জাহানারা ইমাম হলেন বাঙালির চেতনার অহংকার। রুমি-জামির মা থেকে শহিদ জননী রূপে তাঁর উত্তরিত হওয়ার গোটা পর্যায়ক্রমটিই হলো, বাঙালির রক্তে ভেজা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সশব্দ পদধ্বনি। সেই শব্দকে তিনি বাংলায় স্থাপন করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃনির্মাণের ক্ষেত্রে। হাজার বছরের সেরা বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবারে শাহাদাত বরণের পর, বাংলাদেশে যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল, তা হয়ে উঠেছিল, কার্যত পাকিস্তানের একটি ছায়া উপনিবেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অবরুদ্ধ করে, সেই চেতনাকে পর্যবসিত করা হয়েছিল দেশভাগের কালের মুসলিম জাতীয়তাবাদের ফেলে আসা ধ্যান ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে। সেই ধারণার মূলে স্থাপিত ছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাবিরোধী একটা অভিঘাত।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনি মেজর চক্রের ক্রীড়নক, খুনি খোন্দকার মোশতাক প্রথম বাতিল করেছিল, স্বাধীন বাহাত্তরের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে। বাংলাদেশকে আবার পাকিস্থানের লেজুরবৃত্তিতে সংযুক্ত করবার ক্ষেত্রে এদের সবথেকে অন্তরায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যে চেতনার মূল মন্ত্র ই ছিল সম্প্রীতি আর ধর্মনিরপেক্ষতা। এই অপকর্ম করবার উদ্দেশে রাজাকার পুনর্বাসনকারী জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে দিতে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র কে ব্যবহার করতে শুরু করে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাংলাদেশের মানুষের ভিতরে ধরে রাখতে সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, কলিম শরাফি, শওকত ওসমানেরা শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার আগেই যে লড়াই শুরু করেছিলেন, সেই লড়াইকে একটা নির্দিষ্ট ধারণমন্ত্রে উপনীত করতে পেরেছিলেন শহিদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর মুক্তিযুদ্ধের টেস্টামেন্ট, ‘একাত্তরের দিনগুলি’-র ভিতর দিয়ে।
জাহানারা ইমামের এই ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়া ইতিহাসের পুনর্নিমাণ, ‘একাত্তরের দিনগুলি’ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভিত্তিভূমি প্রস্তুতেও একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলনের নেতৃত্ব জাহানারা ইমাম দিয়েছিলেন, দলীয় রাজনীতির আবর্তের বাইরে রাজনৈতিক- সামাজিক আন্দোলনের এমন সমন্বিত ধারা কেবল বাংলাদেশে তো বটেই, গোটা বিশ্বের নিরিখে বিরল।

বঙ্গবন্ধু শহিদ হওয়ার পর কার্যত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে প্রকাশ্য কথা বলার ক্ষেত্রে সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমানের মত দু’ একজন মানুষ ই প্রকাশ্য ভূমিকা রাখতেন। এরশাদের পতনের পর যে নিরাবাচন হয়, সেখানে খালেদা জিয়া জিতে দেশের রাষ্ট্রপতি করে একাত্তরের ঘাতক দালাল, বরিশালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের শান্তি কমিটির প্রধান আবদুর রহমান বিশ্বাসকে। ব্যক্তি জীবনে সে ছিল ওয়ার্কাস পার্টির নেতা, অধুনা ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে নিন্দিত রাশেদ খান মেননের নিজের ভগ্নিপতি। তাই একদা চিন পন্থী এবং মস্কো পন্থী বামপন্থী রাজনীতিকেরা ও ঘাতক দালালদের শাস্তি ঘিরে আন্দোলনে খুব একটা আন্তরিক ছিল না।
এই সামগ্রিক টানাপোড়েন কে মাথায় রেখেই সব সম্ভবের দেশ, বাংলাদেশে ঘাতক দালাল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারৃর দাবিতে প্রথমে সুফিয়া কামালের মতো মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে, ‘গণতদন্ত কমিশন’ তৈরি করেন জাহানারা ইমাম। মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের সার্বিক অপকর্মের এমন তথ্যানুগ প্রতিবেদন আগে বাংলাদেশে কখনো তৈরি হয় নি। এরপর গণ আদালত।
খালেদা জিয়ার সরকার গণ আদালত সংগঠিত করবার দায়ে জাহানারা ইমাম, শামসুর রাহমান, দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, কলিম শরাফি, কবীর চৌধুরী, সৈয়দ হাসান ইমাম প্রমুখের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা পর্যন্ত এনেছিল। বস্তুত ‘৯৪ এর ২৬ শে মার্চ শহিদ জননীর জীবনাবসান কালে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা বলবৎ ছিল।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পাকিস্থানের সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করে, সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন কে চাপে ফেলার ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগের রাজনীতির প্রয়োগে সেদিন তৎপর ছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে, গণতন্ত্রের মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বাধীন লড়াই, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে একটা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।
‘৯২ সালের ২৬ শে মার্চের গণ আদালত যখন অনুষ্ঠিত হয়, সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। যুদ্ধাপরাধী, ঘাতক দালালদের পুনর্বাসনের ভিতর দিয়ে পাকিস্থান আর আমেরিকার অবাধ মৃগয়া ভূমি হিশেবে গোটা বাংলাদেশকে হাঁড়ি কাঠে ঝোলানোর তাই সবরকম চেষ্টা খালেদা জিয়া করেছিল। এই প্রচেষ্টাকে থমকে দেয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়, যুদ্ধাপরাধী, ঘাতক দালালদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ।
লেখক প্রাবন্ধিক ও গবেষক। দীর্ঘকাল অন্নদাশঙ্কর রায়ের সাহিত্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশা জীবনকেও নিবেদিত করতে চান সম্প্রীতির স্বার্থে।