| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

জল : ছোট গল্প লিখছেন সাত্যকি হালদার

Reporter
সাত্যকি হালদার / ১২২০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২২

সকাল থেকেই মাদলের শব্দ শোনা যায় ছোট্ট স্টেশনটিতে। সেই সঙ্গে দেহাতি ভাষায় নানা রকম কথা। কিছু দিন হল মাঝবয়সী এক বাঁদরওয়ালা এসে ঠাঁই গেড়েছে এখানে। সাত-সকালে এক জোড়া বাঁদর নিয়ে শুরু হয়েছে তার বিভিন্ন কেরামতি।

সকাল বেলা ভিড় করার মতো লোক তেমন হয়নি। প্ল্যাটফর্মের এক মাথায় ছোট একটা দোকান। দোকানের বেঞ্চে এক জন মাত্র খদ্দের। এ ছাড়া কাছাকাছি অন্য কেউ নেই। মাঠ আর জঙ্গল লাগোয়া ছোট স্টেশনটা সারাদিনই প্রায় ফাঁকা ফাঁকা। প্রথম প্যাসেঞ্জার ট্রেন আসে ভোর বেলার দিকে। অন্য দুটো গাড়ি দুপুর আর সন্ধেয়। এই স্টেশনে যেটুকু যা লোকের আনাগোনা তা ওই তিনটে ট্রেনের আগে আর পরে।

যদিও সাতসকালে লোক ডাকায় কোনও খামতি নেই বাঁদরওয়ালার। বাঁদর দুটোকে দিয়ে সে লাফঝাঁপ করায়, হাতের লাঠি উঁচু করে তার মাথায় চড়ে বসতে বলে। সেই সঙ্গে ফুলঝুরি ছোটায় নানা রকম কথার। এই সব কথা আর কায়দার মাঝে চোখ ঘুরিয়ে কখনও এদিক-ওদিক দেখে। ওদিকের দোকান থেকে খদ্দেরটি তুলে আনতে পারলে একটু একটু করে লোক জমিয়ে দেওয়া যায়। একজনের দেখাদেখি হাজির হবে গ্রাম থেকে আসা আরও দু-চারজন। তারপরই হয়তো জমজমাট হবে বাঁদরের খেলা। সেই আশাতে সে কথার মাঝখানে হাত উঁচু করে একটানা মাদল বাজিয়ে যায়।

তার এই কথা আর মাদলের শব্দের মাঝে জঙ্গলের দিকে হঠাৎই হুইসল্‌ শোনা যায় ট্রেনের। সঙ্গে ঢিমে তালে ট্রেন গড়ানোর আওয়াজ। এই হুইসল্‌ এবং গাড়ির শব্দ সকলের চেনা। প্যাসেঞ্জার গাড়ির শব্দের চাইতে এ-শব্দ একেবারেই আলাদা।

দোকানে বসা লোকটা বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। চা বানানো থামিয়ে বছর চব্বিশ-পঁচিশের ছেলেটা তাকায় জঙ্গলের দিকে। স্টেশনের মাঝামাঝি ছোট ঘরখানা ছেড়ে স্টেশনবাবু এবং গ্যাং-ম্যানও তখন বাইরে। স্টেশনবাবুর হাতে ভাঁজ করা বড়সড় এক খাতা। গ্যাং-ম্যান গোটানো পতাকা নিয়ে এমাথা-ওমাথা করে বেড়ায়। বেশ ক-দিন পর সকালবেলার এক্সপ্রেস গাড়িটা সিগন্যাল না-পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে এদিকের এই স্টেশনে।

এই ট্রেনের সঙ্গে স্টেশনের অন্য দিনও দেখাসাক্ষাৎ হয়। যদিও সে দেখা হওয়ায় সম্পর্কের টান নেই। অন্য দিন সকালেও মাঠ আর জঙ্গল চিরে হাজির হয় ট্রেন। তখনের যে গতি তা আসলে বিদ্যুতের চমক। লালচে ধুলোর ঝড় ওঠে স্টেশনে, শুকনো কিছু শালপাতা লাইনের ওপর গড়াগড়ি যায়। গ্যাং-ম্যান বনোয়ারি রঙ-চটা পতাকাখানা অবিরাম নেড়ে যায় ধুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে। স্টেশনবাবু ঘরে বসে চোখ তুলে দেখেন, তারপর সময়টা লিখে রাখেন খাতায়। অথচ ট্রেনটার কোনও ভ্রুক্ষেপ থাকে না এসবে। লম্বা একটা হুইসল্‌ বাজিয়ে স্টেশন ফেলে নিমেষে জঙ্গলের দিকে মিলিয়ে যায়। মাঠ-ঘাট-লেবেল ক্রসিং যেমন ছিটকে যায় পিছনে, ছোট্ট এই স্টেশনটাও তাই। প্রতি দিন সকালে একই নিয়ম।

