পিতার মৃত্যুর পর অপরিসীম দারিদ্র্যে সংসার চালানো যখন প্রায় দুঃসহ হয়ে উঠেছে তখন সমবয়স্ক বন্ধুদের পরামর্শ নিয়ে হুগলীর কামারপুকুর গ্রামের রামকুমার চট্টোপাধ্যায় কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন অর্থ উপার্জনের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। যদিও বয়স্ক পিতা ক্ষুদিরামের জীবনকালেই অগ্রজ রামকুমার সংসারের সমস্ত ভার গ্রহণ করেছিলেন। ইতিমধ্যে স্মৃতিশাস্ত্রজ্ঞানের ফলে বিভিন্ন বিধান দেওয়া এবং স্বয়ং ইষ্টদেবীর কাছ থেকে মন্ত্রলাভ করে জ্যোতিষ শাস্ত্রে পণ্ডিত রামকুমার অব্যর্থ ভবিষ্যৎ বক্তা হিসেবেও যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
সময়টা ছিল ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের সূচনা কাল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তখনও স্থাপিত হয়নি। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, ডাফ সাহেবের স্কুল (বর্তমানের স্কটিশ চার্চ স্কুল ও কলেজ) এই সারস্বত পরিমণ্ডল থেকে সামান্য দূরে বাড়ি ভাড়া করে টোল বা চতুষ্পদী খোলেন রামকুমার ঝামাপুকুর অঞ্চলে, যার বর্তমান ঠিকানা ৬১ নম্বর বেচু চ্যাটার্জী স্ট্রিট, কলকাতা-৯।
এই বাড়ীর তিন চারটে বাড়ি পড়েই থাকতেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। সেই সময় ওই অঞ্চলটি ছিলো বেশ বর্ধিষ্ণু। আশেপাশে থাকতেন রাজা রামমোহন রায়, পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা দিগম্বর মিত্র, শিবনাথ শাস্ত্রী, কেশবচন্দ্র সেন, শ্রীম মহেন্দ্র গুপ্ত প্রমুখ। ঝামাপুকুর লেনের দিগম্বর মিত্রের বাড়িটি ‘রাজবাড়ি’ নামেই পরিচিত। যাঁর নামে বাড়িটির রাজবাড়ি অভিধা, তিনি কিন্তু কোন দেশীয় রাজা ছিলেন না। তিনি কলকাতার প্রথম বাঙালি শেরিফ। বৃটিশ সরকার তাঁকে Companion of the Star of India (CSI) এবং ‘রাজা’ উপাধি দেন।

শুধু টোলে পড়ানোই নয় রামকুমার অভিজাত ধনবান ব্যক্তিদের বাড়িতে নিত্য পূজার কাজও করেছিলেন। এই দুইয়ের আয়ে সংসার যখন একটু সচ্ছলতার মুখ দেখছে, তখন গ্রামে ফিরে মায়ের অনুমতি নিয়ে ছোট ভাই গদাধরকে নিয়ে এলেন কলকাতায়। যিনি পরবর্তী জীবনে হয়েছিলেন আলোকিত মহাপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।
ইতিহাস বলে, ধর্মসংস্থাপকগণ প্রত্যেকে উদ্দেশ্য পূরণের স্বার্থে জন্মভূমির গণ্ডি অতিক্রম করে উপযুক্ত স্থানে লীলাময় হয়েছেন সর্বযুগে। ব্যতিক্রম হলো না এক্ষেত্রেও। কামারপুকুর ছেড়ে গদাধরের গন্তব্য হলো কলকাতা, যাকে কেন্দ্র করে সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে নির্মিত হতে চলেছিল এক নতুন ধর্মরাজ্য। শহর কলকাতা — নবযুগবতারের নতুন লীলাক্ষেত্র। আর এই প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন রামকুমার।
১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ১৭ বছর বয়সে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের রাজধানী মহানগরী কলকাতায় উপস্থিত হলেন গদাধর। দাদার সঙ্গে একত্রে থাকাই শুধু নয়, টোল পরিচালনা এবং পূজোর কাজে দাদাকে যথাযথ সাহায্য করতে এগিয়ে এলো ছোট ভাই। গোবিন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি এবং রাজা দিগম্বর মিত্রের বাড়ির নিত্য পূজার কাজ শুরু করেন তিনি। ঝামারপুকুর অঞ্চলে বর্তমান যেখানে রাধাকৃষ্ণের মন্দির আছে, সেই মন্দিরের বিগ্রহ তখন গোবিন্দ চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে পূজিত হতো। দিগম্বর মিত্রের বাড়িতেও ছিল নিত্য নারায়ণ সেবার কাজ। এক নম্বর ঝামাপুকুর লেন কলকাতা নয় এই বাড়িটি রাজবাড়ী নামে বিখ্যাত বর্তমানে এই বাড়ির একাংশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ চর্চাকেন্দ্র।

