জীবনানন্দ দাশ মরিয়া প্রমাণ করিলেন, তিনি বাঁচিয়া আছেন। রূপসী বাংলার কবি ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মৃত্যুর পশ্চাৎপট জানা যায় না। সবই আন্দাজ করে নিতে হয়।
তবে একটি পুরনো কবিতার উল্লেখ অন্যায় হবে না, —
ধেয়ে আসছে ট্রাম
ধেয়ে আসছে রক্তের চাপ, ধেয়ে আসছে ট্রাম
এখন কি ভরসন্ধে, নাকি নিকষ মধ্যযাম
ধেয়ে আসছে ডায়াবিটিস, ক্ষয় করেছে স্নায়ু
ক্ষণজন্মা কবি এবং কবির পরমায়ু!
***
ধেয়ে আসছে গঙ্গার ঘাট, ওই তো আউটরাম
ধেয়ে আসছে আহিরিটোলা, মাল্যবানের নাম।
ধেয়ে আসছে খালাসিটোলার মদ্যপায়ী কবি
ধেয়ে আসছে শোভনা আর মনিয়াটার ছবি।
***
ধেয়ে আসছে হার্ডিঞ্জ হোস্টেল,প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং
আসছে যে ওই বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়ির হোর্ডিং
ধেয়ে আসে আইবুড়ো ভিখিরি, হাইড্র্যান্টের জল
ধেয়ে আসছে রামযশ কলেজ, দিল্লির অকুস্থল।
***
ধেয়ে আসছে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ
ধেয়ে আসছে সিটি কলেজের অধ্যাপকের শেলেজ
ধেয়ে আসছে চাকরিখেকো যত ম্যানেজমেন্ট ধূর্ত
ধেয়ে আসছে পাওনাদাররা,-রাইটার্স বিল্ডিং পূর্ত।
***
ধেয়ে আসছে কল্লোলিনীর রাতভর মোচ্ছব
ধেয়ে আসছে লাশকাটা ঘর, অপেক্ষমাণ শব
ধেয়ে আসছে লেখককুলের কঠিন পেনের নিব
মরণপিছিল ট্রামলাইনে দাঁড়িয়ে সদাশিব।
***
ডাকছে তাকে গঞ্জনাঘর, করছে কেন রাত
পেছনপানে ডাকছে আকাশ, ডাকছে শিশিরপাত
কখন যেন কসাই ট্রামের ঘণ্টি বেজে ওঠে–
মধ্যরাতেই পাঁজর ফুঁড়ে রক্তকমল ফোটে!
ডাক্তারদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ২২ অক্টোবর তিনি প্রয়াত হন। সেটা ছিল ১৯৫৪ সাল। পরের বছর ছিল প্রেসিডেন্সী কলেজের একশ’ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান। সেই উপলক্ষে প্রকাশিত হয় এক ঢাউস পত্রিকা। তার নাম ‘Presidency College Centenary Volume’। সেখানে শোকপ্রকাশ (Commemoration) শিরোনামে প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রয়াত যে সমস্ত কৃতী ব্যক্তির নাম প্রকাশিত হয়েছিল, তার মধ্যে জীবনানন্দ দাশের নাম ছিল।
দাশ (Das)-পদবিধারী প্রয়াত ছাত্রদের মধ্যে ২ নম্বরে তাঁর নাম আছে। ১ নম্বরে আছে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাম। তিন নম্বরে সময় পত্রিকার সম্পাদক জ্ঞানেন্দ্রনাথ দাসের নাম। চার নম্বরে আছে কংগ্রেস নেতা ও ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ললিতমোহন দাসের নাম। পাঁচে আছে জজ লালমোহন দাস, ছ-নম্বরে কবি ও অনুবাদক নবীনচন্দ্র দাসের নাম। আর সাতে আছে নামী চিকিৎসক উপেন্দ্রনাথ দাসের নাম।
জীবনানন্দের পরিচয়ে লেখা আছে, ‘Notable bengali poet’। প্রেসিডেন্সীতে পড়ার মেয়াদ উল্লিখিত হয়েছে, ১৯১৭-১৯২১। ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ তিনি প্রেসিডেন্সীর ইংরেজি বিএ অনার্সের ছাত্র ছিলেন। ১৯১৯-১৯২১ সময়কালে তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের এম এ-র ছাত্র, কিন্তু ক্লাসগুলি হত প্রেসিডেন্সীর ভবনে।
প্রসঙ্গত, শোকপ্রস্তাবের ভূমিকায় ইংরেজিতে যা লেখা আছে, তার মর্মার্থ হল, প্রয়াত ছাত্রদের সম্পর্কে তথ্য-সংকলকরা যতটা সম্ভব অনুসন্ধান করে কিছুটা লাইমলাইটে আসা প্রাক্তন ছাত্রদের নাম সংগ্রহ করেছেন। নির্বিচারে সকল প্রয়াত ছাত্রের নাম দেওয়া সম্ভব হয়নি, এটা তাঁরা স্বীকার করেছেন এবং তার জন্যে অগ্রিম ক্ষমা চেয়েও নিয়েছেন। এ থেকেই প্রমাণিত হচ্ছে, জীবনানন্দ তখন উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবেই স্বীকৃত ছিলেন।
এই শতবার্ষিকী সংখ্যার মুখবন্ধ হিসেবে দেওয়া হয়েছে, ইংরেজি ভাষার কবি ও প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রাক্তন ইংরেজির অধ্যাপক মনোমোহন ঘোষের একটি পুরনো লেখা। কারণ মনোমোহন ঘোষ প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯২৪-এ। মুখবন্ধটি ছিল ইংরেজিতে লেখা একটি দীর্ঘ কবিতা। আর প্রথম নিবন্ধটি লিখেছিলেন প্রেসিডেন্সীর ইংরেজি সাহিত্যের স্বনামধন্য অধ্যাপক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত। সেটির শিরোনাম, ‘History of college’। তিনি পরবর্তীকালে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েরও অধ্যাপক হয়েছিলেন। ১৯৮৩তে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্যে তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত প্রেসিডেন্সীর ইংরেজি বিএ অনার্সের ছাত্র ছিলেন। ১৯২৭-২৮এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ করেন। পরে পিএইচডিও করেন। তিনি জীবনানন্দের বেরনোর তিনবছর পরে প্রেসিডেন্সীতে পড়তে ঢোকেন। তাই জীবননন্দের নাম যে তিনি জানতেন, সেটা ধরে নেওয়াই যায়। কারণ দুজনেই ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। ইংরেজির অধ্যাপক মনোমোহন ঘোষের সাক্ষাৎ ছাত্র ছিলেন জীবনানন্দ। তবে দুজনের কোনও পারস্পরিক সংলাপ বা পরিচয়ের প্রমাণ কোনও লেখায় পাওয়া যায় না। প্রেসিডেন্সী তথা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও অধ্যাপকের সঙ্গে জীবনানন্দের সখ্য ছিল না মনে হয়। তিনি মনে হয় ব্যাকবেঞ্চার ছিলেন, অধ্যাপকদের প্রীতিদৃষ্টি থেকে খানিক দূরে ছিল তাঁর অবস্থান।
তবে মূলত অধ্যাপকদের সন্ধানী দৃষ্টির জন্যেই জীবনানন্দ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাননি, প্রেসিডেন্সীর ছাত্র হিসেবে তাঁর উল্লেখটুকু অন্তত রয়ে গেছে।
জীবনানন্দ দাশের সমারূঢ় কবিতাটিতে অধ্যাপকদের প্রতি তাঁর ক্রোধ ও বিরক্তি ফুটে বেরোয়। কবিতাটির উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না মনে হয়-
সমারূঢ়
জীবনানন্দ দাশ
‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা—’
বলিলাম ম্লান হেসে; ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর;
বুঝিলাম সে তো কবি নয়— সে যে আরূঢ় ভণিতা:
পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ’পর
ব’সে আছে সিংহাসনে— কবি নয়— অজর, অক্ষর
অধ্যাপক; দাঁত নেই— চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি;
বেতন হাজার টাকা মাসে— আর হাজার দেড়েক
পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি;
যদিও সে-সব কবি ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক
চেয়েছিলো— হাঙরের ঢেউয়ে খেয়েছিলো লুটোপুটি।
অনেকে অধ্যাপক হেরম্বচন্দ্র মৈত্রকে এই কবিতাটির লক্ষ্য ভেবে নিয়েছেন। তবে মনে হয় সামগ্রিকভাবে সমস্ত অধ্যাপকের প্রতিই ছিল তাঁর বিতৃষ্ণা।
ভাগ্যের কী নিদারুণ পরিহাস, ইংরেজি সাহিত্যের কতিপয় বিদগ্ধ অধ্যাপকের নজরে পড়ায় তিনি প্রেসিডেন্সীর প্রয়াত ছাত্রদের লিস্টে জায়গা পেলেন (প্রেসিডেন্সী কলেজ সেন্টিনারী ভলিউম)। আর জীবিত অবস্থায় ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে তিনি ছিলেন অধ্যাপকসান্নিধ্যহীন, উপেক্ষিত।
Very informative
অনেক ধন্যবাদ। অনুপ্রাণিত হলাম।