প্ল্যাটফর্মের সামনে এসে একবার থমকে দাঁড়ালেন অশোকবাবু। হাতে ঝোলানো ব্যাগের ভিতর থেকে একটা ছোট বোতল বের করলেন। প্ল্যাটফর্মের সামনের কল থেকে জল ভরবার জন্যে যেতেই উল্টো দিকের চায়ের দোকানে ছেলেটা চিল্লিয়ে ওঠে, ‘জল নাই, ওদিকের পৌরসভার কল থেকে জল ভরেন।’
অশোকবাবু দোকানের ছেলেটার নাম জানেন, কেষ্ট। একটু পিছিয়ে দোকানের কাছে আসতেই কেষ্ট তাকে দেখে আবার বলে ওঠে, ‘কেমন আক্কেল আপনার, এতদিন ধরে ট্রেন বন্ধ, জল থাকে? চারদিকের অবস্থাটাও একবার দেখুন, এই কলে জল পড়লেও বোতলে ভরতে ইচ্ছে করবে?’
অশোকবাবু এবার চারদিকটা একবার ভালো করে দেখে মাথা নেড়ে উত্তর দেন, ‘এখন আর কেউ পরিষ্কার করে না?’
—কে করবে? এটা তো স্টেশনের বাইরের কল, আমরাই সময়ে অসময়ে পরিষ্কার করতাম।এখন লোকও নেই, পরিষ্কারও নেই।
—তুমি দোকান খুলে বসে আছো কেন? বিক্রি বাট্টা কিছু হচ্ছে?
—সকালের দিকে কয়েক কাপ হয়। কয়েকজন স্টেশনের এই দিকটাতে হাঁটতে আসেন, আর পেপারের লোকগুলো আসে। পঁচিশ তিরিশ কাপ হয়।তবে ট্রেন চললে যা হত, তার এক ভাগও না।
কথাগুলো সত্যি।সব কিছু স্বাভাবিক থাকাকালীন হাওড়া যাবার সময়ে না হলেও রাতের ট্রেনে ফেরবার সময় প্রায়ই এই দোকানে বসে চা বিড়ি খেয়ে একটু জিরিয়ে বাড়ির দিকে সাইকেল চালিয়ে ফিরতেন। বড়বাজারে একটা গদিতে অনেকদিন থেকেই খাতা লেখার কাজ করেন।নামে খাতা লেখার কাজ হলেও প্রতিদিন মালের অর্ডার আনতে যাওয়া এমনকি মাঝে মাঝে মাথায় করে মালও আনা নেওয়া করতে হত। প্রথম প্রথম লজ্জা করলেও পরে নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছিলেন, ‘গরিবের মান সম্মান, লজ্জা শরম কিচ্ছু থাকতে নেই।’
কতদিন অলিগলির মন্দির বা গুরুদোয়ারে বিনা পয়সার খাবার দেবার লাইনে দাঁড়িয়ে বা বসে খেয়ে নিতেন। সেই সকালে বেরিয়ে যাওয়া। বৌ, বাচ্চা মেয়ে নিয়ে সকালে উঠে রান্না করে দেওয়ার কথা বললেও অশোক প্রথমদিকে রাজি হতেন না। সেই অভ্যাসটাই থেকে গেছে। বাড়ি থেকে প্রতিদিন সকাল সাতটার সময় বেরোতে হত। আধঘন্টার সাইকেল চালিয়ে তবে স্টেশন থেকে সাতটা চল্লিশের ট্রেন ধরতে পারতেন। এক এক দিন দেরিও হয়ে যেত। সাইকেল আরো জোরে চালাতে হত। হাওড়া স্টেশনে নেমে আর কোন দিকে দেখবার উপায় থাকত না, ছুটতে হত। প্রতিদিন দু-বেলা ফুল বাজার দিয়ে হেঁটেই বড় বাজারের সেই গদিতে পোঁছে যেত। গদিতে পৌঁছে আর কোন উপায় থাকত না। প্রতিদিন সঙ্গে করে আনা একটু ছাতু আর মুড়ি মুখে ভরেই কাজে বসে যেত। ভাত খেতে খেতে কোন দিন তিনটে, কোন দিন চারটে হত। মাঝে অবশ্য গদি থেকে একবার চা হত, কোন দিন বিস্কুট। তবে বিস্কুট পেলে সেদিন কপালে লিখে থাকা দুর্ভোগটা আগে থেকে বুঝতে পারতেন। পাশে বসে থাকা সুনীল নামের আরেকজন খাতা লিখিয়ে বলতেন, ‘আজ ভাত খেতে চারটে হবে।’
