শ্রাবণ মাস শুরু হয়ে গেলেও মেলা হবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন পুণ্যার্থীরা। করোনার আবহে জল্পেশের শ্রাবণী মেলা ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। করোনায় সুস্থতার হার বাড়লেও রোখা যাচ্ছেনা সংক্রমণ। আভাস মিলছে তৃতীয় ঢেউ এর। যার জেরে শ্রাবণী মেলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জল্পেশ ট্রাস্ট্রি বোর্ড। তবে কোভিড বিধি মেনে পুণ্যার্থীদের জন্য মন্দির খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী অন্যতম প্রাচীন শিব তীর্থ জল্পেশ মন্দিরে বছরের বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি মেলা বসে। তার মধ্যে অন্যতম শ্রাবণী মেলা। শ্রাবণ মাসের পূর্ণ তিথিতে মাসের শুরুতেই মেলার সূচনা হয়। জল্পেশ মেলা কে কেন্দ্র করে স্থানীয় বহিরাগত কয়েক লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যেক বছর মেলায় ভিড় জমান। এই সময় জেলার পার্শ্ববর্তী রাজ্য গুলির পাশাপাশি ভিনদেশ থেকেও পুণ্যার্থীরা শিবলিঙ্গে জল ঢালতে আসেন। বিশেষ করে নেপাল ভুটান ও বাংলাদেশের হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষজন ছুটে আসেন এখানে। রাজ্যের পাশাপাশি সমগ্র উত্তরবঙ্গ ব্যাপী মানুষের কাছে জল্পেশ শ্রাবণী মেলার প্রাধান্য চোখে পড়ে। আষাঢ়ের শেষাশেষি থেকে জেলা প্রশাসন ও মন্দির ট্রাস্টি বোর্ড সিদ্ধান্ত

গ্রহণ করে মেলার প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। স্থানীয় ও বহিরাগত বিপুল দর্শনার্থীদের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেলার সুষ্ঠু পরিবেশ ও পরিচালনার ব্যাপারে চূড়ান্ত তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। তবে এবছরের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। করোনার কোপে পুরোপুরি বিপর্যস্ত বিশ্ব। হাল ফেরাতে কাল ঘাম ছুটছে বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশগুলিতে। সেই দৌড়ে ভারত বর্ষ রয়েছে। করোনা মোকাবিলায় লকডাউন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে দেশব্যাপী আনলক প্রক্রিয়া। তবে মৃত্যুর হার সাম্প্রতিক কিছুটা কমলেও কার্যত বেলাগাম করোনা সংক্রমণ। আশঙ্কা প্রকাশ পাচ্ছে করোনার তৃতীয় ঢেউ এর। সারাদেশ ব্যাপী বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যবিধির ওপর। তাই সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রাবণী মেলা পুরোপুরি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে পুণ্যার্থীদের জন্য মন্দির খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাস্ট্রি বোর্ড। শ্রাবণী মেলায় বাড়তি ঝুঁকি নেওয়া আদৌ সম্ভব হবে কিনা সে ব্যাপারে ধন্দে রয়েছেন তারা। ইতিহাসে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার আসন্ন শ্রাবণী মেলা কে ঘিরে প্রশাসক থেকে শুরু করে অগণিত ভক্তদের মনে প্রশ্ন চিহ্ন তুলে দিয়েছে! তবে এই মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীর পেটে টান পড়ে গিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী যারা এই মন্দিরের উপরেই নির্ভর করে সংসার যাপন করতেন। এই অবস্থায় তারা পুনরায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ছন্দে ফেরার আশা প্রকাশ করেছেন ।
জল্পেশ মন্দির ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক গিরিন্দ্র নাথ দেব বলেন, “এবছর শ্রাবণী মেলা পুরোপুরি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে মন্দির খোলা থাকবে পুণ্যার্থীদের জন্য। করোনার ভয়াবহতা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” টিকা দেওয়ার শংসাপত্র বা ডবল ডোজের ভ্যাকসিনের রিপোর্ট দেখাতে না পারলে শ্রাবণ মাসের পূর্ণ তিথিতে মন্দিরে ঢুকতে পারবে না ভক্তরা। ময়নাগুড়ি ব্লক প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পঞ্চায়েত সমিতি এবং মন্দির কমিটি একত্রিত বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার ময়নাগুড়ি বিডিও অফিসে এই বৈঠক বসে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ময়নাগুড়ির ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক শুভ্র নন্দী, আইসি তমাল দাস, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শিবম রায় বসুনিয়া, সহ-সভাপতি ঝুলন সান্যাল, মন্দির কমিটির সম্পাদক গিরেন্দ্র নাথ দেব।

