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত পেশোয়ার অঞ্চল থেকে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের এক স্বর্ণপদকে দেবী শিবজায়া পার্বতী হিসাবে মহাদেবের পশুরূপ বৃষের সঙ্গে উপস্থিত। আবার কাছাকাছি সময়ের এক মুদ্রা-নিদর্শনে পাওয়া যায় সিংহবাহনা দেবীকে। প্রসন্নবদনা দেবী সাধারণত চতুর্ভুজা, তবে দ্বিভুজ ও অষ্টবাহু রূপের মূর্তিও বিরল নয়। শিবজায়া হিসাবে তিনি ত্রিনয়নী। বিভিন্ন প্রহরণের মধ্যে তাঁর হাতে দেখা যায় চক্র, ত্রিশূল, কমণ্ডলু, শঙ্খ, বজ্র, ধনুতূনীর, খড়গ, ঘন্টা, ঢাল ও দণ্ড। আবার আর্যতের বা অন্যান্য সংস্কৃতির দেবী মূল কেন্দ্রীয় মহাদেবী দুর্গার সঙ্গে মিশে যাওয়ার ফলে কখনও কখনও তিনি সর্বাণী, কল্যাণদেবী, ভুবনেশ্বরী এবং ললিতারূপেও আর্বিভূতা।

মহাদেবী দুর্গার সর্বাধিক পরিচিত শান্ত রূপ হলো লক্ষ্মী বা শ্রীলক্ষ্মী। শ্রীশ্রীচণ্ডীর ভূমিকাপর্বে ও বৃহৎনারদীয় পুরাণ ইত্যাদি গ্রন্থে মহাদেবী দুর্গা নিজেই বলছেন: শ্রীলক্ষ্মী তাঁরই অন্য রূপ। এ ছাড়াও স্বামী প্রজ্ঞানানন্দের ‘মহিষাসুরমর্দিনী তত্ত্ব’ ও স্বামী অচ্যুতানন্দর ‘শ্রীশ্রীদুর্গা তত্ত্ব ও কাহিনী’ একই সাক্ষ্য বহন করে। ধনৈশ্চর্য ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী এই দেবী শুধু হিন্দুদের নন, বৌদ্ধ ও জৈনদেরও বিশিষ্ট আরাধ্যা দেবী। প্রাগৈতিহাসিক যুগে তিনি রূপভেদে আদিমাতা ও পৃথ্বীমাতা। এই লোকায়ত দেবী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চবর্ণের দেবমণ্ডলে স্থান পান। প্রাচীনত্বের বিচারে তাঁর সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋক্বেদে। মহাকাব্য ও পুরাণের কিংবদন্তি অনুসারে দেবতা ও অসুরের সমুদ্রমন্থনের সময়ে তিনি সমুদ্র থেকে দেবীরূপে উঠে এসেছিলেন। পরবর্তী সময়ে শ্রীলক্ষ্মী পত্নী হিসাবে বিষ্ণুর সঙ্গে সংযুক্তা হন।
দেবী সরস্বতী কিন্তু দেবী লক্ষ্মীর মতো আদিমাতা ও পৃথ্বীমাতার রূপভেদ নন। ঋক্বেদে তিনি প্রধানত নদী হিসাবে বহুল উল্লিখিত। সরস্বতী নদীর তীরে বৈদিক ঋষিরা বেদপাঠ করতেন ও বিদ্যাচর্চা করতেন—ফলে একদিন এই দেবীনদী হয়ে গেলেন বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। মহাকাব্য, পুরাণ ও বিভিন্ন সাহিত্যগ্রন্থে দেবী সরস্বতীর বর্ণনা নিম্নরূপ : ‘তিনি বিষ্ণুর বাম পার্শ্বে প্রদর্শিত, দুধ বা কুন্দফুলের মতো তিনি শ্বেতবর্ণা, কমনীয় কান্তি, শ্বেতাম্বরা, সর্বাভরণভূষিতা, বীণা-পুস্তক-অক্ষসূত্র-পদ্মাদি তাঁর লাঞ্ছন, শ্বেতপদ্মাসীনা, হংস তাঁর বাহন। তিনি দ্বিভুজা কিংবা চতুর্হস্তা, সমপদভঙ্গিতে দাঁড়ানো অথবা পদ্মাসনে উপবিষ্টা।’ সরস্বতী শুধু বিদ্যার নন, নৃত্যগীতাদিরও অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