তারপরেই মাঝে মাঝেই রেগে উঠে গদির মালিকের মা বোন সব এক করে দিতেন, তবে সেখানেও খুব জোরে কিছু বলা যেত না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো কারোরই কিছু করবার থাকে না। চারটের সময় দয়া করে খেতে যাবার জন্যে বললে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেতে হয়। জোরে গালও দেওয়া যায় না, দেওয়ালেরও কান থাকে। সুনীল ও অশোক দুজনেই গলি থেকে বেরিয়ে আরেকটা গলিতে ঢোকেন, মাটির নিচে নেমে যায়।একটা ছোট ঘুপচি মতো ঘরে খাবারের ব্যবস্থা থাকে। স্যাঁতস্যাঁতে ঘর, মাটিতে আরশোলা ঘুরে বেড়ায়। পিছনে কাঠের পিঁড়ে বা একটা কাঠ নিয়ে খেতে বসেন। মুটে মজুর থেকে আরম্ভ করে অশোক সুনীলদের মত বেশ কিছু মানুষ প্রতিদিন এই ঘরে ভাত খান। খুব কম টাকায় খাওয়া হয়, একটা তরকারি, ডাল আর ভাত। যেদিন দেরি হয় সেদিন ডালটাও জোটে না। গদিতে ফিরে আরেক প্রস্থের কাজ। ওখান থেকে বেরোতেই সেই সন্ধে সাতটা। বাড়ি ফিরতে খুব কম হলেও সাড়ে দশটা। তখন মা মেয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ে, বৌয়ের চোখে ঢুল আসে, অশোকের সারাটা শরীরে সারা বছর অমাবস্যা নেমে থাকে।
কি ভাবছেন, এক কাপ চা নেবেন?
একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলেন অশোক বাবু। কেষ্টার কথায় আবার ঐ জায়গায় ফিরে এসে উত্তর দেন, ‘আচ্ছা, ঐ সকালের ট্রেনটা চলে গেছে?’
—সকালের ট্রেন বলতে, স্টাফ ট্রেনটা? না যায় নি? কিন্তু ওটাতে কি হবে?
—আজ একটু হাওড়া যেতে হবে।
—বাসে চলে যান, ওটাতে ভুলেও চাপবেন না। শোনেন নি গত পরশু আর পি এফ খুব লাঠি পেটা করেছে। ফাইন নিচ্ছে। ওটা শুধু রেলের স্টাফদের জন্যে।
অশোক বাবু কিছু সময় চুপ থেকে উত্তর দেন, ‘ভালোই হবে, এমনিতেও মরছি, তেমনিতেও মরব।’
—বাসে যান, কোন ঝামেলা থাকবে না।
এবার অশোক বাবু হেসে ওঠেন,‘ভাই রে পকেটে এই দ্যাখ মাত্র কুড়ি টাকা আছে। গদিতে সেই মার্চ মাস থেকে যেতে পারিনি। আমাদের তো বাবুদের মত ব্যাঙ্কে টাকা ঢোকে না। অল্প কয়েকটা টাকা হাতে হাতেই দেয়। জমানো কিছুই নাই। একটা কাজ জুটিয়ে ছিলাম, তার আবার এই মাসটাই শেষ। এখন বাসে গেলে কতটাকা ভাড়া লাগতে পারে বল তো?
—সেটা তো ঠিক কিন্তু রেলের লোকগুলো খুব পাজি। কিছুই শুনছে না। শুধু লাঠি উঠিয়ে পেটাচ্ছে। না হলে আটকে রেখে দিচ্ছে। ন-গ্রামের বামুনপাড়ার বুধন চক্রবর্তীকে চেনেন, কলকাতার কোন এক মন্দিরে পূজা করত। টুকটাক ভালোই হত। ওকে পুলিশে আটকে রেখে পরের দিন ভোর তিনটের সময় ছাড়ে। এমন বদ বাড়িতে একটা ফোন পর্যন্ত করতে দেয় নি। এদিকে বাড়িতে তো কান্নাকাটি আরম্ভ হয়ে গেছিল।
কথাগুলো শুনে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়েন অশোকবাবু। কিছু সময় পর বলেন, ‘ট্রেনটা কখন এখান দিয়ে যায়?’