যদিও সব নিয়মের মতো এরও ব্যতিক্রম হয় কখনও। কোনও মাসে একবার কী দুবার, কখনও আবার তাও নয়। বারো কিলোমিটার দূরের জংশন থেকে সংকেত আসে এখানে, আর তাতেই টকটকে লাল হয়ে থাকে আউটপোস্টের সিগন্যাল। জঙ্গল ছাড়িয়ে ঢোকার মুখে গাড়িখানা হুইসল্‌ দিতে থাকে পরপর। তারপর ঢুকতে থাকে গড়িয়ে গড়িয়ে। প্ল্যাটফর্মের সামনের মাথা ছুঁয়ে টগবগে ডিজেল ইঞ্জিনটা মুহূর্তে শব্দ কমিয়ে দেয়। সিগন্যালের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া তখন আর কিছু করার থাকে না ট্রেনটার।

আর এই ট্রেন দাঁড়ালে কেমন এক উৎসব লাগে এখানে। উৎসবের জেরে চাপা পড়ে যায় বাঁদর-ওয়ালার হরেক রকম কেরামতি।

স্টেশনবাবু হঠাৎই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। নানা রকম খাতাপত্র নিয়ে ঘর-বার করতে হয় তাকে, সঙ্গে অনেক লেখালেখি। গোটানো ফ্ল্যাগ হাতে বনোয়ারি এমাথা-ওমাথা ছুটে বেড়ায়। স্টেশন ছাড়ালে মাঠের পাশে যে গ্রাম সেখানেও খবর হয়ে যায় এটা। আদুর গায়ের কচিকাঁচারা তো আসেই, বড়রাও দু-চারজন হাজির হয় সেখানে। ট্রেন দাঁড়ানোর সময় যত বাড়ে, প্ল্যাটফর্মের ভিড় তত জমে উঠতে থাকে।

গ্রামের লোকেরা বেশি ভিড় করে ইঞ্জিনের পাশে। পায়ের আঙুলে ভর করে ভিতরের রহস্য বুঝে নিতে চায়। কখনও মাথা ঝুঁকিয়ে তলের চাকাগুলোকে দেখে। তাদেরই আরেকটা ভিড় জমে কাচ-আঁটা ফার্স্ট ক্লাস বগির সামনে। এসি-মেশিনের শব্দ আর কাচের ওপাশে ফর্সা-আবছা মুখ, সব মিলিয়ে দেশের কোনও বড় শহর যেন তাদের এই গাঁয়ের স্টেশনে হাজির। মাঠে কাজ করতে থাকা বউ-ঝিরাও কাজ ফেলে একটু একটু করে ঘিরে ধরে গাড়িটা।

গাড়ি কতক্ষণ দাঁড়ায় তার ঠিক নেই। কখনও পনেরো-বিশ মিনিট, কোনও দিন আবার আধ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়। আর সময় বাড়লেই দরজার কাছে এক-দুজন করে হাজির হয় ভিতরের যাত্রীরা। খড়খড় করে কাচ উঠে যায় জানালার। ভিতরের জোড়া জোড়া চোখ তখন প্ল্যাটফর্মের সারা গায়ে ঘুরে বেড়ায়। ট্রেন ছেড়ে গ্রামের কৌতূহলও সেই সব মসৃণ মুখ আর ধোপদুরস্ত পোশাকে লেগে থাকে।

কিন্তু ভিতর ছেড়ে নামার সাহস চট করে যাত্রীদের হয় না। অচেনা দেশ, অজানা জারগা, তার ওপর স্টেশনের যা নাম তাও কোনও কালে শোনা নয়। দরজায় দাঁড়িয়েই ভিতরের লোকেরা তাই সিগন্যাল দেখে, স্টেশনের আশপাশে চোখ বোলায়। কখনও তাদের চোখ যায় গা-খোলা লোকগুলোর দিকে। তারপর ট্রেন আরও দাঁড়ালে উৎসাহী যাত্রীদের মধ্যে এক-দুজন নেমে আসতে থাকে। চেনা জানালার সামনে শুরু করে সতর্ক পায়চারি। খালি জলের বোতল হাতে কেউ কেউ একটু ঝুঁকিও নিয়ে ফেলে। ছোট্ট লাইন পড়ে যায় প্ল্যাটফর্মের একমাত্র জলের কলটাতে। টিউবওয়েলের কঁচর-কঁচ জলে ভরে উঠতে থাকে নানা আকারের শহুরে বোতল।

তবে এর মধ্যে অসুবিধা হয় শেষ বগির যাত্রীদের। ট্রেন দাঁড়ালেই চারখানা বগি প্ল্যাটফর্মের বাইরে। তাতেই ঝামেলায় পড়ে সেদিকের লোকেরা। নীচে নামার জন্য তাদেরও মন হাঁসফাঁস করতে থাকে। যদিও জলের জন্য ঝুঁকি নেওয়া যায় না। পিছনের বগির যাত্রীদের তাই সামনে জমে উঠতে থাকা স্টেশনটাই দেখে যেতে হয়। জলের কাছে পৌঁছনোর কোনও উপায় থাকে না তাদের।

তবে সব সমস্যারই শেষ পর্যন্ত একটা সমাধান জুটে যায়। এদের বেলাও তাই। শেষের বগির যাত্রীদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে গ্রামেরই একজন। ট্রেন থামলেই শেষ বগিগুলোর নিচে হাজির হয় সে। টলমল পায়ে খোয়া-পাথরের ওপর হেঁটে বেড়ায় সত্তর বছরের বুড়ো দশরথ।

সিগন্যাল দৈনিক লাল হলেই তার ভালো। বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার মতো কদাচিৎ ট্রেনখানা দাঁড়ালে সে একছুটে চলে যায় প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায়। তারপর বাইরে দাঁড়িয়ে-থাকা বগিগুলোর নীচে। তখন শুধু একটা কথা তার মুখে, জল লাইগবে বাবু, জল জল। পিলাটফরম টিউকলের মিঠা জল।

প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। হাবভাব দেখে খটকা লাগে একটু। গায়ের পোশাকটা চাদর না জামা বোঝার উপায় নেই। লুঙ্গির মতো জড়ানো ধুতিটার এখানে-ওখানে সেলাই। জানালা দিয়ে যাত্রীরা বরং অবাক চোখে দেখে ওকে। রেললাইনের খোয়ার ওপর খালি পায়ে তখন দশরথের ছুটোছুটি। পানি পিয়েগা বাবুলোগ, ঠান্ডে পানি। টিসান কলকা মিঠা পানি…।

তৃষ্ণার একটা পর্যায়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর থাকে না। কোনও একটা জানালা থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে। চাহিয়ে কিতনা?

উৎসাহ বেড়ে যায় দশরথের। জানালার নীচে সে খলবলিয়ে ওঠে। …এক রুপায়া।

এরপর কোনও জানালা থেকে একটি খালি বোতল নেমে আসে। বোতল হাতে পেয়েই দৌড় শুরু করে দশরথ। খোয়া-পাথরের ওপর দিয়ে টাল সামলাতে সামলাতে সোজা প্ল্যাটফর্মের দিকে। তারপর খানিক এগিয়ে টিউবওয়েল। প্রায় সবাইকে ঠেলে সরিয়ে বোতলে জল ভরে নেয়। শেষ হলে আগের মতোই টলতে টলতে জানালার নীচে। …লিন বাবু।

বোতল উঠে যায়। এক টাকার একটি কয়েন লাফিয়ে নামে জলভেজা চওড়া তালুতে। পরখ করার মতো দেখে দশরথ কোঁচড়ে চালান করে দেয় ওটা।

ব্যস। একটা বোতল পেলে হল। তারপর আর চেঁচাতে হয় না। একের দেখাদেখি জানালায় আরও বোতল। অনেক ডাকাডাকি। কখনও দুটো কখনও তিনটে বোতল নিয়ে বুড়ো ছুটছে প্ল্যাটফর্মের দিকে। ফেরত দিয়ে আবার ছুট। যতক্ষণ ট্রেন ততক্ষণ তার কোঁচড়ে একটি-একটি টাকা।

তারপর লাল সিগন্যাল এক সময় হলুদ হয়ে যায়। ধুলো থেকে ওঠা মোষের মতো গা-ঝাড়া দেয় ট্রেনটা। চাকাগুলো গড়াতে শুরু করে লাইন বরাবর। শেষ বোতলটি তুলে ধীরেসুস্থে প্ল্যাটফর্মে ফিরে আসে দশরথ। কোঁচড়ের পয়সাগুলো তখন বার করা দুই হাতের তালুতে।

আর এই ট্রেন চলে গেলেই চা-দোকানের লোটনের সঙ্গে এক প্রস্থ ঝগড়া বেধে যায় তার। ঝগড়া না বলে একতরফা চ্যাঁচামেচিও বলা চলে। বেশিরভাগ লোটন চ্যাঁচায়, দশরথ শোনে বা শোনে না। দশরথকে প্ল্যাটফর্মে উঠে আসতে দেখে ছেলেটা বলে, তুমার জন্য লতুন সরবতখানা আজও বরবাদ বুড়া। জলের কারবার তুমি একা করবা নাকি!

দশরথ তার কথায় উত্তর করে না। তার দেখাদেখি লোটনও কিছুদিন এই গাড়ি দাঁড়ালে তাতে জল বেচতে যাচ্ছে। চা-দোকানের সামনে এখন সবুজ-হলুদ লম্বাটে বোতল। যদিও লোটনের বানানো জলে যাত্রীদের টান তেমন নেই। তারা বরং দশরথের হাত থেকে সদ্য ভরে দেওয়া জল কিনে খায়।

দশরথকে চুপ থাকতে দেখে আরও কথা ছেটায় লোটন। দোকানে ঢুকে বলে, ঠিক আছে, তুমি তুমার মতো চলো। রেলের লোক টিশান থেকে ভবঘুরে হটাতে এলে আমাকে ধরবা নাই তখন।

তারপরেও চুপ থাকে দশরথ। আরও কিছু বকবক করে চা বানানোয় মন দেয় লোটন।

সকালের এই ট্রেন চলে গেলে স্টেশন একেবারে শান্ত। সারাদিনের মতো ঢিলেঢালা। গাঁয়ের মেয়েরা মাঠে যাওয়া আর ফেরার সময় সিমেন্টের লম্বা বেঞ্চগুলোতে বসে। খোশগল্প করে নিজেদের মধ্যে। টিউবওয়েলের মুখে হাত চেপে জল খায় কেউ কেউ। প্ল্যাটফর্ম লাগোয়া শেডের ছায়ায় দশরথ। কখনও বসে, কখনও শুধু ঝিমায়। ফাঁকা জায়গা জুড়ে দাঁড়ানো লম্বাটে টিউবওয়েলের মতো সেও একটু একা। বসে বসে কখনও শুধু জলের কলটাকেই দেখে। প্ল্যাটফর্মের শেডের ওপর দিয়ে দুপুর গড়িয়ে যায়।

দুপুর আর বিকেলে আর দুটো প্যাসেঞ্জার গাড়ি আসে এখানে। আদ্রা হয়ে চক্রধরপুর বা আরও দূরে কোথাও যায়। টাইম-টেবিলে বিকেল থাকলেও শেষ গাড়িখানার আসতে বহু দিনই সন্ধে হয়ে যায়। লোকের মুখে তখনও এর নাম বিকেলের গাড়ি।

সেই গাড়িটা এসে নিয়মমাফিক দাঁড়ালে শেষবারের মতো জমজমাট হয় স্টেশন। যারা সে গাড়িতে যায় বা আসে তারা আশপাশের মানুষ। কালো তেলতেলে মুখ, বউ-ঝিদের কপালে সিঁদুরের ফোঁটা। তাদের সবার সঙ্গে খানিকটা করে বোঁচকা। এই ট্রেন এলেই হইচই আর হাঁকাহাঁকিতে খুশি হয়ে ওঠে স্টেশন।

নিজের ঘর ছেড়ে স্টেশনবাবু তখনও বাইরে এসে দাঁড়ান। পায়চারি করেন এমাথা-ওমাথা। হাতের শালপাতায় চপ আর মুড়ি। বনোয়ারি গল্প শুরু করে গ্রামের লোকের সঙ্গে। আশপাশের অনেক মানুষ তার চেনাজানা। তারাও ওকে নানা রকম গল্পগাছা শোনায়। ওদিকে লোটনের দোকানও বেশ জমজমাট তখন। সেখানে চায়ের চাইতে মুড়ি আর তেলেভাজার খদ্দের বেশি। লোটন একহাতে ভাজে, অন্য হাতে তাদের সামলায়। যারা কেনে না তারাও দাঁড়িয়ে বেচাকেনা দেখে। বিকেলে গ্রামের অনেকেই আসে স্টেশনে। লোকজনের ওঠানামা, হইচই, ট্রেন ছাড়ার মুখে দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার, এসবের মধ্যে রাত বাড়ে এক সময়।

