গত আট মাস ধরে কোভিড আমাদের উপর তার ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে। আমরা কেউই এই ভাইরাসের কুপ্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত নই। সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জীবন জীবিকা আজ একটি ভাইরাসের জন্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আশার কথা—কোনো অতিমারীই চিরকাল স্থায়ী হয় না। একদিন না একদিন এই অতিমারী পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। কিন্তু অধিকাংশ অতিমারী বিদায় নেওয়ার পরে জনজীবনে তার কিছু ছাপ বা প্রভাব রেখে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ছাপের প্রভাব মূল অতিমারীর চাইতেও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আজ তেমনই একটি ছাপ বা প্রভাবের কথা আপনাদের বলবো।
আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে, ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সাল অবধি পৃথিবীতে তাণ্ডব চালিয়ে ছিল আরেক অতিমারী—‘স্প্যানিশ ফ্লু’। উইকিপিডিয়া বলছে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’-এর দরুন কেবলমাত্র ভারতে মারা গিয়েছিলেন ১২ থেকে ১৭ মিলিয়ন মানুষ যা তৎকালীন ভারতের জনসংখ্যার ৫%! ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ চলে যাওয়ার পরে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল ভারত। কিন্তু গাড়োয়াল হিমালয়ের অধিবাসীদের এই অতিমারীর মূল্য চোকাতে হয়েছিল অন্যভাবে।
গাড়োয়ালের অধিবাসীরা অধিকাংশই হিন্দু। তাঁরা মৃতদেহ দাহ করেন। অতিমারীর সময় তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে পরে যে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’-তে মৃত ব্যক্তির দাহকার্য্য সম্পন্ন করবার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ অধিকাংশ সময়েই তাঁদের কাছে থাকতো না। এর ফলে বেশিরভাগ সময়েই মৃতদেহের মুখে আগুন ছুঁইয়ে সেগুলিকে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ফেলে দেওয়া হতো এবং পাহাড়ের নীচে পড়ে থাকা এই পরিত্যক্ত মৃতদেহগুলির অধিকাংশই বিভিন্ন মাংসাশী প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হতো।
অপ্রত্যাশিতভাবে জুটে যাওয়া নরমাংসের স্বাদ এমনই একটি চিতাবাঘের খাদ্যাভ্যাস আমূল বদলে দেয়। অতিমারী অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরে এই বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাসের দরুণ সেই চিতাবাঘটি পাকাপাকিভাবে নরখাদক হয়ে ওঠে। চিতাটি প্রথম মানুষ শিকার করে রুদ্রপ্রয়াগ অঞ্চলে এবং সেইজন্য চিতাটির নাম দেওয়া হয় ‘রুদ্রপ্রয়াগের নরখাদক চিতাবাঘ’… নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা কুখ্যাত নরখাদক। ১৯১৮ থেকে ১৯২৬—এই আট বছরে এই চিতাবাঘটির পেটে গিয়েছিল ১২৫ জন মানুষ! জিম করবেটের মতে ১২৫ সংখ্যাটি কেবলই সরকারী হিসাব। আসল সংখ্যাটা এর চাইতে অনেক বেশী।

