মাঝামাঝি এই গঞ্জটায় হাট সপ্তাহে দু-দিন। বুধবার আর রবিবার। বুধে ভিড় হয় বেশি। সপ্তাহের মাঝে কাছাকাছি হাট নেই বলে বাইরের বেপারীরা দল বেঁধে আসে। তাদের হইচই-এ ব্যস্ত থাকে হাটখোলা। মাদুর আর ছিট-কাপড়ের দোকানিদের জন্যও চলাফেরার জায়গা থাকে না। তুলনায় রবিবারটা খানিক হালকা। পরের দিন কাছে আর একটি হাট হওয়ায় লোকজনের চাপ কম হয় রবিবার।
এ দিকের এই হাটে উত্তর আর দক্ষিণের লোকের মেশামিশি। ন্যাজাট কালীনগর ছাড়িয়ে আরও দক্ষিণে যারা থাকে তারা ইছামতীর পথে কাঁকড়া আর খেজুরের গুড় নিয়ে আসে। আবার তেঁতুলিয়ার উত্তরে যারা, তারা সড়কপথে মাদুর আনে, ইঞ্জিন ভ্যানে ভরে আমের সময় আম, কখনও আনারস বা তরমুজ আনে দক্ষিণের বেপারীদের জন্য। এখানের হাটে তাই নোনা জলের ভাষা আর মিঠে জলের টান একাকার হয়ে থাকে।
হাটের খানিক দূরে রক্ষাকালীতলা। রক্ষাকালী এখানের জাগ্রত দেবী। তার সামনে কপালে হাত না ছুঁইয়ে এখানকার কেউই বড় গাঙে নৌকো ভাসায় না। বড় গাঙ বলতে ইছামতী। সেখানে নৌকো ভাসালে দু ভাটার শেষে তবে ছোট মোল্লাখালি। রক্ষাকালীতলায় প্রতি হাটের দিন বিকেলে ঘণ্টা বাজিয়ে পুজো হয়। পিতলের প্রণামীর থালায় খুচরো পয়সা কিঞ্চিৎ বেশি জমে ওই দুই দিন। বিয়ে করতে যাওয়ার আগে ছেলেরা গড় হয়ে একবার প্রণাম করে ওখানে। সন্তান না হলে মেয়েরা বটের নিচু ডালে সুতো দিয়ে ঢিল বেঁধে রেখে যায়। মেয়ে হলে পুরনো ঢিল খুলে ছেলের কামনায় আর একটি টিল বাঁধে পরের বছর।
রক্ষাকালীর পেছনে ভাঙা ইটের বাঁধানো চাতালটা খানিক আড়ালে। ওদিকটায় বা রক্ষাকালীর কাছে আলো ছিল না কখনও। তবে কিছু দিন হল ষাট পাওয়ারের ডুমের ব্যবস্থা হয়েছে। এলাকার যে-সব শৌখিন গাঁজাখোর সন্ধেবেলা খোল-করতাল পিটিয়ে কীর্তন গায় আর আটটা বাজলে কলকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, তাদের সৌজন্যে এই ব্যবস্থা। ওদেরই একজন সন্ধের পর ভুঁড়ির ওপর বাঁশ নাচাতে নাচাতে হাটের ইলেকট্রিক পোস্টে হুক মেরে দিয়ে যায়। তখন বড় গাঙ থেকে বাতাস হয় একটু একটু। রক্ষাকালীর মুখের সামনে সারা সন্ধে ছোট ছোট পোকা ফিনফিনিয়ে উড়ে বেড়ায়।
হারু পাল এখানে ভূসিমালের কারবারি। তিল কিংবা সরষে নতুন উঠলে বস্তা বস্তা কিনে পেছনের ছোট গুদামটায় ভরে রাখে। পরে বাজার চড়া পেলে দেখেশুনে ছাড়ে। কখনও দক্ষিণ থেকে আসা গুড়ের হাঁড়ি, সস্তায় পেলে তাও কিনে ভরে রাখে গুদামে। খাটো জামা পরা বছর পঞ্চাশেকের লোকটা নিজেই বসে গদিতে। গদির সামনের দিকে মুদিখানার ব্যবস্থা। সেখানে জিরে-হলুদের পাশাপাশি শ্রীমতি তরল আলতা ও বাচ্চাদের স্লেট-পেন্সিল পাওয়া যায়। কাজের ফাঁকে লোকটা গল্প করতে ভালোবাসে বলে আমার মতো দু-একজন আধবেলা কাজের লোক হাটের দিন ওর দোকানে এসে জুটে যায়।
চৈত্রের গোড়াতেই এবার চড়চড়ে গরম। তার মধ্যে সন্ধের মুখে ঝড়বাদল হয়ে গেল এক দিন। সেদিন আবার বুধবার, ভরা হাট। স্বপ্নে পাওয়া ওষুধ আর কাচের চুড়ি নিয়ে যারা ছড়িয়ে বসেছিল তাদের একেবারে ধোয়ামোছা অবস্থা। আমি মেঘের হাল দেখে বাজারটা গোড়াতেই সেরে রেখেছিলাম। হারু পালের গদিতে যখন উঠি তখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বাজার এবং হাটখোলা পুরো অন্ধকার, ঝুড়ি আর মালের বস্তা নিয়ে লোকজন ছুটোছুটি করছে এদিক-ওদিক। বার কয়েকের চেষ্টায় মোমবাতিখানা ধরিয়ে হারু পাল বলল, বিকেলের হাটখানা পুরো মাটি করে দিল গো। বলুন তো কম্পাউন্ডারবাবু, এসব ঝড়বৃষ্টি কি হাটের দিনে না দিলেই নয়!
গত হাটেও বিকেলে মেঘের আনাগোনা হয়েছে। বাতাস ছিল খানিকটা তবে বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু মেঘ দেখলে যা হয় আর কী। লোকজন আগে আগেই ফাঁকা হয়ে গেছে। সন্ধের মুখে হাট আর তেমন জমেনি। সেদিনও হারু পালকে এমনই মোমবাতি জ্বেলে দোকান সামলাতে হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ওই দোকান সামলানোই সার। হাটের কেনাবেচায় ভাঁটা পড়লে হপ্তা কারবারের অনেকটাই মাটি হয়ে যায়।
হারু পালের দোকান থেকে বেরোতে সেদিন আটটা। ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর বাতাস থামলে বেরোব ভাবছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হল না। আটটার সময় হাটখোলায় লোক নেই বললে চলে। দু-একটা কেরোসিন বা মোমের আলো জ্বলছে দূরে দূরে, তার মধ্যে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে লোকজন। যারা এদিক-ওদিক আটকে ছিল, লম্বা পা ফেলে তারাও বেরিয়ে পড়েছে বাড়ির পথে। আমি বাজারের ব্যাগ দুটো হাতে ঝুলিয়ে জামাকাপড় বাঁচিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
হাটখোলা থেকে হাসপাতাল প্রায় মাইল খানেক। হাসপাতাল বলতে একটা আউটডোর-নির্ভর স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কাছাকাছি লোকের মুখে হাসপাতাল হয়ে গেছে। হাটের এলাকা থেকে এই দূরত্ব অন্য সময় সুবিধার, বাজারের কাছে হলে আউটডোরে রোগীর ভিড় দেখতে হত না। কিন্তু এই ঝড়বাদলের রাতে এই পথটাই অনেকখানি মনে হল। আগে-পরে দু-এক জন যারা রয়েছে তারাও বাড়ি ফেরায় ব্যস্ত। ডেকে নিয়ে যে কথা বলতে বলতে যাব তার উপায় নেই। তাছাড়া সেই সব লোকজনও ছাড়াছাড়া। দু-একটা সাইকেল বারবার বেল বাজিয়ে অন্ধকার সামলে কোনও রকমে এগোচ্ছে।
দেন বাবু ব্যাগ দুটো আমার হাতে ছেড়ে দেন।
গলার স্বর চেনা বা অন্য কারও মতো। তবে নাম বা মুখ মনে করার উপায় নেই। একেবারে গা ঘেঁষে এসে কথা বলল লোকটা। আমার মুঠো ছুঁয়ে ব্যাগের হাতল ধরেও ফেলেছে প্রায়। …পালমশাইর দোকান ছেড়ে বেরনোর পর আপনারে দেখিছি, কাদাজলে একা একা হাঁটতেছেন। চলেন আপনারে হাসপাতালে পৌঁছে দে যাই।
অবিশ্বাসের ইচ্ছা থাকলেও দেখানোর সুযোগ পেলাম না। ব্যাগের হাতল ওর মুঠোয় চলে গেল। এমন গায়ে-পড়া লোক এই গ্রাম-দেশে কম নেই। ঝড়বাদল না থাকলেও এই লোক হয়তো আমার সঙ্গে যেত। তবু গলার স্বর হাতড়ে আমি তার মুখ ভাবতে থাকি। এত পরিচিত ভঙ্গিতে এসেছে যে চট করে নামও জিজ্ঞাসা করা যায় না। কথা বলানোর জন্য তাকে বলি, তা তুমি কি ওই পর্যন্ত যাবে না অন্য কোথাও?
না বাবু আমি যাব সেই ফতুল্লাপুর। নদীর চর। তারপর নদী পেরিয়ে তারাগুণিয়ার ঘাট।
তা এত রাতে ঘাট পার হওয়ার নৌকো পাওয়া যাবে? কথা চালু রাখার জন্য বাড়তি একটু এগিয়ে যাই আমি।
তা বাবু ভগমানের দয়ায় হাটের দিন বাড়তি ব্যবস্থা থাকে। মোটামুটি সবারে না নে লৈকো ছাড়ে না। তবে আগের হাটে সেও আমার ছাড়া হয়ি গেল।
কী করলে তখন?
কথা চালানোর প্রশ্ন রাখি ঠিকই, কিন্তু অন্য সন্দ এসে যায় মনে। আজ রাতে নৌকো না পেয়ে লোকটা হাসপাতালে এসে শুতে চাইবে না তো! সেবার এরকম বিপদে-পড়া একটা লোককে আশ্রয় দিয়ে হাসপাতালের পুরনো ঘড়িখানা হারাতে হয়েছিল। তাই নিয়ে নানা ঝঞ্ঝাট। সকালবেলা এসে ডাক্তারবাবুর বকাবকি। সেই থেকে যত বিপদে পড়ুক হাসপাতালে শুতে চাইলে পত্রপাঠ বিদায় দি তাকে।
লৈকো চলি গেলে অসুবিধে ঠিকই, তবে না পেলে কী আর করা! ঘাটের ওপর চালা মতোন আছে একখান, রোদে-বিষ্টিতি লোকে মাথা দেয়। চারটে মুড়ি খে আমিও শুয়ে যাবানি। ভগমানের ইচ্ছেয় রাত ঠিক পার হয়ি যাবে।
হাসপাতালের মুখটা এসে গিয়েছিল। ঘোষেদের আমবাগান ছাড়ালেই টিনে ছাওয়া লম্বা আউটডোর। ও পাশে বড় গাছের তলে কয়েকটা কোয়ার্টার। ঝড়েজলে আলো নেই বলে বাঁ দিকের পুরো জায়গাটা আঁধারের স্তুপ। হাসপাতালের শিরীষ গাছটায় দলে দলে জোনাকি। ঘরের কাছাকাছি এসে খানিকটা কৌতূহল হল লোকটার জন্য। বেশ মজার লোকই বটে। নৌকো পেলে ভগবান, না পেলেও তাই। ব্যাগ দুটো ওর হাত থেকে নিতে গিয়ে কায়দা করেই নাম জিজ্ঞাসা করলাম। তুমি তো নিতাই, তাই না?
না বাবু। চিনতি সামান্য ভুল হয়ি গেল। ওই নাম আমার বড় শালার, ইটিন্ডায় ছিট-কাপড়ের দোকান।
ও। তাহলে তুমি কে?
আমি হচ্ছে গে যোগেন্দ্র। তারাগুণের যে-কোনও লোক যোগেন বললি এক বারে চেনে। অনেক রাত হল বাবু, আমি এগোই। দেখি তিনি সামনে কোন ব্যবস্থা রাখলেন।
সামনে এগিয়ে গেল যোগেন। অন্ধকারে মিলিয়ে গেলও বলা যায়। জলকাদার মধ্যে ছপছপ করে কয়েকটা পায়ের শব্দ শোনা গেল অল্প দূর অবধি।
একটা মানুষ খানিক পথ এক সঙ্গে এল, নিজের হাতে ব্যাগ বইল আমার, তবে তার মুখ দেখা হল না। যদিও মুখ দেখায় কী বা এমন রয়েছে। বছর দশ তো হল এই এলাকায়। আউটডোরে ওষুধ গুনে গুনে কম মুখ তো দেখিনি। চোখ বুজে ভাবলে সব মুখই শেষ পর্যন্ত এক। যোগেনও না হয় মিশে থাকল সেই দলে।
ভিজে জামাকাপড় সামলে পকেট হাতড়ে চাবি বার করে খুলে ফেলি কোয়ার্টারের দরজা। তার পর দেশলাই ঠুকে মোমবাতির সলতে। বাইরে তখনও গাছের পাতায় জল পড়া আর বাতাসের শব্দ। যোগেন খেয়াঘাটে নৌকো পেল কিনা কে জানে।
পরের হাটে বিকেলের দিকে ঝড়বৃষ্টি আর নেই। হারু পালের দোকানে আড্ডা হল বেশ খানিক ক্ষণ। দক্ষিণে আমের চাহিদা বাড়ায় সেই হাটে আমের খুব আমদানি। ঝুড়ি ঝুড়ি আম এল চার দিক থেকে। তার ওপর সামনে জামাইষষ্ঠী। আমেরই উৎসব। আগের বার দেশ থেকে ফেরার সময় গিন্নি তারিখটা মনে করিয়েছে বেশ কয়েক বার…।
পরের বার দেশ থেকে এসে দেখি বাজার এলাকা বেশ জমজমাট। নদীয়া থেকে পুতুলনাচের দল এসে বসেছে। তাই নিয়ে মেতে রয়েছে লোকজন। হারু পালও দোকান বন্ধ করে প্রতি রাতে পুতুলনাচ দেখছে। ওদের টানাটানিতে আমাকেও এক দিন লোকজনের পিছনে বসে পড়তে হল।
হাসপাতালের সামনে এর মধ্যে একটা টিউবওয়েল বসানো হয়েছে। নতুন বসানো কল নিয়ে লোকজনের ধারণা অন্য। আশপাশের সব বাড়ি থেকে কলসি আর প্লাস্টিকের জারিকেনে জল নিতে আসছে মেয়েরা। সারা দিনই প্রায় রাস্তার কোণাটা জমজমাট।
এ-সবের মধ্যে যোগেনের কথাটা চলেই গিয়েছিল মন থেকে। তার মতো লোকের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই এদিকে আলাপ-পরিচয় হয়েছে। আমি তাদের তেমন চিনি না, তারা আমার অনেকখানি জেনে আছে। হাটতলায় বা বাসরাস্তার মুখে এমন এক-দু জনের সঙ্গে দেখা হয় প্রায়ই।
মাস ছয়েকের মাথায় আউটডোরে স্লিপ মিলিয়ে ওষুধ দিচ্ছি একদিন, ডাক্তারবাবু পাশের ঘর থেকে রোগী ছাড়ছেন, রোগাটে একটা লোক এসে দাঁড়াল আমার সামনে। সেও পাশের ঘরে ডাক্তারবাবুকে দেখিয়ে এসেছে। আমার হাতে স্লিপ দিয়ে বলল, চিনতি পারলেন বাবু?
ওযুধ নেওয়ার সময় খেজুর করার লোকের অভাব হয় না। এদের ধারণা, কম্পাউন্ডারের সঙ্গে দুটো কথা বললে ওষুধ হয়তো ভালো পাওয়া যায়। জানে না ওষুধের ভালোমন্দ ভাক্তারবাবুর কলমে। আমার কাজ গুনে গুনে বড়ি-ক্যাপসুল দেওয়া আর খাওয়ার নিয়ম বোঝানো। তাই এ-সব প্রশ্নে মুখ না দেখেই সায় দিয়ে যাই। লোকটার স্লিপ মেলাতে মেলাতে এ বারেও মাথা হেলিয়ে দিলাম।
আপনি বাবু চিনতি পারেননি। না দেখিই সায় দে দেলেন। অবশ্য আপনারই বা দোষ কী, ঝড়জলে আমার তো মুখ দেখতি পাননি।
স্লিপের নামটার দিকে তাকাই। যোগেন্দ্র দাস, বয়স আটচল্লিশ, গ্রাম তারাগুণিয়া। ওষুধ হাতে তুলে দিয়ে দেখি ছিপছিপে চেহারার লোকটা দরজায় ঠেস দিয়ে আমার মুখে চেয়ে হাসছে। থুতনির কাছে একটুখানি দাড়ি, পুরনো হয়ে যাওয়া নীল পাঞ্জাবি ঢলঢল করছে গায়ে। ওষুধ বুঝিয়ে বললাম, তাহলে তুমিই সেই লোক!
ওষুধ নিয়ে যোগেন পাঞ্জাবির পকেটে রাখে। থুতনিতে একটু আঙুল বোলায়। বলে, গেল হপ্তায়ও একদিন এসিছিলাম। সে অবশ্য ওষুধের জন্যে নয়, আপনার সঙ্গে দেখা করতি আসা। শোনলাম আপনি দেশে গেছেন। তা ভগমানের ইচ্ছেয় দেশের খবর ভালো তো সব!
যোগেনের কথায় আবার সেই ভগবান। আমার সেই ঝড়বৃষ্টির রাত মনে পড়ে। ঘাটে নৌকো পাওয়া না-পাওয়া দুয়েতেই তাকে স্মরণ করেছিল সে। হাসপাতালের আউটডোর সেদিন শেষ হওয়ার মুখে। ডাক্তারবাবুর ঘরেও রোগী তেমন নেই। একটা বাজলে আউটডোর-নির্ভর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঢিলেঢালা হয়ে যায়। আমাদের চার পাশটাও সেরকম। হাতের কাজ সারতে সারতে আমি দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো যোগেনের সঙ্গে কথা বলতে থাকি। ওই বলে বেশি, আমি শুনি আর ফাঁকে ফাঁকে কিছু কথা গুঁজে যাই।
ওর কথায় সেদিনই জানতে পারি, ও আগে ছিল দক্ষিণের লোক। ভান্ডারখালির ও দিকে কোথায় ঘর। সেখানে এখনও বাপ-মা-ভাই, ভাইয়ের বউ, নাকি অনেকখানি জমিজমাও। ওর কথায়, বছর দশেক আগে কী সে কী মনে হল, সেখান থেকে চলে আলাম। তার পর চলতে চলতে এই তারাগুণিয়া গ্রাম।
…জায়গাটা কেমন পছন্দ হয়ি গেল। ফাঁকা ফাঁকা বাড়িঘর। সামনে নদীর অত চওড়া একখান বাঁক। বাঁকের ধারে মন্দির দরগা সব পাশাপাশি। অন্ধকারে নদীর ঘাটে দাঁড়ালি ভগমানের বাতাস পাতাম বাবু।
যোগেনের কথায় কেমন আলাদা রকম টান। এখান থেকেই একটু ভিন্ন লাগে তাকে। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে বলে যায় কথাগুলো। অবশ্য তলেতলে এও ভাবি, আমার মন পেতে লোকটা মিলমিশের বুলি আওড়াচ্ছে না তো!
তা বাবু আপনি একদিন যাবেন তারাগুণের ঘাট। আমি এসে সঙ্গে কোর নে যাব। নিজির চোখে দেখি আসবেন সব। দ্যাখবেন মনটা কেমন হালকাপানা হয়ি গেল।
ফার্মেসি বন্ধ করে বাইরে বকুলগাছটার তলে এসে দাঁড়াই। এখান থেকে আমি কোয়ার্টারের দিকে যাব। অবশ্য ঘরে আমার কোনও তাড়া নেই। আরও কয়েকটা কথা বলা যায় যোগেনের সঙ্গে। ওকে বলি, তা তোমার সঙ্গে যে যাব, ঘরে তোমার লোকজন কে রয়েছে?
আরও একবার হেসে ফেলে লোকটা। লজ্জার সামান্য ছায়া পড়ে চোখে। বলে, যোগেনের ঘরে লোকের অভাব নেই বাবু। বউ রইয়েছে, সঙ্গে দুই মেয়ে। আপনারে পেলি তারাও দ্যাখবেন কেমন খুশি হয়।
ওর চোখমুখের এমন ভাব যে পারলে সেদিনই আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। ওর ঘরসংসার নিয়ে আরও একটু কৌতূহল দেখাই আমি। তা বিয়েটা তুমি এদেশে এসে করলে না দক্ষিণ থেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলে?
এইবার একটু গম্ভীর হয়ে যায় সে। মাথা নামিয়ে পায়ের দিকে তাকায়। বলে, সে এক বেত্তান্ত বাবু, সব খুঁটিনাটি আমারও মনে নেই। শুনতি চালি আপনারে সংক্ষেপে এট্টু বলি।
যোগেনের বিয়ের ব্যাপারটা মোটামুটি এই রকম। প্রথমে বিয়েসাদির তেমন ইচ্ছা ছিল না তার। ঘুরে ঘুরে বেড়াত। রাতে শুতো মন্দিরের চাতালে। গ্রামের লোকই উদ্যোগী হয়ে তার বিয়ে দিয়ে দেয়। যার সঙ্গে বিয়ে দেয় তার নাম শেফালি, কম বয়সের বিধবা, সঙ্গে বছর চারেকের এক মেয়ে। …তা আমি দ্যাখলাম সত্যিই ওরে দ্যাখবার কেউ নেই, তার ওপর বাচ্চাডা ওরম ফুটফুটে। পাশে না দাঁড়ালি মা-মেয়ে দুজনেই হয়তো পাচার হয়ি যাবে। গ্রামের লোকও আমারে সবাই বুঝোল।
তা তুমি যে দুই মেয়ের কথা বললে! আমার আগ্রহ ক্রমে বেড়ে উঠতে থাকে।
আবার হাসি যোগেনের চোখে। আবার লজ্জার আভাস। …ছোট মেয়েডা হইয়েছে আমাদের বে-র বছর দুইর মাথায়। এখন তার তিন বছর। আমার এক ফালি উঠোনে দুই বুনি একসঙ্গে খেলে বেড়ায়। আমি চরের জমিতে থাকলি দুই জনায় ভাত নে আসে।
আউটডোরের পর বকুলতলায় দাঁড়িয়ে আমার সত্যি অবাক হওয়ার পালা। কার্তিকের দুপুরের রোদ খুব বেশি চড়া হতে পারেনি। হাসপাতাল ছাড়িয়ে যে ফাঁকা মাঠ সেদিক থেকে ভেসে আসছে ঘুঘুপাখির ডাক। বাতাসে ধুলো উড়ছে মাঝে-মাঝে। আমার সামনে নির্বিকার দাঁড়িয়ে যোগেন্দ্র দাস। যেন যে কথাগুলো বলছে সেগুলো ওর কথা নয়, আর কারও জীবনের গল্প। যেন ওর কিছুই আসে যায়নি এ-সবে।
সেদিন যোগেন আর বেশিক্ষণ থাকেনি। হাটখোলায় নানারকম কাজের কথা বলল। ঢ্যাঁড়সের বীজ কিনতি হবে, নিড়েনটায় ধার করতি দেব। বেরনোর সময় দুই বুন বায়না দে দেছে, সবুজ রঙের ফিতে লাগানো হাওয়াই নেওয়া লাগবে।
আমাদের হাসপাতাল ছাড়ালে অনেকখানি পথ টানটান। তার ও পাশে গাবতলা, পথ বেঁকে গেছে বাজারের দিকে। হাসপাতাল ছাড়িয়ে সোজা পথে হাঁটতে থাকে যোগেন। পাঞ্জাবির বুকে হাত বোলায় বার কয়েক। রোদ বাঁচাতে হাতে ঝোলানো ফাঁকা থলেটা এক সময় মাথায় তুলে নেয়।
ওকে বিদায় দিয়ে ঘরে ফিরে আসি আমি।
সে বছর বর্ষাকালটায় গোড়া থেকেই বৃষ্টি। জৈষ্ঠ্যের মাঝামাঝি অল্প-বিস্তর শুরু হয়েছিল। আষাঢ় মাসে একেবারে মুষলধারায় নামল। হাসপাতালের আশপাশে পুকুরগুলো ভরাট হয়ে গেল ক দিনেই। পেছনে মাইলের পর মাইল ধানক্ষেত জলভরা সাদা বিলের মতো হয়ে রইল। মাঝে হাটতলায় যাওয়া হয়নি বেশ কয়েক দিন। শুনলাম সে-সব দিনে হাটও তেমন জমেনি। নদীতে জল বাড়াবাড়ি হলে দক্ষিণ থেকে পাইকাররা তেমন আসে না। আর দক্ষিণের লোক না এলে এই সব উজানের হাট প্রায় ফ্যাকাসে হয়ে থাকে।
বর্ষা বেশি হলে জলের বাড়াবাড়ি নদীর এ দিক থেকে ও পারে বেশি হয়। ও দিকের গ্রাম বলতে লক্ষ্মীনাথপুর, তারাগুণিয়া এই সব। মাঝখানে শুনলাম ও দিকে চরের জমি সবই প্রায় জলের তলায়। নদীর কাছাকাছি যাদের বাড়ি তাদের কাউকে কাউকে নাকি সরেও যেতে হয়েছে। কারা নাকি দক্ষিণেও চলে গেছে। ওপারে জলের কথা শুনে যোগেনের কথাও মনে হয়। বউ-মেয়ে নিয়ে ঘোর বর্ষায় তার কী হাল কে জানে!
হাটের কাছে রক্ষাকালীতলায় গেঁজেলদের আড্ডাতে বর্ষায় কোনও রকম ভাঁটা পড়েনি। বৃষ্টিবাদলার মধ্যেও তারা যথারীতি এসেছে। কারেন্ট না থাকলে কোত্থেকে হারিকেন জোগাড় করে নামকীর্তন সেরেছে। তারপর যথারীতি কলকেয় টান। ওদের দলে দয়াপদ নামে রোগা গোছের লোক ছিল একটা। সে-লোকটা খোল পেটাত বেশি। বর্ষার মধ্যে এক সকালে দয়াপদ পটাং করে মরে গেল। সন্ধেবেলা তার দেহ রক্ষাকালীতলায় এনে গেঁজেলরা আছাড়িবিছাড়ি কাঁদল। তার পর দয়াপদকে কাঁধে করে নিয়ে পুড়িয়ে এল কেয়াতলার ঘাটে। হাটে দয়াপদ খয়ের-সুপুরি নিয়ে বসত বলে তার সম্মানে হাট বন্ধ থাকল এক দিন।
এই সব নানা ঘটনায় দিন কাটতে থাকে। বর্ষা কোনও দিন একটু কমে, কোনও দিন আগের চাইতেও বেড়ে যায়। হাটতলায় লোকের আনাগোনাও সেই সঙ্গে বাড়ে-কমে। হারু পালের দোকানে কোনও দিন যাই, কোনও দিন যাই না। পরপর দু হাট না গেলেই হারু পাল লোক মারফত খবরাখবর নেয়।
মাঝে বর্ষা কম হওয়ায় তারাগুণিয়ার লোক এল এক জন। লোকটা হারু পালের মাস-কাবারি খন্দের। নিজেও গুড় আর মাদুরের কারবার করেছে কিছু দিন। হাটের দিনে দেখা হত বলে খানিকটা মুখচেনা। পালমশাইর সঙ্গে ব্যবসার কথাবার্তা শেষ হলে তার কাছেই সেদিন যোগেনের খবর জানতে চাই।
প্রথমে যোগেনকে মনে করতে পারেনি লোকটা। হাতের ব্যাগ দুটো নামিয়ে খানিকক্ষণ ভেবেছে। পরে অবশ্য চেহারার বর্ণনা শুনে মিলিয়ে ফেলেছে চট করে। খানিকটা হতাশভাবে সে বলে, তার কথা আর বলবেন না দাদা। সে যে কী করে, কোথায় যায় তা তার বাড়ির লোকও জানে না। গ্রামের যে-সব গণ্যিমান্যি লোক, তারাও তারে পাগলা-যোগেন নাম দে দেছে।
অনেক দিন পর যোগেনকে মোটামুটি চেনে এমন একজনকে পাওয়া গেল। যোগেন সম্বন্ধে আরও খানিকটা জানতে চাই আমি। …কেন, গণ্যমান্যরা তাকে নাম দেবে কেন! যত দূর জানি সে তো কারও পেছনে লাগার লোক নয়!
এতে আরও উৎসাহ পেয়ে যায় লোকটা। দোকানের দরজায় নামিয়ে রেখেছিল যে ব্যাগ দুটো সেগুলো আরও ভিতরে এনে রাখে। তারপর আমাদের কাছ ঘেঁষে আসে। তা হলি শোনেন তার কীত্তি। একদিন ভরা মেঘে সন্ধেবেলা লৈকো নে একাই চলি গেল বড় গাঙের জলে। বর্ষার নদীতে নাকি ভগমান থাকেন….। গ্রামের সবাই তারে যত বুঝোয় ভগমানের জন্যি এত কটা মন্দির, শান-বাঁধানো চাতাল, নোনা গাঙে তিনি থাকতি যাবেন কেন, যোগেন ততই চরে-নদীতে ভগমান খুঁজি বেড়ায়। তা তেনারা ওরে পাগলা বলবে না তো বলবে কী!
হক কথা। ভরা বর্ষার নদীতে যে ভগবান খুঁজতে যায় তাকে গ্রামের লোক নাম দিয়ে দেবেই। কিন্তু যোগেন সম্বন্ধে নতুন করে ভাবনা হয় আমার। সংসারী হওয়ার পরও তার যে কেন এমন খেয়াল কে জানে। লোকটাকে বলি, তা হলে এখন কোথায় রয়েছে সে? গ্রামেই, নাকি গাঙের জলে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে!
লোকটার তখন আরও খানিক কথা বলার ইচ্ছা। …এখন ঠিক বলতি পারব না। মাঝে শোনলাম দক্ষিণে গেছে, কেউ বলে নিজি যায়নি, বউ-মেয়েরে পাঠায় দেছে ও দিকে। কারা নাকি যোগেনরে প্রাইমারি ইস্কুলে রিলিফির তাঁবুতেও দেখিছে।
সন্ধে হয়ে আসছিল। ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় লোকটা। ব্যাগ দুটো ঝুলিয়ে নেয় দুই হাতে। রাস্তার জলকাদার দিকে চোখ রাখে। যদিও তখনও তার যোগেন সম্বন্ধে কথা বলার উৎসাহ। আমরা টানাটানি করলে সে আরও কিছু বলে যেতে পারে।
লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার পর হারু পালও সেদিন যোগেনকে নিয়ে মুখ খোলে। বলে, মাথায় ঝামেলা তা আমি আগেই জানতাম। দেখেননি চোখগুলো কেমন ভাসাভাসা। আমার ন-কাকারও ছিল ওই তাল। তবে সে লোকটা বেশি দিন বাঁচেনি।
যোগেন সম্বন্ধে আমিই শুধু কথা বলি না কোনও। ওকে নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারি না। আমিই হয়তো চিনে উঠিনি ওকে।
মাঝখানে আমার বদলির প্রক্রিয়ায় কিছু বাতাস এসে লাগল। নদী, চর আর গুড়ের হাটের দেশে চাকরি হল প্রায় বছর দশেক। মাঝখানে অনেকবার তদ্বির করেছি বদলির। কিন্তু দেশের এই প্রান্ত এলাকার মানুষের কথা যেমন রাজধানীতে কম পৌঁছয়, এই গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে কম্পাউন্ডারের বদলির আবেদনও তেমনই। অনেক বার লিখেও কাজ হয়নি কোনও। শেষে এই পুজোর দিকে খবর পাওয়া গেল চাকরিতে ক জন নতুন লোক আসছে। তাদেরই কেউ আসায় এ বার আমার নিজের দেশে ফেরা হবে।
মাঝখানে সদর অফিসে যাতায়াত করতে হল ক দিন। সকালে বেরোলে কাজ সেরে ফিরতে সেই সন্ধে। খুব তাড়া করলে হয়তো বিকেলে ফেরা হত। এ রকমই এক বিকেলে সদর থেকে কাজ সেরে ফিরেছি, শুনি আউটডোরের বকুলতলায় কে একজন লোক দুপুর থেকে আমার অপেক্ষায় বসে। অনেক জিজ্ঞাসাতেও সে কাউকে কিছু বলেনি। দেরি হলেও আমার সঙ্গেই দেখা করতে চায়।
কোয়ার্টার থেকে চোখে-মুখে জল দিয়ে গেলাম বকুলতলায়। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ায় লোকটি। তার চেহারার ধরন বা ওঠা-বসা কিছুই চেনা লাগে না আমার। অথচ কাছে যেতে তার গলার স্বর বেশ স্বাভাবিক। ভালো আছেন বাবু, অনেক দিন আপনার সঙ্গে দেখা করতি পারিনি।
যোগেন। যোগেন্দ্র দাস। অনেক দিনের পুরনো সেই মানুষটি। গলার স্বর তার একই রয়ে গেছে। এমনকী কথা বলার সময় চোখের যে ভাব তাও। কিন্তু যা পাল্টেছে তা তার চেহারার ধরন। আগের চাইতে অনেক রোগা হয়ে গেছে সে। গলাটা লম্বা মতো, মাথার চুল হালকা হয়ে এসেছে। ওকে দেখে আমি বেশ অবাক হয়ে যাই। বলি, কী খবর তোমার! কোথায় হারিয়ে ছিলে এত দিন!
কুথাও না। আপনাদের ধারেপাশেই ছিলাম। যোগেন হাসে।
কথার ভাবে সেই পুরনো যোগেন। আবারও কথা বলি আমি, মাঝে শুনলাম তুমি দক্ষিণে না কোথায় চলে গেছ! তা একা গেলে নাকি বউ-মেয়েদের নিয়ে?
তা হলি তো অনেকখানিই জানেন। দক্ষিণে আমি যাইনি, তারাই চলি গেছে।
যোগেন থামে। কথার মাঝে দুই চোখ হাসিতে উজ্জ্বল। …চরের পানি নেমে যাওয়ার থে শেফালি আর ঘর করতিছে না আমার। এক কাপড়ে বেরোয় চলি গেছে। বলি গেছে, ভগমানের টান যদি কমে তো ফেরবে, না হলি নয়।
যেন যোগেনের চেহারা পরিবর্তনের খানিকটা কারণ পাওয়া যায়। চরে নয়, উত্তর-দক্ষিণে নয়, ঘরেই তার অনেকখানি ভাঙাচোরা হয়ে গেছে। সেই ভাঙনের ছাপ তার শরীরে। শেষ দিকে তার যে-সব মাতামাতির কথা শুনেছি তাতে হয়ত তার বউয়ের পক্ষে ঘর করা অসুবিধার হয়ে দাঁড়ায়। গাঙের জলে যে ভগবান খুঁজতে যায় তার সঙ্গে সংসার করা সহজ কথা নয়। খানিক পরে ওর কাছে জানতে চাই, তা হলে তোমার মেয়েরা কোথায় এখন, মা ছাড়া ওদের চলছে কী ভাবে!
অনেকক্ষণ চুপ থাকে যোগেন। লম্বা করে শ্বাস নেয়। …তারা দুজনাই মার সঙ্গে গেছে। পাগলা বাপের ঘরে তাদেরও রাখতে রাজি নয় শেফালি।
কথার শেষেও যোগেন চুপ করে থাকে। মাথাটি নীচের দিকে নামানো। বকুলের ডালে অল্প শব্দ হয় বাতাসের। দূরে কোথাও একটি কাঠঠোকরা গাছ ঠুকরে চলে। কথা চালানোর মতো কথা বলি আমি। তা হলে তোমার তো বেশ কষ্ট করে চালাতে হয় এখন!
না বাবু। আমার এখন কোনও কষ্ট নেই। এক কথাতে মুখ তুলে ফেলে যোগেন। পাতার ফাঁক দিয়ে এক টুকরো রোদ পড়ে ওর মুখে। …তারাগুণের চরে ভগমান ভাঙন যেমন দেখালেন জোড়ও তো কম দেখালেন না। তারা আমারে ছেড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু দুই বুন যে এক সঙ্গে রয়েছে এই আমার অনেক। ওরা আলাদা হলি আমি সইতি পারতাম না।
যোগেন এক ঝলক তাকায় আমার মুখে। দেখি ওর দুই চোখ ভেজাভেজা। দূরের ডালে কাঠঠোকরা তখনও শব্দ করে চলে। বাতাসের দোলা ওঠে বকুলের পাতায়। রোদের ছোট ছোট টুকরো ঘোরে যোগেনের মুখে। আমরা দুজনেই সেই বিকেলে অনেক ক্ষণ চুপ করে থাকি।
সেদিন সন্ধে কাছাকাছি এলে যোগেন চলে যেতে চায়। তার আগে বলে, এই বার আমার ঘর আর চরের জমি দেখতি যাওয়া লাগবে। আপনি চলি যাবেন শুনেছি, তার আগে এক বার ঘুরোয় আনতি চাই। আমি নিজি একখান ছোট লৈকো নে আসব।
ওর কথায় সেদিন রাজি হই আমি।
তার পর একদিন যোগেন নিতে আসে আমাকে। সেটা আমার বদলির দিন কয়েক আগে।
তখন কার্তিকের শেষ, বাইরে শীতের ভাব এসে গেছে। শীত এলে এই সব গ্রাম কেমন শান্ত হয়ে যায়। লোকজনের ছুটোছুটি কমে, মাইলের পর মাইল জমিতে মাথা নামিয়ে কাজ করে যায় চাষিরা। শীতে নদী ছোট হয়ে যাওয়ায় চরের জমিকে চওড়া লাগে অনেক। সেদিন বিকেলে নদীর চরে ছাগল চরছে, ডাঙায় তোলা বড় একখানা নৌকো কাত করে রাখা। শীতের গোড়ায় নদীর চরে যাযাবরের দল এসে তাঁবু খাটায়। তাদের মেয়েরা চুল বাঁধছিল কাত হওয়া নৌকোখানা ঘেঁষে। যোগেনের সঙ্গে আমি ঢালু পাড় বেয়ে ঘাটে বাঁধা নৌকোটির কাছে চলে যাই।
যোগেনই নৌকোর মাঝি সেদিন। আমাকে মাঝামাঝি বসিয়ে ও এক মাথায় গিয়ে দড়ি খুলে দেয়। অল্প স্রোতে ভেসে পড়ে নৌকো। যোগেন বৈঠা চালিয়ে ধীরে ধীরে বাইতে শুরু করে। শান্ত একটি বিলের মতো সেই বিকেলে শুয়ে থাকা ইছামতী, মাথার ওপর সূর্যাস্তের রঙ গড়ানো শুরু হয়ে গেছে। পাড়ের জমি থেকে গরু নিয়ে ঘরে যাচ্ছে লোকেরা, কখনও চিৎকার করে একে-ওকে ডাকছে। ছলাৎ শব্দে যোগানের লগি আঁচড় টানে ইছামতীর জলে।
নদীর মাঝামাঝি এসে ছোট বিরতির মতো যোগেন বৈঠাটি তুলে নেয়। বৈঠার মাথা থেকে টুপটুপ করে জল গড়ায় নদীতে। যোগেন পা টেনে আমার মুখোমুখি বসে বলে, দেখেন বাবু চা রদিকটা চেয়ে দেখেন, এই জায়গায় এসে তেনারে ছাড়া আর কিছু কি মনে হয়!
আমার সেই ভরা বর্ষার নদীতে যোগেনকে নিয়ে শোনা গল্পের কথা মনে পড়ে। এই সেই অসুখ যার জন্য সে চারপাশে পাগল বলে পরিচিত। যে অসুখে ওর বউ-মেয়ে ছেড়ে চলে গেছে, যে অসুখ নিয়ে ও একা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রসঙ্গ তোলায় আমি খানিক সুযোগ পেয়ে যাই। বলি, এ দিকটায় একা-একা কেন আসো যোগেন! জানো লোকে তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে?
হাসলি আমি কী করতি পারি! যোগেন উদাস হয়ে তাকায় আকাশে মিলে যাওয়া নদীর দূর বাঁকে। সেখানে ছোট-ছোট ডিঙি নৌকোর আভাস। …আমি বাবু ভগমানের মুখের কথা শুনতি আসি।
সে তো অনেক দিন ধরেই আসছ। কথা কি এখনও শোনা হয়ে যায়নি!
না বাবু, সে কথার শেষ নেই কোনও। তা ছাড়া রাতের আন্ধারে যখনই এখানে আসি, শুনি তিনি কেবলই কান্দেন।
বিকেলের আলো আরও কমে আসে। যোগেন আমার দিক থেকে মুখ সরিয়ে রাখে। কখনও নদী দেখে, কখনও চর বা আকাশের দিকে তাকায়। খানিক থেমে আবারও কথা বলতে শুরু করে ও। গলার স্বর কেমন আচ্ছন্ন আর ভারী। …তবে বাবু, ভগমানের নিজির বুকে দুঃখ নেই কোনও। আমাদের জন্যি ওনার যত শোক। আমাদের কষ্ট দেখলি উনি অবুঝ হয়ে যান। তখনই চোখের জল এই গাঙের বুকে গড়ায়।
বিকেল প্রায় মুছে এসেছে তখন। দূরের নৌকোয় বাতি জ্বালানো হয়েছে। নদীর পাড়ে কোথাও কোথাও আলোর বিন্দু। যোগেন আবার বৈঠা তুলে নেয় হাতে। বৈঠার মাথা নামায় ইছামতীর জলে। বলে, সেই জন্যিই এই জায়গায় বারে-বারে আসি। ওনারে একা রাখি যেতি মন চায় না আমার।
বহুদিন পরে মন ছুঁয়ে যাওয়া একটা গল্প পড়লাম। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।
দেবকুমার সোম
নিপুণ পুঙখানুপুঙখ বর্ণনায় লেখক আমাদের সময় থেকে সময়ান্তরে নিয়ে যান। কোনও গল্প নয়, আদিগন্ত একটি মানুষ। টলস্টয়ের কথা মনে পড়ে।