মহাদেবীর উগ্ররূপের মধ্যে মহিষাসুরমর্দিনী বা মহিষমর্দিনী শীর্ষস্থানীয়া। নামেই প্রকাশ যে, তিনি মহিষরূপী এক অসুরকে তিনি মর্দন অর্থাৎ নিহত করেছিলেন। সংগ্রামের সময় তাঁর সঙ্গে ছিল বাহন সিংহ। মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য খণ্ডে (৮২ অধ্যায়) উল্লিখিত আছে “মহিষাসুরের অত্যাচারে পীড়িত দেবতারা মধুসূদন ও মহাদেবের শরণাপন্ন হলে তাঁরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তেজ বিচ্ছুরণ করতে লাগলেন। সেই সঙ্গে ব্রহ্মার মুখমণ্ডল থেকেও তেজোরাশি বিনির্গত হতে লাগল। এই তিন দেবতা ও অন্যান্য দেবতার বিচ্ছুরিত তেজোরাশি পুঞ্জীভূত হয়ে দেখা দিলেন এক আলোকসামান্যা নারী—‘অতুলং তত্র তত্তেজঃ সর্বদেবশরীরজম্। একস্থং তদভূন্নারী ব্যাপ্তলোকত্রয়ং ত্বিষা।’এই নারীই সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের শক্তিভূতা সনাতনী দেবী মহামায়া, মহিষাসুরনাশিনী পরমারাধ্যা দেবী দুর্গা।” আবির্ভাবের পর দেবীকে বিশেষ প্রহরণ ও বসনভূষণ দান করেনদেবতারা। এর পর প্রচণ্ড সংগ্রামের শেষে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করলে দেবলোকে শান্তি স্থাপিত হয়।
মার্কণ্ডেয় পুরাণের এই সুবিদিত কাহিনি সুপ্রাচীনকাল থেকে ভাস্কর্যে ও চিত্রে রূপায়িত হয়ে এসেছে। অনেক শিল্প-ঐতিহাসিক আবার মহিষমর্দিনী দেবী দুর্গার সঙ্গে প্রাচীন গ্রিসের যুদ্ধের দেবী অ্যাথিনা এবং পশ্চিম এশিয়ার অ্যাসিরিয়ান ইষতার দেবীর আত্মীয়তা খুঁজে পেয়েছেন। কেউ-বা বলছেন মহাদেবী দুর্গা আদিতে বিদেশিনি, পরে ভারতীয় হয়ে শিবের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছেন। কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়। এই সৌসাদৃশ্যকে বলা যেতে পারে আন্তঃ-সাংস্কৃতিক বা ইন্টার কালচারাল স্টাইল যার উৎপত্তির মূলে আছে একাধিক প্রতিবেশী রাজ্যের মানুষের একই বা প্রায় একই ধরণের ভাবনাচিন্তা ও রূপকল্পনা। কেননা দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় সহস্রকের গ্রিস, পশ্চিম এশিয়া ও ভারতবর্ষকে নিয়ে একটি বিরাট সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল।
শিল্পশাস্ত্র অনুযায়ী মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় রূপটি খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের আমলে প্রথম অভিব্যক্ত হয়েছিল। সেখানে দেখা যায় দেবী চতুর্হস্তা, মূল বাম হাত দিয়ে মহিষের গলা টিপে ধরছেন বা তার জিভ টেনে বের করছেন। ডান হাত মর্দনের ভঙ্গিতে পশুটির পিঠে রেখেছেন, অন্য দু-হাতে তাঁর ত্রিশূল ও খেটক। কিঞ্চিৎ কুঁজো হয়ে তিনি মহিষটিকে দু-পায়ের উপরে সংস্থাপিত করেছেন।
বাস্তব রূপায়ণ ও সংস্থানের বিচারে মহিষমর্দিনী দুর্গার মূর্তিবৈচিত্র্য অসাধারণ। বিভিন্ন নিদর্শনে তাঁর হাতের সংখ্যা দুই থেকে বত্রিশ পর্যন্ত প্রসারিত। তবে কালক্রমে তাঁর দশুভুজা রূপটিই আদর্শ ও জনপ্রিয় হয়ে দাঁড়ায়। আবার মহিষাসুরের রূপায়ণেও পার্থক্য চোখে পড়ে। মহিষাসুর কখনও পূর্ণাঙ্গ মহিষাকৃতি, কখনও তাঁর দেহ মানুষের—মুখ মহিষের, কখনও বা তিনি বিছিন্নশির—পশুস্কন্ধ থেকে কুপিত মানুষরূপে বেরিয়ে আসছেন। কখনও তাঁর পশুমুণ্ড দেবীর পায়ের তলায় অবস্থিত এবং কখনও তিনি পূর্ণাবয়ব নরাকৃতিতে দেবীর সঙ্গে যুদ্ধরত।
