হাসান আজিজুল হক চলে গেছেন। তিনি ছিলেন আমার প্রিয় লেখক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম আমি। হাসান আজিজুল হক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের শিক্ষক ছিলেন।
ক্যাম্পাস জীবনে তাঁকে নানাভাবে দেখেছি। এই মুহূর্তে একটি স্মৃতি গভীরভাবে মনে পড়ছে। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময় রাজশাহীর মতিহার থেকে যখন মিছিল বের হবে তখন আমরা রাস্তার যে পারে, তার উল্টো পারে ছিলেন হাসান আজিজুল হক ও ড. সামসুজ্জোহা। আমরা মিছিল করছি, তাঁরা ছুটে মিছিলের সামনে এলেন। বললেন, রাস্তার ওপাশে পাঞ্জাবি সেনারা বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা আগে যেও না, আগে আমরা যাব, তারপর তোমরা। এভাবে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের আগলে রাখতেন সন্তানের মতো। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেন। তিনি আমার জীবনের অন্যতম মানুষ। তাঁর জীবন দর্শনের আলোয় নানাভাবে আমার জীবনকে আলোকিত করেছেন।
হাসান আজিজুল হক কখনো কেন্দ্রে অর্থাৎ রাজধানীতে ছিলেন না। থাকতেন রাজশাহীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অদূরে ‘উজান’ বাড়ি ছিল তাঁর ঠিকানা। উত্তরবঙ্গের সবুজাভ পদ্মার তীরের ওই শহরে বিকশিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যজীবন। শিক্ষকতার মহান ব্রতকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। নিজে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন সেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে করতে কাটিয়ে দিলেন জীবনটা। সেখানে থেকেই করেছেন সাহিত্যচর্চা। রাজধানী থেকে বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পসাহিত্য নানা মাত্রায় বিকশিত হয়েছে। কিন্তু রাজশাহীতে থেকেও বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্রস্থলে ছিলেন হাসান আজিজুল হক। সেটা তাঁর লেখনীর গুণে।
লেখক হিসেবে হাসান আজিজুল হক নিজস্ব একটি ভূগোল তৈরি করেছেন। যে ভূগোলের চরিত্রগুলো দৃষ্টিভঙ্গিতে, বয়ানে, শব্দ-প্রয়োগে নিজস্ব ব্যাকরণ মেনে চলে। পাকা জহুরির মতো চরিত্রগুলোর জীবন ঘষে অন্তরের আগুন বের করতে সক্ষম ছিলেন তিনি। তাঁর গল্প-উপন্যাস বিষয়বৈচিত্র্যে ও গভীরতায় পাঠকের অন্তরে নতুন আবেদন সৃষ্টি করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- আত্মজা ও একটি করবী গাছ, জীবন ঘষে আগুন, পাতালে হাসপাতালে, নামহীন গোত্রহীন, মা মেয়ের সংসার, বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প, সক্রেটিস, বৃত্তায়ন, শিউলি, আগুনপাখি, ফিরে যাই ফিরে আসি, উঁকি দিয়ে দিগন্ত, একাত্তর : করতলে ছিন্নমাথা, লাল ঘোড়া আমি, ফুটবল থেকে সাবধান ইত্যাদি।
এসব লেখায় এপার বাংলা-ওপার বাংলা মিলিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, সেই জায়গাটি আমরা গর্ব ভরে স্মরণ করি। কর্মের মাধ্যমে আগামী দিনে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। এই সত্যকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রাখছি। আমাদের নতুন প্রজন্ম জানবে হাসান আজিজুল হক একজন ভিন্ন ধারার লেখক ছিলেন। যিনি তাঁর রচনায় নিজস্ব ধারা তৈরি করেছিলেন।
শুধু লেখালেখি করেই দায় সারেননি হাসান আজিজুল হক। মুক্তিযুদ্ধ, এই দেশ, দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব সময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। তাঁর মৃত্যু যে শূন্যতা তৈরি করল তা পূরণ হবার নয়। সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।