| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পাশ্চাত্যের আকাশেও স্বমহিমায় ভাস্বর জীবনানন্দ দাশ (শেষাংশ) : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ২৪২৯ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২১

রোমাণ্টিক কবি না হয়েও তাঁর কবিতায় ফিউচারিজমের প্রভাব পড়েছে। ‘বনলতা সেন’ কাব্যের ‘বুনো হাঁস’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’র ছায়া নবরূপ লাভ করেছে : ‘বুনো হাঁস পাখা মেলে—শাঁই শাঁই শব্দ শুনি তার,/ এক-দুই-তিন-চার-অজস্র-অপার—’। আবার ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যের ‘হাওয়ার রাত’ কবিতায় মশারির উড়ন্ত চিত্রে অভিনব চিত্রকল্প রচিত হয়েছে : ‘এক একবার মনে হচ্ছিল আমার—আধো ঘুমের ভিতরে হয়তো—/মাথার উপরে মশারি নেই আমার/ স্বাতী তারার কোল ঘেঁষে নীল হাওয়ার সমুদ্রে শাদা বকের মতো উড়ছে সে।’ অন্যদিকে ফিউচারিস্টদের যুগজ্বরও জীবনানন্দে প্রতিফলিত। সেদিক থেকে সময়ের গতিতে যেমন age of speed and steel, তেমনই age of feverও উঠে আসে। গতির বাঁধনহারা প্রকৃতি যেমন যেমন মানুষকে উদ্দীপ্ত করে, তেমনই ক্লান্ত করেও দেয়। অভিজ্ঞতাভারাক্রান্ত কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুচেতনার মধ্য তার বহুমাত্রিক পরিচয় উঠে এসেছে। কখনও তা শঙ্খচিল শালিকের জন্ম চেয়েছেন, কখনও মেঠো ইঁদুরের মতো মৃত্যুকে দেখেছেন, কখনও আবার কমলালেবুর মধ্যে পুনর্জন্ম খুঁজে ফিরেছেন। এজন্য পার্থিব চেতনায় মুগ্ধতাবোধের তীব্রতায় যেমন জন্মভূমির প্রতি তাঁর শ্রেয়বোধের পরাকাষ্ঠা লক্ষ করা যায় (‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের ‘বাংলার মুখ দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’), তেমনই পরজন্মে ফিরে আসার চেতনাও বিস্তার লাভ করে (‘রূপসী বাংলা’র ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায়’)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঔপনিষদিক মৃত্যুচেতনা তথা মৃত্যের মাধ্যমে নবজন্ম লাভের চেতনা জীবনানন্দের ছিল না।

জার্মানের এক্সপ্রেসনিজমের প্রভাবও জীবনানন্দের কবিতায় প্রতীয়মান। তাঁর বিখ্যাত কবি ‘আট বছর আগের একদিন’-এ তা স্পষ্ট। অসুস্থ মানসিকতা, বিকৃত পরিসর, বিশৃঙ্খল প্রকৃতি প্রভৃতির অস্বাভাবিক প্রকাশই এক্সপ্রেসনিজমের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক ভাবেই তাতে খরা-বন্যা,ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রভৃতির মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে বিপর্যস্ত পৃথিবীর রূপকে তুলে ধরার মাধ্যমে দৃশ্যমান জগতের অস্বাভাবিক রূপকে মূর্ত করে তোলার প্রয়াস সেখানে নিবিড় হয়ে ওঠে। কেননা এই মতবাদে জীবনের কোনো স্বাভাবিক সমাধান নেই। ক্যারিকেচার বা স্থূল রূপের পরিচয়ে তার ভাষাতেও রহস্যময়তা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। দার্শনিক বেনোদাত্ত ক্রোচের সত্যের চেতনায় মতবাদটি দার্শনিক ভিত্তি। সত্যের আধার প্রজ্ঞা(intuition)। আর প্রজ্ঞাই প্রকাশ বা এক্সপ্রেশন। ভ্যানগগের ছবিতে আকৃতি ও বর্ণের বিকৃতিতে তার প্রকাশ লক্ষণীয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জার্মানে মতবাদটি আন্দোলিত হলেও এর সূচনা হয়েছিল ফ্রান্সে, চিত্রকর হার্ভের মাধ্যমে ১৯০১-এ। ১৯২৪ পর্যন্ত মতবাদটি সচল ছিল। বাংলায় একে প্রকাশবাদ বা অভিব্যক্তিবাদ বলা হয়। বাইরের কৃত্রিম প্রকাশের বিপ্রতীপে অন্তরের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের প্রকাশে মতবাদটি স্বাভাবিক ভাবেই সক্রিয়তা লাভ করে। সেদিক থেকে এক্সপ্রেশনিস্টদের প্রকাশের মধ্যে স্বেচ্ছাচারী, বিস্ফোরকধর্মী, বিশৃখলাপরায়ণ ও গতিশীলতাই কবিতার শৈলী হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক ভাবেই এতে যুক্তি বা সঙ্গতির অভাববোধ তীব্র মনে হয়। কবিতায় উদ্ধৃতির যদৃচ্ছা ব্যবহার হতে শুরু করে, ছন্দ ভেঙে যায়, ভাবেও অসঙ্গতি আসে। বারটোল্ড ব্রেখট, স্ট্রিণ্ডবার্গ প্রমুখের নাটকে, রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’ নাটকে অনুভূতির আবেগময় অভিঘাতে তার পরিচয় বর্তমান।