যদিও পানারের নরখাদক চিতার এবং চম্পাবতের নরখাদক বাঘীনির শিকার সংখ্যা (যথাক্রমে ৪০০ এবং ৪৩৬) রুদ্রপ্রয়াগের নরখাদকের চাইতে অনেক বেশী, তথাপি রুদ্রপ্রয়াগের নরখাদক তার প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল অন্য কারণে। প্রথমত চিতাবাঘটি শিকার করতো কেবলমাত্র রাতে—দিনের বেলায় তার টিকিটিও দেখা যেতো না। দ্বিতীয়ত চিতাবাঘটির রাজত্ব ছিল কেদারনাথ-বদ্রীনাথ অঞ্চলে, যেখানে বছরব্যাপী তীর্থযাত্রীদের আনাগোনা লেগে থাকতো। তীর্থযাত্রীদের মুখে মুখে সারা দেশে এবং দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল চিতাবাঘটার কথা। দেশী এবং বিদেশী সংবাদপত্রে একাধিকবার চিতাবাঘটিকে নিয়ে লেখা হয়েছিল। তৃতীয়ত চিতাবাঘটির শিকার করবার ধরণ ছিল অদ্ভুত। বাড়ির দরজা ভেঙে, জানালা দিয়ে গলে, মাটির বাড়ির বাইরে থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে মানুষ তুলে নিয়ে যেতে সে ছিল সিদ্ধহস্ত! এর মধ্যে একই ঘরে থাকা চল্লিশটা ছাগলকে ডিঙিয়ে ঘরের কোন থেকে ঘুমন্ত রাখালকে তুলে নিয়ে যাওয়া কিংবা অন্ধকার ঘরে মুখোমুখি বসে ধূমপানরত দুই বন্ধুর মধ্যে একজনকে বিন্দুমাত্র জানান না দিয়ে অন্যজনকে নিঃশব্দে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ছিল।
করবেটের ভাষায়, ‘দিনের বেলায় গ্রামে গ্রামে বাজার দোকান বসতো, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে বা গরু ছাগল চড়াতে যেতো, বাড়ির পুরুষেরা ক্ষেতে চাষ আবাদ করতে ব্যস্ত থাকতো, বাড়ির মেয়েরা জঙ্গলে কাঠ কাটতে যেতো। কিন্তু যেই সূর্য্য পশ্চিমে ঢলে পড়তো, পুরুষ এবং মেয়েরা ত্রস্ত পায়ে বাড়ির পথ ধরতো, বাজারে দোকানিরা তাড়াহুড়ো করে দোকান বন্ধ করতে শুরু করে দিতো, যে ছেলেমেয়েরা মাঠ বা স্কুল থেকে ফিরতে দেরী করছে তাদের মা-বাবা উদ্বিগ্ন হয়ে ছটফট করতে থাকতো। সন্ধ্যা হতে না হতেই বন্ধ হয়ে যেতো সমস্ত বাড়ির দরজা জানালা। যেসব তীর্থযাত্রীদের ধর্মশালায় আশ্রয় নেওয়ার মতো সৌভাগ্য হতো না—ধর্মশালার বারান্দায় তাঁরা গায়ে গা লাগিয়ে ভয়ে মরার মতো পড়ে থাকতেন। ওই আট বছর গাড়োয়াল হিমালয়ে রুদ্রপ্রয়াগের চিতা ছিল সন্ত্রাসেরই নামান্তর’।
তৎকালীন বৃটিশ সরকার এই নরখাদক চিতাকে মারার জন্য প্রচলিত উপায়ের বাইরে বেরোতে বাধ্য হয়েছিল। মড়ির মধ্যে পটাশিয়াম সায়ানাইড, আর্সেনিক কিংবা স্ট্রিকনিনের মতো তীব্র বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। চিতাটি এই বিষ মেশানো মাংস খেয়েও ছিল, কিন্তু মরে নি! চিতাটিকে ধরবার জন্য বিশেষ ধরণের লোহার ‘ট্র্যাপ’ ব্যবহার করা হয়েছিল। চিতাটি ধরা পরে—কিন্তু ট্র্যাপ ভেঙে পালিয়ে যায়। জিম করবেট-সহ আরও অনেক শিকারীকে চিতাটিকে মারার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাও ব্যর্থতার মুখ দেখে।
আট বছরের মধ্যে তিন খেপে নরখাদকটিকে মারার চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন জিম করবেট। এর মধ্যে দু’বার তাঁর নিজের জীবনই বিপন্ন হয়েছিল নরখাদকটির কারণে। একবার একটা পাহাড়ের উপরে চিতাটির জন্য টোপ হিসাবে একটি ছাগল নিয়ে উঠেছিলেন করবেট এবং তাঁর বন্ধু ইবটসন। কিন্তু পাহাড়ের উপরে মাচা বাঁধার জন্য উপযুক্ত কোনো গাছ না পাওয়ার জন্য নেমে আসতে বাধ্য হন। নেমে আসার সময় করবেটের হাত ফসকে ছাগলটা পালিয়ে যায়। করবেটের ভাষায়, ‘ছাগলটা পালিয়ে যাওয়ার পরে নিরাশ হয়ে আমি আর ইবটসন নেমে আসছি—হঠাৎ মনে হলো, একটু নীচে পাথরের ধাপের উপর সাদা মতো কি একটা পড়ে রয়েছে। কাছে গিয়ে দেখলাম, আমারই ছাগলটা, গলায় চারটে দাঁতের দাগ স্পষ্ট। নরখাদকটার কাজ! মিনিটখানেক আগেই মেরেছে—মাংস পেশী এখনও কাঁপছে। খাওয়ার জন্য মারেনি—মৃতদেহটাকে আমার ফেরার রাস্তায় ফেলে আমাকে একটা মেসেজ দিতে চেয়েছে—‘ছাগলটাকে খুঁজছিলে তো, দিয়ে গেলাম, তবে সন্ধ্যা হয়ে আসছে, দেখা যাক তোমাদের দুজনের মধ্যে কে জীবিত অবস্থায় ফিরতে পারে!’ তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পাথরে ধাক্কা লাগিয়ে লন্ঠনটাকে ভেঙে বসলো ইবটসন। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে—আমার পকেটে একটা মাত্র দেশলাই বাক্স। কয়েক পা করে এগোচ্ছি, আর একটা করে দেশলাই কাঠি জ্বেলে চারদিকে ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছি—এইভাবে প্রায় এক মাইল হেঁটে একটা কুঁড়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বন্ধ দরজায় পিঠ দিয়ে বসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ছিলাম আমরা। পরদিন ভোরে বেরিয়ে পায়ের ছাপ দেখে বুঝেছিলাম, অন্ধকারে চিতাটা আমাদের অনুসরণ করেছিল’।
আরেকবার মরিয়া হয়ে চিতাবাঘটার আসা যাওয়ার রাস্তায় একটা পাথরের উপরে রাইফেল নিয়ে বসেছিলেন করবেট। সন্ধ্যা হওয়া মাত্রই শুরু হয় ঝড় বৃষ্টি—জলে ভিজে অকেজো হয়ে যায় রাইফেল। নিরুপায় হয়ে ঝড় বৃষ্টি এবং অন্ধকারের মধ্যেই হাতে একটি আফ্রিদি ছোরা ধরে পায়ে হেঁটে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌছান করবেট। পরদিন বৃষ্টি ভেজা মাটির উপরে চিতাটার পায়ের ছাপ দেখতে পান তিনি—পুনরায় অনুসরণ। করবেট লিখেছেন, ‘এতো ভয় আমি কোনদিন পাইনি’!
ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা। করবেট লিখেছেন, ‘তবে কি গ্রামবাসীদের কথাই সত্যি? সত্যিই কি ওটা একটা অশুভ আত্মা!—যাকে মারা যায় না? তবে কি গাড়োয়ালবাসীদের তাঁদের ভবিতব্যের উপর ছেড়ে দিয়ে আমাকে চলে যেতে হবে? আমার হিসাব বলছে গোলাবরাই গ্রামের পাশের রাস্তাটা চিতাবাঘটা পাঁচদিন অন্তর পার হয়। ঠিক করলাম, রাস্তার পাশের বড় গাছটার উপর আমি পরপর দশ রাত কাটাবো। এই দশটা রাতের মধ্যে যদি আমি সফল না হতে পারি, তাহলে সরকারকে জানিয়ে দেবো যে আমি পারলাম না। অন্য কোনো শিকারী এবারে আমার জায়গা নিতে পারে’।
মাচার উপরে কেটে গেল করবেটের দশটা রাত—চিতাটা এলো না। একাদশ দিনের দিন সকালে ইন্সপেকশন বাংলোয় বসে করবেটের মনে হলো—‘আর একটা রাত—আর একটা রাত বসবো’।
পাঠক—এরপরের ঘটনা যে কোনো থ্রিলারের ক্লাইম্যাক্সকে হার মানিয়ে দেবে। করবেট বলতেন, ‘জঙ্গলের মধ্যে বন্দুকের ট্রিগার টানার চাইতে ক্যামেরার শাটার টিপতেই আমি বেশী পছন্দ করি’। আমার ব্যক্তিগত মত এই যে করবেটের আঙুল ট্রিগারে যেমন স্বচ্ছন্দ ছিল—কলমেও ততোটাই স্বচ্ছন্দ ছিল। তাই এই ঘটনার শেষটা করবেটের কলমের মাধ্যমেই আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
‘আমাকে মাচায় তুলে দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে ইবটসন চলে গেল। একটু বাদে দেখি পণ্ডিত এক বালতি দুধ নিয়ে দ্রুত পায়ে ধর্মশালার দিকে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করায় বললেন, তাঁর ধর্মশালায় প্রায় দেড়শো তীর্থযাত্রী এসেছে। নরখাদকটার কথা বলার পরেও তাঁরা এখান থেকে নড়তে চাইছেন না। পণ্ডিতকে বললাম, তীর্থযাত্রীরা যেন সাবধান থাকেন, মন বলছে নরখাদকটা আশেপাশেই রয়েছে’।
‘আমার গাছ থেকে একটু দূরে একজন কুলি তাঁর দুটো কুকুরকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে কাঁটা ঝোপ দিয়ে তৈরী করা বেড়ার ভিতরে। কাঁটা ঝোপগুলো বেশ উঁচু। চিতার পক্ষেও পার হওয়া মুশকিল’।
‘একটু বাদে অন্ধকার নামলো। কোথাও কোনো শব্দ নেই। পণ্ডিতের ধর্মশালায় তীর্থযাত্রীদের চাপা গলায় কথাবার্তা কানে আসছিল। একটু রাত বাড়তেই সেটা বন্ধ হয়ে গেল। রাত ন’টা নাগাদ ধর্মশালা থেকে একটা লোক লন্ঠন হাতে বেরিয়ে এলো। সে রাস্তা পার হলো। মিনিটখানেক পরে পুনরায় ধর্মশালার ভিতরে গিয়ে ঢুকলো’।
‘লোকটা ঢুকে যাওয়া মাত্রই হঠাৎ কুলির কুকুরদুটো রাস্তার দিকে মুখ করে তারস্বরে ডাকতে আরম্ভ করল। আমার মনে হলো কুকুরগুলো চিতাটাকে দেখতে পেয়েছে। কোনো ঝোপের মধ্যে বসে চিতাটা নিশ্চয়ই লোকটাকে দেখেছে। এবারে ধীরে ধীরে ধর্মশালার দিকে এগোচ্ছে’।
‘কিছুক্ষণ পরে কুকুর দুটো চুপ করে গেল। চিতাটা বোধহয় ওদের দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে। আমার গাছের নীচে বাঁধা ছাগলটাকে একটা জমাট বাঁধা অন্ধকারের মতো দেখতে লাগছে। আমার রাইফেলে টর্চ বাঁধা। বুড়ো আঙুল টর্চের বোতামের উপর রেখে আর তর্জনী ট্রিগারের উপর রেখে ছাগলটার দিকে তাক করে নিশ্চল হয়ে বসে আছি। মনের ভিতর ঝড় চলছে। কাকে টার্গেট করছে চিতাটা? ছাগলটাকে নাকি তীর্থযাত্রীদের মধ্যে একজনকে?’
‘হঠাৎ মনে হলো গাছের নীচে কে যেন দৌড়ে গেল…ছাগলটার গলায় বাঁধা ঘন্টা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। টর্চ জ্বালতেই দেখলাম আমার রাইফেলের ‘মাছি’ চিতাবাঘটার কাঁধে স্থির হয়ে আছে। রাইফেলের নল এক ইঞ্চি না নাড়িয়ে ট্রিগার টেনে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে টর্চ নিভে গেল। ব্যাটারি শেষ নাকি যান্ত্রিক গোলযোগ বুঝতে পারলাম না। আমার গুলির ফল কি হলো সেটা বোঝারও আর কোনো উপায় রইলো না। আমার রাইফেলের আওয়াজ পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল। পণ্ডিত একবার দরজা খুলে জিজ্ঞাসা করলেন যে আমার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি না। আমার স্নায়ুর উপরে এতো চাপ পড়েছিল যে উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না। কোনো উত্তর না পেয়ে পণ্ডিত তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিলেন। অন্ধকারের মধ্যে ছাগলটার গলায় বাঁধা ঘণ্টার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। জীবিত আছে। ঘাস খাচ্ছে’।
‘ভোরের আলো ফোটার পরে গাছ থেকে নেমেই দেখলাম রাস্তার পাশের পাথরটায় রক্তের চওড়া দাগ। এতো রক্ত! উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে রক্তের দাগ অনুসরণ করতে করতে এগিয়ে চললাম। নরখাদকের পিছু নেওয়ার সময় যে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়, মনে হলো সে সবের আর কোনো প্রয়োজন নেই। তার খেলা শেষ হয়ে গেছে! রাস্তা পার হয়ে একটা বড় গর্ত। দেখলাম সেই গর্তে চিতাটা পরে রয়েছে। শেষ ঘুমে মগ্ন!’