বঙ্গদেশের দুর্গাপূজা, অর্থাৎ লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিকসহ দশভুজা মহিষমর্দিনী দুর্গার রূপকল্পনার প্রাচীনত্ব খুব বেশি নয়। ষোড়শ শতকের কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল-এ লক্ষ্মী গণেশসহ দশভুজা চণ্ডিকা বা অম্বিকা পূজার ইঙ্গিত আছে, যদিও দুশো/আড়াইশো বছর আগে এই রূপমূর্তির নিয়মিত পূজার্চনা শুরু হয়েছিল, প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিমার নিদর্শন থেকে জানা যায়।
শুধু মহাদেবী দুর্গা নন, মাতা পরিচয় নিয়ে আরও একাধিক দেবী হিন্দু ঐতিহ্যে ও প্রতিমাশিল্পে আত্মপ্রকাশিতা। বৃহৎসংহিতা থেকে জানা যায় ‘মাতৃকা’ নামে সাত জন দেবী রূপায়িত হয়েছেন। এ ছাড়াও ঋক্বেদ, মহাভারত ও অন্যান্য সাহিত্যগ্রন্থেও তাঁদের উল্লেখ আছে। শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য অনুসারে তাঁরা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর-এর শক্তি। এঁরা হলেন ব্রহ্মাণী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, ইন্দ্রাণী, বারাহী ও চামুণ্ডা।
মহাদেবীর দশপ্রকার রূপের একত্র নাম দশমহাবিদ্যা—কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দশমহাবিদ্যার রূপকল্পনায় বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ মূর্তিতত্ত্বের প্রভাব আছে। আবার বৌদ্ধ দেবী তারা বা তারিণীর ধ্যানধারণার উৎস যে হিন্দু বা ব্রাহ্মণ মহাদেবী দুর্গা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
দশমহাবিদ্যার প্রথমা ও অন্যতম রূপ দেবী কালী বা কালিকা। তিনি নানা নামে পরিচিতা—ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, শ্মশানকালী; আবার স্থানের নামানুসারে ঢাকেশ্বরী, যোগেশ্বরী, ভুবনেশ্বরী, রণচণ্ডী, জয়চণ্ডী ও গড়চণ্ডী; আবার অন্য নামে তারা, আনন্দময়ী, করুণাময়ী ও ভবতারিণী। ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ-সংকলিত তন্ত্রসার-এর কালীতন্ত্রের ধ্যান থেকে জানা যায়, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন শিবের ওপর। তিনি দিগ্বসনা, মুক্তদেহী, করালবদনা, মুণ্ডমালা-বিভূষিতা, ঘন মেঘের মতো শ্যামবর্ণা, উপরের ডান হাতে অভয় ও নীচের ডান হাতে বরদ মুদ্রা, উপরের বাম হাতে খড়্গ ও নীচের বাম হাতে সদ্য-ছিন্ন নরমুণ্ড এবং তাঁর রক্তলুব্ধ জিহ্বা বেরিয়ে আছে; কখনও কখনও তার কোমরেও মানুষের কাটা হাতের মালা। শ্রীরামকৃষ্ণের উপাসিতা দক্ষিণেশ্বরমন্দিরের কালীর(ভবতারিণী) ঠিক এই রূপ। কোমল ও কঠোরের এমন আশ্চর্য সমন্বিত রূপের মাতৃ-প্রতিমা বিশ্বের মূর্তিশিল্পে অনন্য ও অদ্বিতীয়।
রানি রাসমণির ভক্তি ও বিশ্বাসের জ্বলন্ত প্রমাণ দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির। সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য দিয়ে দেবীকে মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী করে তুলেছিলেন। মাতৃদর্শনেই শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম সিদ্ধি। ঠাকুর বলছেন, “ঐরূপ অসহ্য যন্ত্রণার সময়ে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িতাম এবং ঐরূপ হইবার পরেই দেখিতাম—মার বরাভয় করা চিন্ময়ী মূর্তি—দেখিতাম মূর্তি হাসিতেছে—কথা কহিতেছে—অশেষ প্রকারে সান্ত্বনা ও শিক্ষা দিতেছে।” (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ—‘ব্যাকুলতা ও প্রথম দর্শন’)।