অন্যদিকে জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার মধ্যে তা মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, ১৯১২-তে এক্সপ্রেশনিস্ট লেখক গটফ্রিড বেন ‘লাসকাটা ঘর’ নাম দিয়ে একটি লিফলেট ছড়িয়েছিলেন। ‘লাসকাটা ঘর’-এর কথা ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাতেও বর্তমান। স্ত্রীপুত্র নিয়ে সুখস্বাচ্ছন্দ্যময় পারিবারিক সুখী জীবন পেয়েও আত্মহত্যা করে সেই ‘লাসকাটা ঘর’-এ টেবিলের উপরে শায়িত লোকটির মৃত্যুর কারণ থেকে বাদাহীনের পথের কথায় এক্সপ্রেশনিজমের পরিচয় নিবিড় হয়ে উঠেছে। রহস্যময় উপস্থাপনায় অতিরঞ্জিত প্রকাশে ভাষা স্বাভাবিক ভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে : “কোনোদিন জাগিবে না আর/ জানিবার গাঢ় বেদনার/ অবিরাম—অবিরাম ভার/ সহিবে না আর—‘/ এই কথা বলেছিলো তারে/ চাঁদ ডুবে চ’লে গেল—অদ্ভুত আঁধারে / যেন তার জানালার ধারে / উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এল।’ আবার মজাদার নাটকীয় বিভঙ্গী উঠে এসেছে : ‘অশ্বত্থের শাখা / করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে / করেনি কি মাখামাখি?/ থুরথুরে অন্ধ পেঁচা এসে/ বলেনি কি : ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে?! চমৎকার!/ ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!/ জানায়নি পেঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার ?’ শুধু তাই নয়, ভাষার কুহেলিকা অভিব্যক্তিকে আরও রহস্যঘন করে তুলেছে : ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—/ আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/ খেলা করে ; আমাদের ক্লান্ত করে,/ ক্লান্ত—ক্লান্ত করে;’। যদিও এই ভাষার কুহেলিকা জীবনানন্দ দাশের পূর্বেও লক্ষ করা যায়। তাঁর ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র ‘বোধ’ কবিতায় সেই বোধের পরিচয়ে তারই উত্তরসূরি : ‘আলো-অন্ধকারের যাই—মাথার ভিতরে/ স্বপ্ন নয়, কোন্‌ এক বোধ কাজ করে;/ স্বপ্ন নয়— শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়, / হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;/ আমি তারে পারি না এড়াতে’। সেই বোধই আরও ঘনীভূত হয়ে ‘আট বছর আগের একদিন’-এ অভিব্যক্ত হয়েছে। অন্যদিকে জীবনানন্দের আরও অনেক কবিতাতেই ভাষার কুহেলিকায় প্রকাশ লক্ষ করা যায়। তাঁর বস্তুবিশ্ববিমুখী মনের মগ্নচৈতন্যের ভাষায় এক্সপ্রেশনিজমের পথ বেয়েই তাঁর সুরিয়ালিজম বা পরাবাস্তবতা বা অধিবাস্তবতার প্রকাশ নিবিড় হয়ে উঠেছে।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় সুরিয়ালিজমের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। বাংলায় তিনিই সুরিয়ালিস্ট কবি হিসাবে নন্দিত হন। রিয়াল বা বাস্তবের চেয়েও অতি বাস্তব বা বাস্তবের অন্তরে আরও গভীর বাস্তবচেতনায় সুরিয়ালিজমের বিস্তার। অবশ্য তা যেমন কবিতায় অবচেতন মনের ছবি আঁকা নয়, তেমনই বিভিন্ন ভাবে কল্পনার জগতের হদিশ দেওয়াও নয়। চেতন ও অচেতন, অন্তর ও বাইরের জগতের মধ্য দৈহিক ও মানসিক বেড়া ভেঙে দেওয়াই তার বিশেষত্ব। বাস্তব ও কল্পনার মাঝের মানসিক ব্যবধান সেখানে অস্বীকৃত হল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তীব্র অভিঘাতে ১৯১৫-১৬তে ডাডাইজমে যে শিল্প-সাহিত্যের প্রচলিত বিবিধ প্রথা, রীতি বা বক্তব্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা জেগে ওঠে, তার প্রতি বিরূপ হয়ে ডাডাবাদীদেরই কিছু লেখক সুরিয়ালিজমে সামিল হয়েছিলেন। স্মরনীয়, উদ্দেশহীন ডাডাইজম বেশিদিন টেকেনি। ১৯২২-এ শেষ হয়ে যায়। আর ১৯২৩-২৪-এ সুরিয়ালিজমের যাত্রা শুরু হয়। মনস্তাত্বিক আঁদ্রে ব্রেতোঁ এই মতবাদের হোতা। এতে অবচেতন মনের অর্গল গেল খুলে, চেতনমনের যুক্তিশৃঙ্খল হল মুক্ত। স্বাভাবিক ভাবেই রচনায় এল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবের প্রকাশ মূর্ত হয়ে প্রতিমায় আবেদনক্ষম হয়ে উঠল। আসলে যা ছিল ভাবজগতে, তাই চিন্তা-কল্পনা আর স্বপ্নে একীভবন হয়ে প্রকাশিত হল। সেখানে চেতন মনের বাস্তবতার সঙ্গে মগ্নচৈতন্যের অতিবাস্তবতার অপূর্ব প্রকাশে সুরিয়ালিজম বা পরাবাস্তবতা বা অধিবাস্তবতার বৈপ্লবিক প্রভাব স্বাভাবিক ভাবেই শিল্প-সাহিত্যে ছড়িয়ে পড়ে। কনকনে শীতের প্রকাশে গায়ে কাঁটা দেয় যেমন বোঝা যায়, শরীর হিম হয়ে ওঠার অনুভূতি জেগে ওঠে।

