কবি আবু হেনা মোস্তফা কামালের জন্মগ্রাম গোবিন্দা বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার অন্তর্ভুক্ত। সে হিসেবে বলতে হয় কবির জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলায়। আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রায় চল্লিশ বছরের কবি জীবনে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে মাত্র তিনটি : আপন যৌবন বৈরী [১৯৭৪], যেহেতু জন্মান্ধ [১৯৮৪] এবং আক্রান্ত গজল [১৯৮৮]। আর এই তিনটি গ্রন্থেই তিনি শক্তিমান কবি হিসেবে বাংলা কবিতার ইতিহাসে স্থান নিশ্চিত করেছেন শিল্পীর রূপান্তরে বিশ্বাস করতেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ব্যক্তির রূপান্তরের প্রতিও ছিল তার অগাধ আস্থা। তার মধ্যে প্রকৃত শিল্পীসত্তা ছিল বলেই এই দুইয়ের মধ্যে তিনি কোনো বিরোধ দেখেননি। সেই একই কারণে পারিপার্শ্বিক নানান সীমাবদ্ধতাকেও তার তুচ্ছ মনে হয়েছিল। কেননা, সীমাবদ্ধতার চেয়ে প্রকৃত শিল্পের শক্তিকেই তিনি আমৃত্যু বড় করে দেখেছিলেন। সে-কারণেই বলতে পেরেছিলেন, ‘একজন কবির অনেক সীমাবদ্ধতাই তুচ্ছ হয়ে যায়, যদি তার উচ্চারণে থাকে সত্যের জোর।’ এই যে যাকে তিনি বলেছেন, ‘সত্যের জোর’, সেটি তার সমস্ত সাহিত্যকর্মের প্রধান শক্তি। বলা যায়, সেই শক্তিকে অবলম্বন করেই তিনি তার মতো করে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা ও ভাবধারা নিয়ে যে সমালোচনা ও মূল্যায়ন করেছেন তা অত্যন্ত সরস,সাচ্চা ও নির্ভেজাল বলা যায়। তিনি তার এ প্রবন্ধের নাম দিয়েছেন, “জসীমউদ্দীনের কবিতা : জীবন ও শিল্প”। তার সারগর্ভ নিচে আলোচনা করা হলো।
মোরোপীয় সংস্কৃতির তীব্র অভিঘাতে আধুনিক বাঙালির যে সাংস্কৃতিক নবজন্ম-তার সঙ্গে জাতীয় ভবচৈতন্যের সম্পর্ক ছিলো না ব’লে বাংলার লোকসাহিত্য এবং লোক-ঐতিহ্য আধুনিক বাংলার উচ্চতর সাহিত্যের অবলম্বন হয়ে ওঠেনি। মাইকেল মধুসূদন থেকে বিহারীলাল-রবীন্দ্রনাথ হয়ে আজ পর্যন্ত বাংলা কবিতার যে-ধারা প্রবহমান তা একান্তই নাগরিক। প্রাবন্ধিক আবু হেনার মতে সমগ্র আধুনিক বাংলা কাব্যের ইতিহাসে — “জসীমউদ্দীনের সাধনা স্বাতন্ত্র্য ও সাফল্যের বিচারে বিশিষ্ট”। তার মতে মধ্যবিত্ত সম্প্রসারণের কাল যখন ফুরিয়ে এসেছে, বিশ শতকের সেই প্রথমদিকেই মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের উন্মেষ। স্বভাবতই মুসলিম মধ্যবিত্ত তখন অপেক্ষাকৃত আশাবাদী। সুতরাং জসীমউদ্দীনের কবিমানসে লোকজ জীবন ও ঐতিহ্যের প্রাধান্য কোনো প্রতিক্রিয়া-সঞ্জাত নয়। বরং বলা চলে বৃহত্তর বাংলার কৃষক সমাজ ও তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে জসীমউদ্দীনের পরিচয় ঐতিহাসিক কারণেই প্রত্যক্ষ ও নিবিড়। গ্রাম-বাংলা ও তার সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য তাঁর কবিতার শুধু উপকরণ নয়; প্রেরণাও বটে। গ্রামীণ গাথা ও পুঁথিসাহিত্যের আবহাওয়ায় পুষ্ট জসীমউদ্দীনের কাব্যসাধনায় যে-আবহমান বাংলার পরিণয় উদ্ভাসিত-তা কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিতে অসম্পূর্ণ অথবা খণ্ডিত নয়। জসীমউদ্দীনের শৈশব-কৈশোর তো বটেই- যৌবনেরও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে গ্রাম-বাংলায়। সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্যে স্কুল-কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু মানসিক রসপিপাসা চরিতার্থ করেছেন পুঁথি-গাথা-জারি-সারি-ভাটিয়ালির বিচিত্র আসরে।
জসমিউদ্দীনের কবিতায় তাই লোকজ উপকরণ ও আধুনিক শিল্পচেতনার চমৎকার সংশ্লেষ ঘটেছে। তিনি কাব্যের বস্তুসম্পদ আহরণ করেছেন লোক-ঐতিহ্য থেকে। গ্রামীণ জীবন তিনি খুব কুশলী হাতে আঁকতে সক্ষম কিন্তু এই অঙ্কন-রীতিতে আধুনিক শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট। ‘রাখালী’ অথবা ‘বালুচর’ কাব্যের খণ্ড কবিতাগুলিতে কৃষক, জেলে, মাঝি, বৈরাগী প্রভৃতির জীবনের পটভূমিতে প্রেমের অনুষঙ্গ লিরিক্যাল পরিচর্যায় বিকশিত হয়েছে। নকসী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এর কাহিনী-বিন্যাসের মূলে ‘মৈয়মনসিংহ গীতিকা’র অনুসৃতি অস্পষ্ট নয়- কিন্তু এখানে কবির লিরিক অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হলো নিবিড় নাটকীয়তা। গ্রাম-জীবন ও গ্রামীণ সংস্কৃতির অযত্ন-রক্ষিত অনুজ্জ্বল উপকরণ জসীমউদ্দীনের কবিতায় দ্যুতিমণ্ডিত অলঙ্কারে রূপান্তর লাভ করলো। এই রূপান্তর এতই বৈপ্লবিক যে তাকে জন্মান্তর বললে অত্যুক্তি হয় না। অতএব জসীমউদ্দীনকে যাঁরা ইঙ্গিতে ‘লোকসাহিত্য রচয়িতা’ বলে কটাক্ষ করেন তাঁদের শিল্পবোধ সম্পর্কে সংশয় জাগে। জাতীয় ঐতিহ্য থেকে কাব্যের বিষয়বস্তু গ্রহণ সাহিত্যের ইতিহাসে কোনো নতুন ঘটনা নয়। ‘

