ইংল্যান্ডের ইংরেজি উপন্যাস সাহিত্যের গতানুগতিকতায় পরিবর্তন আনতে যে নারী কথাসাহিত্যিক ঋদ্ধতার স্বাক্ষর রাখেন তিনি হলেন ইংরেজি সাহিত্যের ব্যতিক্রমধর্মী ঔপন্যাসিক জেন অস্টিন (১৬ ডিসেম্বর, ১৭৭৫ – ১৮ জুলাই, ১৮১৭) । তিনি ইংরেজি সাহিত্যের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, যা পাঠক, সমালেচক ও সমাজ বিশ্লেষকের কাছে কালজয়ী অভিধায় চিহ্নিত।
ঊনিশ শতকের আগে ইংরেজি উপন্যাস সাহিত্যে ইংল্যান্ডের ভদ্রসমাজের পটভূমিকায় লেখা রোমান্টিকতার উপস্থিতি তেমন ভাবে লক্ষিত হয়েছে বলে জানা যায় না। কিন্তু এটা লক্ষিত হয় জেন অস্টিনের লেখা উপন্যাসগুলোতে।
১৭৭৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারের অর্ন্তগত স্টিভেনটনে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রখ্যাত ইংরেজ মহিলা-ঔপন্যাসিক জেন অস্টিনের জন্ম। তাঁর বাবা জর্জ অস্টিন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট হলেও আর্থিক দিক থেকে ছিলেন দরিদ্র। তিনি ছিলেন রেক্টর। স্টিভেনটনে ধর্মশিক্ষা দিযয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। সেই সঙ্গে নিজের সন্তানদেরও শিক্ষাদান করতেন। জেন অস্টিন ছিলেন তাঁর সপ্তম সন্তান। জেনের শিক্ষা কিছুটা হয়েছিল তাঁর দাদাদের কাছে। তাঁর দুই দাদা ছিলেন ধর্মযাজক। অপর দুই দাদা ছিলেন নৌবাহিনীতে। এক সময় তাঁরা অ্যাডমিরাল পদে উন্নীত হন। আর এক দাদা এডওয়ার্ড ভাগ্যক্রমে ভূম্যধিকারী ভদ্রসমাজে প্রবেশের সুযোগ পান। শিশুদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য অস্টিন পরিবারের আয়োজনের ত্রুটি ছিল না। গ্রামভ্রমণ, ধাঁধাখেলা, গ্রন্থপাঠ, গল্প ও পারিবারিক নাটক রচনার মাধ্যমে পরিবারের শিশুরা যে শিক্ষা পেত, তা প্রথাবহির্ভূত হলেও খুব উঁচুদরের ছিল। এর ফলেই শিশু জেনের মনে ঔপন্যাসিক হওয়ার ইচ্ছা জেগে ওঠে। অক্সফোর্ড, সাউদাম্পটন ও রিডিং-এর বোর্ডিং স্কুলে তিনি কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন। তবে এই পড়াশোনা তাঁর জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি।
জেনের কৈশোর কেটেছিল গ্রামীণ সমাজে। তবে মাঝে মাঝে নিকটবর্তী শহরে গিয়ে বল নাচে অংশ নিতেন। যে গ্রাম্য সমাজে জেন বাস করতেন, সেই সমাজকে তিনি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন। কৈশোর বয়সেই তিনি গ্রামীণ সমাজে আচার আচরণ, রীতিনীতি তাঁর মনে রেখাপাত করে যাতে তিনি শিখে উপন্যাস লেখার কৌশল রপ্ত করতে সক্ষম হন।
ব্যক্তিজীবনে জেন তার বড়বোন ক্যাসান্ড্রার ভাগ্যবিপর্যয়। ঘটনাক্রমে জেন ও তাঁর প্রিয় বড়বোন ক্যাসান্ড্রা কেউই বিয়ে করেননি। ক্যাসান্ড্রার বাগদান সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের আগেই তাঁর ভাবী স্বামী জলে ডুবে মারা যান। জেনের বাগদান সম্পন্ন হয়েছিল তাঁর দাদার এক বন্ধুর সঙ্গে। কিন্তু পরদিনই তিনি সম্বন্ধ ভেঙে দেন। জেন অস্টিন কেন বাগদানকে মেনে নিতে অস্বীকার করার বিষয়টি আমরা তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ তে প্রত্যক্ষ করি।
১৮০১ সালে তাঁর বাবা অবসর নেন। তারপর তাঁরা সপরিবারে বাথে চলে আসেন। বাথ ছিল অভিজাত শহর। যদিও তার আভিজাত্য সেই সময কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। ১৮০৫ সালে বাবার মৃত্যুর পর তাঁরা সেখান থেকে চলে যান সাউদাম্পটনে। বাথ বা সাউদাম্পটন — কোথাও গিয়ে জেন আনন্দ পাননি। শেষে ১৮০৯ সালে তাঁর দাদা এডওয়ার্ড তাঁর মা ও বোনেদের নিজের হ্যাম্পশায়ার এস্টেটের গ্রামীণ পরিবেশে একটা ছোটোখাটো বাড়ি উপহার দেন। এখানে এসে জেন অস্টিন দাদার ছেলেমেয়েদের দেখাশোনার ভার নেন। ফাঁকে ফাঁকে তাঁর পুরনো লেখা সংশোধন করতে থাকেন। লেখক হিসেবে কিছু খ্যাতিও অর্জন করেন। ১৮১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস এমা। এই উপন্যাসটি উৎসর্গিত হয়েছিল প্রিন্স রিজেন্টের প্রতি। জেনের সাফল্য প্রিন্সের দৃষ্টিও তাঁর প্রতি আকর্ষিত করে। প্রথম যৌবনে জেন অস্টিন সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি (১৮১১), প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস (১৮১৩) ও নরদ্যাঙ্গার অ্যাবে (১৮১৭)। তিনটি উপন্যাস লিখেছিলেন। এই তিনটি উপন্যাস পরে তিনি আগাগোড়া সংশোধন করে প্রকাশ করেন। পরিণত বয়সে তিনি লিখেছিলেন ম্যানসফিল্ড পার্ক (১৮১৪), এমা (১৮১৬) ও পারসুয়েশন (১৮১৭ সালে নর্দ্যাঙ্গার আব্বের সঙ্গে একত্রে প্রকাশিত)।
অস্টিন তাঁর সমগ্র জীবন কাটিয়েছেন নিম্ন উচ্চবিত্ত সমাজের এক একান্নবর্তী পরিবারে। তিনি মূলত তাঁর পিতা ও ভাইদের কাছে লেখাপড়া শেখেন এবং কিছুটা নিজে পড়াশোনা করেও শেখেন। পেশাদার লেখক হিসেবে তাঁর উত্থানের পিছনে তাঁর পরিবারের স্থায়ী সমর্থনের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কৈশোর থেকে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি শিল্পের শিক্ষানবিশি করে গেছেন। এই সময় কালের মধ্যে তিনি একাধিক সাহিত্যিক রূপ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। এর মধ্যে তিনি পত্রোপন্যাস রচনার কাজেও হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে সেই রূপটি পরিত্যাগ করেন। তিনি তিনটি উপন্যাস রচনা করে সেই উপন্যাসগুলি বারংবার সংশোধন করেন এবং চতুর্থ একটি উপন্যাস রচনায় হাত দেন। লেখক হিসেবে তিনি যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেন। এছাড়া তিনি নরদ্যাঙ্গার অ্যাবি ও পারসুয়েশন নামে দুটি উপন্যাসও রচনা করেন। এগুলি তাঁর মৃত্যুর পর ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়। অস্টিন ‘স্যান্ডিটন’ শিরোনামে আরও একটি উপন্যাস রচনার কাজে হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি।
অস্টিন এর উপন্যাসগুলি অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ভাবোপন্যাসের সমালোচনামূলক পুনরীক্ষণ। এগুলি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতাবাদের উত্থানের একটি সোপানও বটে। তাঁর উপন্যাসের প্লট মূলত হাস্যোদ্দীপক হলেও তা সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সেকালের মেয়েরা যে বিবাহ ব্যবস্থার উপর কতটা নির্ভশীল ছিল, তারই প্রতিফলন ঘটায়। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। এই সময় মাত্র কয়েকজন সমালোচকই তাঁর রচনার সঠিক মূল্যায়ান করতে পেরেছিলেন। ১৮৬৯ সালে তাঁর এক ভ্রাতুষ্পুত্র ‘আ মেমোরি অফ জেন অস্টিন’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করলে, তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ১৯৪০-এর দশকের মধ্যে বিদ্বজ্জন সমাজে তিনি একজন মহান ইংরেজ সাহিত্যিকরূপে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন
‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ জেন অস্টিন রচিত ঋদ্ধ উপন্যাস। ১৭৯৬ সালে এই উপন্যাস রচনার কাজ শুরু হয়। এটি লেখিকার উপন্যাস রচনার দ্বিতীয় প্রয়াস এবং তাঁর সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি, প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস, নরদ্যাঙ্গার অ্যাবে উপন্যাসত্রয়ীর অন্যতম। উপন্যাসটি প্রকাশিত হতে বারো বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। অস্টিন ১৭৯৭ সালেই মূল পান্ডুলিপিটি রচনার কাজ শেষ করে ফেলেছিলেন। এই পান্ডুলিপি রচনার কাজটি তিনি করেন হ্যাম্পশায়ারের স্টিভেনটনে। এখানকার এক টাউন রেকটরিতে তিনি তাঁর পিতামাতা ও ভাইবোনদের সঙ্গে বাস করতেন। অস্টিন প্রথমে উপন্যাসটির নাম দিয়েছিলেন ফার্স্ট ইম্প্রেশনস। তবে এই নামে বইটি আদৌ কোনোদিন প্রকাশিত হয়নি। বরং তিনি পান্ডুলিপিতে ব্যাপক সংশোধনী আনেন, তারপর পুনরায় উপন্যাসটির নতুন নামকরণ করেন এবং শেষে ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ নামে বইটি প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এলিজাবেথ বেনেট। ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনাভাগের ইংল্যান্ডের ভূম্যধিকারী উচ্চবিত্ত সমাজে তার আচরণ, বেড়ে ওঠা, নৈতিকতাবোধ, শিক্ষা ও বিবাহকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের ঘটনাগুলি বিন্যস্ত। এলিজাবেথ এক মফঃস্বলবাসী ভদ্রলোকের দ্বিতীয়া কন্যা। সে লন্ডনের নিকটস্থ হার্টফোর্ডশায়ারে অবস্থিত মেরিটন নামে এক কাল্পনিক শহরে বাস করত।
উপন্যাসের পটভূমি ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল হলেও, এই উপন্যাসটি আধুনিক পাঠকের কাছেও সমান জনপ্রিয়। আজও সাহিত্য সমালোচকগণ এই বইটির প্রশংসা করে থাকেন।
১৮১৬ সালে জেন অ্যাডিসন’স ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়েন। ১৮১৭ সালের মে মাসে চিকিৎসার সুবিধার জন্য তিনি উইনচেস্টারের বাড়ি ভাড়া নেন। কিন্তু সেযুগে সেই রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। অবশেষে ১৮১৭ সালের ১৮ জুলাই জেন অস্টিনের মৃত্যু হয়। উইনচেস্টার ক্যাথিড্রালে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
জেন অস্টিন-এর ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, অন্যান্য উপন্যাসগুলো এবং তাঁর ঋদ্ধ গল্পসমূহ সাহিত্যজগতে তাঁকে অমর করে রাখবে।
মনোজিৎকুমার দাস, কথাসাহিত্যিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।