শুভ বড়দিনের প্রীতি ও শুভেচ্ছা! আজ যিশু খ্রিস্টের (প্রচলিত) জন্মদিন। যিশু খ্রিস্টের জন্মের সময়ে রাজা হেরোদের ষড়যন্ত্র থেকে আমাদের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী শিক্ষা নিতে পারেন। বাইবেলের মধ্যে মথি সুখবরের ২ অধ্যায় ১-৯ পদে এ ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। রাজা হেরোদ রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে গালিল অঞ্চলের শাসক ছিলেন। রাজা হেরোদ তার নিজ ভাই ফিলিপের স্ত্রী হেরোদিয়ার সাথে ব্যভিচার ও পাপ করেছিলেন বলে যোহন বাপ্তাইজক সরাসরি তুলে ধরেছিলেন। পরে হেরোদ যোহন বাপ্তাইজককে কারাগারে বদ্ধ করে রেখেছিলেন। হেরোদিয়ার আগের ঘরের মেয়ে হেরোদের জন্মদিনে নেচে হেরোদকে খুব সন্তুষ্ট করেছিলেন। হেরোদ সে মেয়েকে যা চান, তা দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আর সে মেয়ে তার মা হেরোদিয়ার চক্রান্তে যোহন বাপ্তাইজকের মাথা চেয়েছিলেন। অবশ্য হেরোদ না চাইলেও তার প্রতিজ্ঞার কারণে কারাগারে থাকা যোহন বাপ্তাইজকের মাথা কেটে সে মেয়েকে উপহার দিয়েছিলেন (বাইবেল, মথি ১৪ রুকু ১-১২ আয়াত)।
যোহন বাপ্তাইজকের হেরোদ এতই ভয় করতেন যে, যিশু খ্রিস্টকে হেরোদ যোহন বাপ্তাইজক আত্মা বা পুনরাগমন বলে মনে করতেন। হেরোদের মত যে কেউ পাপ করে বা কোন অন্যায় করে, তার মধ্যে সত্যতা ও ন্যায্যতার ভয় রয়েছে। সৎ ও ধার্মিক লোকদের কোনো ভয় নেই। অন্যায় ও জুলুমকারীরা ভয়ের মধ্যে থাকে। সেজন্য সৎ লোকদের দাঁড়ানো দরকার। এ হেরোদ যিশু খ্রিস্টের জন্মের কথা শুনে বিচলিত হয়েছিলেন। এহুদিয়ার বেথলেহেমে যিশু খ্রিস্টের জন্ম হয়েছে। পূর্বদেশ থেকে পণ্ডিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের তারা দেখে যিরূশালেমে এসেছেন বনি ইসরাইলদের রাজা সে যিশু খ্রিস্টকে খুঁজতে ও তাঁকে প্রণিপাত করতে। রাজা হেরোদ যখন শুনতে পেলেন ইসরাইলদের রাজা জন্ম হয়েছে। তার সিংহাসন কেঁপে উঠেছিল। তিনি ভুলভাবে চিন্তা করলেন যে, তার রাজত্ব শেষ হতে চলেছে। তিনি পণ্ডিতদের গোপনে ডাকলেন ও ষড়যন্ত্র করলেন। তিনি তাদেরকে বেথলেহেমে প্রেরণ করে বললেন, ‘তোমরা গিয়ে বিশেষ করে সেই শিশুর অন্বেষণ কর; দেখা পেলে আমাকে সংবাদ দিও, যেন আমিও গিয়ে তাঁকে প্রণাম করতে পারি।’
পণ্ডিতদের সে তারাটি পথ দেখিয়ে যিশু খ্রিস্টকে যেখানে ছিলেন সে ঘরে নিয়ে গেল। পণ্ডিতেরা তাঁকে স্বর্ণ, কুন্দুরু ও গন্ধরস উপহার দিলেন। তারা স্বপ্নে এ আদেশ পেয়ে রাজা হেরোদের সাথে দেখা না করে অন্য পথ দিয়ে নিজেদের দেশে চলে গেলেন (বাইবেল মথি ২ রুকু ১৩-১৬ আয়াত)। যিশু খ্রিস্টের উদ্দেশ্য হেরোদ ও তার রাজত্বকে ধ্বংস করা ছিল না। অথচ হেরোদ ভুল চিন্তা করেছিলেন এবং যিশুকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। পরে প্রভুর এক দূত যোশেফকে স্বপ্নে বলে দিলেন যেন, শিশু যিশু ও মরিয়মকে নিয়ে সে রাত্রিতেই মিশরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কারণ হেরোদ যিশু খ্রিস্টকে মেরে ফেলার চেষ্টা করবে। যোশেফ ও মরিয়ম শিশু যিশুকে নিয়ে হেরোদের মৃত্যু পর্যন্ত মিশরেই থাকলেন। পণ্ডিতদের দ্বারা হেরোদ তুচ্ছীকৃত হয়েছেন বুঝতে পেরে বেথলেহেম ও পার্শ্ববর্তী এলাকার দুই বছর ও তার ছোট বয়সী সকল বালককে হত্যা করালেন। আর সব অঞ্চলে রোদন ও হাহাকার উঠেছিল (বাইবেল ২ অধ্যায় ১৬-১৮ আয়াত)। রোমান ইতিহাসের এক জঘন্য ও ঘৃণ্য অপরাধ সে সময়ে ঘটেছিল। এ ধরনের ঘটনা নবী মুসার জন্মের সময়ে মিশরের রাজা ফেরাউনের সময়েও ইসরাইলের সকল ছেলে-সন্তানকে জন্মের সময়েই মেরে ফেলার আদেশ হয়েছিল। অবশ্য সদাপ্রভু সে আদেশ কার্যকর হতে দেন নি (বাইবেল আদিপুস্তক ১ অধ্যায় ১৫-১৮ পদ)। যোশেফ ও মরিয়ম ঈশ্বরের কথামতো মিশরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তখনও ঈশ্বরের পরিকল্পনামতো যিশু খ্রিস্টের কাজের সময় হয়নি। নির্যাতিত, অবজ্ঞাত ও তুচ্ছীকৃত বহু সৎ ও ভাল লোক সমাজে থাকতে চায় না। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে পারে না। যারা রক্ষা করবে, তারা নির্ভরযোগ্য নয়। যখন সমাজে অরাজকতা ও অনৈতিকতা বেড়ে চলে, তখন অনেক ভালো লোক চুপ মেরে যায়, কথা বলে না। তাদের ভয় হয়, উচিত কথা বলে তারা আক্রমণের মুখে পড়বে। কিন্তু ঈশ্বর তার প্রিয় লোকদের রক্ষা করেন।
কেন হেরোদ এহুদিয়ার সব ছেলে-সন্তানকে হত্যা করেছিল? পূর্বদেশের পণ্ডিতেরা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যিশু খ্রিস্ট হচ্ছেন ইসরাইলদের রাজা হেরোদ যিশু খ্রিস্টকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ধরে নিয়েছেন। হেরোদ যিশু খ্রিস্টকে শিশু অবস্থায়ই হত্যা করতে চেয়েছিলেন। তিনি কোন ধরনের ঝুঁকি নিতে চান নি। শত্রুকে হত্যা করতে পারলে তার সিংহাসন টিকে থাকবে। তিনি বুঝেননি যে, হত্যা করাতেই সমাধান নয়। মৃত্যু কোনো সমাধান নয়। মৃত্যু সম্পর্কে যাদের ভুল ধারণা রয়েছে, তারা এমন চিন্তা করতে পারে। মৃত্যুতে সবকিছুর শেষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে মৃত কেউ জীবিত থাকার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠে। হেরোদ তা বুঝতে পারেন নি, যেভাবে আমাদের সমাজেরও অনেকে বুঝতে পারে না। এমনকি অপরাধীদের বিনা বিচারে হত্যা করাতেও কোনো সমাধান নেই। সংঘাতে কোনো উপকার নেই। সমাজে আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে যেন, আমরা শত্রুকে ভালোবাসি, নিরাপত্তা দিই ও তাদের সাথে মিশি। তাহলেই সকলের উপকার হবে। যে যিশু খ্রিস্টকে হেরোদ শত্রু মনে করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, সেই যিশুর শিক্ষা হচ্ছে শত্রুকে প্রেম করা। হেরোদের টার্গেট ছিল যিশু খ্রিস্টকে হত্যা করা। কিন্তু তাঁকে না পেয়ে সকল শিশুকে হত্যা করেছিলেন। কোনো লাভ হয়নি। যিশু খ্রিস্ট নিরাপদেই থাকলেন। ঈশ্বর যাকে রক্ষা