এই যীশু জন্ম নিয়েছিলেন এক মেষপালকের ঘরে। দারিদ্র আর অবহেলা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তাঁর অপরাধ ছিল সত্য কথা বলা, মানুষের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করা। মানবমুক্তির দিশা দেখিয়েছিলেন যীশু।
আর এক যীশুকে আমরা চিনি যিনি চার্চের বৈভব, ধর্মধ্বজীদের স্বার্থে বলি এক সাম্রাজ্যিক যীশু। যার ছবি সামনে রেখে ইউরোপীয়দের ধনমত্ততা, হিংসা, আক্রমণ, সাম্রাজ্যলিপ্সা। কিন্তু আদত যীশু তো এমন ছিলেন না। ক্ষমতা নিজের মতো করে সবকিছু গড়ে নেয়, নেয় তার অভিসন্ধি হাসিল করতে। এই হাসিলে ব্যবহৃত হন যীশু, বুদ্ধ, পয়গম্বর হজরত। যেমন এখন আমাদের দেশে ‘রাম’ ব্যবহৃত হচ্ছেন আধুনিক হিংসার অভিলাষে!

গ্রেট টেম্পল মাউন্ট
সে কতকাল আগের কথা। তিরিশ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোন সময়। চালচুলোহীন এক যুবক বলে বেড়াচ্ছে ‘সেই রাজা’। মানুষের মুক্তির, স্বর্গের প্রকৃত রূপ তাঁর জানা! সবাই তাঁর কথা শুনছে, দলে দলে লোক তাঁকে দেখতে যাচ্ছে। যুবকের নাম জিসাস। ওর অনুরক্ত পিটার সকলকে ডেকে ডেকে বোঝাচ্ছে— ওই তো ঈশ্বর, ভগবানের দূত। রাজা হেরড প্রমাদ গুনলেন। এও কি সম্ভব! এই জিসাস নামের যুবক তো রাজা হেরডের অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করছে। রাজাকে অমান্য করলে তার শাস্তি আছে, কিন্তু রাজা হওয়ার অধিকারটাকেই তো জিসাস নামের কূলগোত্রহীন এই যুবক চ্যালেঞ্জ করছে! এর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
রাজার হুকুম। ধরে আনো ওই যুবককে। ধরে আনতে হলো না। যুবক নিজেই জানালেন তিনি আসছেন রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।
দু-দিন ধরে অবিরম হেঁটে জিসাস পৌঁছলেন জেরুজালেমে। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের মানুষের কাছে যা এক পবিত্র তীর্থস্থান। তিনি কি কিছু আন্দাজ করেছিলেন? শহরের গ্রেট টেম্পল-এর দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন— জেরুজালেম ও জেরুজালেম, তুমি তোমার সন্তানকেই আজ মারতে চলেছো।

wailing wall, কান্নার প্রাচীর
এরপরের ইতিহাস আমাদের জানা। জিসাসের মাথায় আটকে দেওয়া হয়েছিল ব্যঙ্গাত্মক চারটি শব্দ, ‘কিং অব দ্য জিউজ’। রক্তের স্রোতের মাঝে তাঁকে বহন করতে হচ্ছিল বিরাট ক্রুশটি। বহন করছেন আর্তের দেবতা জিসাস। কারোর প্রতি কোনও অভিযোগ নেই, আছে শান্ত এক জিজ্ঞাসা, কেন এত অত্যাচার, কেন মানুষ সকলে সমান নয়, কেন নয় সকলে আপন ভাগ্যের রাজা!
জেরুজালেমের মাত্র ৩৫ একর ভূমিকে ঘিরে রয়েছে টেম্পল মাউন্ট, ইহুদি ও ইসলামের তীর্থভূমি, আল আকসা মসজিদ, ডোম অফ দ্য রক আর বিস্তীর্ণ প্রাচীর। সেই প্রাচীরের পশ্চিম দিক হল wailing wall, কান্নার প্রাচীর। আর এই দেওয়াল পেরিয়েই এক পাথুরে এবং পাহাড়ি বধ্যভূমির উপর ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল জিসাসকে, একজিকিউশান হিল নামে যার পরিচয়। মাউন্ট অলিভস শহরের বাইরে বড় বড় বাগান, বিরাট পাথুরে দরজা, সমাধিভূমি পেরোতে পেরোতে পাওয়া যায় একজিকিউশান হিল এর দর্শন। রেজারেকশান বা পুনর্জাগরিত জিসাস বা যীশু জেরুজালেমের সমাধিস্থল থেকে মাউন্ট অফ অলিভস পর্যন্ত হেঁটেছিলেন, তাই আজও জেরুজালেম খ্রিস্ট ধার্মিকদের পরমত্বের প্রাপ্তি।
ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি। ক্ষমতা আনুগত্য চায়, প্রশ্ন নয়। নাজারাতের সেই যীশু যিনি ক্ষমতার বিকল্প পথ দেখিয়েছিলেন তাঁর আবাহন ঘটুক। পৃথিবীর দেশে দেশে শোষণ, বঞ্চনার আবহে ফিরে আসুন দরিদ্রের যীশু, মানুষের প্রাণের দেবতা। মুক্তির ধর্মতত্ত্ব লাতিন আমেরিকার দেশগুলির মতই ছড়িয়ে পড়ুক আনাচে কানাচে। লড়াই এর সামনের সারিতে থাকুন মেজাইয়া যীশু, তাঁর ধর্ম হোক মুক্তির দিশারি।
বেশ ভাল লাগল ।