নারী নির্যাতন থেকে দলিত ও মুসলিমদের ওপর অত্যাচারে দেশে সব থেকে ওপরে রয়েছে এই রাজ্যের নাম। সেই রাজ্যেই করোনাকালে গঙ্গায় সারি দিয়ে ভেসেছে লাশ। কেবল তাই নয়, উন্নাওয়ের মিঞাগঞ্জ এলাকায় রাস্তার ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে করোনা টিকা। তার মানে কি কোনও করোনা টিকাই কোল্ড স্টোরেজে রাখা হয়নি, রাস্তার ধারে ফেলে রাখা হয়েছিল? অথচ করোনা ভাইরাসের টিকা না নিয়েও একের পর এক করোনা টিকা প্রাপ্তির মেসেজ পেয়েছেন সাধারণ মানুষ।
এদিকে কেন্দ্রের মোদী সরকার বলেই চলেছে, করোনা টিকাকরণে কোনও রকম গলদ তারা মানতে চান না। গোটা দেশে ১০০ কোটির টিকাকরণ শেষ বলে যেমন জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তেমনই সেই লক্ষ্যে এগোনোর জন্য সব রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মোদী সরকার এই বছরের মধ্যে দেশের টিকাকরণ প্রক্রিয়া শেষ করতে মরিয়া। কিন্তু উন্নাওয়ের মিঞাগঞ্জ এলাকার রাস্তায় ৩ হাজার করোনা টীকা পড়ে থাকার অভিযোগ যে বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশের যোগী সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
সরকারের গাফেলতির মুখ ঘুরিয়ে দিতে অবশ্য উত্তরপ্রদেশের কানহা গৌশালায় গোরুদের লাউডস্পীকারে ভজন শোনানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সে রাজ্যের হামিরপুর জেলার কানহা গৌশালায় এবার থেকে প্রতিদিন সকাল এবং সন্ধ্যায় লাউডস্পীকারে ভজন চালানো হবে। কারণ, গৌশালায় যদি গোরুদের ভজন শোনানো হয় তাহলে গোরুরা সেই সুরে সাড়া দিতে পারে।
গত কয়েক মাসে উত্তরপ্রদেশের এই পরিস্থিতিতে আগামী বছরের শুরুতে সে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। ভোটের কথা মাথায় রেখে রাজ্যের সার্বিক চিত্রপট হোয়াইট ওয়াস করতে গেরুয়া শিবির মেরুকরণকে হাতিয়ার করেছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে যোগী-শাহ যুগলবন্দীতে ইতিহাস ঘেঁটেঘুঁটে একশা। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পরে তাঁর সেনাপতি সেলুকাসকে যুদ্ধে হারিয়েছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। ভারতের ইতিহাস এতদিন এ কথাই বলে এসেছে। তা সত্ত্বেও কেন ইতিহাসে আলেকজান্ডারকেই মহান বলা হবে। ইতিহাসের পাতায় বরাবরই সম্রাট আলেকজান্ডার বীরযোদ্ধা৷ কেবল তাই নয়, তিনি গ্রীক সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির মূল কারিগর।

তিনি ভারতবর্ষের একাংশ জয় করেছিলেন। তবে বেশিদিন এ দেশের জলবায়ু তার সহ্য হয়নি। মুলতান জয়ের পর প্রধান সেনাপতি সেলুকাসকে দায়িত্ব দিয়ে গ্রিসের পথে রওনা দেন। অনেক রাজ্য আর অনেক দেশ জয় করে তিনি ফিরে যেতে চান মায়ের কোলে। কিন্তু যাত্রা পথের মাঝখানে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যাবিলনের রাজপ্রাসাদে। আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৩ নাগাদ। আর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হন আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর।
কিন্তু ইতিহাসে যাই থাক না কেন, তাকে সটান নস্যাৎ করে দিলেন এবার যোগী। বিজেপির ওবিসি মোর্চা আয়োজিত সামাজিক প্রতিনিধি সম্মেলনে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বন্দনায় বললেন, ‘ইতিহাসবিদরা কখনই সম্রাট অশোক কিংবা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের কৃতিত্বের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখেননি। উলটে তাঁরা আলেকজান্ডারকে নিয়ে মাতামাতি করেছে। ওই আলেকজান্ডারকে তো চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য পরাস্ত করেছিলেন।
যোগীর ইতিহাস শুনে ইতিহাসের শিক্ষক-পড়ুয়া থেকে শুরু করে সাধারণ ইতিহাস জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদেরও ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। পাশাপাশি চমকে উঠেছেন বিরোধী রাজনীতিকেরাও। বুঝতে অসুবিধে হয় না চন্দ্রগুপ্ত হিন্দু রাজা বলেই তাঁকে আলেকজান্ডারের সঙ্গে যুদ্ধে জিতিয়ে দিয়ে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেছেন। ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী আলেকজান্ডার যখন ভারত থেকে বহু দূরে মারা যান, সেই সময় চন্দ্রগুপ্ত নাবালক। অনেকেই যোগীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করছেন, যোগীর ‘ইতিহাস জ্ঞান’ নিয়ে নেটমাধ্যমও তোলপাড়। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করা বা হিন্দুত্বকরণের চেষ্টা তো যোগীরা বহু দিন ধরেই করে আসছেন। যাদের কেউ একজনও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনদিন অংশ নেন নি, বরং ব্রিটিশদের পা চেটে তাদের কাছে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, তাদেরও বীর বলে প্রচার করতে মরিয়া বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার।
কেবল যোগী কেন, তাঁর এই কাণ্ডজ্ঞানহীন ইতিহাস বর্ণনার ঠিক আগের দিনই উত্তরপ্রদেশে হিন্দি ভাষা প্রচারের এক অনুষ্ঠানে রামায়ণ প্রসঙ্গে অদ্ভুতুড়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রামায়ণ অনুযায়ী, রাজধর্ম শেখার জন্য রাম ভাই লক্ষ্মণকে পাঠিয়েছিলেন মৃত্যুশয্যায় শায়িত রাবণের কাছে। যোগী বা মোদীর মতোই পান্ডিত অমিত শাহ বললেন, রাজধর্ম শিখতে রাম ভরতকে পাঠিয়েছিলেন মৃত্যুশয্যায় থাকা রাবণের কাছে। আসলে রামায়নের অআকখ না জানলেও রামকে সামনে রেখেই বিজেপি ভোটপ্রচার করে, মিথ্যে হিন্দুত্বের প্রচার করে। তাঁরা ভুল বা মিথ্যে বললেও তাদের লজ্জা সঙ্কোচ বোধ হয় না। কারণ শিক্ষা-স্বাস্থ্য-আইনশৃঙ্খলা-কর্মসংস্থানের মতো জরুরি বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে তো তাদের মুখ পুড়বে। তাই সঙ্ঘের নির্দেশ অনুযায়ি ইতিহাস বিকৃত করা মিথ্যে হিন্দুত্বের প্রচার চালানো।