ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় গণ-আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল নাম জয়প্রকাশ নারায়ণ। এ বছর গান্ধীজির সার্ধশত জন্মবার্ষিকী দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে। এই সময় জয়প্রকাশ নারায়ণ বা জেপিকে স্মরণ করাও বিশেষ তাৎপর্যের। আজীবন গান্ধীবাদী জেপিকে লড়াই করতে হয়েছিল গান্ধীজির কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই। সত্তরের দশকে তাঁর আন্দোলনে যেভাবে ভারতের বহু অঞ্চলে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়, এমন উদাহরণ গান্ধীজিকে বাদ দিলে আর কারও ক্ষেত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে কি না এটা একটা বড়ো প্রশ্ন।
জয়প্রকাশ নারায়ণের জন্ম ১৯০২ সালের ১১ অক্টোবর সীতাবদিরা গ্রামে। এই গ্রাম সে সময় বিহারের শরণ জেলায় অবস্থিত ছিল। বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের বালিয়ায় এই গ্রামটির অবস্থান। তাঁর বাবা হরশু দয়াল ছিলেন সরকারি চাকুরে এবং মা ফুলরানি দেবী ছিলেন গান্ধীজির আন্দোলনের প্রতি সংবেদনশীল একজন মহিলা।
১৯২০ সালে জয়প্রকাশের বিবাহ হয়। তাঁর স্ত্রী প্রভাবতী দেবীও ছিলেন গান্ধীবাদী ব্রজকিশোর প্রসাদের কন্যা। দুই পরিবারই ছিল কংগ্রেসের সমর্থক। প্রভাবতী বিবাহের পরেই সবরমতী আশ্রমে (আমেদাবাদ) চলে যান। তাঁর স্বামী জয়প্রকাশ এবং বাবা ব্রজকিশোর উভয়ই চেয়েছিলেন গান্ধীজির আদর্শে নবদম্পতি জীবন শুরু করুক।
রাওল্যাট আইনের বিরুদ্ধে গান্ধীজি দেশজোড়া আন্দোলনের ডাক দেন ১৯১৯-২০ সাল নাগাদ। এক সভায় মৌলানা আবুল কালাম আজাদের বক্তৃতা শুনে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন জেপি। ইংরেজিমাধ্যম ছেড়ে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের প্রতিষ্ঠা করা বিহার বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করেন। এর পর আমেরিকার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং লোয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে পড়েন জেপি। বার্কলেতে খরচ চালাতে গাড়ির মেকানিক এবং কারখানায় শ্রমিকের কাজও করেছেন। তাও পেরে ওঠেননি বিপুল খরচ সামাল দিতে। তাই লোয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে শিক্ষা শেষ করতে হয় তাঁকে।
ইতিমধ্যে তিনি রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের দ্বারা প্রভাবিত। কার্ল মার্কসের লেখা এবং মানবেন্দ্রনাথ রায়ের লেখা তাঁকে প্রভাবিত করে।
পণ্ডিত নেহরুর আহ্বানে ১৯২৯ সালে গান্ধীজির আইন অমান্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন জেপি। নাসিক জেলে ১৯৩২ সালে বন্দি থাকার সময় তাঁর পরিচয় হয় রামমনোহর লোহিয়া, অচ্যুৎ পটবর্ধন, অশোক মেহতা প্রমুখের সঙ্গে। কংগ্রেসের বামপন্থী এবং সমাজবাদী অংশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বাড়ে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় রেল ইউনিয়নের হয়ে বিপুল কাজকর্মে যুক্ত হন জয়প্রকাশ নারায়ণ।
১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ বিহার সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ওই বছরই ৮ থেকে ২৭ মে দেশজোড়া রেল ধর্মঘট শুরু হয়। গুজরাটে নবনির্মাণ সমিতি ও কংগ্রেস সরকারের দুর্নীতি ও স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের চাপে গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী চিমনভাই প্যাটেল পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মোরারজি দেশাই দীর্ঘ অনশন করেন।
জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁর ‘সর্বাত্মক বিপ্লব’ প্রবন্ধে লেখেন, স্বাধীনতা লাভের মাত্র ছ-মাসের মধ্যে গান্ধীজিকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর আদর্শে কৃষক স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে না। শ্রমিকরা মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভয়ংকর সমস্যায় পড়েছেন। বিহার আন্দোলন নতুন সুযোগ উপস্থিত করেছে। আমরা মার্কসবাদ, গণতান্ত্রিক সমাজবাদের পথ ধরে সর্বোদয়ের পথে হাঁটবো। বাস্তব কর্তব্যের ক্ষেত্রে বিপ্লব পরবর্তী সময় আদর্শগত অবস্থানগুলো দ্রুত পাল্টে দেওয়া হয়। অর্থাৎ বিরোধী থাকাকালীন যেসব কথা বলে আন্দোলন করলাম, ক্ষমতায় এসে সুবিধা মতো সেসব পাল্টে দিলাম, এটা হতে দেওয়া যাবে না। আমাদের দেশে তাই ঘটছে।
১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ পাটনায় শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায় এবং আট জনের মৃত্যু হয়। ওই বছরই ৮ এপ্রিল পাটনায় জেপির এক বিশাল মিছিলে পুলিশ ভয়ানক লাঠি চালায়। দু-মাস পরেই ৫ জুন পাটনার গান্ধী ময়দানে লাখো লাখো মানুষের সভায় জয়প্রকাশ নারায়ণ বলেন, দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। প্রয়োজন, আমূল বদলে ফেলা। স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশের মানুষ খেতে পায় না, জিনিসপত্রের দাম আগুনছোঁয়া, এর বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই করতে হবে। ইতিমধ্যে ছাত্র সংঘর্ষ সমিতিও জোরালো আন্দোলন শুরু করেছে।
উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলি থেকে ১৯৭১ সালে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর বিরোধী প্রার্থী ছিলেন এসএসপি দলের রাজনারায়ণ। তিনি এলাহবাদ হাইকোর্টে মামলা করে বলেন, ইন্দিরা গান্ধী ভোটে প্রশাসনকে কাজে লাগিয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ১২ জুন কোর্ট রায় দেয়, ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন অবৈধ। এর কিছুদিন পরেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন আভ্যন্তরীণ গোলযোগের অভিযোগে জরুরি অবস্থা জারি করেন ইন্দিরা গান্ধী। বিনা বিচারে আটক করার আইন ‘মিশা’ সারা দেশে জারি করা হয়। এর কিছুদিন আগে কলকাতায় জ্যোতি বসু এবং প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে নিয়ে বিশাল মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেপি। ১৯৭৭ সালের ১৮ জানুয়ারি ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচন ঘোষণা করেন। ১৯৭৭-এর ২১ মার্চ নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। উত্তরপ্রদেশ, বিহার প্রভৃতি জায়গায় কংগ্রেস পর্যুদস্ত হয়। বাংলায় কংগ্রেস মাত্র তিনটি আসন পেয়েছিল। কেন্দ্রে জনতা দল ক্ষমতায় আসে।