ট্রেন চলে গেলে স্টেশন যখন অন্ধকার, লোটনের চা-দোকানে হারিকেন আর স্টেশনের দুমাথায় সামান্য আলো জ্বলে, তখন দু-একজন করে গ্রামের পথে ফিরে যায়। এই সময় সবার পেছনে দশরথও টুকটুক করে ঘরে ফেরে।

শীত আসার মুখে স্টেশন এলাকাটা চুপচাপ হয়ে যায়। বিশেষ করে বিকেলের দিকে। পুজোর পর বিকেলের ভিড়টা কমে আসতে থাকে। লোকজন ট্রেন থেকে নেমে গ্রামের পথে মিলিয়ে যায় চটপট। বেঁকে যাওয়া লাল মাটির রাস্তাটা সারাদিনই সুনসান। লোটনের চা-দোকানে ভিড় কমে। স্টেশনবাবু আর বনোয়ারিরও ঢিলেঢালা ভাব। টিউবওয়েল লাগোয়া চত্বরে ওই সময়গুলোতে দশরথও যেন শীতেরই অপেক্ষায়। সন্ধের দিকে কুয়াশা জমে মাঠে। মাথার ওপর হিমের শব্দ। হাতল তোলা টিউবওয়েলটার পাশে এই সময় সে ঠায় বসে থাকে।

এর মধ্যে আবার একদিন তাকে ডাক দেয় লোটন। দোকানের দিক থেকে চোখ নাচিয়ে বলে, লতুন এক চিজ আমদানি করেছি বুড়া। একেবারে টাটকা। তুমার কারবার ইবার বরবাদ।

সেটা এরকম শীত আসি-আসি এক বিকেল। জঙ্গলে পাতা ঝরছে একটা-দুটো। স্টেশন লাগোয়া ইউক্যালিপ্টাস ছায়া বিছিয়ে গেছে মাঠের গায়ে। লোটনের কথায় ভাবান্তর হয় না দশরথের। টিউবওয়েলের পাশে গা এলিয়ে বসে বলে, ইবার তো লতুন লয়, আগেও তো তুই বরবাদ করেছিস আমার কারবার।

লোটন হাসে। বোকাবোকা সেই হাসি। দশরথের জল দেওয়া কাজের পেছনে অনেক দিন লেগে রয়েছে ও। সরবতের পর কিছুদিন কাঠি লাগানো আইসক্রিম এনেছিল। তা দিয়েও এক্সপ্রেস গাড়িখানায় সুবিধা হয়নি। তারপরও নতুন নতুন ধান্দা ভেবে চলেছে। বোকা হাসির মধ্যেই সে দশরথের উদ্দেশে পরের কথাগুলো বলে। …ইবার আর আইসকিরিম লয় হে, আলাদা রকম জিনিস। তুআরা কখনও দ্যাখো নাই উসব। পুরুল্যা টাউন থেক্যে আনা করাইছি ইবার…।

পুরুলিয়া টাউনের যথেষ্ট ভার এই স্টেশনে। শুধু স্টেশনে নয়, আশপাশের গ্রামেও এক ব্যাপার। সব বিতর্কের শেষ কথা। যদিও গ্রাম থেকে খুব কম লোক অন্তত একবার সেখানটায় গেছে। যারা গেছে তাদের আলাদা হাবভাব। কথাবার্তায় এসে পড়ে সেই শহরের নাম। সেখানের ছাপমারা যে-কোনও জিনিস এখানে বেশি দরে বিকোয়।

শীতের সন্ধ্যায় শহরের নামটার পর বুড়ো কেমন চুপ মেরে যায়। কিংবা জায়গার জন্য নয়, লোটনের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না তার। লোটন আরও কিছু বলতে চাইলেও গুটি মেরে বসে থাকে টিউবওয়েলটার পাশে।

সেদিন সন্ধের মুখে স্টেশনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অল্প কিছু মানুষ। বিকেলের গাড়ির অপেক্ষায়। সামনে কার্তিক মাসের ফুরিয়ে আসা দিন। স্টেশনখানাও রাতের জন্য চুপচাপ। লোটনের দোকান ছেড়ে আরও দূরে হাঁটতে থাকে দশরথ। জঙ্গলের গাছে তখন সন্ধের হিম, মাঠের ওপর টান হয়ে শুয়ে থাকা কুয়াশা। প্ল্যাটফর্মের একমাত্র টিউবওয়েলটাও সেই কুয়াশায় দাঁড়ানো, হ্যাণ্ডেল উঁচু করা একদিকে। স্টেশন ছেড়ে দশরথ গ্রামের পথে নেমে যায়।

সে বছর শীতে বেশ কিছুদিন দাঁড়ায়নি সকালের গাড়িটা। আদ্রার দিকে কাজ হচ্ছিল লাইনে। কাঠের স্লিপারের পরিবর্তে কংক্রিটের স্লিপার। ফলে আরও গতি বাড়ছিল এক্সপ্রেস গাড়িটার। তাড়াতাড়ি মিলিয়ে যাচ্ছিল দূরের লাইনে। কুয়াশার মধ্য দিয়ে তখনও স্টেশনে এসেছে দশরথ। মাঝখানে আসতেও পারেনি বেশ কটা দিন।

সেবার সেই বাঁদরওয়ালা বেশ ক-মাসের জন্য স্টেশনে রয়ে গেল। এমনিতে সে বর্ষার শেষ দিকে আসত। তারপর মাসখানেক খেলা দেখিয়ে উধাও হয়ে যেত শীতের মুখটায়। কিন্তু সেবার তার বুড়ো বাঁদরটার অসুখ। শীত এসে গেলেও বাঁদরওয়ালা তাকে নিয়ে টানাটানি করল না।

স্টেশন এলাকাটা এর মধ্যে পাল্টে গেছে খানিক। প্রায় ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে পান-গুমটি বসেছে। পানের সঙ্গে মনিহারি জিনিস পাওয়া যায় সেখানে, দড়িতে ঝোলে পান-মশলার ঝলমলে প্যাকেট। স্টেশন থেকে গ্রামে যাওয়ার রাস্তায় কখনও একটা ট্রেকার এসে দাঁড়ায়। স্টেশন রাস্তার দু পাশেও জায়গা দখলের খুঁটি পুঁতেছে লোকজন। কাছাকাছি টেলিফোন বুথ নেওয়ার জন্য শহর থেকে এসে কে একজন খোঁজখবর করে গেছে।

এর মধ্যে এক্সপ্রেস ট্রেনটা আর দাঁড়াবে না এমনটা ধরেই নিয়েছিল লোকজন। সে-গাড়ি নিয়ে কথাবার্তাও অনেক কম। সকালবেলা গাড়িটা যেমন যাওয়ার তেমন যায়, তাকে নিয়ে কেউ বিশেষ ভাবে না। আশপাশের সবাই স্টেশন এলাকায় জায়গা পাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। বনোয়ারির মুখে শোনা যায় প্যাসেঞ্জার ট্রেন নাকি আরও কয়েকটা বাড়বে।

এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিন। দিন জুড়ে জুড়ে মাস, শীতকালটাও এক সময় চলে যাওয়ার মুখে। স্টেশনের শিরীষ গাছটায় পুরনো পাতা ঝরে গিয়ে নতুন পাতা এল। মাঠের মাঝে দাঁড়ানো পলাশের ডালে ফুল এল একটা-দুটো। আর এসবের মধ্যেই আউট-পোস্টের সিগন্যাল আবার একদিন সকালে লাল হয়ে থাকল। প্রথমে কেউ সেটা বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু জঙ্গলের দিকে হুইসল্ পড়তে থাকল পরপর। বাঁদরওয়ালার সাজিয়ে বসা খেলা সেদিন আবার বরবাদ হয়ে গেল।