‘দিনের পর দিন ব্যার্থ হতে হতে আমিও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যে গ্রামবাসীদের কথাই হয়তো ঠিক। এটা আদৌ কোনো চিতা নয়—একটা অশুভ আত্মা। যার শরীরটা চিতার, মাথাটা পিশাচের—যাকে মারা যায় না। বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যে আমাকে দিনের পর দিন ব্যার্থ হতে দেখে নরখাদকটা পৈশাচিক উল্লাসে মাটিতে গড়াগড়ি দেয় এবং কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে আমার গলায় দাঁত বসানোর আশায় ঠোট চাটে। আমাদের দু’জনের একে অপরকে পরাজিত করবার চেষ্টার শেষ হলো আজ। আমাদের দু’জনের ব্যক্তিগত দেনা পাওনার হিসাব মিটিয়ে দিয়েছে আমার রাইফেলের একটি মাত্র বুলেট’।
‘এ কোনো পিশাচ নয়—একটা প্রকাণ্ড চিতাবাঘ। এর একমাত্র অপরাধ—এ মানুষের রাজত্বে অনধিকার প্রবেশ করেছে। মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে। কিন্তু এটাও ঠিক—সে এই কাজ শখ করে করেনি—করেছে নিজের পেট ভরানোর জন্য, নিজের প্রাণ রক্ষার তাগিদে’।
বিংশ শতাব্দীর প্যানডেমিক ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ প্রকৃতির নিয়মেই একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিল। একবিংশ শতাব্দীর প্যানডেমিক কোভিড-১৯ ও একদিন প্রকৃতির নিয়ম মেনেই বিদায় নেবে। বিংশ শতাব্দীর মারক প্যানডেমিক ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ জন্ম দিয়েছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচাইতে কুখ্যাত নরখাদকের। একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবী সবুজ হারিয়েছে, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, নরখাদক চিতাবাঘ আর জন্ম নেয় না। তাহলে কোভিড কি ধরণের ছাপ ছেড়ে যেতে চলেছে? আরও বেশী অর্থনৈতিক মন্দা? আরও বেশী বেকারত্ব? আরও বেশী নারীপাচার? আরও বেশী শিশুপাচার? আরও বেশী ধর্মান্ধতা? এর উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে যে ধরণের ছাপই কোভিড ছেড়ে যাক না কেন, মানুষ সেই বিপদকেও কাটিয়ে উঠবে বলেই আমার বিশ্বাস। ‘অশুভ আত্মা’ রুদ্রপ্রয়াগের নরখাদক চিতাকেও কিন্তু শেষ অবধি গুলি খেয়েই মরতে হয়েছিল।
যে গাছের উপরে তৈরী মাচায় বসে জিম করবেট নরখাদক চিতাকে গুলি করেছিলেন, সেই গাছ এবং সেই মাচা আজও আছে। যেখানে চিতাবাঘটির মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল সেই স্থানটিও সরকার সংরক্ষণ করেছে, জিম করবেট এবং ১২৫টি মানুষ খাওয়া সেই দুর্ধর্ষ নরখাদককে মানুষ যাতে না ভুলে যায় এই উদ্দেশ্যে।
নরখাদকটি যে আসলে সত্যিই চিতাবাঘ—কোনো অশুভ আত্মা নয়, গাড়োয়ালের মানুষের কাছে সেটা প্রতিপন্ন করবার জন্য চিতাটির মৃতদেহ ইন্সপেকশন বাংলোর বারান্দায় একদিন রেখে দিয়েছিলেন করবেট। সারাদিন ধরে দলে দলে মানুষ চিতাটিকে দেখতে এসেছিল। করবেট লিখেছেন, ‘আমার ভারতের গরীব মানুষেরা কৃতজ্ঞতা জানাতে কখনও খালি হাতে আসে না। একটি ফুল বা নিদেনপক্ষে ফুলের একটি পাপড়ি হাতে করে নিয়ে এসে অঞ্জলির মতো করে গ্রহীতার পায়ে ঢেলে দেয়। সেদিনের বিকেলের মতো অভিজ্ঞতা আমার কোনদিন হয়নি। ‘আমাদের একমাত্র ছেলেকে খেয়েছে শয়তানটা; আমরা বুড়ো হয়েছি, ঘর খাঁ খাঁ করছে’—‘আমার স্ত্রীকে খেয়েছে এটা; বাচ্চাটা ছোট, জানিনা কি করে ওকে সামলাবো’—‘আমার ছেলেটা রাতে অসুস্থ হয়ে পরে; চিতাবাঘটার ভয়ে কেউ ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চায়নি, ভোর রাতে ছেলেটা মারা যায়’—এমনই কতো মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম সেদিন। পায়ের চারদিক ফুলে ফুলে ভরে যাচ্ছিল—কিন্তু চোখও শুকনো ছিল না’।