সুদেব সিংহ
জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা ১০১ বছরের সময়-পর্ব পূর্ণ করলো। ১৩ এপ্রিল ১৯১৯, অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানে এই নারকীয় তাণ্ডব ঘটেছিল। তার অব্যবহিত পরেই অমৃতসর এবং আশপাশের মানুষ ইট-পাথর ছুড়ে, টেলিগ্রাফের পোস্ট উপড়ে, রেললাইন তছনছ করে তাঁদের স্বাভাবিক ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছিলো। ব্রিটিশ সরকারের হিসেবে ৩৭৯ জন মারা গিয়েছিলেন। জাতীয় কংগ্রেস জানিয়েছিল, ১,৫০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সংবাদ অনুযায়ী প্রায় ১,৭০০ জনের হত্যা হয়েছিল। যাঁরা প্রতিবাদ করছিলেন তাঁরা সকলেই নিজ দেশবাসীদের পশুর চেয়েও অধম অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হতে দেখে জ্বলে উঠেছিলেন।
মনে করা যেতে পারে, গত ২০১৩ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন অমৃতসর যান। সেখানে জালিয়ানওয়ালাবাগ শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, এই ঘটনা ব্রিটিশ ইতিহাসেও গভীর লজ্জার এক অধ্যায়। গত ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে লন্ডন শহরের মেয়র সাদিক খান বলেন, ব্রিটিশ জাতির, আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয়দের কাছে এই বীভৎস ঘটনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।

বোঝা যায়, উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে যুক্তি-প্রতিযুক্তি, ইতিহাস এবং সমাজবিদ্যাচর্চা ব্রিটিশ জাতিকে বোঝাতে পেরেছে যে কয়েক হাজার নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলা ইতিহাসের বিচারে চিরকালীন অপরাধ। যাঁরা প্রাণভয়ে পালাতে গিয়ে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছিলেন, পাছে তাঁরা বেঁচে যান, সেজন্য আরও গুলিচালনা, এটা কোনও মানবিকতার বিচারেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
১৯১৯-এর ১৩ এপ্রিল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে ১,৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল। অথচ এই ডায়ারকে ব্রিটেনের হাউস অব লর্ডসের বহু সদস্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। নোবেলজয়ী বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক রাডইয়ার্ড কিপ্লিং বলেছিলেন, এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ডায়ার মানবজাতির উপকারই করেছেন। কিপ্লিংয়ে ভারতীয় তথা এশীয়দের প্রতি বিদ্বেষের কথা সকলেই জানেন। ব্রিটিশ বিচারপতি স্যর সিডনি রাওলাটের নামে লোকে চিনে নিতো, ‘দ্য অ্যানার্কিকাল অ্যান্ড রেভোলিউশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট অব ১৯১৯’—সোজা কথায় সরকারি দমন পীড়নকে বৈধতা দিতে ১৮ মার্চ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে পাশ হয়েছিল এই আইনটি।

এই আইনে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার, অনির্দিষ্ট কালের জন্য ব্জেলে বন্দি রাখা, আদালতে পেশ না করা- এরকম বহুবিধ সুযোগসুবিধে ছিল। আসলে ১৯০৮ সালের মানিকতলা বোমা মামলা ব্রিটিশ সরকারকে চমকে দিয়েছিল। পাঞ্জাবে গদর পার্টিও অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ের মহড়া শুরু করেছিল। ১৯১৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। ব্রিটিশ সরকার চাইছিল যে কোনও মূল্যে বিপ্লবী কার্যকলাপের শিকড় উপড়ে ফেলতে। পার্লামেন্টে রাওলাট আইন পাশ হতেই গান্ধীজি তীব্র সমালোচনা করেন। কিন্তু আক্রমণ নেমে আসছিল বাংলা এবং পাঞ্জাবে। অমৃতসর, তরণ তারণ, কলকাতা, ঢাকা- সব জায়গাতেই রাওলাট আইন-বিরোধী বিক্ষোভ বড়ো আকার নিচ্ছিল। ৩০ মার্চ পাঞ্জাব এবং উত্তর পশ্চিম ভারতে আন্দোলন চরম আকার নিলো। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ পথে নেমেছিলো। গান্ধীজি ৬ এপ্রিল সাধারণ হরতাল ডেকেছিলেন।
পাঞ্জাবের জনপ্রিয় দুই কংগ্রেস নেতা, ডঃ সত্যপাল এবং ডঃ সইফুদ্দিন কিচলুকে বন্দি করে অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয়। পাঞ্জাবের বিভিন্ন শহরেই সেনা এবং পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে সামনাসামনি সংঘাতে জড়াচ্ছিলেন সাধারণ মানুষ।

সে বছর ১৩ এপ্রিল ছিল বৈশাখী। বাঙালিদের যেমন ১ বৈশাখ, পাঞ্জাবিদেরও তেমনই বৈশাখী উৎসব। এই উপলক্ষেই জালিয়ানওয়ালাবাগের ৭-৮ একরের বাগানে জমা হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। পাঞ্জাবের লেফটান্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও.ডায়ার সামরিক আইন বা মার্শাল ল জারি করেছিলেন। এই আইনের একটি ধারায় ছিল, রাজনৈতিক সমাবেশ বন্ধ। কিন্তু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সমাবেশে কোনও নিষেধ ছিল না।

জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানে সকাল ৯টা থেকে ঐতিহ্যশালী বৈশাখী উৎসবের সূচনা হয়। এই উৎসবে মানুষ আলোচনা করছিল, ডঃ সত্যপাল এবং ডঃ সইফুদ্দিন গেলেন কোথায়! তাঁরা এই উৎসবে থাকবেন না কেন? ইতিমধ্যে জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে উদ্যানের একটা বড়ো অংশ ঘিরে ফেলেন। এর পরই ঘটে যায় সেই বর্বরোচিত গুলিচালনা এবং অগণিত নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু। রক্তে ভেসে যাওয়া সেই বৈশাখীর মুহূর্তকে এবারের বৈশাখীতে আমরা স্মরণ করছি। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে, যে কোনও গণহত্যাকে ধিক্কারও জানাই, ধিক্কারের সেই ভাষা আমরা সংগ্রহ করছি তাঁর কাছ থেকে, যিনি প্রায় একক হাতে ‘বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা’-কে সার্থক করেছেন, সেই রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড ত্যাগ করার চিঠি থেকে। ভারতের তদানীন্তন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে তীব্র আক্রমণ করে কবি লেখেন- ‘The enormity of the measures taken by the Government in the Punjab for quelling some local disturbances has, with a rude shock, revealed to our minds the helplessness of our position as British subjects in India.[…] This callousness has been praised by most of the Anglo-Indian papers, which have in some cases gone to the brutal length of making fun of our sufferings, without receiving the least check from the same authority—relentlessly careful in smothering every cry of pain and expression of judgment from the organs representing the sufferers.’

সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ১৩ এপ্রিল ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত