২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. সহিদুল ইসলামের পরিচয়পত্র গ্রহণকালে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো সুগভীর করতে একযোগে কাজ করার বিষয়ে তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা কেবল আনুষ্ঠানিক নয় বরং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর অনেক আগে থেকে পরিচয়ের সংযোগকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন আমেরিকায় ক্ষমতায় আসার পরে অনেকেই মনে করেছিল জলবায়ুর ক্ষতিকর দিক থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ঠিক তাই হয়েছে। জানুয়ারি (২০২১) মাসে বাইডেন আমেরিকাকে ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে যে নীতি গ্রহণ করেছেন তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণে জলবায়ু সম্পর্কিত প্যারিস এগ্রিমেন্ট গত চার বছর স্থবির হয়েছিল। এতে কেবল আমেরিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি, বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাইডেন সরকারকে ৩০ ভাগ সরকারি জমি ও পানি আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সংরক্ষণ করার জন্যে বলেছে এবং তিনি একটি টাস্ক ফোর্স তৈরি করেছেন, যারা সরকারের পরিবেশনীতি অনুযায়ী গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমছে কি না তা দেখবেন।
বাইডেন অবশ্য আরও নতুন নতুন কমিশন করবেন, সরকারের মধ্যে যাতে তার পরিবেশবান্ধব নীতিগুলো বাস্তবায়ন হয়, এবং সেভাবেই কাজের সুযোগ বাড়ে; পাশাপাশি কয়লা খনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা, তাদের স্থানান্তরকেও সরকার সহায়তা দিতে পারে। আর এ লক্ষ্যে মার্কিন কংগ্রেস মি. বাইডেনের দুই ট্রিলিয়িন ডলারের ক্লাইমেট চেঞ্জ এজেন্ডা পাস করতে পারে। এই নতুন নীতি অনুসরণ করার ফলে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এদেশের বহু মানুষ বাস্তুত্যাগ করতে বাধ্য হয়। গৃহহারা, ফসলহারা মানুষের দিকে চেয়ে কাজ করার সুযোগ হবে বিশ্ব অঙ্গনে।উল্লেখ্য, গত এক দশকে শুধু ৭ লাখ মানুষ স্থানচ্যূত হয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমাদের অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশান যে হারে হচ্ছে, তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ এই মাইগ্রেশান ১৩ দশমিক ৩ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে কোভিড-১৯ অতিমারিতে বিপুলসংখ্যক কম আয়ের মানুষ তাদের জীবিকার পথ হারিয়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে, আবার উত্তরবঙ্গসহ বেশ কিছু স্থানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঢাকা শহরে কাজের খোঁজে এসেছে অনেক কৃষক। এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সহযোগিতা পাবে আমেরিকার কাছ থেকে।
মনে রাখতে হবে, গত নভেম্বর ২০২০ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত কমলা হ্যারিসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। জো বাইডেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার সাথে ৪৭তম ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন।বারাক ওবামা ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা সরকার ও বারাক ওবামার প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ ঘটে। ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে ওবামা প্রশাসনের ইতিবাচক ধারণা ছিল সবসময়। বারাক ওবামা এদেশের মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে ২০১৫ সালে প্রশংসা করেন।শেখ হাসিনা সরকারের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট হয়ে এদেশকে তিনি এশিয়ার টাইগার আখ্যা দেন। ওবামা সরকারের সময় ২০১৪ সালে সপ্তাহব্যাপী সফরকালে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহ-সভাপতিত্ব ২৬ সেপ্টেম্বর শান্তিরক্ষা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এবং রুয়ান্ডার রাষ্ট্রপতি পল কাগমে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা তুলে ধরেছিলেন। এদিক থেকে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শেখ হাসিনাকে ভালো করেই চেনেন ও জানেন। এই পরিচয়ের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে বাংলাদেশের ওপর।
আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের এখন সুসম্পর্ক। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সেই সাথে সহায়তার জন্য ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করে। সে সময় অবকাঠামোগত উন্নয়নেও সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শেখ হাসিনার শাসনামলে আমেরিকার অন্যতম প্রধান মিত্রে পরিণত হয় বাংলাদেশ। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ বিরোধী ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে এ দুই রাষ্ট্র বেশকিছু সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।ওবামা প্রশাসনের আন্তর্জাতিক উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং পরিবেশ উন্নয়নমূলক অনেক কাজে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিল। ২০১২ সালে রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যে একটি কৌশলগত চুক্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছর আগস্ট মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এজন্য প্রতি তিন থেকে চার মাস পর ‘ট্রেড এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম এগ্রিমেন্ট (টিকফা)’ এর ইন্টারসেশনাল সভা করার প্রস্তাব দিয়েছে।ওই সভায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের স্থগিতকৃত জিএসপি সুবিধা পুনরায় চালুর বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পূর্বে ঘোষিত বিভিন্ন দেশের জন্য মার্কিন জিএসপি সুবিধা প্রদান প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরে। পরর্বতী প্রকল্প চালু হলে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা প্রদানের বিষয় বিবেচনা করার সুযোগ আছে।
শেখ হাসিনা সরকার মনে করে, জো বাইডেনের সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, হেলথ প্রডাক্ট রপ্তানি, করোনাকালে তৈরি পোশাকের ক্রয় আদেশ বাতিল না করে ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য মেডিকেল সামগ্রী উৎপাদন, বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প কারখানা বাংলাদেশে রিলোকেশন, কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধি-সহ বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের তৈরি পণ্য সহজে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির বিষয়ে মার্কিন সরকারের সহযোগিতা পাবে। তবে দু’দেশের মধ্যে গত ১২ বছর ধরে সকল সহযোগিতামূলক কার্যক্রমই পরিচালিত হচ্ছে। কারণ এদেশে গণতন্ত্র আছে, আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এদেশের অবস্থান বিশ্বব্যাপী অভিনন্দিত। ২০১৬ সালেও বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পর সবচেয়ে বেশি মার্কিন সহায়তা লাভ করেছে।
নভেম্বরে জয়ী হয়ে জো বাইডেন নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যিনি অনৈক্য নয় বরং করোনা মহামারী এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অশান্তির মধ্যে পতিত নিজের দেশ ও বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করবেন বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের এই স্পিরিট বাংলাদেশকে একসঙ্গে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।দু’দেশের সম্পর্ক মানবিক বিশ্ব গড়ার পথে এগিয়ে চলেছে।
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, ইউজিসি পোস্ট ডক ফেলো এবং বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com