নাটক তথা অভিনয়শিল্পে যাঁদের গভীর অভিনিবেশ, যেমন দেবনারায়ণ গুপ্ত, তাঁরা বাংলা রঙ্গমঞ্চের অভিনয়ের ধারাকে খানিকটা সহজ করে বলার জন্য দুটো ভাগ করেন। একটি ধারা খুবই আবেগ-ঘন, কিছুটা তথাকথিত নাটুকে। এই ধারার প্রতিনিধিরা হলেন স্বয়ং গিরিশচন্দ্র, দানীবাবু, শিশিরকুমার, অহীন্দ্র চৌধুরী, নির্মলেন্দু লাহিড়ী প্রমুখ। দ্বিতীয় ধারাটি তথাকথিত স্বাভাবিকতার প্রতি ঝুঁকে রয়েছে। এই ধারায় রয়েছেন অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি প্রমুখ। এই ধারার অভিনয় বাস্তববাদী সিনেমায় প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। তুলসী চক্রবর্তী অপরেশচন্দ্রের কাছ থেকে যেকোনও মুহূর্তকে সহজ স্বাভাবিক করে তোলার শিক্ষা পেয়েছিলেন, এমনটা বলা হয়। এভাবে বিচার করলে এই দুই ধারায় স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করেছেন জহর রায়। তবে তিনি নিজেই বলতেন— কৌতুক অভিনয়ে তুলসীবাবুই সেরা। কিন্তু জনপ্রিয়তায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জহর রায় জুটি সুচিত্রা-উত্তম জুটির সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিতে পারে। সে ছিল এক যুগ যখন নানা ক্ষেত্রে ক্ষণজন্মা মানুষজন এই ধুলোর পৃথিবীতে বিচরণ করতেন।

১৯১৯ সালের ১৯/২০ সেপ্টেম্বর জহর রায়ের জন্ম। অবিভক্ত বাংলাদেশের বরিশালের বাসিন্দা তাঁরা। তাঁর বাবা সতু রায় অল্প কিছু দিনের জন্য সাধারণ রঙ্গালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। পরে কর্মসূত্রে সতু রায় পাটনা চলে যান। অল্পবয়স থেকেই শৌখিন দলে অভিনয় শুরু করেন জহর রায়। দেখতে দেখতে বেশ পরিচিতি। পাটনায় এসেছিলেন বর্ষীয়ান কৌতুক অভিনেতা অজিত চট্টোপাধ্যায়। তাঁর উদ্যোগেই জহর রায় ১৯৫২ সালে যোগ দিলেন ‘রঙমহল’ থিয়েটারে। অন্য দিকে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘উপহার’, ‘অঞ্জনগড়’, ‘ডাকিনীর চর’ প্রভৃতি ছবি করার সুবাদে বিমল রায়, তপন সিংহ, নির্মল দে, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখের সঙ্গে পরিচিতি। ১৯৫৭ সালে সত্যজিৎবাবুর ‘পরশ পাথর’। মুখ্য চরিত্রে আবার তুলসী চক্রবর্তী। এর পরের বছরই জহরবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ ঋত্বিককুমার ঘটকের। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ ছবির সেই ট্র্যাফিক পুলিশকে মনে পড়ে?

‘সুবর্ণরেখা’য় মুখুজ্জের চরিত্রে অসামান্য অভিনয় করেন জহর রায়। কয়েক বছরের মধ্যেই ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর সেই যুদ্ধবাজ মন্ত্রীর চরিত্র যার উদ্দেশে গুপী বাঘা গাইবে ‘ও মন্ত্রীমশাই ষড়যন্ত্রী মশাই থেমে থাক’।
১৯৭০ এবং ৭১ সালে মূলধারার চারটি অসামান্য ছবিতে অভিনয় করলেন জহর রায়। ‘নিশিপদ্ম’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘ধন্যি মেয়ে’ এবং ‘ছদ্মবেশী’। ‘ছদ্মবেশী’ ছবিতে ঈশ্বরের কাছে চিঠি পাঠানোর প্রচেষ্টা কিংবা হাতির ব্যবসা ফাঁদার জন্যে মালিকের কাছে টাকা ধার চাওয়ার দৃশ্য, অথবা সেই গান— ‘ছো ছো ছো কেয়া সরম কি বাত, ভদ্দর ঘর কি লড়কি ভাগে ডেরাইভার কে সাথ’— সব মিলিয়ে বাঙালির জনজীবনে জহর রায় তখন সুপ্রতিষ্ঠিত। এর পরেও অভিনয় করেছেন ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ ছবিতে।

আজীবন রঙমহল নাট্যালয়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। তাঁর অভিনীত নাটকগুলির মধ্যে ‘কবি’, ‘শেষ লগ্ন’, ‘কালপুরুষ’, ‘মায়ামৃগ’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নহবত’, ‘সুবর্ণ গোলক’ প্রভৃতি। বেশ কিছু নাটক পরিচালনাও করেছিলেন। ১৯৭৭ সালের ১ আগস্ট খুবই অল্পবয়সে জহর রায় মারা যান। সে এক যুগ ছিল যখন জহর রায়দের মতো অভিনেতারা আজীবন বই সংগ্রহ করেছেন। বই রাখার জন্যে আলাদা বাড়ি ভাড়া করেছেন। সাহিত্য, নাটক, বিদেশি সিনেমা, সংগীত, ইতিহাস প্রভৃতি নানা বিষয়ে অগাধ পড়াশোনা করতেন জহর রায়। হাতিবাগানের রঙমহল থেকে আসা কিংবা যাওয়ার পথে মাঝে মাঝেই ঘণ্টা দুয়েক কাটাতেন কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে। বলতেন— হিল্লি-দিল্লি শুটিং করে বেড়াই, কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে। আজ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে সমসময়ের অভিনেতাকুলের দিকে তাকিয়ে কতজন যে দীর্ঘ নিঃশ্বাস গোপন করেন তা গুনে শেষ করা যাবে না।