কিন্তু এখানেই শ্রীরামকৃষ্ণ থেমে থাকেননি। ধর্মসংঘাতের যুগে ‘সমন্বয়াবতার’ রূপ তাঁকে গ্রহণ করতে হয়। শুরু হয়েছিল ‘সর্বধর্ম গহন-পথে’ তাঁর যাত্রা—মা-ই যার দ্বার খুলে দিলেন। কিন্তু মা ভবতারিণী শ্রীরামকৃষ্ণকে কেবল সাকার উপাসনায় আবদ্ধ রাখেননি। শ্রীরামকৃষ্ণ মায়ের ইচ্ছাতেই অদ্বৈত অনুভূতি লাভ করলেন। ধর্মরাজ্যে দিগ্বিজয়ী সম্রাট, মহাসাম্যের ধ্বনি উদ্গাতা, বিশ্ব মানবতার প্রতিনিধি শ্রীরামকৃষ্ণকালীর সন্তান। তিনি কালীর অবতার, কারণ শক্তিরই অবতার হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের দেহান্তের পরে শ্রীমা সারদা তাঁর উপরে আছড়ে পড়ে কেঁদে বলেছিলেন, ‘মা কালীগোতুমি কী দোষে আমায় ছেড়ে চলে গেলে।’
দক্ষিণেশ্বর শিব ও শক্তির মিলনক্ষেত্র। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে তার প্রভাব ও প্রকাশ সর্বদাই পরিলক্ষিত। এখানেই সাধনকালে শ্রীরামকৃষ্ণ এক গ্রাম্য নারীর বেশে শ্রীমা সারদাকে তাঁর লীলাসঙ্গিনী হিসাবে পেয়েছিলেন। সারদাদেবীর দক্ষিণেশ্বরে আগমন ও অবস্থানে শিব ও শক্তির জীবন্ত রূপ শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছিল। ১৮৭৩ সালের মে মাসে ফলহারিণী কালী পূজার রাত্রিতে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর লীলাসঙ্গিনী মা সারদাকে ষোড়শীদেবীরূপে পূজা করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ যেন বলতে চেয়েছেন: আমি স্ত্রীকে ষোড়শীদেবীরূপে পূজা করে সমযগ্র নারীজাতিকে চরম মর্যাদা দিয়েছি। আমি সারদার ভিতর দেবীত্ব জাগিয়ে আমার সাধনলব্ধ ফল ওর ভিতর উৎসর্গ করেছি। এর ফলে জগতে মাতৃভাব প্রকাশিত হবে।
শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন—
‘ও (শ্রীমা) সারদা—সরস্বতী, জ্ঞান দিতে এসেছে। রূপ থাকলে পাছে অশুদ্ধ মনে দেখে লোকের অকল্যাণ হয়, তাই এবার রূপ ঢেকে এসেছে।’
‘ও জ্ঞানদায়িনী, মহাবুদ্ধিমতী। ওকি যে সে! ও আমার শক্তি।’
‘ঐ যে মন্দিরে মা (ভবতারিণী) রয়েছেন, আর এই নহবতের মা (শ্রীমা)—অভেদ।’
ভগিনী নিবেদিতা জগজ্জননী ‘মা’ সম্বন্ধে বলছেন,
‘সর্ববস্তুতে বিরাজমান মাতা তিনি
তাঁকে নমস্কার।
যাঁকে মহামায়া বলে জগৎ ঘোষণা করে
তাঁকে নমস্কার।
তুমি দাও সকল আশীর্বাদ,
তুমি দাও সকল শক্তি,
তুমি দাও সকল বাসনা
তুমি পরম করুণাময়ী,
তোমাকে নমস্কার, নমস্কার।
তুমি মহারাত্রি, তুমি মোহরাত্রি
তুমি মৃত্যুযাত্রী—ভয়ঙ্করী।
তোমাকে নমস্কার—নমস্কার—নমস্কার।’
Pix Collection : Mark Baron on Collecting Early Lithograph Prints of Hindu
Osadharon ekti lekha porlam. Shikhlamo onek kichhu.
Excellant prsentation about Mother God.I have certain point to clarify about ” Shiva jaya hisabe trinayana ” .Third eyes are given / imagined to very powerful God(s) and Goddess(s) . Durga and Kali posses that quality of themselves.