‘উঠো উঠো গোরাচাঁদ নিশি পোহাইলো নদীয়ার লোকসবে জাগিয়া উঠিল…’
আনুমানিক সাড়ে তিনশো বছর ধরে জামাইষষ্ঠী প্রথা চলে আসছে নবদ্বীপের মহাপ্রভু শ্রীশ্রীচৈতন্যদেবের মন্দিরে। আজকে তিনি শ্রীকৃষ্ণের অবতার নন বরং তিনি আজ নবদ্বীপবাসীর আদরের জামাই। সকাল থেকেই তাই ধামেশ্বর মহাপ্রভুর মন্দিরে চলছে উৎসবের আমেজ। আনন্দে মুখরিত হয়ে নবদ্বীপবাসী পালন করছে জামাইষষ্ঠীর রীতিনীতি।
কারন এই নবদ্বীপধামে শ্রীশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রায় পাঁচশত বছর আগে ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে শুভ ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিনে (বাংলা ক্যালেন্ডারের একাদশ মাসের পূর্ণিমা দিনে-ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ফেব্রুয়ারি-মার্চ) জন্মগ্রহণ করেন। শিশুটির মা শচীদেবী ও পিতা শ্রী জগন্নাথ মিশ্র। বাংলাদেশের শ্রীহট্ট থেকে তারা এসেছিলেন নবদ্বীপে সংস্কৃত শাস্ত্র চর্চার জন্য। পিতা জগন্নাথ মিশ্র ছিলেন একজন পন্ডিত ব্যক্তি।
যথাসময়ে এই শিশুটি বাংলায় গৌরাঙ্গ প্রভু এবং সারা বিশ্বে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হিসাবে পূজিত হয়। পার্থিব দুঃখ-কষ্টে ভুগতে থাকা লোকেরা তাঁর মিষ্টি চেহারা, মধুর বচন ও কোমল হৃদয়ের মমতা দেখে তাঁকে ভগবানের অবতার বলে মনে করত।ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বঙ্গীয় সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। হিন্দুধর্মের জাতিভেদ উপেক্ষা করে তিনি সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরে “হরি বল” ধ্বনি বিতরণ করতেন এবং হরিনাম প্রচারে মৃদঙ্গ (শ্রীখোল)-করতাল সহযোগে অনুগামীদের নিয়ে নবদ্বীপের রাজপথে ‘নগর সংকীর্তন’-এ বের হতেন। অত্যাচারী জগাই ও মাধাইকে তিনি ভক্তেরূপে পরিণত করেন। তার প্রভাবে মুসলমান ‘যবন’ (হরিদাস ঠাকুর) সনাতন ধর্ম ও বৈষ্ণব মত গ্রহণ করেন এবং নবদ্বীপের শাসক চাঁদকাজী তার আনুগত্য স্বীকার করেন।

প্রথম ধর্মপত্নী লক্ষ্মীপ্রিয়াদেবীর সঙ্গে বিয়ের পর চৈতন্যদেব একবার তাঁর আদিনিবাস শ্রীহট্ট গিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গে পর্যটনকালে লক্ষ্মীপ্রিয়াদেবীর সর্পদংশনে মৃত্যু ঘটলে তিনি মায়ের অনুরোধে দ্বিতীয়বার বিষ্ণুপ্রিয়াদেবীর সাথে পাণিগ্রহণ করেন।
শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু গৃহত্যাগ করার পর বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী প্রচুর কষ্ট পেয়েছিলেন। স্বামী বিরহ যন্ত্রনায় তিনি বাকি জীবনটা উৎসর্গ করেন ভগবানের সেবার জন্য। তিনি পণ্ডিত ও জ্ঞানী মহিলা ছিলেন। অনেক পতিত এবং মূঢ়জনকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান দান করেছিলেন। কথিত আছে সন্ন্যাস নেওয়ার পর মহাপ্রভু শান্তিপুরে আসেন মায়ের সঙ্গে দেখা করতে, ফেরার সময় নবদ্বীপে নিজ ধামে যান। কিন্তু সন্ন্যাসীদের স্ত্রীর মুখ দেখা বারণ বলে, সন্ধ্যায় সামান্য প্রদীপের আলোয় এক ঝলক বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী, প্রভুর সাক্ষাৎ পান। প্রণাম করে মাথা তোলবার সময় আর তিনি স্বামীকে দেখতে পান না, পান তার পায়ের খড়ম দুখানি। ইতিহাসে তিনি সম্ভবত একমাত্র নারী যিনি পরবর্তী সমগ্র জীবনে শুধু স্বামীর খড়ম পূজা করেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামীর প্রতি তার যে অগাধ ভালোবাসা, প্রেমাশ্রুতা, তাকে মহীয়সী বানিয়েছে, তাই সকল হিন্দুনারীগণের আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হন। বর্তমানে এই পাদুকার বয়স প্রায় ৫০০ বছর পেরিয়ে গেছে।
চৈতন্য দেবের দারু-বিগ্রহটি তৈরি হয় ১৫১৩ সালে নিম গাছের কাঠ দিয়ে। মূর্তির পাদপিঠে খোদাই করা আছে ‘১৪৩৫ শক। বিষ্ণুপ্রিয়া সেবিত মহাপ্রভুর মূর্তির সেবাইত বংশের বিষ্ণুপ্রসাদ গোস্বামী তার “ধামেশ্বর শ্রী শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর শ্রীমন্দির ও শ্রীবিগ্রহের ইতিহাস” গ্রন্থে লিখেছেন যে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই চিনাডাঙ্গায় (বর্তমান মহাপ্রভুপাড়া) একটি পশ্চিমদ্বারী মন্দির নির্মিত হয় দিনাজপুরের রাজার অর্থনুকূল্যে। তবে সালটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ আছে। মন্দিরের বর্তমান সেবাইত হলেন গৌর কৃপানন্দ গোস্বামী।
প্রতিদিন সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় ধামেশ্বর মন্দিরের ব্যস্ততা। সকালে মহাপ্রভুকে দেয়া হয় বাল্যভোগ, এরপর অর্চনা পর্ব শুরু হয়। সারা দিনে মোট পাঁচবার মহাপ্রভুর সেবা পুজো হয়।
নদীয়ার প্রতিষ্ঠিত চৈতন্যদেবের যে দারুমূর্তি ধামেশ্বর মহাপ্রভু নামে পরিচিত সেই বিগ্রহ বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী নিজ সেবা করতেন। বাকিদিনে ভগবান শ্রী চৈতন্য হল জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লপক্ষে ষষ্ঠীর দিনে হয়ে ওঠেন ঘরের জামাই অর্থাৎ বিষ্ণুপ্রিয়াদেবীর স্বামী। এই মন্দিরের সেবায়েতরা বংশ পরম্পরায় নিমাইয়ের স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়ার ভাইদের উত্তর পুরুষ। প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে শ্রী চৈতন্যদেবের বিগ্রহকে তারা জামাই হিসাবে এই দিন আপ্যায়ন করে আসছেন। জামাইকে আদরের জন্য সমস্ত কিছুর আয়োজন করেন নবদ্বীপবাসীরা।
জামাইষষ্ঠীর দিন সকালে মঙ্গলারতি কীর্তনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের সূচনা। মহাপ্রভুর ঘুম ভাঙ্গানো হয় রুপোর রেকাবিতে করে মরসুমী ফল, রুপোর বাটিতে ক্ষীর, রুপোর গ্লাসে জল দিয়ে। তারপরে নিবেদন হয় বাল্যভোগ। নবদ্বীপে প্রবীণ মহিলারা মহাপ্রভুকে ষষ্ঠীর ‘বাটা’ বা ‘ষাট’ দেন। তালপাতার হাতপাখায় আম পাতা দুর্বল লাল সুতো ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে বেঁধে ছড়া কেটে কেটে মহাপ্রভুকে ষষ্ঠীর ষাট দেন প্রবীণারা।
“জ্যৈষ্ঠ মাসে জামাইষষ্ঠী ষাট ষাট ষাট
ভাদ্র মাসে চাপড়াষষ্ঠি ষাট ষাট ষাট…।’’

বারোমাসের ষষ্ঠী ছাড়া কাটা হয়, শেষ হলেই চিঁড়ে, মুড়কি, দই আম কাঁঠাল, মিষ্টি ইত্যাদি দেওয়া হয়। শুধুমাত্র খাবারেই নয় পোশাকেও থাকে জামাই সাজসজ্জা। নতুন গরদের ধুতি, পাঞ্জাবি, গায়ে উত্তরীয়, গলায় গোলাপের মালা যেন নতুন জামাই। গতবছর পুরীর জগন্নাথধাম থেকে বিশেষ বস্ত্র আনা হয় মহাপ্রভুর জন্য।
এরপর নিবেদন করা হয় মধ্যাহ্নভোজ (সময় দুপুর ২-২.৩০)। ভোজে থাকে সাদা ভাত, কচু শাক, মোচাঘন্ট, শুক্ত, ভাজা ডাল থোড়, বেগুন পাতুরি, ছানার ডালনা, লাউ, চাল কুমড়ো, পোস্ত দিয়ে রাঁধা সব রকম নিরামিষ পদ, আমক্ষীর, কর্পূর দিয়ে সাজা সুগন্ধি পান ইত্যাদি। এরপর বিকালে হয় উত্থান ভোগ অর্থাৎ রুপোর পাত্রে ছানা আর মিষ্টি। রাত্রের ভোগে থাকে ঘিয়ে ভাজা লুচি, মালপোয়া নানান রকমের মিষ্টান্ন, রাবড়ি আর খিলিকরা সুগন্ধি পান। শুধু দোকানের কেনা মিষ্টি নয়, মায়েদের হাতে তৈরী করা বিভিন্ন মিষ্টি দিয়ে মহাপ্রভুকে বরণ করা হয়। আজ সন্ধ্যাবেলায় নাটমন্দিরে বিশেষ কীর্তনের আয়োজন করা হয়েছে।
এই দিনটিতে প্রতিটি পরিবারের মেয়ের মায়েরা মহাপ্রভুকে পাখার বাতাস দিয়ে জামাইষষ্ঠী উৎসব পালন করেন। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এই প্রথা আজও যেন অবিকল একইরকম। আসলে ঐতিহ্যই মূলকথা মহাপ্রভুরধাম নবদ্বীপে। আরাধ্য দেবতাকে পিতা-মাতা-সন্তান, সখা বলে আপন করার রীতি বহু পুরানো কিন্তু জামাই বলে দেবতাকে আপন করার রীতি নবদ্বীপ ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। এখানেই নবদ্বীপের বিশেষত্ব।।
খুবই সুন্দর
থ্যাঙ্ক ইউ