—এটার তো কোন টাইম নাই। কোন দিন আটটাতেও আসে। আজ এখনো যায় নি।তবে আপ লাইনে কখন গেছে দেখিনি। অশোকবাবু আর কথা না বাড়িয়ে এক পা এক পা করে প্ল্যাটফর্মের দিকে যান। কয়েক দিন আগে বাজারে কে যেন বলছিল কয়েকটা স্টেশনে সাধারণ লোকদের দেখলেই রেল পুলিশে লাঠি হাতে তাড়া করছে। অশোকবাবু অবশ্য এই স্টেশনে সে রকম কোন পুলিশ দেখতে পেলেন না। কয়েকজন ভদ্রলোককে ব্যাগ হাতে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখতে পেলেন। তার মানে ট্রেনটা এখনো যায় নি। প্ল্যাটফর্মের ভিতরে না গিয়ে বাইরেই একটা কোণে দাঁড়িয়ে থাকলেন। মনে মনে ভেবে নিলেন ট্রেনটা এলেই ঝাঁপিয়ে চেপে পড়বেন। করলেনও তাই। ট্রেনটা এক নাম্বার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এক ছুটে সামনে কামরাতেই চেপে গেলেন। সিটে তখন রেলের স্টাফরা আরামে বসে বসে যাচ্ছেন, বিড়ি টেনে এন্তার গল্প করছেন। অশোকবাবুর দু’চোখে কান্না এল।এদের চিন্তা ভাবনা কিচ্ছু নেই। মাস গেলে আরামের মাইনে, তাও বিনা পয়সার ট্রেন, অথচ… ‘দাদা তো রেলের লোক মনে হচ্ছে না।’
গেটে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোক অশোকবাবুকে দেখে জিজ্ঞেস করতেই খুব মৃদু ভাবেই ঘাড় নেড়ে উত্তর দিলেন, ‘না, বড় বাজারে কাপড়ের একটা গদিতে খাতা লিখতাম। আপনি?’
—ওষুধ সাপ্লাই করি। এতদিন বাইকেই যাচ্ছিলাম আজ নিয়ে দ্বিতীয় দিন ট্রেনে এলাম। কয়েক সপ্তাহ আগে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেছে।এখন এই বাঁ’টাতে জোর পাচ্ছি না। কয়েকদিন বেরোয় নি, ওষুধের দোকান ঠিক ওষুধ এনে নেবে, কিন্তু মরণ হয়েছে আমাদের মত যারা ওষুধ সাপ্লাই করি। খুব খারাপ অবস্থা দাদা।
দুঃখ ভাগ করলে কি কমে যায়? কে জানে তাও সারাটা রাস্তা সেই অচেনা ভদ্রলোকটির সাথে গল্প করবার মাঝে অশোকবাবু নিজেকে একটু হাল্কা করবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। মাঝে মাঝে কামরার ভেতর থেকে বিড়ির গন্ধের সাথে বিভিন্ন রকমের টিপ্পনী অশোকবাবুদের কানে আসতে লাগল। বোঝা গেল এই ভাবে অশোক বাবুদের ট্রেনে চাপাটাকে ওনারা ঠিক পছন্দ করছেন না। কিন্তু কি করা যাবে? কোন উত্তর না দিয়ে গেটের এক পাশে বসে থাকলেন। মনে মনে ভাবতে লাগলেন, ‘মালিক সব টাকা না দিলে রাস্তায় বসতে হবে।’
ট্রেনটা কখন যে হাওড়া স্টেশনে ঢুকে গেল অশোকবাবু খেয়াল করেন নি। একটু অন্য মনস্কও হয়ে গেছিলেন। পিছনের দিকে, ‘দেখি উঠে দাঁড়ান…’ কানে যেতেই উঠে দাঁড়ালেও এই হাওড়া স্টেশনের সাথে অশোকবাবুর আগে পরিচয় নেই। গোনা গুন্তি লোক, বেশির ভাগ রেলের স্টাফ। যে কয়েকজন সাধারণ প্যাসেঞ্জার আছেন তারা এক্কেবারে চোরের মত এগোচ্ছেন। কয়েকজন তো ঢোকার সময় স্লো করবার সময়েই চলন্ত ট্রেন থেকেই লাফিয়ে নেমে পড়লেন। অশোকবাবু এই দিক দিয়ে কোন দিন যান নি। শুনেছেন বাঁ’দিকে দুধ ঘোষদের সাইকেল গ্যারেজ আর ডানদিকে টিকিয়াপাড়াতে ওঠা যায়। ভিড়ে যেমন মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে তেমনি শূন্যতা একটা অস্থিরতা ও ভয়ের জন্ম দেয়। অশোকবাবু সেই ভয় নিয়েই প্লাটফর্মে নেমে আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে যেতে আরম্ভ করলেন। যেতে যেতেই হাওড়া স্টেশনে লোক গুনতে লাগলেন। হঠাৎ পিছন থেকে একটা শক্ত কিছুর স্পর্শ লাগল।প্রথমটা গুরুত্ব না দিলেও দ্বিতীয়বার স্পর্শটা পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘোরাতেই হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। একজন টিটি ও তার সঙ্গে দুটো পুলিশ। প্রথমটা একটু বেশি ঘাবড়ে গেলেও টিটি ভদ্রলোকের মুখের দিকে কিছু সময় অশোকবাবু তাকিয়ে থাকলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন, কি ব্যাপার?’