তাঁর কাব্যে বিধৃত মানুষ একান্তই পদ্মা-মেঘনার স্রোতোধারায় পুষ্ট জনপদের অধিবাসী। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তির বহির্জীবনের চেয়ে অন্তর্জীবনের ওপরেই তাঁর গভীরতর মনোযোগ। কলকারখানার শ্রমিক তাঁর কাব্যের নায়ক নয়- রূপাই পূর্ববাংলার এক ‘রাখাল ছেলে’, সোজনও তাই। তাদের দৈনন্দিন জীবনের মালিন্যের ওপর প্রেমের বিপুল ‘জ্যোতির অভিক্ষেপ ঘটেছে। ফলে সাধারণ মানুষই আচরণে-আয়তনে অসাধারণ উজ্জ্বলতা পেয়েছে। ‘নকসী কাঁথার মাঠ’-এ মানব-মানবীর প্রেম-বিরহ ও ব্যর্থতার যে-উপাখ্যান তীব্র নাটকীয় সংবেদনায় মণ্ডিত, তার সূত্রপাত ‘রাখালী’ কাব্যের নাম-কবিতাতেই। নায়িকা ‘বড়’ যে- কোনো এক গ্রামের।
…একটি মেয়ে চুলগুলি তার কালো কালো,
মাঝে সোনার মুখটি হাসে আঁধারেতে চাঁদের আলো।
মুখখানি তার কাঁচা-কাঁচা, না সে সোনার না সে আবীর,
না সে করুণ সাঁঝের গাঙে আধ-আলো রঙীন রবির।
কেমন যেন গাল দুখানি, মাঝে রাঙা ঠোঁটটি তাহার,
নায়কও কবির অপরিচিত নয়:
এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে ও-পথ দিয়ে চলতে ধীরে,
ওই মেয়েটির রূপের গাঙে হারিয়ে গেল কলসটিরে।
এই রাখাল ছেলের সঙ্গে কবির একাত্মতা সহজভাবে উৎসারিত হয়েছে বলেই লিরিক হিসেবে এইসব কবিতার সাফল্য। নাগরিক তিক্ততা ও কঠোর বাস্তববোধই এই কুষাণ তরুণকে পীড়িত করে না ।। সমস্ত পল্লীপ্রকৃতির ভেতরে ছড়ানো আছে তার কবিতার সাম্রাজ্য। রাখাল ছেলের কণ্ঠে জসীমউদ্দীন নিজেই বলেন —
ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ-ঘেরা গাঁ,
কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা;
সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,
সাঁঝ আকাশের ছড়িয়ে-পড়া আবীর-রঙে নাওয়া;
সেই গ্রামের কৃষাণ-দুহিতা তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে। কখনো-
কলমীলতা শাড়ী মেয়ের, কলমী-রাঙা মুখ,
ঠোঁট দুখানি সিঁদুর-ভাঙা রাঙা যে টুকটুক্।
আবার কখনো
নীল শাড়ীখানি দুলিছে লীলায় ঢাকিয়া সোনার দেহ,
রহিয়া রহিয়া চমকে বিজলী ভাঙিয়া মেঘের গেহ।
সম্ভবত এই কিশোরীর কথা ভেবেই ‘রাখাল ছেলে’র ভেতরে জসীমউদ্দীন আবিষ্কার করেন সেই ‘ব্রজের রাখাল’কে। তাকে তাই অনুরোধ করেন —
ঘরে ফিরে যাও সোনার কিশোর, এ পাপ-মথুরা পুরী,
তোমার সোনার অঙ্গেতে দেবে বিষবাণ ছুঁড়ি ছুঁড়ি।
জসীমউদ্দীনের কাব্যসাধনায় এই বিশেষ থেকে নির্বিশেষে উত্তরণের প্রবণতা নিত্য বহমান। তাঁর কবিতায় লৌকিক নায়ক-নায়িকার চোখে মাঝে মাঝেই অলৌকিকতার অঞ্জনাভাস লাগে। একাকীত্ব-বোধের গীতরূপ জসীমউদ্দীনের খণ্ড কবিতায়, আর ট্র্যাজিক আবেদন তাঁর কাহিনীকাব্যে। ‘বালুচর’ গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় এই নিঃসঙ্গতার হাহাকার প্রতিধ্বনিত:
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা, আমি বাঁধি তার ঘর,
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
যে মোরে করিল পথের বিরাগী;
পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি;
দীঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর;
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।
বৈষ্ণব পদাবলীর সুরেলা অনরণন উদ্ধৃত স্তবকে শোনা যেতে পারে। ‘ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর/পর কৈনু আপন, আপন কৈনু পর’- সম্ভবত এই কবিতার স্মৃতিই জসীমউদ্দীনের ‘প্রতিদান’ কবিতার উৎস। অন্যত্র ‘পরাজয়’ কবিতায় যখন কবি বলেন :
ফুল তুলেছিনু মালা গাঁথিবারে ফুল-শর চাহি নাই-
ধূপ জ্বেলেছিনু গন্ধ শুঁকিতে অগ্নিরে কেন পাই?
কেন ভুজঙ্গ জ্বালা
চন্দন বনে কপালে লেপিতে কপাল হইল কালা।
তখন, স্বভাবতই, বাংলা কবিতার একনিষ্ঠ পাঠকের সেই বিখ্যাত পদ ‘অমিয়া সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল ভেল’ মনে পড়তে পারে। বস্তুত বৈষ্ণব কবিতার আবেগ জসীমউদ্দীনের অনেক গীতিকবিতাতেই উৎকীর্ণ। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কিছু মরমী কবিতা ও গানে পরমাত্মা প্রেমিক পুরুষ হিসেবে কল্পিত হয়েছেন। কিন্তু জসীমউদ্দীনের লৌকিক প্রেমের কবিতায়ও লক্ষ করি, কখনো কখনো প্রেমাস্পদ পুরুষ কবি বিরহিণী রাধিকার মতো তার আগমন প্রত্যাশা করেন :`
কাল সে আসিবে, মুখখানি তার নতুন চরের মত,
চখা আর চখী নরম ডানায় মুছায়ে দিয়েছে কত।
চরের চাষীর ধানের ক্ষেতের মতই তাহার গা,
কোথা বা হলুদ, আবছা হলুদ, কোথা বা হলুদ না।
জসীমউদ্দীনের খণ্ড-কবিতায় ব্যক্তির সামাজিক পরিচয় ইঙ্গিত আছে কিন্তু তাঁর আখ্যান-কাব্যের নরনারী সমাজ প্রতিবেশেরই ফসল। বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই নায়ক রূপাই এক তরুণ চাষী। পিতৃহীন, কিন্তু সচ্ছল। ‘নকসী কাঁথার মাঠ’-এর কাহিনী
দশ খান্দা জমি রূপার তিনটা গরু হালে,
ধানের-বেড়ী ঠেকে তাহার বড় ঘরের চালে।
তার বংশগত আভিজাত্যও কম নয়। রূপার পিতামহের নামে লোকে তটস্থ হতো। রূপার পিতা গ্রাম্য চৌকিদারের কাছেও সম্মানিত ছিলো। আর তার মাতামহ ও পিতৃব্য সম্পর্কে কবি বলেছেন :
রূপার নানা সোয়েদ-ঘেঁসা, মিঞাই বলা যায়, —
কাজী বাড়ির প্যায়াদা ছিল কাজলতলার গাঁয়।
রূপার চাচা অছিমদ্দি, নাম শোননি তার?
এংরেজী তার বোল শুনিলে ষাঁড় মানিত হার।
নায়িকা সাজু ‘শেখের বাড়ির ডাগর ছুঁড়ি’এবং সেও পিতৃহীনা। তার আর্থিক অবস্থা অসচ্ছল নয়। গ্রামীণসমাজে ঈর্ষাযোগ্য বংশমর্যাদাও আছে: তার মা মোল্লা বাড়ির বড়মেয়ে।
সামাজিক পটভূমিতে রূপাই-সাজুর পূর্বরাগ লোকনিন্দার বিষয় হয়েছে। সম্ভবত উচ্চবিত্ত মুসলমানের অনুসরণে গ্রামসমাজেও কিছু কিছু কৃত্রিম মূল্যবোধের অনুপ্রবেশ ঘটেছিলো। প্রণয় পরিণয়ে পর্যবসিত হওয়ার আগপর্যন্ত উভয়পক্ষকেই শুনতে হয়েছে কুৎসা। মোটামুটি সচ্ছল মুসলমান চাষীর সমাজ-জীবনের সংস্কার-রীতিনীতি রূপাই-সাজুর জীবনাচরণের ভেতর • দিয়ে প্রতিফলিত। এইসব বর্ণনায় জসীমউদ্দীন-এর অকৃত্রিম বাস্তব-প্রীতির পরিচয় মেলে বিবাহোৎসবে কনের গৃহে কালুগাজী চম্পাবতী-সোনাভানের পুঁথি পাঠ হয়, যে-রূপাই কাহিনী শুরুতে অপূর্ব কালো (কালোয় যে-জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন, / তারি পদ-রজেন লাগি লুটায় বৃন্দাবন) কিশোরের প্রতীক, তার বরবেশের অপরিহার্য অঙ্গ, ‘ফুল পাগড়ী ‘জোড়া জামা’। বিবাহ অনুষ্ঠানে অন্যান্য উপহারদ্রব্যাদির সঙ্গে পাত্রপক্ষকে ‘সিঁদুর’ দি হয়। কিন্তু ‘কলমা’ পাঠের সময় শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী ‘সাক্ষী-উকিল’ ইত্যাদির উপস্থিতি ঘটে। ‘ক্ষীর ভোজনী’ অনুষ্ঠানে শুধু ‘এয়োরা’ই বর-কনের ঠোঁটে ক্ষীর স্পর্শ করে।
‘ভীষণ খরায়’ উদ্বিগ্ন গ্রামের কৃষকরা বৃষ্টির প্রার্থনা করে দরগাহতলায় দুধ শিরনি দেয় — ‘নৈলা’ গান গায়। তবুও বৃষ্টি না হলে মেয়েরা বদনা বিয়ের গান গাই বের হয়। তাদের কারো একজনের মাথায় থাকে :
…কুলোর উপর বদনা-ভরা জল,
তেল হলুদে কানায় কানায় করছে টলমল।
তারা মেঘকে ডেকে বলে-
আড়িয়া মেথা, হাড়িয়া মেঘা, কুড়ীয়া মেঘার নাতি,
নাকের নোলক বেচিয়া দিব তোমার মাথার ছাতি।
কৌটা-ভরা সিঁদুর দিব, সিঁদুর মেঘের গায়,
আজকে যেন দেয়ার ডাকে মাঠ ডুবিয়া যায়।
ফসল-তোলার সময় সমগ্র গ্রামে কাজের ঢল নামে। এমনকি নতুন চাষানীর কথাও আর কৃষকের মনে পড়ে না ‘ধানের কাব্য’ শেষ হলে ‘গানের কাব্য’ শুরু হয়। গভীর রাত পর্যন্ত কিষাণের বাঁশি বাজে। তরুণী বধূ কপট ক্রোধে বলে-
ওমনি করিয়া সারারাত আজি বাজাইবে যদি বাঁশি,
সিঁদুর আজিকে পরিব না ভালে, কাজল হইবে বাসি।
জমিচাষের অধিকার মানেই যে ফসলের অধিকার নয়- তার প্রমাণ, গাজনা চরের জমিতে ‘বন গেঁয়ো’রা এসে ধান কেটে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে গফরগাঁয়ের রহমান চাচা, ছমির মিঞা, কাজেম খুনী, মোহন ভুঞার ঔরসজাত গদাই ভুঞা, রূপাই- যায় গাজনাচরে। তাদের গলায় মুহুর্মুহু ‘আলী-আলী’ ধ্বনি ওঠে। রূপাই-র কণ্ঠেও একই ওষ্কার। তার হাতে লাঠি ঘোরে- তার সাথে ঘোরে —
… পায়ের তলে মাঠের মাটি।
আজ যেন সে মৃত্যু-জনম ইহার অনেক উপরে উঠে,
জীবনের এক সত্য মহান লাঠির আগায় নিচ্ছে লুটে।
মরণ যেন মুখোমুখি নাচছে তাহার নাচার তালে,
মহাকালের বাজছে বিষাণ আজকে ধরার প্রলয়-কালে।
মুসলিম বীরত্বের প্রতীক ‘আলী’ এবং হিন্দু পুরাণের ‘নটরাজ’ — ধ্বংসের দুই মূর্তির সমন্বয় রূপাইর চরিত্রে সহজেই ঘটতে পারে। রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা একসময় শেষ হয়। সরল চাষীর সুখের সংসার তার অজ্ঞাতসারেই ভেঙে যায়। রূপাই তাদের একজন। পুলিশের ভয়ে পলায়নমান রূপাই সাজুকে বলে —
লড়াইয়ে আজিকে কত মাথা আমি ভাঙিয়াছি দুই হাতে,
আগে বুঝি নাই তোমার মাথার সিঁদুর ভেঙেছে তাতে।
এমনি করেই নির্বোধ কৃষকের জীবননাট্যে আকস্মিক যবনিকাপাত হয়। এই কাহিনীর ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বুনিয়াদ অপ্রত্যক্ষ নয়। জসীমউদ্দীনের কৃতিত্ব, তিনি এই অতি পুরাতন ছবির ওপরে শিল্পের রং ফলিয়ে তাকে আধুনিক কাব্য-সংসারে তুলে এনেছেন।
স্মর্তব্য যে-উল্লিখিত চারটি কবিতাই (রাখালী, রাখাল ছেলে, কবর, পল্লীজননী) জসীমউদ্দীনের কবিতার পরীর উপকরণ জন্যে আলোচিত কৌতূহলের বিষয় যে, কবিতার উপকরণ পরীজীবন সম্পর্কিত হলেও অস্যময় থাকে। ভাষা আদৌ পরীমুখিন নয়। তাঁর শরত্বর জন্পনির্ভর কবিতায় যে-কথ্য ক্রিয়াপদ স্বামীনের ভাও নাগরিক। মাত্রাবৃত্তের এলানো ভঙ্গির জন্যে সাধু ক্রিয়াপদের প্রাচুর্য ঘটলেও তার সামগ্রিক আবেদনে সাধুভাষার প্রভতা নেই, কেননা শব্দভাণ্ডার মূলত তদ্ভব ও দেশি। উদাহরণ হিসেবে ‘কবর’ ও ‘পল্লী জননী’ কবিতা থেকে দুটি স্তবক উদ্ধৃত করছি।
ক. গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে,
ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়া যেতে গেঁয়ো-পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,
হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।
খ. ফেরে ভন ভন্ মশা দলে দলে ফুল ফুটে ঝরে বনে,
ফোঁটায় ফোঁটায় পাতা-চোঁয়া জল ঝরিছে তাহার সনে।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একলা জাগিছে মাতা,
সম্মুখে তার ঘোর কুজুটি মহাকাল রাত পাতা।
পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেল,
আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।
‘বালুচর’ কাব্যের সতেরোটি কবিতাই মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। এইসব কবিতায় গ্রামীণ শব্দের ব্যবহার প্রায় অনুপস্থিত। নাগরিক কথ্যভাষার শক্তি ও গতি দুই-ই ‘বালুচরে’র ভাষায় লক্ষ করা যায়। ‘সফল সন্ধ্যা’ কবিতা থেকে একটি স্তবক নিচে উদ্ধৃত করা গেলো :
ও অধর আর ওই রাঙা হাসি, ওই ফুল তনুখানি,
অনাহত কোন্ রাগিণীতে যেন আমারে ফিরছে টানি।
এত ভাল লাগে এ দেহ তোমার, সেথায় যে প্রাণ থাকে
সেকি একবার সাড়া দিতে নারে ভালবাসি এই ডাকে!
ও রাঙা ঠোঁটের কালো তিলকটির ভোমর পাখার পরে,
সেকি ওই কথা উড়াতে পারে না আজিকে আমার তরে।
কিন্তু প্রয়োজনবোধে ভাষার এই কথ্য মেজাজকে অতিক্রম করে জসীমউদ্দীন তৎসম শব্দবহুল সাধুভঙ্গির আশ্রয়ও কখনো কখনো নিয়েছেন। ‘মুসাফির’ কবিতার এই পঙতি গুলি তার দৃষ্টান্ত।
নামে দিগন্তে দুপুরের বেলা, আসে এলোকেশী রাতি,
গলায় তাহার শত তারকার মুণ্ডমালার বাতি।
মেঘের খাঁড়ায় রবিরে বধিয়া নাচে সে ভয়ঙ্করী,
দূর পশ্চিমে নিহত দিনের ছিন্নমুণ্ড ধরি।
রুধির লেখার দিগন্ত ছায় লোল সে রসনা মেলি,
হাসে দিগন্তে মত্ত ডাকিনী করিয়া রক্ত-কেলি।
হয়তো এরকম আরো উদাহরণ দেয়া যাবে তবু এ-কথা স্বীকার করতেই হয় যে জসীমউদ্দীনের কবিভাষায় তৎসম শব্দভারাক্রান্ত এই সাধুরীতির ব্যবহার নিয়ম নয় বরং তার ব্যতিক্রম। তাঁর প্রিয় ছন্দ স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত; এবং কথ্যরীতি ঐ দুটি ছন্দেই বেশি খোল্ল্লাই হয়। বৈচিত্র্যের জন্যে তিনি তৎসম শব্দের প্রয়োগে মাঝে মাঝে ভিন্ন সুরের অবতারণা করেন। ‘রাখালী’ ও ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ দুবছরের ব্যবধানে প্রকাশিত হয়। ‘রাখালী’ কাব্যের খণ্ড-কবিতাগুলিতে, আমরা বলেছি, আনুপাতিক বিচারে গ্রামজ শব্দের ব্যবহার খুব কম। কিন্তু ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ কাব্যে ক্রমশ তার অনুপাত বৃদ্ধি পেয়েছে। তার কারণ এই যে এটি কাহিনীকাব্য- এবং সেই কাহিনীর একটি বাস্তব সামাজিক ভিত্তি আছে। এখানে কবির সঙ্গে একজন নাট্যকার এসে যোগ দিয়েছেন। প্রতিবেশ, চরিত্র ইত্যাদি বাস্তবানুগ করে তোলার জন্যেই এখানে আঞ্চলিক শব্দের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। কবি নিজেও বলেছেন: ‘… গ্রন্থের চরিত্রগুলির ভিতরে কথোপকথন জুড়িতে আমি যতদূর পারিয়াছি তাহা গ্রাম্য রাখিতে চেষ্টা করিয়াছি।’ এই বিষয়-সজাগতা, বলা বাহুল্য, আধুনিক কবির চরিত্র-লক্ষণ। তেরোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ কাব্যের চারটি ছাড়া অবশিষ্ট পরিচ্ছেদগুলি স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা। এই ছন্দের প্রতি জসীমউদ্দীনের পক্ষপাতের কথা এবং তার কারণ আগেই উল্লেখ করেছি। এবার ‘নকসী কাঁথার মাঠে’র কিছু স্তবব বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে :
ক. “খড়ি কুড়াও সোনার মেয়ে! শুক্কো গাছের ডাল,
শুনো আমার প্রাণ নিয়ে যাও, দিও আখার জ্বাল।
শুকনো খড়ি কুড়াও মেয়ে! কোমল হাতে লাগে,
তোমায় যারা পাঠায় বনে বোঝেনি কেন আগে।”
খ. চৈত্র গেল ভীষণ খরায়, বোশেখ রোদে ফাটে,
এক ফোঁটা জল মেঘ চোঁয়ায়ে নামল না গাঁর বাটে।
ডোলের বেছন ডোলে চাষীর, বয় না গরু হালে,
লাঙ্গল জোয়াল ধূলায় লুটায় মর্চা ধরে ফালে।
কাঠ-ফাটা রোদ মাঠ-ফাটা রোদ আগুন নিয়ে খেলায়,
ধুয়া তারি উড়ছে ধুলোয় বাউকুড়ানীর ঠেলায়।
গ. “কিরে বেটা বকিস নাকি?” কনের চাচা হাঁকে,
জালি কলার পাতার মত গা কাঁপে তার রাগে।
“কোথায় গেলি ছদন চাচা, ছমির শেখের নাতি;
দেখিয়ে দেই দুলার চাচার কতই বুকের ছাতি!
