করোনাকালে শবযাত্রায় প্রিয়জনদের অনেকেই দূরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কেউ ভয়ে আসছেন না মরদেহের পাশে। ছত্তিসগড়ে ময়লা ফেলার গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের মরদেহ। সে রাজ্যের রাজনন্দগাঁওয়ের একটি হাসপাতাল থেকে এভাবেই দেহ সৎকার করতে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
তবে এর পাশাপাশি একেবারে উলটো ঘটনাও ঘটে। আমরা তাকেই বলি ব্যাতিক্রম। করোনাকালে ঠিক তেমনটাই ঘটে চলেছে জলপাইগুড়িতে। রাত বিরেতে করোনায় কেউ মারা গেলে আতান্তরে পড়েন বাড়ির লোক। তখন কোথায় যাবেন, কাকে ডাকবেন, কেই বা এই দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়াবেন? কিন্তু খবর পাওয়া মাত্র এই ভয়ংকর সময়ে মৃতের বাড়ির লোকের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন দেবশ্রী ভট্টাচার্য ও গীতা থাপা।

অতিমারির এই ভয়ংকর সময়ে জলপাইগুড়ি শহরে অতি পরিচিত মুখ দেবশ্রী ভট্টাচার্য ও গীতা থাপা। খবর পেয়েই তাঁরা যেমন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গ্রীন জলপাইগুড়ির অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে করোনা আক্রান্তদের হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছেন। আবার কখনও বা রাতের অন্ধকারে শববাহী গাড়ি চালিয়ে মৃতদেহ সৎকারের জন্য শ্মশানঘাটে পৌঁছে দিচ্ছেন। সাধারণত এই কাজে পুরুষরাই অভ্যস্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরণের কাজ পুরুষরাই করে থাকেন। দেবশ্রী আর গীতা মহিলা হয়েও সেই কাজে এগিয়ে এসেছেন।
এই কাজে তাঁদের আরও বেশি উৎসাহ দেওয়ার জন্য শহরের বিভিন্ন মহল থেকে ইতিমধ্যে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। এবার ওই দুই বীর নারীকে কুর্নিশ জানিয়ে সংবর্ধনা দিল জলপাইগুড়ির মাসকলাই বাড়ি বন্ধু সমিতি ক্লাব ও পাঠাগার। ক্লাবের সদস্য রাজু দে নিজের হাতেই এই দুই মহিলার ছবি আঁকেন। তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এই ছবি। এছাড়াও পুষ্পস্তবক ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সংবর্ধীত করা হয় তাঁদের। উপস্থিত ছিলেন জলপাইগুড়ি পুরসভার প্রাক্তন উপ পুর প্রধান পিনাকী সেনগুপ্ত, গ্রীন জলপাইগুড়ি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সম্পাদক অঙ্কুর দাস সহ আয়োজক সংস্থার কর্মীরা।

জলপাইগুড়ি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সম্পাদক অঙ্কুর দাস বলেন, মেয়েরা যে ছেলেদের থেকে কোন অংশে কম নয় তার উজ্জ্বল নিদর্শন জলপাইগুড়ির এই দুই মহিলা। অসম্ভব মনের জোর এবং প্রচন্ড সাহসী এই দুই মহিলাকে নিয়ে ছবি এঁকে রাজু দে বলেন, ওঁরা আমাকে এতটাই প্রাণিত করেছে যে ক্যানভাসে ওদের মুখ পুরুষের থেকেও শক্তিশালী হয়েফুটে উঠেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা দেশের পাশাপাশি গোটা জলপাইগুড়ি জেলার পরিস্থবিতিও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এখন শহরে করোণা আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও পুরোপুরি উদ্বেগ কাটেনি। এই বিপদ সঙ্কুল সময় দেবশ্রী আর গীতা যেভাবে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

দেবশ্রী আর গীতা প্রতিদিন যে কেবল অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন তা নয়, তাঁরা মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন। তাই তাঁদের ক্ষেত্রে যে কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট বেমানান মনে হয়। এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যখন মানুষ ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছেন সেই ভয়ানক পরিস্থিতিকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে দেবশ্রী সদর্পে জানান, মানুষের প্রশংসা, বিভিন্ন সংস্থার সংবর্ধনা তাদের আরও বেশি উৎসাহী করছে, তাঁরা মানুষের কাছে অনেক বেশি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে উঠছেন।