১৫ আগস্ট কিংবা স্বাধীনতার সঙ্গে এই গানটির সম্পর্ক খুঁজে পাইনি। কিন্তু বিগত ৫৮ বছর স্বাধীনতা দিবসে অন্য অনেক গানের ভিড়ে অন্তত একবার বেজে উঠেছে এই গানটি— ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ/জারা আঁখমে ভর লো পানি/যো শহিদ হুয়ে হ্যায় উনকি/জারা ইয়াদ করো কুরবানি…’ কোনও হিন্দি ছবির গান নয় তবু এতকাল পরেও গানটি হৃদয় স্পর্শ করে। জাতীয় সংগীত না হয়েও গানটি প্রায় সেই আসনেই অধিষ্ঠান করছে। দেশপ্রেম জাগানোর মতো যাবতীয় সম্পদ রয়েছে গানটির কথায়। কেবল তাই নয়, মনে হয় গানটির কন্ঠশিল্পী যদি সারাজীবনে আর কোনও গান নাও গাইতেন তাহলেও তিনি স্মরণীয় হতেন কেবলমাত্র এই গানটির কারনে।
তবু গানটি যে আটান্ন বছর পেরিয়েও অমর কেবলমাত্র কন্ঠের ছোঁয়া লেগে কিংবা গায়কীর জাদুবলে নয়, গানের কথায় যেমন বীর শহীদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা-ভক্তি জাগানো ভাবনা তেমনি সুরের মূর্ছনা। সুর ও বানীর যথাযথ মেলবন্ধনেই যে গানটি প্রাণ পেয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এত কিছুর পর প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে এমন কথা কে লিখলেন আর কেই বা সুর করলেন। সত্যি কথা বলতে নিরানব্বই শতাংশ শ্রোতাই গানটির গীতিকার ও সুরকারের নাম জানেন না। তাদের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে গানটির জন্মকথায় চলে যাই।
গানটির সূতিকাগার বলা যায় মুম্বাই শহরের মাহিমা এলাকার রাস্তা। আজ থেকে আটান্ন বছর আগে ১৯৬২ সালের ডিসেম্বর মাসে সবে মাত্র চিন-ভারত যুদ্ধ থেমেছে কিন্তু তার রেশ পুরপুরি মিলিয়ে যায় নি। যুদ্ধে শহীদদের পরিবারে তখনও প্রিয়জন হারানোর বেদনার কান্না থেমে যায় নি। এমনই এক বিষন্ন দিনে মাহিমার পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন অখ্যাত এক কবি। আরব সাগরের নোনা হাওয়া তাঁর মনকেও উদাস করেছিল। বিষন্ন বোধ করেন কবি, দু-একটি পঙক্তি তাকে অস্থির করে তোলে। কিন্তু তার কাছে সেই মুহূর্তে নেই কোনও কাগজ-কলম। কিন্তু মনে আসা পঙক্তি দুটি লিখে রাখা খুবই দরকার।
কবি কাছাকাছি এমন কাঊকে পেলেন না যার কাছে এক টুকরো কাগজ আর একটি কলম আছে। আরও সামনে এগোলেন, রাস্তার ধারে একটি পান সিগারেটের দোকান দেখতে পেয়ে সেখান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনলেন। প্যাকেটের সিগারেটগুলি বের করে এক টুকরো কাগজ যাও বা হল কিন্তু দোকানদারের কাছে কলম নেই। তবে কলম পাওয়া গেল অন্য এক পান ক্রেতার কাছে। কবি ধার করা কলম দিয়ে ওখানে দাঁড়িয়েই লিখে ফেললেন যো শহিদ হুয়ে হ্যায় উনকি/জারা ইয়াদ করো কুরবানি। কলম ফেরত দিয়ে জোর পায়ে হাঁটা দিলেন ফিরতি পথে।

কবি প্রদীপ ও গায়িকা লতা মঙ্গেশকর
খাওয়া ঘুম ভুলে সারা রাত জেগে লিখলেন … ইয়ে শুভ দিন হ্যায় হাম সবকা/লেহেরা লো তিরঙ্গা প্যায়ারা/পর মত ভুলো সীমা পর/বীঁরো নে হ্যায় প্রান গাঁওয়ে… পরের দিন সকালেই ছুটে গেলেন সুরকার বন্ধু সি. রামচন্দ্রর বাড়ি। প্রদীপের কবিতাটি পড়েই হীরক খণ্ড চিনতে ভুল করেন না অভিজ্ঞ সুরকার। কাল বিলম্ব না করে মাঠে নেমে পড়েন তিনি। কিন্তু এমন গান গাইবে কে? লতা মঙ্গেসকর ছাড়া আর কারও কথা তো ভাবা যায় না। রামচন্দ্র-র সঙ্গে লতার সম্পর্কটা তখন বেশ খারাপ, কিন্তু তাঁর কাছেই প্রস্তাব রাখলেন সুরকার। গান শুনে লতারও না বলার উপায় ছিল না। তিনি প্রবল উৎসাহে গানটি কন্ঠে তুললেন তার পরে সেটি রেকর্ড হয়।
কবি প্রদীপ। আসল নাম রামচন্দ্র নারায়ণজি দ্বিবেদী। ২০১৫-তে নীরবে পেরিয়েছে তাঁর জন্মশতবর্ষ। ১৯৪৩-এ মুক্তি পাওয়া হিন্দি ছবি ‘কিসমত’ কলকাতায় রক্সি সিনেমা হল-এ চলেছিল টানা ১৮৭ সপ্তাহ, আর প্রদীপের লেখা সেই ছবির গান ‘আজ হিমালয় কি চোটি সে ফির হমনে ললকারা হ্যায়/দূর হটো অ্যায় দুনিয়াওয়ালোঁ, হিন্দুস্থান হমারা হ্যায়।’ সিনেমার রিল রি-ওয়াইন্ড করে বার বার চালাতে হত, দর্শকের দাবিতে। গানটির জনপ্রিয়তার চোটে, সম্ভাব্য গ্রেফতারি এড়াতে কিছু দিনের মধ্যে কবি প্রদীপকে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হয়।
স্বাধীনতার পরে ১৯৫৪ সালে ‘জাগৃতি’ ফিল্মের জন্য প্রদীপ নিজে লিখে গাইলেন— ‘আও বচ্চোঁ তুমহে দিখায়ে ঝাঁকি হিন্দুস্তান কি/ ইস মিট্টি সে তিলক করো ইয়ে ধরতি হ্যায় বলিদান কি’। মহাত্মা গান্ধীকে অভিবাদন জানিয়ে কবি প্রদীপ লিখেছিলেন— ‘দে দি হমে আজাদি বিনা খড়্গ বিনা ঢাল/ সবরমতী কে সন্ত তুনে কর দিয়া কামাল’। দেশভাগ, সামাজিক অধঃপতনের শুরু দেখে ‘নাস্তিক’ ছবির জন্য লেখেন ‘দেখ তেরে সংসার কি হালত কেয়া হো গয়ি ভগবান/ কিতনা বদল গয়া ইনসান/ সুরজ না বদলা চাঁদ না বদলা না বদলা রে আসমান/ কিতনা বদল গয়া ইনসান’। এই গানটিও নিজে গেয়েছিলেন।
১৯৬৩-র ২৭ জানুয়ারি, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরুর উপস্থিতিতে লতা রাজধানীতে গাইলেন— ‘অ্যায় মেরে বতন কে লোগোঁ’। শুনতে শুনতে নেহরুর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। তিনি গীতিকারের খোঁজ করলেন। এর পর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রদীপকে ‘রাষ্ট্রীয় কবি’ উপাধি দেওয়া হয়। প্রদীপ এই গানের স্বত্ব থেকে যা আয় করেছিলেন, সমস্তটাই যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের পরিবারের জন্য দিয়েছিলেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে সত্তরটি ছবিতে গান লেখেন। মোট গানের সংখ্যা প্রায় ১৭০০। ১৯৯৭ সালে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে, তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়া হয়। নব্বইয়ের দশকে হিন্দি ছবির গান তিনি মেনে নিতে পারেন নি, বিতৃষ্ণায় গান লেখাই ছেড়ে দেন। ১৯৯৮ সালের ১১ ডিসেম্বর, ৮৩ বছর বয়সে মারা যান।
খুবই ভালো লাগল। মন কাড়লো।