রামকুমারের ইচ্ছা ছিল ছোট ভাইকে শাস্ত্রজ্ঞ করে তুলবেন, সেই উদ্দেশ্যেই ভর্তি করতে চেয়েছিলেন নিজের টোলে যাতে আগামী দিনে জীবন জীবিকা অর্জন সহজ হয়। কিন্তু দাদার ইচ্ছেতে বাধ সাধলেন ছোট ভাই। আত্মজ্ঞান লাভের সহায়ক নয় এমন কোন বিদ্যা অধীনতা করতে তার ঘোর অনীহা। সরাসরি জানালেন, ‘চাল কলা বাঁধা বিদ্যা আমি শিখব না।’
জীবনের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এত বড় প্রতিবাদ সেই সময় এই বয়সের একজন তরুণের কন্ঠে যেভাবে ধ্বনিত হয়েছিল তা সত্যিই ছিল অবিশ্বাস্য। কেতাবী শিক্ষা বা প্রচলিত পৌরহিত্য তাকে আকৃষ্ট করেনি, তিনি জীবের মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছিলেন সাক্ষাৎ শিবকে। তাঁরই সাধনার প্রস্তুত হয়েছিল তাঁর মন প্রাণ।
ব্যবহারিক বিদ্যাশিক্ষার প্রস্তাবকে তাচ্ছিল্য করে মানবজীবনে যথার্থ বোধ সম্পন্ন গদাইয়ে প্রতিবাদ ছিল রামকৃষ্ণের সাধক ভাবের প্রথম প্রকাশ।
রামকুমার মনঃক্ষুণ্ণ হলেও তাঁকে লেখাপড়ার জন্য বাধ্য না করে নিজের যজমানদের নিত্যপূজাগুলির ভার তাঁর উপর দিয়ে নিজে অধ্যাপনায় মনোনিবেশ করেন। গদাধর তাঁর সরল ব্যবহার, পূজায় পারদর্শিতা এবং মধুর ভজনের দ্বারা সহজেই মিত্রপরিবারের ও অন্যান্য পল্লীবাসীদের প্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৮৫৫ সালে রাণী রাসমণির দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরে পূজকের ভার নেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। গদাধর দাদার হাত ধরে চললেন দক্ষিণেশ্বরে। স্থানান্তর ঘটলো গদাইয়ের। ঝামাপুকুরে গদাই দাদার সঙ্গে দু’বছরের কিছু বেশী সময় ছিলেন।

এর কিছুদিন পরেই রামকুমার কামারপুকুরে ফেরার পথে প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেহত্যাগ করলেন। শৈশবে পিতাকে হারিয়েছিলেন গদাই, সেই থেকে পিতৃতুল্য অগ্রজের স্নেহচ্ছায়ার বিশাল ছাতাটি যেন মাথার উপর থেকে হঠাৎই সরে গেল। প্রচন্ড মর্মাহত হলেন তিনি, সহজাত বৈরাগ্য বর্ধিত হল। বড় গাছের তলায় যেমন ছোট গাছ বাড়তে পারেনা, রামকুমার যেন নিজেকে সরিয়ে নিয়ে গদাধরের পথ প্রশস্ত করে দিয়ে গেলেন। তবে এ হলো বহিরঙ্গের কথা — অবতার পুরুষের লীলা আপন মহিমাতেই পথ করে নেয়, বাহ্য ঘটনাগুলি তার সহায়ক হয় মাত্র।
রামকুমারের মৃত্যুর পর রানী রাসমনির আন্তরিক আগ্রহে গদাইকে পূজারীর পদে অভিষিক্ত করা হলো। রানী রাসমণি যখন স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন মন্দির নির্মাণ ও দেবী পূজার — তখন রামকৃষ্ণকে কে চিনত? কিন্তু তারই লীলাক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে চলেছিলো সকলের অজ্ঞাতে, বিচিত্র ঘটনাবলীর মাধ্যমে। দক্ষিণেশ্বরেই দীর্ঘ এবং কঠোর সাধনার পরে গদাধর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। সে এক বিস্তৃত ইতিহাস।
দক্ষিণেশ্বরে বসবাসের জায়গা যেমন নির্দিষ্ট হলো, তেমনি ভারতীয় ধর্ম দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার প্রায় সমস্ত পথেই তার চরম সাধনা, সেই মহান সত্যের বুকে আরো একবার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো। সব ধর্মের সারমর্ম যে এক, ধর্ম যে অন্তরের বিষয়, তা যে মানুষকে আরো মহান করে গড়ে তোলার কাজের সহায়ক — সে কোন ধর্মের উৎপত্তি যেখানেই হোক না কেন তা যে মনুষ্যত্বের জয় গানে মিলিত হয়েছে, প্রাধান্য দিয়েছে মানব চেতনার উদঘাটনে, এই উপলব্ধি তাঁরই।
এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হয় যে, গদাই থেকে যুগবতার শ্রীরামকৃষ্ণ হওয়ার যাত্রায় জ্যৈষ্ঠভ্রাতা রামকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। নবযুগ অবতারের লীলা মহীরুহ বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য বিধাতা যেন রামকুমারকে মাধ্যম করে পাঠিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের জীবননাট্যে।