—এই ট্রেনটা কি আপনাদের জন্যে, কেন চেপেছেন?
—কেন চেপেছেন এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবো বলুন তো। আমাদের জন্যে নয় সেটা জানি, কিন্তু কিছু করবারও নেই।
—কোথা থেকে চেপেছেন?
অশোকবাবু তার স্টেশনের নাম বললেন। টিটি ভদ্রলোক শুনে উত্তর দিলেন, ‘বেশ চেপেই যখন পড়েছেন তখন সাড়ে আটশো টাকা ফাইন দিন।’
—সাড়ে আটশো, মানে আটশো পঞ্চাশ। তাইতো?
অশোক বাবু চারদিকটা একবার দেখে নিলেন। এদিক ওদিক আরো অনেককেই এই রকম ভাবে পুলিশে ধরে রেখেছে। হয়ত ফাইন চাইছে। একটা ঢোঁক গিললেন অশোকবাবু। তারপর বলে উঠলেন, ‘বলছি কি একটু বাথরুমে যাবো? ভয় নেই পালিয়ে যাবো না। এই আমার ছোট ব্যাগটা এখানে রাখছি।’
টিটি ও পুলিশগুলো নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। টিটি ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘যান, তাড়াতাড়ি আসবেন।’
বাথরুম থেকে ফেরার সময় নিজের বোতল থেকে এক বোতল পানীয় জলও ভরলেন। তারপর টিটি ভদ্রলোকের কাছে এসে দেখলেন পুলিশগুলো চলে গেছে। চারদিকে একবার তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘এই যে আমি রেডি, এবার নিয়ে চলুন।’
ভদ্রলোক একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মানে? কোথায় নিয়ে যাবো?’
—আপনি তো আটশো পঞ্চাশ টাকা ফাইন চেয়েছেন…?