করতে মনস্থ করেন, তাকে কেউ ধ্বংস করতে পারে না। আর হেরোদ ঈশ্বরের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কাজ করলেন। বহু নিরাপরাধ শিশুকে তিনি হত্যা করলেন। এ হেরোদ মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে কাজ করছিলেন। নিজেকে এমনকি ঈশ্বরের চেয়েও বড় মনে করছিলেন। পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে, ‘তখন এক নিরূপিত দিনে হেরোদ রাজবস্ত্র পরিধানপূর্বক সিংহাসনে বসে তাদের কাছে উচ্চৈঃস্বরে বলতে লাগলেন, এ দেবতার রব, মানুষের নয়। আর প্রভুর এক দূত তখনই তাঁকে আঘাত করলেন, কেননা তিনি ঈশ্বরকে গৌরব প্রদান করলেন না; আর তিনি কীটভক্ষিত হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন’ (বাইবেল প্রেরিত ১২ রুকু ২১-২৩ আয়াত)। আমাদের নিজের স্বার্থকতা ও সফলতার চেয়ে ঈশ্বরের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যকে বড় করে দেখতে হবে। নিজেকে যেমন প্রেম করব, তেমনি অন্যকেও প্রেম করতে হবে। তা না হলে যদি আমাদের স্বার্থপর ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ টিকে থাকার পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ না নেয়, তাহলে আমরা নিজেরা নিজেদেরকে হারাব।
আসলেই কি যিশু খ্রিস্ট বনি ইসরাইলের রাজা ছিলেন? পবিত্র বাইবেল মতে যিশু খ্রিস্ট তেত্রিশ বছর পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। যিশু খ্রিস্টকে যখন বনি ইসরাইলরা গ্রেপ্তার করে এহুদিয়ার গভর্নর পিলাতের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন পিলাত তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি কি ইহুদিদের রাজা?’ যিশু খ্রিস্ট উত্তর করেছিলেন, ‘তুমিই বললে’ (পবিত্র বাইবেল মথি ২৭ রুকু ১১ পদ)। পিলাত যখন রাজা হেরোদের কাছে যিশু খ্রিস্টকে প্রেরণ করলেন, তখন হেরোদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছিল। কিতাবে লেখা আছে, ‘যিশুকে দেখে হেরোদ অতিশয় আনন্দিত হলেন, কেননা তিনি তাঁর বিষয়ে শুনেছিলেন, এজন্য অনেক দিন হতে তাঁকে দেখতে বাঞ্ছা করছিলেন, এবং তাঁর কৃত কোনো চিহ্ন দেখবার আশা করতে লাগলেন। তিনি তাঁকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু যিশু খ্রিস্ট তাঁকে কোনো উত্তর দিলেন না। … আর হেরোদ ও তার সেনারা তাঁকে তুচ্ছ করলেন ও বিদ্রূপ করলেন, এবং জমকালো পোশাক পরিয়ে তাঁকে পিলাতের কাছে ফেরত পাঠালেন। সেদিন হেরোদ ও পিলাত পরস্পর বন্ধু হয়ে উঠলেন, কেননা পূর্বে তাদের মধ্যে শত্রুভাব ছিল’ (বাইবেল ২৩ অধ্যায় ৮-১২ পদ)। পিলাত ও হেরোদ দীর্ঘদিনের শত্রুতায় জড়িয়ে ছিলেন। পিলাত ও হেরোদ চিন্তা করলেন, তাদের দু’জন দু’জনের শত্রু হলেও যিশু খ্রিস্ট তাদের দু’জনেরই আরও বড় শত্রু। যেভাবে তখনকার জগত ঈসা মসিহের পিছনে অনুসরণ করছিল, তাতে তারা দু’জনই ভীত হয়েছিলেন। লেখা আছে, ‘তখন ফরিশীরা পরস্পর বলতে লাগল, তোমরা দেখছ, তোমাদের সব চেষ্টা বিফল; দেখ, জগৎ-সংসার তার পশ্চাদগামী হয়েছে’ (বাইবেল যোহন ১২ অধ্যায় ১৯ পদ)। তেমনিই একজন মহান নেতা, ধার্মিক ও জগতের পরিত্রাতাকে হত্যা করতে তারা পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠলেন। এ যেন অন্যায় উদ্দেশ্যে ন্যায়কে বিসর্জন দেয়া। আমাদের সমাজে এ ধরনের ষড়যন্ত্র আমরা বহুদিন থেকে দেখে আসছি। একে অপরকে ধ্বংস করার জন্য আমরা অন্যায়ের সাথে হাত মিলাই। প্রতিদ্বন্দ্বীকে শেষ করে দিতে আমরা অন্যায়ের দ্বারস্থ হই। আমাদের দেশের জন্মলগ্ন থেকেই আমরা এ ধরনের ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু নিজের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আমরা এমন অন্ধ যে, আমরা তা চোখ থাকতেও দেখি, আর কান থাকতেও শুনি না, এবং কোন পদক্ষেপ নিই না। আমরা নিজেরা শেষ হয়ে যাব, আমাদের দেশকেও শেষ করে দেব, তবুও অন্য কেউ যেন টিকে না থাকতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের কী লাভ? মানুষের কোন উপকারের চিন্তা কি আমাদের আছে? আমরা কি মানুষের মঙ্গলের চিন্তা কখনো করি?
শাস্ত্রের কথামতো যিশু খ্রিস্ট ইসরাইলদের ও সারা পৃথিবীর সব মানুষের রাজা তবে বনি ইসরাইলরা, রোমান গভর্নর পিলাত ও রাজা হেরোদ যিশু খ্রিস্টের রাজত্বের অর্থ বুঝেননি। যিশু খ্রিস্ট ছিলেন ঈশ্বরের আত্মিক রাজ্যের রাজা। তিনি মানুষ হিসেবে তাঁর জন্মের মধ্য দিয়ে এ পৃথিবীতে স্বর্গীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে এসেছেন। তাই যোহন বাপ্তাইজকের কাছে বাপ্তিস্ম নেয়ার পরপরই যিশু খ্রিস্টের যে ঘোষণা, তা হচ্ছে ‘মন ফিরাও, কেননা স্বর্গ-রাজ্য সন্নিকট হল’ (বাইবেল মথি ৪ অধ্যায় ১৭ পদ)। এর আগে যোহন বাপ্তাইজকও একই প্রচার করেছিলেন, “মন ফিরাও, কেননা স্বর্গ-রাজ্য সন্নিকট হল” (বাইবেল মথি ৩ অধ্যায় ১ পদ)। যোহন বাপ্তাইজক ও যিশু উভয়েই ঈশ্বরের রাজ্যের সুখবর দিয়েছিলেন। এ রাজ্যের প্রকৃতি জাগতিক নয়, কিন্তু আধ্যাত্মিক। বনি ইসরাইলরা ও রোমান পৌত্তলিক শাসকরা এ রাজ্যের প্রকৃতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তারা আরেকটি কারণে যিশুকে হত্যা করতে চেয়েছিলের, কারণ যিশু যখন দ্বিতীয় বার এ পৃথিবীতে আগমন করবেন, তখন তিনি জাগতিক প্রকৃতির রাজ্যের রাজা হবেন। তবে তাঁর সেই ভবিষ্যতের রাজ্য ও সে রাজ্যে তাঁর রাজত্ব নির্ভর করে প্রথম আগমনে তাঁর নিরূপিত কাজ হিসেবে ক্রুশীয় মৃত্যুর উপর। আমাদের মনে রাখতে হবে, ছাড় দেয়াতে কোনো পরাজয় নেই। এখন যে যত বেশি ছাড় দেবে, ত্যাগ করবে, এবং অন্যকে নিজের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর জ্ঞান করবে, সে তত বেশি লাভবান হবে। আর তার জনসমর্থন আরও বাড়বে। এই বড়দিনে আসুন আমরা ষড়যন্ত্র পরিহার করে সবাইকে সমানভাবে গ্রহণ করি। শত্রুকে মিত্রে পরিণত করি। বড়দিন থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক, বাংলাদেশ।