সকাল সকাল তীব্র সাইরেন বাজিয়ে দু-দুটো অ্যাম্বুলেন্স গলির মুখে এসে দাঁড়াল। ছোটো গলির বিবর্ণ বাড়িগুলোর কয়েকটা জানলা খুলে গেল। কয়েকজোড়া কৌতুহলী চোখ উঁকি মারল। লুঙ্গির গিঁট কষে বাঁধতে বাঁধতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল আরো দুএকজন।
— কি হয়েছে? কি হয়েছে? কার কি হলো? কে অসুস্থ? দুটো অ্যাম্বুলেন্স কেন?
ততক্ষণে পুলিশের দলবল বক্সীদের দরজা ভাঙতে শুরু করে দিয়েছে। গলিতে বাড়ছে উৎসাহী লোকের ভীড়।
— সরুন, সরুন। আমাদের কাজ করতে দিন।
হুইসিল বাজালো ছোকরা পুলিশ। স্ট্রেচারে করে বাড়ির মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল তিনটে পরপর অচৈতন্য দেহ। মা দীপালি বক্সী (৬২), ছেলে অর্ণব বক্সী (৩৭), মেয়ে অর্পিতা বক্সী (৩৫)।
অ্যাম্বুলেন্স চলে যাবার পর জটলা আরো ঘনীভূত।
— কি হয়েছিল বক্সীদের? ইদানিং ওদের একদম দেখা যেত না তো? বাড়ি থেকে বেরোতোও না। সুইসাইড করল না কি?
— কবেই বা ওদের দেখা যেত! পাড়ার কারোর সঙ্গেই তো মেলামেশা ছিল না! অসামাজিক, অহংকারী লোক ছিল সব। ছেলেটার ঐ বাইকচাপা বন্ধুটাই মাঝেমধ্যে আসত। আজ যে এসেছিল, ঐ না?
— হ্যাঁ ঐ। ওর নাম মৃন্ময়। মৃন্ময় নাকি খানিকটা আঁচ করে পুলিশকে খবর দেয়।
অ্যাম্বুলেন্সের পিছনে বাইকে যেতে যেতে মৃন্ময় ভাবছিল, ইস্ বড্ড দেরি করে ফেললাম বোধহয়। দিন পনেরো আগে যখন বক্সীকে ফোন করলাম, তখনি যে ওর গলায় বিষণ্ণতার সুর।
— কেমন আর আছি? ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছি!
— কি যে সবসময় বাজে কথা বলিস। তোর মুখে মরা ছাড়া আর কোনো কথা নেই। কি হোলো তোর? একদিন চল বসি।
মৃদু হেসে ফোন কেটে দিয়েছিল অর্ণব। তারপর কাজের চাপে আর যোগাযোগ করা হয়নি। কাল রাত থেকে বক্সীর ফোন নীরব। ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমে রাত কেটেছে মৃন্ময়ের। ইদানিং বক্সীর ব্যবহার বড় অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। ঐরকম ব্রাইট একটা ছেলে যেন কেমন গুটিয়ে যাচ্ছিল নিজের মধ্যে। মৃন্ময় একমাত্র যোগাযোগ রাখার চেষ্টা রাখত। মাঝেমধ্যে কথা হত ছোটবেলার দুই বন্ধুর।
— রোববার করে ধাপিতে আয় না বক্সী। ঐদিন আমরা সবাই একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। চুটিয়ে আড্ডা দিই। প্রাণ খুলে খিস্তিখাস্তা করি। তুই শালা সেই বইমুখো ইস্কুলের ফার্স্ট বয় রয়ে গেলি! আর বেরোতে পারলি সেই দুনিয়া থেকে।
— আমাকে ছেড়ে দে রে। আমি বেকার, বাতিলের দলে। আমি গেলে তোদের ভালো লাগবেনা।
— যত বাজে কথা। তুই আয় তো!
কোনো রবিবারেই বন্ধুদের আড্ডায় আসেনি অর্ণব। গতকাল রাতে অর্ণবের ফোন সমানে বলেছে সুইচড্ অফ। ভোর হতেই তাই ছুটে এসেছে মৃন্ময়। দরজা ধাক্কা দিয়েছে। কোনো সাড়া পায় নি। শেষমেশ থানায় দৌড়ে গেছে। দরজা ভাঙতেই দেখে মা, ছেলে, মেয়ে তিনজন পড়ে আছে তিনটে বিছানায়। কোনো সাড় নেই। কে জানে কি হবে?
বাইকের স্পীড বাড়াল মৃন্ময়।
নিজের কাজকর্ম ফেলে অনেক দৌড়ঝাঁপ করল। ছোটোবেলার বন্ধু অর্ণবকে অনেক চেষ্টা করেও আর বাঁচাতে পারল না। কাকিমা আর অর্পিতা এখনো মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ডাক্তার বললেন, দীর্ঘদিন অনাহারে নাকি এদের এমন হাল! কি করে! সব কিছু কেমন যেন ওলোটপালট হয়ে যাচ্ছে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মৃন্ময়ের। পয়সার অভাব থাকার কথা নয় বক্সীদের। গরীবের সন্তান মৃন্ময় বুঝতে পারত বক্সীরা যথেষ্ট স্বচ্ছল। কাকু রাইটার্সে উঁচুপদে চাকরি করতেন। কাকিমাও টিচার ছিলেন। তবে সবটাই ছিল কেমন যেন গোলমেলে। মৃন্ময়ের চারভাইবোনের সংসারে অর্থের অভাব থাকলেও আনন্দ ছিল। হৈ চৈ, আত্মীয়স্বজনের আসা যাওয়া লেগেই থাকত।
উল্টোদিকে বক্সীর বাড়িতে তাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলে চলে আসত মৃগাঙ্ক, প্রণব, অরুণাভ। বেশিক্ষণ গল্প করলে কাকিমা ডাক দিতেন,
— লাল্টু তুমি এবার ওদের যেতে বলো, অনেক আড্ডা দিয়েছ।
কখনো কাকু কাকিমার মুখোমুখি হলে মৃন্মযদের দেখে হাসতেনও না। পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন।
ক্লাসের ফার্স্ট বয় অর্ণব বক্সী সবসময় চাপে থাকত। নম্বর কম পাবার ভয়। ফার্স্ট পজিসন হারানোর ভয়। বাড়িতে মা বাবার অতিরিক্ত উচ্চাশা। কখনো সখনো দুর্বল মুহূর্তে অর্ণব মৃন্ময়কে বলে ফেলত,
— আমার ভালো লাগেনা এই জীবন। সবসময় কি ফার্স্ট হতেই হবে!
সদ্য কিশোর মৃন্ময় অত বুঝত না।
— কি যে বলিস? তুই এত ব্রিলিয়ান্ট! মাস্টারমশাইরাতো আমাদেরকে তোর মত হতে বলে।
জীবনের সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া হয়ে ওঠে না অর্ণবের। আই আইটি না পাওয়ায় অর্ণব ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়। তারপরে তার জীবন-কেরিয়ার সব ধোঁয়াশা।
ততদিনে মৃন্ময় কোনোরকমে কলেজের গন্ডী পেরিয়েই জীবনযুদ্ধে নেমে পড়েছে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে দিনরাত এক করে নিজের ব্যবসাটা কোনরকমে দাঁড় করিয়েছে। ক্লাসের ফার্স্টবয় বন্ধুকে সে ভোলেনি। মাঝেমধ্যে ফোন করে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আগেকার মতই গল্পগুজব করে। তবে চাকরিবাকরি, বাড়ির কথা বললেই কেমন গুটিয়ে যায় অর্ণব। ছোটোবেলার বন্ধুকে দাগা দিতে ভালো লাগে না মৃন্ময়ের।
— কোন হতাশায় নিজেকে এমন করে শেষ করে দিলি বক্সী। আমিও কেন তোকে বুঝতে পারলাম না। বড্ড দেরি করে ফেললাম রে!
অনুশোচনায় ভোগে মৃন্ময়।
— কাকিমা আর অর্পিতাকে আমি যেমন করে হোক সারিয়ে তুলবই দেখিস।
বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে দীপালি আর মেয়ে অর্পিতা। পরম আত্মীয়ের মত মৃন্ময় তাদের পাশে থেকেছে। তাদের দেখাশোনা, ভালোমন্দের ভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। যে বক্সীবাড়ির দরজার ভেতরে ঢোকার অধিকার ছিল না মৃন্ময়ের, এখন সেখানে তার অবারিত দ্বার। কাকিমা, অর্পিতাও অনেকটা সহজ হয়েছে। বক্সীর কাছে শুনেছে অর্পিতাও ভালো স্টুডেন্ট ছিল। ওর একটা কাজ যোগাড় করে দিতে পারলে ভালো হয়। নিদেন পক্ষে দুটো টিউশানি।
এত আসা যাওয়া করলেও দীপালি কোনোদিন মৃন্ময়কে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেন নি। সেদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
— তুমি বিয়ে করেছ মৃন্ময়? ছেলেপুলে আছে?
মৃন্ময় সলজ্জে ঘাড় নাড়ল।
— হ্যাঁ কাকিমা। আমার ছেলের এই চার বছর হ’ল।
— একদিন সঙ্গে করে ওদের এনো না। দেখতে ইচ্ছে করছে ওদের।
মৃন্ময় বিহ্বল হয়ে পড়ল। বক্সীদের সদর দরজাটা বসন্তের এলোমেলো হাওয়ায় হঠাৎ খুলে গেল। অর্পিতা দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল। দীপালি মানা করলেন।
— থাক না। বেশ সুন্দর ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। যা গুমোট করেছিল। আশেপাশে কোথাও নিশ্চয়ই বৃষ্টি হচ্ছে।
সাবলীল গতিতে গল্প এগিয়েছে। শেষে একটু আলোর রেখা দেখা দিল। ভালো লাগলো।
আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানবেন। ????????
একটি অত্যন্ত সুন্দর ছোট গল্প। পাঠককে ভাবার অনাবিল অবকাশ দিয়ে শেষ হল। সার্থক এ সৃষ্টি…!
ভালো লাগল।