রবীন্দ্রসঙ্গীত হাল্কা-ভারী না হলেও বর্ষায় হাল্কা রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে খিচুরি খাওয়ার আনন্দ উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না। সেখানে মনের অবচেতনের সীমা ছেড়ে মগ্ন চৈতন্যলোকে ডুব দিয়ে জীবন ও জগতের অপার রহস্য উদ্ঘাটনে শিল্পী-সাহিত্যিকের প্রয়াস চলে। চোখের দেখায় নয়, অতল মনের চেতনাই তাতে সুগভীর ও সুদূর প্রসারিত। সেক্ষেত্রে ব্যঞ্জনা নয়, তার অভিব্যঞ্জনাই কবিতার স্বতন্ত্র প্রকাশকে আবেদন করে তোলে। সুরিয়ালিজমের বিশেষত্বগুলি নানাভাবেই জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নিবিড় হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, প্রকাশের স্বকীয় কবিসত্তাতেই মতবাদটি তীব্র আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। ইতিহাসচেতনা, সমাজচেতনা, ইন্দ্রিয়ঘনত্ব প্রভৃতির প্রকাশে তাঁর জীবনসন্ধানী মনের চলনে সুরিয়ালিজমের ঘনিষ্ট যোগ। দীপ্তি ত্রিপাঠী মনে করেন, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র(১৯৩৬) ‘পরস্পর’ কবিতা থেকে জীবনানন্দের সুরিয়ালিজমের প্রভাব লক্ষণীয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রথম কাব্য ‘ঝরাপালক’(১৯২৭)-এ ইমেজিস্টদের প্রভাব ছিল তীব্র। অন্যদিকে যুক্তিগ্রাহ্য বা বিশ্বাসযোগ্য না হলেও সুরিয়ালিজমের ফ্যান্টাসি বা যোগসূত্রহীন কাল্পনিক কবিতাগুলিও মনকে আকৃষ্ট করে তোলে।

জীবনানন্দের অধিকাংশ বিখ্যাত কবিতাতেই সুরিয়ালিজমের ছায়া প্রতীয়মান। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় তাঁর অপূর্ব প্রকাশ : ‘হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাটিতেছি পৃথিবীর পথে,/ সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে/ অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে/ সেখানে ছিলাম আমি ; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;/ আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,/ আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।……।’ সনেটটিতে ‘হাজার বছর ধ’রে’ বাংলা বা বাঙালির ইতিহাস ধরে অগ্রসর হলে পথ শুধু আরও প্রাচীনত্বে বা তার আভিজাত্যে অথবা তার ধূসর-অন্ধকারাচ্ছন্ন জগতে হারিয়ে যায় না, ইতিহাসচেতনায় তালগোল পাকিয়ে তোলে। অথচ তার কালপরিচয়ের মধ্যেই অমোঘ আকর্ষণ ‘আমি’ত্বের পরিচয়কে অপূর্ব ভাবসৌন্দর্য দান করে। ‘বনলতা’ও পাঠকের মনোলতাকে নিজের দিকে টেনে রাখে। অন্যদিকে ‘বনলতা সেন’(১৯৪২) কাব্যের ‘হরিণেরা’ বা ‘অবশেষ’ প্রভৃতি কবিতাতেও সেরূপ পরিচয় বিদ্যমান। স্বপ্নের চিত্রকল্প সেখানে স্বপ্নেই মিশে গেছে। অন্যদিকে জীবনানন্দের কাব্যিক উৎকর্ষে সুরিয়ালিজমের পরশ বহুমাত্রিক।

‘রূপসী বাংলা’(১৯৫৭-এ কাব্যটি প্রকাশিত হলেও কবিতাগুলি অনেক পূর্বে লেখা।) কাব্যের মৃত্যুচেতনায় বা স্মৃতিমেদুর আবেগের মধ্যেও তার বিস্তার লক্ষ করা যায়। ‘আবার আসিব ফিরে’ বা ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ প্রভৃতি সনেটের মধ্যেও সেই ভাবসৌন্দর্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে ‘মহাপৃথিবী’(১৯৪৪) কাব্যের ‘শ্রাবণ রাত’, ‘স্বপ্ন’, ‘নিরালোক’, ‘সাতটি তারার তিমির’(১৯৪৮) কাব্যের ‘ঘোড়া’, ‘সেই সব শেয়ালেরা’, ‘হাঁস’ প্রভৃতি কবিতায় সুরিয়ালিজমের পরিচয় নিবিড় হয়ে আসে। ‘ঘোড়া’ কবিতাটিকে জীবনানন্দের সুরিয়ালিয়াস্টিক চেতনাই স্বতন্ত্র আভিজাত্য প্রদান করেছে। ঘোড়ার মধ্যে দিয়ে জীবনের ইতিহাস নয়, ইতিহাসের মধ্যে রহস্যময় অপরাজেয় জীবনের অস্তিত্ব অভিনব ভাষ্য লাভ করে : ‘আমরা যাইনি ম’রে আজো— তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়:/ মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে;/ প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন— এখনও ঘাসের লোভে চরে/ পৃথিবীর কিমাকার ডাইনোমোর প’রে ……।’ আসলে জীবনানন্দ দাশের কবিচেতনায় সভ্যতাবিমুখতায় তাঁর অন্তর্দৃষ্টি যত প্রসারিত হয়েছে, ততই তাঁর মননবিশ্বে সুরিয়ালিজমের প্রভাব তীব্রতা লাভ করেছে। সত্যসন্ধানী কবির মানসনেত্রে বাস্তবের অতিরেকে অতিবাস্তবের পরশ তাই স্বাভাবিক মনে হয়। আবার সেই কবি সভ্যতার নগ্ন বাস্তবতাকেই শুধু নয়, নগ্ন মানসচিত্রের সুগভীর চিত্রকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ক্যামেরাম্যান হয়ে থাকেননি, শিল্পীর তুলিকে লেখনী করে তুলে তাকে জীবননিষ্ঠ করে তুলেছেন, জীবনসত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। এজন্য জীবনানন্দের সত্যসুন্দর মূর্তি পরাবাস্তবতার আবেশের ঘোরে বন্দি না থেকে জীবনপ্রত্যয়ী চেতনায় প্রতিমার হাতছানি বয়ে আনে। শেষ পর্যন্ত তিনি যে কোনো মতবাদে আবদ্ধ না থেকে মুক্ত জীবনানন্দে সমান সচল কবি হিসাবেই তাঁর স্বকীয় প্রকাশ আকাশ হয়ে উঠেছে।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “পাশ্চাত্যের আকাশেও স্বমহিমায় ভাস্বর জীবনানন্দ দাশ (শেষাংশ) : স্বপনকুমার মণ্ডল”

  1. Rupa kundu says:

    ভীষণ তথ্যসমৃদ্ধ মননশীল এক লেখা পড়লাম স্যার,,,, মন ছুঁয়ে গেলো।
    দারুণ ????????

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev