ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের গদখালী। এই গদখালীতে তিন দিনের ফুলমেলা শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ১৯ জানুয়ারি বিকালে, এ মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে তিনদিনের এই ফুলমেলা। ফুলচাষি, ব্যবসায়ী দর্শনার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এই মেলার শেষ হবে আগামী শনিবার।
বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম যশোরের গদখালি। এই গ্রামের নাম জানে না এমন কেউ নেই। এখানকার ফুলের সৌন্দর্য আর সুরভী শুধু সম্মৃদ্ধি ছড়াচ্ছে না; দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোপানও বৃদ্ধি করেছে। ফুলকেন্দ্রীক পর্যটন শিল্পের বিকাশে এই মেলা কাজে আসবে সবাই মনে করে।
যশোর শহর থেকে যশোর-বেনাপোল রোড ধরে শতবর্ষী শত শত রেইনট্রির ছায়া মাড়িয়ে ১৯ কিলোমিটার গেলে গদখালী বাজার। সেখান থেকে পূর্ব দিকে কিছু দূরে রাস্তার দুই পাশের গ্রামগুলোতে ফুলের মাঠ।

দেশে ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে যশোরের ঝিকরগাছার গদখালী। গদখালী সংলগ্ন পানিসারাতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলচাষ হচ্ছে। দেশের ফুলের চাহিদার ৭০ শতাংশই যোগান দেয় এই এলাকার চাষিরা। তারা ফুল চাষ করে ভালো লাভ করেন।
রোববার ও বৃহস্পতিবার গাদখালী বাজারে ফুলের হাট বসে। দূর-দূরান্ত থেকে বেপারিরা এসে এখান থেকে ফুল কিনে নিয়ে যায়। সাধারণত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, খুলনার বেপারিরা ফুল কিনতে আসেন।
প্রতিবছর বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে যেমন, ১৪ ই ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২৬ মর্চ ও ১৬ ডিসেম্বর এ অঞ্চলে ফুলপ্রেমী মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারী আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ফুলের রাজধানী খ্যাত ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী, পানিসারা, নাভারন, নির্বাসখোলা ইউনিয়নের বিভিন্ন ফুল বাজার ও ফুলক্ষেতে ফুলপ্রেমী মানুষের ও ভ্রাম্যমান ফুল ব্যবসায়ীদের ভিড় জমে।

ঢাকা থেকে যশোরগামী সরাসরি বাস ছাড়ে গাবতলি থেকে। আর সিলেটের কদমতলি যশোরগামী থেকে বাস ছাড়ে। যশোর বাসস্ট্যান্ড নেমে, সেখান থেকে রিকশা নিয়ে চলে যেতে হবে লোকাল বাসস্ট্যান্ডে। সেখানেই পেয়ে যাবেন গদখালী যাওয়ার বাস। গদখালী নেমে ক্ষেত দেখার জন্য ভ্যান নিতে পারেন। ভ্যান ভাড়া নেবে ১০০-১৫০ টাকা। গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার দু-পাশে চোখে পড়বে ফুলের ক্ষেত। বাসস্ট্যান্ডের রাস্তার পাশেই সকালে বসে দেশের সর্ববৃহৎ ফুলের পাইকারি বাজার।
ফেব্রুয়ারি এলে নাওয়া-খাওয়ার সময় থাকে না ফুল চাষিদের। সামনে বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘিরে ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের। এ দিবসগুলো ঘিরে এবার ৮০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা তাদের।

১৯৮২ সালের দিকে শের আলি সরদার রজনীগন্ধা ফুল চাষের মাধ্যমে এখানে ফুল চাষ শুরু করেন। জানা যায় মূলত তিনিই গদখালিতে ফুল চাষের পথিকৃৎ।
যশোরে প্রায় ৬ হাজার ফুলচাষি ১৫শ’ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিউলাস, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকা-সহ ১১ ধরনের ফুল। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগের বেশি যশোরের গদখালী থেকে সরবরাহ করা হয়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ফুল এখন যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ায়ও। প্রথম দিকে বছরের নির্দিষ্ট কয়েক মাসে ফুল চাষ হলেও এখন প্রায় সারা বছরই ফুল চাষ হয়ে থাকে।
দেশে প্রথম ফুলের বিশাল এই বাণিজ্যও শুরু হয়েছিল জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী-পানিসারাতে।

প্রথমবারের মতো ফুল মেলা আয়োজনে দারুণ খুশি দেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল উৎপাদনের গোড়াপত্তনকারী হিসেবে পরিচিত শের আলী সরদার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “এ মেলা যেন তাঁর কাজের স্বীকৃতি। ছোট্ট পরিসরে অজানা শঙ্কা নিয়ে সাহসের সঙ্গে ফুলচাষ শুরু করেছিলেন তিনি। সেটার এত প্রসার দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত।”
এদিকে ফুল উৎসবকে কেন্দ্র করে উৎসবে মেতেছেন এ অঞ্চলের ফুলচাষি ও সংশ্লিষ্টরা। ফুল ক্ষেতকে নবরূপে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি ফুল সেডকে এক একটি স্টলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। গদখালির পানিসারা হাড়িয়া ফুল মোড়ের ক্ষেতগুলো দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে। এ মোড়ে অবস্থিত রেস্টুরেন্টেগুলোকেও ফুল ক্ষেতের আদলে রূপ দেওয়া হয়েছে।
প্রথমবারের ফুল উৎসবকে কেন্দ্র করে নতুন করে সেজেছে গদখালি-পানিসারা এলাকা। ফুল উৎসবকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রতিটি ঘরে ঘরে উৎসবে মেতেছে।
ফুলচাষিরা মনে করেন এই মেলা আমাদের ফুল চাষিদের মিলন মেলায় পরিণত করেছে। তারা চায় প্রতিবছর এই মেলা আয়োজন করা যেন হয়। একই সঙ্গে তারা মেলাটির খবর সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানও জানান।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।