—আমি না, রেল চেয়েছে, আমি শুধু কালেক্ট করছি।
—যাই হোক, কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার কাছে পঞ্চাশ টাকাও নেই। আমি সব কিছু দেখাচ্ছি। প্রয়োজনে জামা প্যান্ট সব…. শেষের কথাগুলো বলতে বলতে আশোকবাবু প্লাটফর্মের মেঝেতে বসে তার ব্যাগ থেকে একে একে সব জিনিস বের করে রেখে দিলেন। জিনিস বলতে একটা ভাঙা ছাতা আর ময়লা ধরা একটা জলের বোতল। টিটি ভদ্রলোক সব দেখে একটু কড়া ভাবেই বলে উঠলেন, ‘এই সব দেখিয়ে সিমপ্যাথি আদায়ের চেষ্টা করছেন, শুনুন আমি আপনার মত অনেককে দেখেছি। ভালোয় ভালোয় ফাইনের আটশো পঞ্চাশ টাকা বের করুন না হলে সোজা চালান করে দেবো। আমি ফোর্স ডাকছি।’
অশোকবাবু কথাগুলো ভালো ভাবে শুনে চারদিকটা দেখে নিলেন। পুলিশগুলো চলে গেছে। উত্তর দিলেন, ‘বেশ তাহলে তাই চলুন, আমি রেডি।’
টিটি ভদ্রলোক একটু থতমত খেয়ে বলে ওঠেন, ‘একবার গারদে ঢুকে গেলে কিন্তু সারা জীবনের জন্যে একটা দাগ থেকে যাবে।’
–ক্ষিধের থেকে আর কোন বড় দাগ থাকে? বাড়িতে বলেই বেরিয়েছি, ‘দশদিনের মধ্যে যদি না ফিরি জানবে মারা গেছি।’ বামুনের বাড়ির বৌ লোকের বাড়ি এঁটো বাসন মাজতে যাচ্ছে, মেয়েটার পড়া কি হবে জানি না, এবার বলুন।
অশোকবাবু চুপ করে গেলেও তার কানে টিটি ভদ্রলোকের লম্বা শ্বাসের আওয়াজ কানে এল। কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে টিটি ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘যান, যেখানে যাচ্ছিলেন যান।’
অশোকবাবু ব্যাগের মধ্যে সব কিছু গুছিয়ে নিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর টিটি ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আপনি আমাকে নিয়ে চলুন।’
—আরে না, আপনি যেখানে যাচ্ছিলেন যান।
—না স্যার, যখন ধরলেন তখন তো নিয়ে যেতেই হবে। আমি তো ফাইন দিতে পারিনি।
—এত মহা মুশকিল, আমি যখন বলছি তখন আপনি কেন ঝামেলাতে জড়াচ্ছেন। এতে আপনার নিজেরও অসুবিধা, আমারও অসুবিধা।
টিটি ভদ্রলোক এগিয়ে যেতে চাইলে অশোকবাবু পিছন এগিয়ে তাঁর পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলতে আরম্ভ করেন, ‘আপনি দয়া করুন, আমাকে অন্তত একবেলার জন্যে হলেও জেলে দিন।’
এবার টিটি ভদ্রলোক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন,‘আপনি এমনি কেন করছেন বলুন তো?’
অশোকবাবু কিছু সময় চুপ থেকে বলে ওঠেন, ‘স্যার, আমাকে জেলে দিলে আজকের দিনে তো ফ্রিতে খেতে পাবো। বিশ্বাস করবেন কি না জানা নেই, এই কয়েক মাস বাড়ির তিনজনেই আধ পেট করে খেয়ে আছি। চাল পেয়েছিলাম, কিন্তু ভয়ে ভালো করে খেতে পারিনি। তাছাড়া চাল তো শুকনো খাওয়া যায় না। যদি একবেলাও আপনার আশির্বাদে পেট ভরে খাওয়া যায়….’
টিটি ভদ্রলোক কোন কথা বলতে পারলেন না। অশোকবাবুর মনে হল ফাঁকা হাওড়া স্টেশনের শূন্যতার মাঝে ভদ্রলোকের নিজের অস্বস্তি হচ্ছে। এমনিতে এই সময় প্যাসেঞ্জারের সংখ্যা কম। টার্গেটের চাপ না থাকবার সাথে বেশি রোজগারের রাস্তাটাও বেশ কয়কদিন ধরেই বন্ধ ছিল। এই কয়কটা দিন যা হোক একটু ধরাধরি আরম্ভ হলেও বলবার মত কিছু নয়। কয়েকজন ভীতু মানুষকে ধমকিয়ে ভয় দেখিয়ে ফাইনের কথা বলে দু’ পাঁচশ হয়েছিল। এখানে সে’রকম পরিকল্পনা করলেও সব হিসাব উল্টে গেল। প্ল্যাটফর্ম, রেল লাইন কি শুধু জীবন, না থেমে যাওয়া? পাশের প্ল্যাটফর্মে আরেকটা ট্রেন ঢুকছে। টিটি ভদ্রলোক সেদিকে তাকিয়ে থাকলেও অশোকবাবুও তারদিকে তাকিয়ে প্ল্যাটফর্মের উপরেই বসে পড়লেন। কে জানে শূন্যতার সত্যি কোন সংবাদ আছে কিনা?
ঋভু চট্টোপাধ্যায়, ভি কে নগর, এম এ এম সি, দুর্গাপুর-৭১৩২১০, পশ্চিম বর্ধমান।
ভালো লাগল । বাস্তবতার এক নগ্ন চিত্র ফুটে উঠেছে ।