আগামী ৯ অগাস্ট রাজ্যসভার ভোট৷ রাজ্যসভায় দীনেশ ত্রিবেদী ১২ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করায় পশ্চিমবঙ্গের একটি আসন শূন্য হয়েছে। ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত তাঁর মেয়াদ ছিল। কিন্তু মেয়াদ ফুরনোর আগেই চলতি বছরের গোড়ায় বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের আগে দীনেশ তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করে যোগ দেন বিজেপি-তে। তারপর তৃণমূলের হয়ে জেতা রাজ্যসভা আসনটি থেকেও পদত্যাগ করেন তিনি। দীনেশ ত্রিবেদীর ছেড়ে যাওয়া আসনে রাজ্যসভায় কাকে পাঠানো হবে তা নিয়ে গতো কয়েকদিন ধরেই চলছিল জল্পনা। উঠে আসছিল একাধিক নাম৷ কেউ কেউ মনে করেছিলেন, ওই আসনে প্রার্থী করা হবে মুকুল রায়কে৷ কেউ আবার যশবন্ত সিনহার নামও করেছিলেন।
প্রসঙ্গত, মুকুল রায় বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে এলেও খাতায় কলমে তিনি কৃষ্ণনগর উত্তরের বিজেপির বিধায়ক৷ তাঁর বিধায়ক পদ এবং পিএসি-র চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে গেরুয়া শিবির৷ বিধানসভার বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়ে চলেছেন৷ ফলে বিতর্কের অবসান ঘটাতে মুকুলকে রাজ্যসভায় পাঠানো হতে পারে বলে তৃণমূল দলেরই একটি অংশ মনে করেছিলেন৷
তবে যশবন্ত সিনহা, মুকুল রায়ের কাউকেই রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছে না তৃণমূল। শনিবার শাসক দল রাজ্যসভা ভোটের তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করলো প্রসার ভারতীর প্রাক্তন সিইও জহর সরকারকে। দলের টুইটার হ্যান্ডলার থেকেই এই ঘোষণা করা হয়েছে। তৃণমূলের তরফে টুইটারে লেখা হয়েছে, ‘আমরা আনন্দের সঙ্গে জহর সরকারকে সংসদের উচ্চকক্ষের প্রার্থী মনোনয়ন করছি। জনসেবায় জহর সরকারের ৪২ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তিনি প্রসার ভারতীর প্রাক্তন সিইও। জনসেবায় তাঁর মূল্যবান অবদান দেশসেবায় আরও সহায়তা করবে।’
রাজনৈতিক মহলের অভিমত, রাজ্যসভার মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জহর সরকারের নাম ঘোষণা করায় বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান পদকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক থেকে এখনই পিঠটান দিতে নারাজ নেত্রী৷ তাই এই পদক্ষেপ৷ রাজনৈতিক মহলের মতে, দলনেত্রী আগে দেখে নিতে চাইছেন এ বিষয়ে বিজেপি কতদূর এগোতে পারে৷ তারপর তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন৷ পাশাপাশি নেত্রী প্রবীন আইএএসকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে অন্য আইএএসদের জন্য এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করলেন যে ভাল কাজের পরিানাম ভালই হয়।
১৯৭৫-এর আইএএস ব্যাচ জহর সরকার এই রাজ্যে বর্ধমান এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো জেলার জেলাশাসক হিসাবে কাজ করেছেন। বাম আমলে তিনি বিভিন্ন দফতরে সচিবের দায়িত্বও পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে সংস্কৃতি মন্ত্রকের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের সময়ে তাঁকে প্রসার ভারতীর সিইও করা হয়। সেই দায়িত্ব তিনি ২০১৬ পর্যন্ত পালন করেছেন। এছাড়াও ব্যক্তিগত পরিসরে তিনি তৃণমূল নেত্রীর ঘনিষ্ঠবৃত্তের অন্যতম একজন৷ এমনকি রাজ্যের মুখ্য সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবসরের সময় তৈরি হওয়া মোদী-মমতার বিতর্কের সময়েও তাঁকে তৃণমূল নেত্রীর পাশেই থাকতে দেখা গিয়েছিল৷ আগাগোড়া মোদী বিরোধী ইমেজও রয়েছে জহরবাবুর৷ সেটাই অন্যদের পিছনে ফেলে তাঁকে শেষ মুহূর্তে এগিয়ে দিল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা৷
প্রার্থী হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণার পরই জহর সরকার সংবাদ মাধ্যমে বলেন, ‘আমার কাছে এটা অবিশ্বাস্য। আমি ৪২ বছর সরকারি চাকরি করেছি। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, এখনও নই। কিন্তু আমাকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল। আমি কৃতজ্ঞ। কেন্দ্রে স্বৈরাচারী সরকার চলছে। বিভিন্ন সরকারে কাজ করার অভিজ্ঞতায় বর্তমান সরকারের এক্সরেপ্লেট তিনি রাজ্যসভায় তুলে ধরবেন বলেও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি তিনি অনুরক্ত না হলেও, তৃণমূল তাঁকে রাজ্যসভায় যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তৃণমূলের তোলা আওয়াজের পাশে বিভিন্ন দল দাঁড়াচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। মানুষ পাশে থাকাতেই রাজ্যে তৃণমূল ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
দিল্লি সফরে যাওয়ার আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিন সকালে প্রাক্তন আইএএস-কে ফোন করে জানান, রাজ্যসভার জন্য দলের তরফে তাঁকে ভাবা হচ্ছে। তাতে উনি রাজি কি না। একটু ভেবে জহর জানান, কোনও আপত্তি নেই। তার পরই দলের তরফে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়। প্রসঙ্গত, আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে মমতা সরকারের টানাপড়েনের সময়, আলাপনেরই পক্ষ নিয়েছিলেন তিনি। আলাপনকে দিল্লিতে তলব করায় খোলাখুলি মোদি-শাহ পাগল হয়ে গেছেন বলে টুইটারে মুখ খুলেছিলেন তিনি।
গত ১৬ জুলাই রাজ্যসভা ভোটের দিন ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ভোটে মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন আগামী ২৯ জুলাই। ভোটগ্রহণ হবে ৯ অগাস্ট। তবে মানস ভুঁইয়ার ছেড়ে যাওয়া রাজ্যসভার আসনে কবে ভোট, তা এখনও ঘোষণা করেনি কমিশন। তবে জহরবাবুর নির্বাচিত হওয়া নিয়ে কোনও সংশয় নেই।