রাহুল গান্ধী বেশ খোলামেলা মানুষ। তার হাবভাব মোটেই মার্কামারা রাজনীতিবিদদের মত নয়। ভোটে হারলে তিনি উধাও হয়ে যান, দেখা করতে চলে যান প্রিয়জনদের সঙ্গে। আবার হঠাৎই নিজের মর্জিমাফিক উদয় হন রাজনীতির মঞ্চে। ক’দিন আগেই তামিলনাড়ুর বিখ্যাত মানুষ বনাম ষাঁড়ের লড়াই দেখতে তিনি চলে গেলেন তামিলনাডু। এই সেই জালিকাট্টু, যা এক দশক আগে কংগ্রেস তামিলনাডুতে বন্ধ করে দিয়েছিল নৃশংসতার তকমা দিয়ে। এক দশক পর রাহুল ষাঁড়ের মধ্যে আবিস্কার করেছেন কৃষকদের প্রতীক। দিল্লির কৃষক সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানাতে তিনি জালিকাট্টু দেখতে চলে গেলেন তামিলনাডু।
রাজনীতি বড়ই বিচিত্র। আরও বিচিত্র যারা এর সঙ্গে যুক্ত। জালিকাট্টুর ষাঁড়টিকে আদতে এক নৃশংস আমোদের প্রয়োজনে ক্ষিপ্ত করে তোলা হয়। রাজনীতিবিদরা সময় সময় তার থেকেও বেশি ক্ষেপে ওঠেন। নাহলে আচমকা রাহুল জালিকাট্টু দেখতে তামিলনাডু যাবেন কেন? কেনই বা দলগুলি এই ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে একেক সময় একেকরকম কথা বলবেন? দুর্জনেরা অবশ্য বলছেন, এই বছরের শেষের দিকেই তামিলনাডু বিধানসভা নির্বাচন। তাই রাহুলকে জালিকাট্টুর আসরে যেতে হয়েছে। ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের লড়াই দেখতে তামিলনাডুর মানুষ দেখতে ভালোবাসে। রাহুলকে যেতে হয়েছে তাদের প্রিয়জন হওয়ার তাগিদে। তামিল অস্মিতা এখানে একটা বড় ফ্যাক্টর।
দেশের পশুপ্রেমী মানুষরা দীর্ঘদিন ধরেই এই নৃশংস ‘স্পোর্টস’ বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের আন্দোলনের চাপে ২০১১তে নিষিদ্ধ হয়েছিল এই জান্তব বিনোদন। দ্বিতীয় ইউপিএ’র আমলে তৎকালীন পরিবেশ মন্ত্রী জয়রাম রমেশ ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের সঙ্গে একদঙ্গল মানুষের এই নৃশংস লড়াই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ২০১৪তে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সুপ্রিম কোর্ট এই আদেশ বহাল রাখে। জয়রাম সেসময় সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, এই আদেশ নৃশংস খেলাটিকে চিরতরে বন্ধ করে দেবে।

এটা ঘটনা যে তামিলনাডুর জনসংখ্যার একটা বড় অংশের মানুষের কাছে জালিকাট্টু একটা বিনোদন। এর মাধ্যমে এই রাজ্যের মানুষদের কাছে আসা যায়। তাদের সমর্থন আদায় করতে জালিকাট্টু একটা বড় অস্ত্র। তাই বিনোদন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থানের বারবার পরিবর্তন হয়। একদা জালিকাট্টু বিরোধী বিজেপিও একটা গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ঘোষণা করে ষাঁড় বিপজ্জনক প্রাণী নয়। এই যুক্তিতে জালিকাট্টু আবার চালু হয়ে গেল। অথচ গোটা ‘স্পোর্টস’টি একটা আঁতকে ওঠার মত ব্যাপার।
ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে পরিবেশ, পশুপ্রেম, বন্যপ্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদির কোন জায়গা থাকেনা। একথা দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই খাটে। সামান্য কিছু রাজনীতিবিদ এর ব্যতিক্রম। কিন্তু তারা একক উদাহরণ মাত্র। দল তাদের সঙ্গে থাকেনা। নাহলে পেটা চালু হওয়ার পরেও জালিকাট্টু চলতে পারতো না। প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করার আইনে এ খেলা বন্ধ করা উচিৎ। একটা রাজ্যের মানুষ ভালোবাসেন বলে স্পোর্টসের নামে এই নৃশংস বিনোদন চলবে! খবর নিলে দেখা যাবে প্রতি বছর জালিকাট্টুতে বহু মানুষ আহত হন এমনকি মারাও যান, মারা যায় অনেক ষাঁড়। তারপরও এই জিনিস চলবে? স্রেফ ভোটের লোভে এই ‘স্পোর্টস’ সমর্থন করবেন সরকার!

রাজনীতির স্বার্থেই কখনও এই খেলা বন্ধ হচ্ছে আবার কখনও চালু হচ্ছে। দেশের অ্যানিমাল ওয়েলফেয়ার বোর্ড অবিলম্বে এই খেলা বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতা তা বন্ধ করতে নারাজ স্রেফ রাজনীতির স্বার্থে। কারণ এতে মানুষ তাদের বিপক্ষে যাবে। যে প্রাণীটিকে একদল মানুষ শারীরিকভাবে আক্রমণ করে ক্ষিপ্ত করে তুলে জান্তব আনন্দ উপভোগ করছেন সেই প্রাণীটিকেই কৃষক সংগ্রামের প্রতীক করে তুলেছেন দেশের প্রধান বিরোধী দলের এক নেতা!
লুপ্তপ্রায় উচ্চকোটির প্রাণী নয়, তাই ষাঁড় সংরক্ষণের আওতায় আসবে না। আইন করে এই নৃশংসতা বন্ধ করার রাস্তাটাও এখন বেশ অস্পষ্ট হয়ে গেছে। রাজনীতির ময়দানে রক্তাক্ত ক্ষ্যাপা ষাঁড় মানুষের সুবিচারের অপেক্ষা করছে। কিন্তু রাজনীতি নিজের স্বার্থেই এই নৃশংসতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যাদের কাছে মানুষই তুচ্ছ, তাদের কাছে ষাঁড় কোন বিবেচ্য ব্যাপারই নয়।
ভীষণ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন। এরই নাম রাজনীতি।
প্রাঞ্জল বিশ্লেষণ। ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ ।
ধন্যবাদ