বেবো বেটা নওশা নিয়ে, দিব না আজ বিয়া।”
বলতে হেন আগুন ছোটে চোখদুটি তার দিয়া।
ঘ. এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল,
কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল।
কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া,
তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া।
জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু;
গা-খানি তার শাঙন মাসের যেমন তমাল তরু।
উপরোক্ত চারটি স্তবকেই স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রয়োগ ঘটেছে।
ক. কবিতাংশে সাজুকে দেখে রূপার ব্যাকুলতা বর্ণনা করা হয়েছে।
খ. কবিতাংশে আছে ‘খরার’ ভীষণতার দৃশ্য।
গ. স্তবকে রুদ্ররস ফুটে উঠেছে কনের চাচার সংলাপে।
ঘ. সর্বশেষ স্তবকে কবি নায়ক রূপাইর রূপ বর্ণনা করেছেন।
শুধু পক্ষপাত নয়, জসীমউদ্দীনের দক্ষতাও যে স্বরবৃত্ত ছন্দেই সবচেয়ে বেশি- উদ্ধৃত স্তবকগুলির প্রতিতুলনায় সেটাই স্পষ্ট হয়। যে-যন্ত্রী একই তারে হাজার সুরের ফলঝুরি ফোটাতে পারেন তাঁকেই তো শিল্পীর শিরোপা দিই।
‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এ জসীমউদ্দীন মাত্রাবৃত্ত ছন্দকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। চব্বিশ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত এই সুদীর্ঘ কাব্যের মাত্র ছ’টি পরিচ্ছেদ স্বরবৃত্তে রচিত। মূলত ছড়ার ছন্দ বলে স্বরবৃত্তের চলনে যে ক্ষিপ্রতা, তা সাধারণ গভীর অথবা সূক্ষ্ম বিষয় চিত্রণের জন্যে অনুকূল নয়। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এ সোজন-দুলীর কৈশোর-প্রণয়, গৃহত্যাগ, দাম্পত্যজীবন, বিচ্ছেদ-বেদনা এবং মৃত্যুবর্ণনায় তাই মাত্রাবৃত্ত ছন্দই ব্যবহৃত হয়েছে। ছ-মাত্রিক ছন্দের উদাত্ত অবকাশে মানুষের প্রেম, অথবা বিরহের মতো অনুভূতি থরে থরে দানা বাঁধতে পারে :
“নদীরে! তোমার বুকে ঢেউ দিলে কূলেতে আঘাত লাগে;
বুকের ব্যথার দোসর নাহিক আপনারে শুধু দাগে।
বন পুড়ে গেলে, সব লোকে দেখে, মনের অনল যার
দ্বিগুণ জ্বলিছে, তবু কেহ তার জানে নাকো সমাচার।”
অথবা,
আহারে দারুণ দুখের বন্ধু, কি করম দোষে অভাগী দুলীর লাগি,
এত যে কাঁদন কাঁদিতেছ তুমি স্বেচ্ছায় হয়ে আমার ব্যথার ভাগী।
আগে যদি আমি জানিতাম সখা। পিরীতির গাছে শুধু ফোটে কাঁটা ফুল,
জনম না হতে আপনার হাতে কাটিতাম তারে উপাড়িয়া ডাল-মূল।
প্রেমজ অনুভূতির চিত্রায়ণে জসীমউদ্দীন মাত্রাবৃত্তকেই নির্ভরযোগ্য বলে জেনেছেন। উল্লেখযোগ্য যে ‘বালুচরে’র সবগুলি কবিতাই প্রেমের এবং তা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। কিন্তু সহজ সৌন্দর্যের আধার প্রাণচঞ্চল দুলালীর বর্ণনা কি বিস্মরণীয়?
ইতল বেতল ফুলের বনে ফুল ঝুর-ঝুর করে রে ভাই
ফুল ঝুর-ঝুর করে;
দেখে এলাম কালো-মেয়ে গদাই নমুর ঘরে।
ধানের আগায় ধানের ছড়া, তাহার পরে টিয়া,
নমুর মেয়ের গায়ের ঝলক সেই না রঙ নিয়া।
দূর্বাবনে রাখলে তারে দূর্বাতে যায় মিশে,
মেঘের খাটে শুইয়ে দিলে খুঁজে না পাই দিশে।
লাউয়ের ডগায় লাউয়ের পাতা, রৌদ্রেতে যায় উনে,
গা-ভরা তার সোহাগ দোলে তারির লতা বুনে।
ছন্দ স্বরবৃত্ত অথবা মাত্রাবৃত্ত যাই হোক, জসীমউদ্দীনের ভাষার প্রবণতা কিন্তু সর্বদাই নাগরিক কথ্যরীতির দিকে। তৎসম শব্দের ভার বর্জিত, প্রচলিত তদ্ভব ও দেশি শব্দের জমিনে তিনি মাঝে মাঝে কুশলী হাতে ‘আখা’, ‘খরা’, ‘বাউকুড়ানী’, ‘জালি’, ‘দুলা’, ‘নওশা’, ‘পিরীতি’, ‘বেতলে’র কারুকাজ করে যে স্বাদ ও সুষমা সৃষ্টি করেন- বাংলা কবিতার ইতিহাসে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। জসীমউদ্দীনের এই কবিভাষার ব্যর্থ অনুকরণে পরবর্তীকালে কোনো কোনো কবি সম্পূর্ণ গ্রাম্যভাষায় লোকজীবনের ভাষ্য রচনা করেছেন (তু. রওশন ইজদানী), কিন্তু আধুনিক রুচির কাছে তা আদৌ গৃহীত হয়নি। বস্তুত জসীমউদ্দীনের শিল্পপ্রকরণ সবটাই আধুনিক। উপমা নির্মাণে ও চিত্রকল্প রচনায় তাঁর অব্যর্থ সিদ্ধি। তাঁর উপমানের ভাণ্ডার বাংলার লোকসাহিত্য, লোকজীবন, লোকসংস্কৃতি আর বিশাল পল্লীপ্রান্তরে ছড়ানো। এজন্যেই তাঁর কাব্যপ্রকরণ আধুনিক হলেও তাতে লোকজ জীবনের খাঁটি স্বাদ ফুটে ওঠে। তাঁর কবিতার নায়ক যেমন নায়িকাকে ‘কলমী ফুলের নোলক’, ‘হিজল ফুলের মালা’, ‘বাঁশের কচি পাতার নথ’ আর ‘সোনালতার বালা’ দিয়ে সাজাতে চায়- কবিও তেমনি গ্রামীণ প্রকৃতি থেকে উপমা এনে তারই আলোয় নায়িকাকে দেখতে ইচ্ছুক :
কেমন যেন গাল দুখানি, মাঝে রাঙা ঠোঁটটি তাহার,
মাঠে-ফোটা কলমী ফুলে কতকটা তার খেলে বাহার।
অথবা
পড়শীরা কয়- মেয়ে তো নয়, হলদে-পাখীর ছা,
ডানা হলেই পালিয়ে যেত ছেড়ে তাদের গাঁ।
অথবা
দূর্বাবনে রাখলে তারে দূর্বাতে যায় মিশে,
মেঘের খাটে শুইয়ে দিলে খুঁজে না পাই দিশে।
কলমীফুল, হলুদ পাখি, শ্যামল তৃণ এবং কালো মেঘ-এই চারটি উপমান এখানেই নায়িকার সৌন্দর্য বর্ণনার জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে। লক্ষণীয় যে এইসব উপমা রচনায় জসীমউদ্দীন কবিপ্রসিদ্ধির অনুসরণ করেননি। নায়কের রূপ বর্ণনায়ও এই রীতির অনুবর্তন দেখা যাবে।
কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া
তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া।
জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু;
গা-খানি তার শাঙন মাসের যেমন তমাল তরু।
এই চারটি পঙ্ক্তিতে রূপাইর মুখ, বাহু ও দেহের অনন্যতা কবি চারটি উপমানের সাহায্যে এঁকেছেন। বাংলা কবিতায় এই সর্বপ্রথম নায়কের সৌন্দর্য আদর্শায়িত না-হয়ে বাস্তব শ্রী-ও লাবণ্যমণ্ডিত হলো। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ক্ষেত্র থেকে এসেছে বলেই এইসব উপমানের চমৎকারিত্ব এত বেশি।
ঘটনার নাটকীয়তা ব্যাখ্যার জন্যে জসীমউদ্দীন উৎপ্রেক্ষা প্রয়োগ করেন। গ্রাম্য সমাজের কুৎসায় অতিষ্ঠ সাজুর মা’র কাছে আকস্মিকভাবে তিরস্কৃত হয়ে রূপাইর মনে হয়-
সাজুর মায়ের কথাগুলি যেন বড়শীর মত বাঁকা,ঘুরিয়া ঘুরিয়া মনে দিয়ে যায় তীব্র বিষের ধাকা।
কে যেন বাঁশের জোড় কঞ্চিতে তাহার কোমল পিঠে,
মহারোষ-ভরে সপাং সপাং বাড়ি দিল গিঠে গিঠে।
ওপরে রাধার সৌন্দর্য ছায়া ফেলে যায়। রূপাইকে দেখে কবির মনে হয়েছে :
কালোয় যে জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন,
ভারি পদ-রজের লাগি লুটায় বৃন্দাবন।
অতএব চূড়ান্ত বিচ্ছেদের আগে রূপাই যখন সাজুকে মিনতি করে :
“মোর কথা যদি মনে পড়ে, সখি, যদি কোন ব্যথা লাগে,
দুটি কালো চোখ সাজাইয়া নিও কালো কাজলের রাগে।
সিন্দুরখানি পরিও ললাটে- মোরে যদি পড়ে মনে,
রাঙা শাড়ীখানি পরিয়া সজনি চাহিও আরশী-কোণে।”
তখন তার সামাজিক পরিচয় এই অনুরোধের সঙ্গে বেসুরো বাজে না। সাজু এবং দুলী দুজনেই, মৈয়মনসিংহ গীতিকার নায়িকাদের মতো, অমোঘ ট্রাজেডির শিকার। তাদের প্রেম, সমাজ অথবা দুর্ভাগ্যের অভিশাপে, অশ্রুজল ও মৃত্যুর ভেতর দিয়ে চরিতার্থ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ অথবা ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’কে ‘মৈয়মনসিংহ গীতিকা’র আধুনিক ভাষ্য বলা যাবে না। এ-কথা আগেই বলা হয়েছে যে লোক-ঐতিহ্য থেকে গৃহীত এই উপকরণ জসীমউদ্দীনের কাব্যে যে- রূপান্তর লাভ করেছে-তা জন্মান্তরের মতোই বৈপ্লবিক। শিল্প-বিষয়ের পরিচর্যা ও রসপরিণামের ক্ষেত্রে আলোচ্য দুটি রচনাই মৈয়মনসিংহ গীতিকা থেকে কতখানি ভিন্ন তা বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে।
প্রথমত, মৈমনসিংহ গীতিকার আখ্যানগুলি কেবল নারীচরিত্রের মহত্ত্ব জ্ঞাপক; দ্বিতীয়ত, সেখানে বাইরের ঘটনাই প্রধান; তৃতীয়ত, গীতিকার সহজ সৌন্দর্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে সত্য, কিন্তু সচেতন শিল্পবুদ্ধির অভাবে তার নাটকীয় আবেদন বিলম্বিত হয়েছে এ-কথা অনস্বীকার্য। পক্ষান্তরে জসীমউদ্দীনের কাব্যের কাল ও সমাজ ভিন্ন; তাই কেবল নারীচরিত্রের ওপরেই এখানে ট্রাজেডির অভিশাপ নেমে আসেনি। সাজু ও দুলীর মতো রূপাই-সোজনও প্রেমের ব্যর্থতায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। মহুয়ার পাশে নদের চাঁদ অথবা মলুয়ার পাশে চাঁদ বিনোদ নিষ্প্রভ চরিত্র; কিন্তু সাজু ও দুলীর উজ্জ্বলতা সত্ত্বেও রূপাই অথবা সোজনের দ্যুতি প্রখর। জসীমউদ্দীনের কবিতার বস্তুগত উপাদান পরীক্ষা করতে গিয়ে আমরা দেখেছি তাঁর সমাজ-চৈতন্য কতখানি সজাগ। ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ থেকে ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ পর্যন্ত তাঁর এই সমাজ- সজাগতা অক্ষুণ্ণ। কিন্তু জসীমউদ্দীন মূলত গীতিকবি। তাই বহির্জীবনের ঘটনার অভিঘাতে ব্যক্তির অন্তর্জগতে যে-আলোড়ন জাগে, তার ঘনিষ্ঠ রূপায়ণেই তাঁর বেশি আগ্রহ ও সার্থকতা। সেজন্যে ‘হলদে পাখির ছা’ সাজু ক্রমশ পরিপূর্ণ নারীতে রূপান্তরিত হয়; তার প্রেমের গুণগত পরিবর্তন হয় ধীরে ধীরে- যেমনটি জীবনে ঘটে। যে-দুলী কৈশোরিক মোহকেই ভালোবাসা জেনে সোজনের সাথে সমাজ ত্যাগ করেছিলো আবার নতুন নায়কের সঙ্গে ঘর বাঁধে বটে কিন্তু অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে রেহাই পায় না। সেখানেই তার ভেতরে ব্যক্তি ও সমাজের সংঘাত ঘটে। বলাবাহুল্য এই মানস-দ্বন্দের অভিজ্ঞতা মৈয়মনসিংহ গীতিকার নায়িকাদের নেই। মহুয়া ভিন্ন সমাজের পুরুষকে ভালোবেসেছে, আর স্বসমাজে ফিরে যায়নি। মলুয়া বাধ্য হয়ে দেওয়ানের গৃহে থেকেছে কিন্তু অসতী হয়নি। এরা সবাই একনিষ্ঠ প্রেমের দৃষ্টান্ত হিশেবেই কাব্যগত। এদের আচরণের মানবিক ভ্রান্তি অথবা দ্বন্দ্ব তাই অপ্রত্যাশিতও। বারো থেকে তেরো বছর বয়সেই এরা পূর্ণ যুবতীর মতো প্রেমে পড়ে এবং সেই প্রেম প্রথম থেকেই পরিণত।
জসীমউদ্দীনের নায়িকারা শিল্পীর সচেতন ও অন্তরঙ্গ পরিচর্যায় স্তরে স্তরে বিকশিত হয়েছে-তাদের আনন্দ-বেদনা কবির সংবেদনশীল শুশ্রূষায় গীতিকবিতার মতো গুঞ্জরিত হয়েছে-পাঠক সহজেই তাদের সঙ্গে একাত্মবোধ করে। রূপাই অথবা সোজনের চরিত্র সমগ্র বাংলা কবিতার ইতিহাসে অনন্য সৃষ্টি। তারা রূপকথার নায়ক নয়, মহাকাব্যেরও নয়। এমনকি দেশজ লোক-কবিতার কাছেও তাদের ঋণ প্রত্যক্ষ নয়। একান্তই মৃত্তিকার ফসল এই দুই তরুণ।
নদের চাঁদ-মহুয়ার মতো দুলী-সোজন আত্মহত্যা করলেও সোজন নদের চাঁদ-এর মতো নিষ্ক্রিয় চরিত্র নয়। দীর্ঘ কারাবাস শেষ হবার পরেও তার অন্তরে প্রেমের শিখা জ্বলে। বেদের বহরের সঙ্গে নদীতে নদীতে ভেসে সে দুলীকে খুঁজে বেড়ায়। রূপাইও একদিন দীর্ঘ পলাতক-জীবন কাটিয়ে সাজুর কাছেই ফিরে আসে। এদেশের গ্রামীণ জীবনের শক্তি ও সৌন্দর্য এই দুই চরিত্রের ভেতর দিয়ে যতখানি জীবন্ত হয়েছে- ততখানি কোথায়? আগেই বলেছি জসীমউদ্দীনের কাব্যপ্রকরণ সবটাই আধুনিক। সেখানেই সৃষ্টির মৌলিক ব্যবধান। মৈমনসিংহ গীতিকার কাহিনীগুলির ভেতরে ঘটনার ন্যূনতা নেই, কিন্তু পরিচর্যার অভাবে ঐসব ঘটনা তীব্র নাট্যরস সৃষ্টি করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রোতা-পাঠককে কল্পনায় সেই ফাঁকগুলি পূরণ করতে হয়। জসীমউদ্দীন আধুনিক কবি; কাব্যের নাটকীয় মুহূর্ত এবং গীতিময় অবকাশ তিনি চূড়ান্ত সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। তাই তাঁর কাব্য পাঠের পর পাঠকের চিত্ত পরিপূর্ণ আনন্দের ভারে নম্র হয়ে আসে। আশ্চর্য সঙ্গীতের কুহকে সমস্ত সংশয় ও অতৃপ্তি শান্ত হয়ে যায়।
উপসংহারে আবু হেনা মোস্তফা কামাল লিখেছেন —
মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশপর্বে জসীমউদ্দীনের মতো তরুণ কবির রচনায় লোকজীবনের রূপায়ণ ঘটেছিলো স্বাভাবিকভাবেই। শতাব্দীর পরবর্তী দশকগুলিতে মধ্যবিত্ত মুসলমান ক্রমশ নগরাভিমুখী হলো, গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে তার ব্যবধান যতই বাড়লো- মুসলমান কবিকর্মী ততই নিরালম্ব শূন্যতার শিকার হলেন। বিভাগোত্তর কালের ঢাকায় তিরিশের অনুকরণে হতাশা নৈরাশ্য ইত্যাদির পুনরাবৃত্তি দেখেছি আমরা তরুণ কবিদের লেখায় — অথচ তখনো ঢাকার প্রকৃত নগরায়ণ শুরু হয়নি। কিন্তু তাই বলে এই তরুণ কবিরা কেউ আর গ্রামে ফিরে যেতে পারেননি।
আবু জাফর রেহমান, শিক্ষক, লেখক ও সংগঠক, বিভাগীয় সম্পাদক, মাসিক ফটিকছড়ি।