সেদিন ট্রেনটা খানিক বেশি সময় দাঁড়াল। আর দাঁড়াতেই সব আগের মতো আবার। স্টেশন জুড়ে হাঁকডাক। সঙ্গে স্টেশনবাবু আর বনোয়ারির ছুটোছুটি। দরজায় দাঁড়িয়ে সিগন্যাল দেখে যাওয়া যাত্রীদের। এবং শেষের চারটে বগির নীচে পাথরের ওপর হাজির দশরথও। মাঝখানে আরও খানিকটা বুড়ো হয়েছে সে। সেই সঙ্গে রোগাটেও। আরও ময়লা হয়েছে জামাকাপড়। কিন্তু যা এক রয়ে গেছে তা তার গলার স্বর। জানালার নীচে আগের মতোই ছুটে বেড়ায় সে। —পানি পিয়েগা বাবুলোগ, ঠাণ্ডে পানি। টিশান কলকা মিঠা পানি…।

প্রথম বোতলটা সেদিন একটু তাড়াতাড়ি হাতে এসে যায়। আগেও এমন হয়েছে, তবে তা কদাচিৎ। পাথরের ওপর দিয়ে ছুটতে থাকে দশরথ। এর মধ্যে টিউবওয়েলটা আরও নড়বড়ে হয়ে গেছে। গোড়ার সিমেন্ট আলগা, জল তোলার আগে হ্যাণ্ডেলের অনেকখানি বসে যায়। তবু লোকজনকে ঠেলে সরিয়ে জল ভরে দশরথ। বোতল ভরা হলে আবার ছুট, সোজা জানালার নীচে। …লিন বাবু।

কিন্তু এই প্রথম চট করে নেমে আসে না হাতটা। জানালার দিকে তাকায় ও। ট্রেনের ভেতর থেকে গলা শুনতে পায়। জরুরৎ নেহি।

ক্যানে বাবু লিবেন না ক্যানে, এত কষ্ট করি আইনলম। খোয়া-পাথরের ওপর অস্থির দশরথ। জানালার দিকে উঁচু করে রাখা হাতখানা।

এবার জানালা দিয়ে ওকেও একটি বোতল দেখানো হয়। সঙ্গে কিছু কথা, সেগুলো সব বুঝতে পারে না। বোতলখানাও অচেনা লাগে ওর। ঝকঝকে প্লাস্টিকের গা, মাথায় নীল ছিপি আঁটা। বোতলের গায়ে অজানা নীল অক্ষর।

বুকের মাঝখানটা ধক করে ওঠে। কদিন আগে শোনা লোটনের কথাগুলো মনে পড়ে যায়। জানালার দিকে তখনও উঁচু করা হাত। এদিক-ওদিক তাকায় দশরথ। সামনের জানালায় নতুন বোতল দিয়ে তখন টাকা নিচ্ছে লোটন। সেই বোতলেরও ঝকঝকে গা, নীল ছিপি মাথায়।

উঁচু হাতখানা ধীরে ধীরে নামিয়ে নেয় ও। কেমন এক চক্কর মাথার ভিতরে। চোখ দুটোও ঝাপসা। কোনও রকমে হাঁটতে থাকে প্ল্যাটফর্মের দিকে। লোটন তখনও নতুন বোতলের জল বেচতে ব্যস্ত, খেয়াল করে না বুড়োকে। প্ল্যাটফর্মে হাত ছুঁইয়ে এলিয়ে বসে পড়ে দশরথ।

সেদিনের ট্রেন ছেড়ে গেলে স্টেশন আগের মতো সুনসান হয়ে যায়। পতাকা গুটিয়ে ফিরে আসে বনোয়ারি। গ্রামের লোকেরা দল বেঁধে ঘরে ফিরে যায়। দুপুর আর বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামে এক সময়। জঙ্গলের গাছে ঝিঁঝি পোকা ডাকে, অন্ধকার ঘিরতে থাকে স্টেশনের চারপাশ। তখনও বসে থাকে দশরথ। অন্ধকার আরও গাঢ় হলে এক সময় কোথায় যেন মিলিয়েও যায়।

সেই শেষ। তারপর কখনও আর দেখা যায়নি ওকে। সেই স্টেশন তারপর আরও ব্যস্ত হয়ে গেছে। দিনে-রাতে বেশ কটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন বেড়েছে। প্লাস্টিকের বোতল সাজিয়ে রাখা কয়েকটা দোকান হয়েছে পরপর। গ্রামের লোকও মাঝেমাঝে টাকা দিয়ে জল কিনে খায়।

প্ল্যাটফর্মের এক কোণা থেকে সেই টিউবওয়েলটাও বহু দিন হল সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “জল : ছোট গল্প লিখছেন সাত্যকি হালদার”

  1. পীযূষ কান্তি দাস says:

    বাস্তব গল্প।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev