গড়বে এবার সবুজ মাঠে মিশরীয় পিরামিড (২-৩-৫)
সময়টা ১৮৮৩। ল্যাঙ্কাশায়ারের প্রিস্টন নর্থ এন্ড ক্লাবে একটি লেকচার দিতে এসেছিলেন এক গ্লাসগো নিবাসী শিক্ষক তথা ডাক্তার, নাম তার জেমস গ্লেডহিল। প্রসঙ্গত একটু বলে রাখি প্রিস্টন ক্লাবের সম্পর্কে। প্রিস্টন নর্থ এন্ড ক্লাবটি ছিল ল্যাঙ্কাশায়ারের ছোট্ট ক্লাব। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা ক্রিকেট এবং রাগবি খেলত। পরে তারা ফুটবলকে নিজেদের ক্লাবের ক্রীড়াসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রথম দিকে তারা ২-২-৬ ফর্মেশনেই খেলতে শুরু করে, কারণ আগেই বলেছি স্কটিশদের আরোপিত সেই ফর্মেশন তখন সর্বগ্রহণযোগ্য। কিন্তু ১৮৮৩তে গ্লাসগোনিবাসী শিক্ষক জেমস গ্লেডহিলের একটি লেকচার সেই ক্লাবের ইতিহাসটাই পাল্টে দেয়। এবার বলা যাক জেমস গ্লেডহিলের গল্পটা। জেমসসাহেব প্রিস্টন ক্লাবের মধ্যে একটি ব্ল্যাকবোর্ডে বোঝালেন এক নতুন ফর্মেশন। প্রথমবার প্রিস্টন ক্লাবের খেলোয়াড়েরা নিজের চোখে দেখল ফুটবলের আরেকটি সজ্জা—২-৩-৫। এই ফর্মেশনটা বেশ মনে ধরেছিল প্রিস্টন ক্লাবের সমস্ত খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাদের। ২-২-৬ কে সরিয়ে তারা নিজেদেরকে অভ্যস্ত করতে আরম্ভ করলো ২-৩-৫ এ। আর এর ফল কি হলো জানেন? চারবছর পর অর্থাৎ ১৮৮৭-৮৮ মরশুমে এই ২-৩-৫ ছকে খেলে প্রিস্টন ক্লাব তুলে নিল লিগ খেতাব, তাও আবার একটিও ম্যাচ না হেরে। তার পরের বছরেও লিগ চ্যাম্পিয়ন তারাই। দিকে দিকে ছড়িয়ে গেলো এই ২-৩-৫ ফর্মেশনের মাহাত্ম্য। স্কটল্যান্ড এই ফর্মেশনে প্রথম খেলল ১৮৮৭তে, আর ইংল্যান্ড খেললো তার তিন বছর আগে ১৮৮৪ তে। কিন্তু জেমস গ্লেডহিল কি এই ২-৩-৫ ছকের আবিষ্কারক ছিলেন? নাহ্, গ্লেডহিলসাহেব শুধুমাত্র একটি লেকচার দিয়েছিলেন মাত্র। হাঙ্গেরির কোচ Arpad Csanandi বলেছিলেন, ২-৩-৫ ছকে প্রথম ফুটবল খেলেছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৮৩ তে। কিন্তু সেই তথ্যও সর্বগ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ১৮৮৩ এর অনেক আগেই ২-৩-৫ ছকে ফুটবল খেলবার উদাহরণ রয়েছে। সময়টা ১৮৭৮। ওয়ালশ কাপ ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল রেক্সহাম আর ড্রুইডস। সেই ম্যাচটিতে রেক্সহ্যাম দল নামিয়েছিল ২-৩-৫-এ আর ড্রুইডস দল নামিয়েছিল ২-২-৬ এ। তাহলে কি রেক্সহ্যাম-ই কি এই ছকের প্রবর্তক?— উঁহু, তাও নয়। কারণ তারও অনেক আগে ১৮৭০ এর দিকে নটিংহ্যাম ফরেস্ট এই ২-৩-৫ ছকে ফুটবল খেলেছিল। নটিংহ্যাম ফরেস্টকে এই ছকটা শিখিয়েছিলেন তাদের অধিনায়ক স্যাম উইডোসন। অনেকে স্যাম উইডোসনকেই এই ছকটির মূল প্রবর্তক হিসাবে স্বীকৃতি দেন। যদিও এই বিষয়টি এখনও বহুলভাবে বিতর্কিত।

কে প্রবর্তন করেছিল এই ছক, সেটি বিতর্কিত বিষয় হতে পারে, কিন্তু কিভাবে এসেছিল এই ছক, কেনই বা এসেছিল অথবা ২-২-৬-এর সাথে এই ছকের তফাৎটা ঠিক কোথায়—আসুন এই বিষয়গুলির সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক।
স্কটিশদের পাসিংয়ের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সর্বত্রই একটা ধারণা বদ্ধমূলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেটি হলো ব্যক্তিগত ড্রিবলিংয়ের চেয়ে কম্বিনেশন এবং পাসিং এ ফুটবলের নান্দনিকতা আর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায় অনেক বেশী। আর এই ধারণার বসেই ১৮৮০ এর দিকে (নটিংহ্যাম ১৮৭০ এর দিকে ২-৩-৫ এ খেললেও এই ছকটি জনপ্রিয়ভাবে প্রসারিত হতে থাকে ১৮৮০ এর দিক থেকেই) এক নতুন পজিশনের আবির্ভাব ঘটে— সেন্টার হাফ। স্কাটিশদের ২-২-৬ এর নিয়মে একটু মাজাঘষা করা হলো। অগ্রভাগে ৬ জন ফরোয়ার্ডের একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডের কাজ হয়ে গেলো শুধুমাত্র গোল করাই নয় বরং আপফ্রন্টকে পাস দেবার জন্য উপর থেকে খানিকটা ডিপে নামা। সুতরাং লিভার যন্ত্রের ফালক্রামের মত একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডের কাজ হয়ে গেলো ক্রমাগত আপ এবং ডিপে ওঠানামা করা। সৃষ্টি হলো এক নতুন পজিশনের, নাম দেওয়া হলো “সেন্টার হাফ”। আর এই সেন্টার হাফের উপস্থিতিই নতুন ফর্মেশনকে ২-২-৬ এর অপেক্ষা করে তুললো আরও বেশী ব্যালান্সড, আরো বেশী কম্বাইন্ড। অর্থাৎ ৬ জন ফরোয়ার্ডের একজন চলে এলো কিছুটা মাঝমাঠে। ফর্মেশন দাঁড়ালো ২-৩-৫। এটাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন জোনাথান উইলসন। ২-৩-৫ কে কাল্পনিকভাবে দেখলে মনে হয় ঠিক যেন পিরামিডের সজ্জা। পার্থক্য শুধু তার অবস্থানে। মিশরের পিরামিডের নিচে অবস্থান করছে ধু ধু বালুরাশি আর ফুটবলের পিরামিডের নিচে বিছানো রয়েছে সবুজ মসলিন। পিরামিডের মধ্যভাগে একজন সেন্টার হাফ যেন ক্রমশই যাতায়াত করছে পিরামিডের আপ থেকে ডিপে এবং ডিপ থেকে আপে। ঠিক যেন পিরামিডস্থ লিভার যন্ত্রের ফালক্রাম। অদ্ভুত তার রোশনাই। অদ্ভুত তার ফ্লুইডিটি। ফুটবলের ভাঙ্গা-গড়ার লড়াইয়ে এক নতুন ছকের সংযোজন হলো, নাম তার পিরামিড।

একটি সান্ধ্য মিটিং এবং…
আর্সেনাল ক্লাবের এক সান্ধ্যমিটিংয়ে হাজির হয়েছেন ক্লাবের কোচ, কর্মকর্তা সবাই। সময়টা ১৯২৫। তাদের মিটিং-এর উদ্দেশ্য ছিল সদ্যসদ্য নিউক্যাসেল ইউনাইটেডের কাছে আর্সেনালের ০-৭-এ গোহারা হারের পোস্টমর্টেম করা। এই মিটিংটার ব্যাপারে বলবার আগে ১৯২৫-এর সময়কার ফুটবল ফর্মেশন সম্পর্কে একটু বলে রাখি। ১৮৮৩ এর সময় থেকে ছড়িয়ে পড়া ২-৩-৫ এর আর পরিবর্তন হয়নি ১৯২৫ অবধি। সবাই মোটামুটি ওই একই গতানুগতিক ফর্মেশনে খেলে। সবই ঠিক ছিল। কিন্তু মুশকিল হলো ১৯২৫ সালে অফসাইড নিয়মের একটা পরিবর্তন। ১৯২৫ সালে ঠিক হয় গোলমুখী পাসের আক্রমণকারী খেলোয়াড় আর গোলপোস্টের মাঝে প্রতিপক্ষের ন্যুনতম দুইজন খেলোয়াড়কে থাকতে হবে (গোলকিপার সমেত), এর আগে এই সংখ্যাটা ছিল “তিন” (১৮৬৬তে আরোপিত অফসাইড নিয়মটি আমাদের পূর্বেই আলোচনা হয়ে গেছে)। অফসাইড রুলের এই পরিবর্তন মুশকিলে ফেলে দেয় ২-৩-৫ ছকটির স্থায়িত্বকে কারণ সেখানে তৈরী হয় প্রবলভাবে কাউন্টার অ্যাটাকের সম্ভাবনা। আর এর ফল হাতেনাতে টের পেয়েছিল আর্সেনাল। নিউক্যাসেলের কাছে তারা হেরে যায় ০-৭ এ। আর সেই হারের পর্যালোচনাতেই সেদিন আর্সেনাল ক্লাবের ভিতরে বসেছিল মিটিং-এর আসর। আর্সেনালের কোচ তখন হারবার্ট চাপম্যান। কেরিয়ারের শেষভাগে দুইবছরের জন্য নিজের পুরোনো ক্লাব আর্সেনালে যোগ দেওয়া বর্ষীয়ান ফুটবলার চার্লি বুকান সেদিন সেই মিটিংয়ে কোচ চাপম্যানকে দুটি কথা বলেছিলেন। প্রথম কথাটি ছিল—“আমাদের সমস্ত ট্যাক্টিক্স এবার পরিবর্তন করবার সময় এসেছে”। আর টম হোয়াইটেকারের রিপোর্ট অনুযায়ী দ্বিতীয় কথাটি ছিল—“মাঝমাঠের নীচের ফাঁকটা পুরোন করতে আমরা কি একজন ডিফেন্সিভ সেন্টার হাফ কিংবা থার্ড ফুলব্যাকের কথা ভাবতে পারিনা?”
১৯২৫-এর সেই সান্ধ্যমিটিংয়ের পর ফুটবল কি আবার খুঁজে নেবে নতুন কোনো রং…নতুন কোনো ফর্মেশন?আসলে সাফল্য আনে গতানুগতিকতা আর চাহিদা আনে বিপ্লব। আর এই কারণেই বোধহয় “Strategy is not a genesis, it is a result of need”-এই কথাটি ধ্রুবসত্য হয়ে আছে ফুটবলের প্রতিটা ছকের অঙ্গনে। আর্সেনালের সেই সান্ধ্যমিটিং কি তাহলে আবার নতুন ছকের আমদানি করবে বিশ্বফুটবলে, কিভাবেই বা হারবার্ট চাপম্যান হয়ে উঠলেন বিশ্বফুটবলের এক নবজাগরক, ইংরেজি অ্যালফাবেটের ‘W’ আর ‘M’ কিভাবে স্থান পেলো নতুন ফুটবল ফর্মেশনে—এসবকিছুর উত্তর আসবে একে একে আগামী সংখ্যাগুলিতে।
এতো ভাঙা-গড়ার খেলা চলে পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত প্রতিদিন, কিন্তু ফুটবলের এই ছক ভাঙার মতো রোমাঞ্চকর খেলা আর দেখেছেন কি!……(চলবে)