বিডিও মন্দির কমিটিকে জানিয়েছে মন্দিরের ভেতর অস্থায়ী কোন দোকান থাকতে পারবে না। সেইসাথে মন্দির সংলগ্ন যে পুকুর সেখানে স্নান বন্ধ থাকবে। মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর ভক্তদের সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে এবং মন্দিরের কোন স্থানে বসে গল্প করা যাবে না। মাস্ক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে মন্দির এবং মন্দির সংলগ্ন এলাকায়। করোনার টিকা বা 72 ঘণ্টা আগে করোনার পরীক্ষার শংসাপত্র দেখার পরে ভক্তরা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে বলে জানা গিয়েছে। এই বিষয়ে মন্দির কমিটি প্রশাসনের এই নির্দেশ ব্যানারে করে বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়ে দেবে বলে জানা গিয়েছে।
শিবম রায় বসুনিয়া বলেন, করণা রুখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সোমবারের বৈঠকে যেটা ঠিক হয়েছে সেটা পালন করলে সকলের সুবিধা হবে। মন্দিরের গেটের ঢোকার মুখে ভক্তদের সব কাগজপত্র দেখা হবে।
মন্দির কমিটির সম্পাদক জানিয়েছেন, প্রশাসন যে নির্দেশ দিয়েছে আমরা সেভাবে মন্দিরে ভক্তদের প্রবেশ করাবো।
সোমবার বিডিও অফিসের বৈঠক শেষে জল্পেশ মন্দির পরিদর্শনে আসেন প্রশাসনিক কর্তারা সহ জনপ্রতিনিধিরা। তবে সেখানে ঢোকার মুখে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের দেখে ক্ষোভ উগরে দেন ভিডিও। কারণ কারো মুখে নেই মাস্ক। বিডিও তাদের দ্রুত মাস্ক পড়ার জন্য বলেন। বিডিও বলেন, বিনা মাস্কে যাদের দেখা যাবে তাদের বিরুদ্ধে পুলিস ব্যবস্থা নেবে।জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত ময়নাগুড়ি থেকে সাত থেকে আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জল্পেশ মন্দির। জল্পেশ মন্দির জর দা নদীর তীরে অবস্থিত। শক্তিপীঠের ভৈরব হলেন জল্পেশ। এখানকার শিবলিঙ্গ হলো জল লিঙ্ অর্থাৎ গর্তের মধ্যেই থাকে।

ইতিহাসবিদেরা জানাচ্ছেন, এক সময় ময়নাগুড়ি এলাকা দিয়েই গিয়েছিল প্রাচীন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সংযোগকারী বাণিজ্য সড়ক সিল্ক রুট। তবে তখন ময়নাগুড়ি নাম ছিল না। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক আনন্দগোপাল ঘোষ জানান, এই এলাকাটি করতোয়া নদীর ধারে কার্জি রাজাদের অধীনে চাপগড় পরগনা বলে পরিচিত ছিল। কার্জিদের শেষ রাজা ছিলেন বজ্রধর কার্জি। সিল্ক রুটের একটি রাস্তা গিয়েছিল নেপালের দিকে। অন্যটি চিলাপাতার জঙ্গল হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে। সেই চাপগড় পরগনার মধ্যেই ছিল গড়তলি নামে প্রাচীন একটি জনবসতি। সেখানেই ছিল একটি পুণ্যক্ষেত্রও। যে জায়গাতেই পরে জল্পেশ মন্দির গড়ে ওঠে বলে অনুমান করা হয়। তবে প্রাচীন মন্দিরটি ভূমিকম্পে ভেঙে যায়। ১৬৩২ সালে তার উপরেই নতুন শিব মন্দির তৈরি করতে শুরু করেন কোচবিহারের রাজা প্রাণ নারায়ণ। ১৬৬৫ সালে সেই কাজ শেষ করেন তাঁর ছেলে মোদ নারায়ণ। এখন জল্পেশ উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান শৈব তীর্থ। প্রায় এক একর জমির উপরে তৈরি মন্দিরটির উচ্চতা ১২৭ ফুট। ১২৪ ফুট দীর্ঘ এবং ১২০ ফুট চওড়া। মন্দির চত্বরে রয়েছে দুই একর আয়তনের ‘সুবর্ণ কুণ্ড’ নামে জলাশয়।
শ্রাবণী মেলা গোটা রাজ্যের সব বিখ্যাত শিব মন্দিরের সেরা ঐতিহ্য বলা যেতে পারে। উত্তরবঙ্গের সব থেকে প্রাচীন মেলা ময়নাগুড়ির জল্পেশ মন্দিরের শ্রাবণী মেলা। প্রতিবছর এই মেলায় কয়েক লক্ষ লোকের সমাগম ঘটে। স্বাধীনতা লাভের আগে এই জলপেশ মেলায় হাতি বিক্রি করা হতো। এই মেলা দেখতে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রচুর লোক আসত। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে জলপেশ মেলা একদিকে যেমন ঐতিহ্যশালী অপরদিকে এই মেলার বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম।