ধসে পড়ছে দেশের এক শৈল নগরী। ৬০০-র বেশি বাড়িতে এমনকি রাস্তাতেও ধরেছে ফাটল। তার সঙ্গে হোটলগুলিতেও। প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ঘরছাড়া হতে হয়েছে বহু মানুষকে। বদ্রিনাথ ধমের প্রবেশদ্বার উত্তরাখণ্ডের প্রাচীণ এই ছোট শহর হয়েই ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স, হেমকুণ্ড সাহিব যেতে হয়। সেই যোশীমঠই এখন বিরাট বিপর্যয়ের মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু যোশী মঠ নয়, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বেশ কয়েকটি শহর ভূমিধসের কারণে আতঙ্কের কেন্দ্রে। হটাৎ কেন হল এমন? বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থার জন্য দায়ী করেছেন সাধারণ মানুষকেই। তাঁদের বক্তব্য, এলাকার ভূতত্বের কথা না ভেবে, পরিবেশের কথা চিন্তা না করে যোশীমঠে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাহাড়ের গায়ে নির্মিত হয়েছে হোটেল। বেড়েছে জনসংখ্যা। এর উপর সাম্প্রতিক অতীতে টানা বর্ষা এবং বন্যার কারণে সেখানকার নীচের মাটি অনেকটাই সরে গিয়েছে। আজ সেই কারণে চরম বিপর্যয়ের মুখে যোশীমঠ।

আজকের ঘটনা হটাৎ নয়। অন্তত কুড়ি বছর আগে থেকেই বেশি সময় ধরে সরকারকে যোশী মঠের পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে আসা হলেও, সবই উপেক্ষা করা হয়েছে। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, প্রতিবছর উত্তরাখণ্ডে আসেন প্রায় ১০ কোটি মানুষ। সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই পাহাড়ের গায়ে হোটেল নির্মান বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকার আমল দেয়নি বিশেষঙ্গদের কথায়। তার উপর জনসংখ্যা বেড়েছে আরও বেশি ঘিঞ্জি হয়েছে নৈনিতাল, মসৌরি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিশেষঙ্গরা মেইন সেন্ট্রাল থ্রাস্টের পুনরায় সক্রিয় হওয়াকেও দায়ি করছেন। যেখানে ভারতীয় প্লেট ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে চলে যাচ্ছে। তাঁরা ২০১৬ সালের একটি রিপোর্টের উল্লেখ করেছেন। যেখানে বলা হয়েছিল, এই শহরের অর্ধেক অংশ তৈরি হয়েছে ভূমিধসে তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষের উপর। গবেষণায় দেখা গিয়েছে নৈনিতালে প্রধানত শেল ও স্লেট-সহ চুনাপাথর রয়েছে। যে কারণে এই সব জায়গার উপরের মাটির শক্তি খুব কম। যোশীমঠের মতো একই অবস্থায় রয়েছে উত্তরকাশী-চম্পাওয়া। তাই যোশীমঠের মতো অবস্থা হতে পারে নৈতিতাল, উত্তরকাশী এবং চম্পাওয়াতেও। এছাড়া এইসব এলাকা অত্যন্ত ভূমিকম্প প্রবণ।
স্থানীয় মানুষদের দাবি, বিগত কয়েক দশক ধরে সরকার ওই এলাকায় পরিকাঠামোগত উন্নয়নে খুব মন দিয়েছেন আর তার জেরে আখেরে তারা এখানে বিপদ ডেকে এনেছেন। তাদের কথা অনুযায়ী ‘উন্নয়নের জোয়ারেই’ জোশীমঠ তলিয়ে যাওয়ার পথে। তার কারণ, উন্নয়ন করতে নাগাড়ে চলেছে বড়সড় নির্মাণকাজ, একধার থেকে কাটা পড়েছে গাছ, পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করা থেকে শুরু করে ধাপ কেটে নতুন জনবসতি তৈরি করার কারণে জোশীমঠের মাটি আলগা হয়ে পরেছে। তার ফলে যা ঘটার সেটাই হয়েছে।

আজকের কথা নয়, অন্তত ৪৭ বছর আগে জোশীমঠের এই পরিস্থিতি আঁচ করা হয়েছিল! ১৯৭৬ সালে মিশ্র কমিটি তাঁদের রিপোর্টে জানিয়েছিল সে কথা। তাঁদের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই শহর গড়ে উঠেছে হিমালয়ের ধসপ্রবণ এলাকার উপরে। তাঁরা জানিয়েছিলেন, প্রাকৃতিক ও মানুষের কর্মকাণ্ডের জেরে জোশীমঠের স্থায়িত্ব বড়জোর ১০০ বছর। তাঁরা রিপোর্টে একথাও বলেছিলেন যে হিমালয়ের কোলে থাকা এই শহর ১০০ বছরের মধ্যেই ধীরে ধীরে মাটির নীচে ধসে যাবে। কিন্তু ১০০ বছর পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে হল না, ৪৭ বছরেই পরিস্থিতির জেরে জোশীমঠের অস্তিত্ব থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়ে গেল।
মিশ্র কমিটি তাঁদের রিপোর্টে কেবল সতর্কতাই নয়, কী ভাবে ধস রোখা যায়, সেই পরামর্শও দিয়েছিল। তাঁরা জানিয়েছিলেন, ভূমিধস রুখতে বোল্ডার সরানো যাবে না, বড়সড় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতয়ে হবে, গাছ কাটা চলবে না। কিন্তু তাঁদের কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তাঁদের দেওয়া সতর্কবার্তা উড়িয়ে দিয়ে বাড়ানো হয়েছে শহরের সীমানা। দিনে দিনে বেড়েছে ব্যবসা বানিজ্য এবং জনসংখ্যা। কেবল তাই নয়, পাহাড়ে ধাপ কেটে, সুড়ঙ্গ খুঁড়ে তৈরি হয়েছে রাস্তাঘাট, একের পর এক জলাধার এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ফলে প্রাকৃতিক শহর একদিনে নয় ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক শহরে। আর ফাঁপা হয়ে গিয়েছে মাটির তলা।

প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পর্যটকের ভার আর বইতে পারছে না হিমালয়ের কোলে ছোট শহরগুলি। তাই এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে যে হিমালয়ের কোলে থাকা ঘিঞ্জি পর্যটন কেন্দ্রগুলিও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে সেকথা বলাই বাহুল্য।