জন্মাষ্টমী ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পালন করা হয়। পুরাণ বলে, শ্রীকৃষ্ণ হলেন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। আজ সকাল থেকেই চলছে প্রিয় গোপালের জন্য ৫৬ ভোগের আয়োজন। ননী, মিছরি, মাখন, মঠরি, রাবড়ি, মোহনভোগ, তালফুলুরি, ক্ষীর, জিলিপির মতো নানা রকম মিষ্টি, শাক, দই, খিচুড়ি, দুধ, কাজু, মোরব্বা… কতকিছুই।
ভাদ্র মাসে জন্ম হাওয়ার জন্য তাল খুব প্রিয় খাবার কৃষ্ণের। জন্মাষ্টমীতে তাই তালের বড়া, তাল ক্ষীর, তালের লুচির মতো নানাবিধ সুস্বাদু খাবারে সাজিয়ে দেওয়া হয় নৈবেদ্যর থালায়।
“তালের বড়া খেয়ে গোপাল (নন্দ) নাচিতে লাগিল।”

শোনা যায়, বাসুদেব কৃষ্ণকে নন্দরাজের কাছে রেখে আসার পর গোকুলে কৃষ্ণের আবির্ভাব উপলক্ষে নন্দ উৎসবেই প্রথম খাওয়া হয়েছিল তালের বড়া। কথায় বলে ভাদ্র মাসে তাল পাকে গরমের প্রভাবে। আর পাকা তালের মৌ মৌ গন্ধে ভরে যায় চারিদিক। তাড়িয়ে তাড়িয়ে তালের বড়া খাওয়ার উৎসবই যেন জন্মাষ্টমী।
বারমাসে তেরো পার্বণের বঙ্গে সব সময়ই পাওয়া যায় বিভিন্ন ফল। ভাদ্রমাসের ফল তাল একটি সুস্বাদু ও লোভনীয় ফল। তালে থাকে প্রচুর পরিমাণ খনিজ ও আঁশ। এছাড়া প্রোটিন, শর্করা, চর্বি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন ও অ্যামাইনো অ্যাসিডেরও ভালো উৎস তাল।
‘ভাদ্র মাসের তাল না খেলে কালে ছাড়ে না’ বলে বাঙালি সমাজে প্রবাদও রয়েছে। তাই এই মরশুমে তাল খাওয়া চাই। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন ভাদ্র মাসের আগেই বাজারে পাকা তাল উঠতে দেখা যায়।
‘তাল’ ঘিরে বাঙালির তাল-বেতালের গল্প নেহাতই কম দিনের নয়।
‘এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে’—
ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই শিশুতোষ কবিতাটি হাত-পা নাড়িয়ে আবৃত্তি করেনি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তালনবমী’ স্কুলের পাঠ্যবইয়ের এই গল্প প্রায় সকলেই পড়েছেন৷
এই গল্পটিকে নিয়ে একটি সিনেমাও তৈরী হয়েছে।
তাল কে ঘিরে বাংলার লোকায়ত ব্রত— পার্বন, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলের জীবনের সঙ্গে তাল, ‘তালের বড়া’ বাঙালদের ভাষায়, আর ঘটিদের ভাষায় তাল ফুলুরি, তালের ক্ষীর, শীতকালে তাল পাটালি, তালের রস, আমুদে লোকেদের জন্যে তালের তাড়ি— সব মিলিয়ে একটা জমজমাট ব্যাপার আরকি!
জীবনে ব্যস্ততার কারণে বহু মিষ্টির দোকানে আজ এগুলির চাহিদা প্রচুর। দোকানদারেরা জানাচ্ছেন, বাড়ির গৃহদেবতাকে ভোগ দেওয়া জন্য সাধারণ গৃহস্থ থেকে মঠ-মন্দিরের ভক্ত-সাধু সকলেই আসছেন কিনতে। তালের বড়া তৈরির পরিশ্রম থেকে রেহাই পেয়ে দোকান থেকে কিনতেই হয়তো বেশি পছন্দ করছেন অনেক বাড়ির কর্ত্রীও।
এক সময় উপকূলীয় অঞ্চলে রাস্তার দু-পাশে সারি সারি দিয়ে তালগাছ ছিল। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বজ্রপাত প্রতিরোধ, নদীভাঙ্গন ঠেকানো, জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন মোকাবেলায় বড় ভূমিকা রাখে তালগাছ। কিন্ত সঠিক পরিচর্যার অভাবে, বৃক্ষ নিধনের কোপে পড়ে তাল গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

অনির্বচনীয় স্বাদ গ্রহণ করতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সুউচ্চ, ঋজু তালগাছ রক্ষা করতে হবে।
তাল আর মোহনভোগ শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় দুই খাবার। আর এই দুটি পদের মিশ্রণে যদি নতুন কোন ভোগ তৈরি করে নিতে পারেন আপনার প্রিয় গোপালের জন্য, তাহলে তো আর কথাই নেই ।
মোহনভোগ তৈরি করার সময় মিশিয়ে দিন তালের কাথ। উপরে ছড়িয়ে দিন নারকেল কুড়ো, কাজু, কিশমিশ। নতুন ডিশে ছোট্ট গোপাল নিশ্চিত খুশি হবে।
জন্মাষ্টমীর দিন গোপালের সব খাবারেই থাকে মাখনের আধিক্য। শ্রীকৃষ্ণের ছাপাণ্ন ভোগে কাজু, কিশমিশ, ঘি সমৃদ্ধ বাংলার মিষ্টি সুজি বা হালুয়া বা উত্তর ভারতের মোহনভোগ অন্যতম।
এই মোহনভোগ উচ্চারণ করা নিয়ে ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রিতে এক বিখ্যাত অভিনেতার একটি বিব্রত অসহয়তার গল্প শোনা যায়।
তৈরি হচ্ছিল ‘পথের পাঁচালি’ ছবির প্রেক্ষাপট।

শট নেবার আগে খটাশ করে যখন ক্ল্যাপস্টিক মারা হয়, তখন তাবড় তাবড় অভিনেতারও নার্ভ ফেল করে।
সিনেমার একটি দৃশ্যে— রান্নাঘরে বসে সর্বজায়ার সঙ্গে হরিহরের বাক্যালাপ। হরিহরের ডায়ালগ ছিলো…
‘চাটুজ্যেমশাইকে বললুম, কাজটা হলে আপনাকে লুচি-মোহনভোগ খাইয়ে দেবো’…
চরিত্রাভিনেতা কানু বন্দ্যোপাধ্যায় দৃশ্যগ্রহনের সময় প্রস্তুত। ক্যামেরা চালু হতেই তিনি সংলাপ বলতে শুরু করলেন, …
‘…কাজটা হলে আপনাকে লুচি-মোহনবাগান খাইয়ে দেবো’
কাট, কাট পরিচালকের মাথায় হাত। কানুবাবু করছেন কী!! শেষ পর্যন্ত আটবার মোহনবাগান বলে ন-বারের বার হরিহরের মুখ দিয়ে বেরোল মোহনভোগ। ভোগ আর বাগানের চক্করে মোহনের সঠিক দিশা পেতে পাঁচ মিনিটের জায়গায় লাগলো এক ঘন্টা।
শুধু সিনেমাতেই নয়,, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালি তে মোহনভোগ নিয়ে একটি হৃদয়ছোঁয়া বর্ণনা আছে। ঘটনাটি এমন—

“একটা বাটিতে অনেকখানি মোহনভোগ, এত ঘি দেওয়া যে আঙুলে ঘিয়ে মাখামাখি হইয়া যায়। অপু একটুখানি মুখে তুলিয়া খাইয়া অবাক হইয়া যায় — এমন অপূর্ব জিনিস আর সে কখনো খায় নাই তো! — মোহনভোগে কিসমিস দেওয়া কেন? কই তাহার মায়ের তৈরি মোহনভোগে তো কিসমিস থাকে না? বাড়ীতে সে মা’র কাছে আবদার ধরে — মা, আজ আমাকে মোহনভোগ করে দিতে হবে। তাহার মা হাসিমুখে বলে— আচ্ছা ওবেলা তোকে করে দেব — পরে সে শুধু সুজি জলে সিদ্ধ করিয়া একটু গুড় মিশাইয়া পুলটিসের মত একটা দ্রব্য তৈয়ারী করিয়া কাঁসার সরপুরিয়া থালাতে আদর করিয়া ছেলেকে খাইতে দেয়। অপু তাহাই খুশির সহিত এতদিন খাইয়া আসিয়াছে, মোহনভোগ যে এরূপ হয় তাহা সে জানিত না। আজ কিন্তু তাহার মনে হইল এ মোহনভোগে আর মায়ের তৈয়ারী মোহনভোগে আকাশ-পাতাল তফাৎ! … সঙ্গে সঙ্গে মায়ের উপর করুণায় ও সহানুভূতিতে তাহার মন ভরিয়া উঠিল। হয়তো তাহার মাও জানে না যে, এরকমের মোহনভোগ হয়! — সে যেন আবছায়া ভাবে বুঝিল, তাহার মা গরিব, তাহারা গরীব — তাই তাহাদের বাড়ী ভাল খাওয়া-দাওয়া হয় না।”
আসলে নাম এক হলেও গরীব আর বড়লোকের ঘরের মোহনভোগ একই হয় না, এই উপলব্ধির শুরু হলো অপুর এখান থেকেই।
বাড়ির তৈরি সুজির হালুয়াতে দুধ-ঘি-কাজু-কিশমিশ পড়লে হালুয়া তো মোহনভোগই হয়।।
সে যাই হোক, জন্মাষ্টমীর বিকেলে লুচি বা পরোটার সঙ্গে ঝাল ঝাল শুকনো লঙ্কার আলুর তরকারি আর তার সঙ্গে প্রসাদ মোহনভোগ থুড়ি বাঙালি ঘরের ডাকনাম হালুয়ার কম্বিনেশন …এক্কেরে বিকেলের আনন্দ জমে ক্ষীর।।
একটা দুইটা লুচি আলুরদম ছাড়া পেলেই খুবই খুশি হব। একটু পড়ে যদি গরমাগরম তালফুলুরি জোটেতো আর কথাই হবে না।
আর একটাপদ আমাদের বাড়িতে হতো তালের মোটালুচি ঘাগড়া বলে জানতাম।
এই দুটি পদ বাসি পেলে খুশিই খুশি।
বাহ! অনেক ধন্যবাদ ????
বাহ দারুণ
থ্যাংক ইউ ????
বাহ খুব সুন্দর লিখেছেন????????????
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????
বাহ! চমৎকার প্রতিবেদন।
অনেক ধন্যবাদ জানাই ????