মঙলুর মনে পড়ে অযোধ্যা পাহাড়ে ‘দিশম সেঁদরায়’ যাবার কথা। সেবার তার সাথে গিয়েছিল শিকারে ভুজু ডিবরা আর গুরা।
নাকি ‘দিশম সেঁদরায়’ বা শিকারে অযোধ্যা পাহাড়ে না গেলে কেউ তাদের মরদ ভাববে না। মেয়েরা তাদের বিয়েই করবে না।
তা মঙলু এখন বুক ঠুকে বলতেই পারে সে মরদ। মরদ মরদ। যে সে মরদ নয়, অযোধ্যা পাহাড়ে ‘দিশম সেঁদরা’ করে আসা মরদ।
লায়া কুলাই টুডুকে বললে সে হেসেই উড়িয়ে দেয়। ধুস। তুই আবার মরদ। এখনও তোর গাল টিপলে হুড় হুড় করে দুধ বেরোয়। তবু যদি ‘পাতাবিঁধা’ মেলা থেকে ঘুরে আসতিস।
পাতাবিঁধা পাতাবিঁধা।
কানাইসর পাহাড় পূজার পাহাড়মেলা সে দেখে এসেছে। লায়া কুলাই টুডুই তাকে সাথে করে দেখিয়ে এনেছে। নাকি কানাইসর পাহাড়ের ধারেকাছেই শিলদা ওঁড়গোদা না মোটগোদায় সে মেলা বসে।
মঙলু আবদার করল লায়ার কাছে, বেশ তো সে মেলায আমাকে নিয়ে চল লায়া।
লায়া শালপাতার চুটা টানে ভুড়ুক ভুড়ুক, ধোঁয়া ছাড়ে, আর মুচুক মুচুক হাসে।
হাসছিস যে?
লায়া বলল, সে মেলা বুঢহা-বুঢহিদের মেলা কী আর, যৈবন মেলা। ছোঁড়াছুঁড়িরাই সেখানে যেতে পারে। প্রতিবছর দঁশায়ের সময় তিনদিন ওঁড়গোদার ভৈরবের কাছে ধলভুম গড়ের রংকিনী এসে থাকে। তিনদিন ধরে মাটির তলা থেকে গুমগুম করে আওয়াজ ওঠে। সে সময় তোর বিষধর সাপও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না রে মঙলু।
শুনে তো অবাক হয়ে যায় মঙলু। তার জেদ চেপে যায় যে করেই হোক গুঁড়গোদার ‘পাতাবিঁধা’ মেলায় সে যাবেই যাবে। সে তো ‘ডাঙুয়া কাডা’। তার তো এখনও বিয়ে সাদি হয়নি।
কুসুমগােঁয়র ‘নামো কুলহির’ অর্থাত্ নীচের দিকের কুমহার ঘরের বিয়ে সাদিতে সে দেখেছে—বরকনে ঘরে এলে ‘কাদোঘাটি’ করতে তারা নদীতে যায়।
তারা মানে বর কনে এবং তাদের সাথিরা। বরের বনেরা ভাইয়েরা, কনের বোনেরা ভাজরা।
নদীতে নেমে জল ছিটাছিটি করে এর-তার গায়ে, নদীর পাঁক তুলে একে ওকে মাখায়। বর মাখায় কনেকে, কনে মাখায় বরকে। ‘কাদোঘাটি’ করে তারা।
তারপর সিনান করে ঘরে আসে। আসার পথে বরকে শিকার করতেই হয় হরিণ। হরিণ আর কোথায় পায়, ’পাতাবিঁধা’ করতে হয়। অর্থাত্ তিরধনুক দিয়ে শুকনো মহুল বা মহুয়া পাতাকে বিঁধতে হয়।
বেঁধা পাতা কােঁখর ঝুড়িতে কুড়িয়ে জড়ো করে কনে। মঙলু তো সেই ‘পাতাবিঁধা’ই দেখেছে। কুমহারদের নতুন বউ তো সেই ‘বিঁধাপাতা’ই ঝুড়ি ভরে নিয়ে আসে ঘরে।
ভুজু-ডিবরা সনাতন পিথোদের বললেই একপায়ে খাড়া, মঙলুর সাথে তারাও যাবে গুঁড়গোদার ‘পাতাবিঁধা’ মেলায়। না হয় এবছরটা শাড়ি বেলাউজ পরে ‘ভুয়াঙ নাচ’ নাচা হবে না, না হয় গাওয়া হবে না—‘হায় রে! হায় রে! অকারেদ হো গুরু হো ভূয়াঙ জানাম লেন—’
তবু তবুতো একটা নতুন জিনিস জানা হবে, দেখা হবে। দশমীর আগের দিনই বেরিয়ে পড়ল তারা।
ওই তো একটাই পথ। রোহিনী দিয়ে যাও কী কুঠীঘাট দিয়ে যাও, লোধাশুলি থেকে ঝাড়গ্রাম, ঝাড়গ্রাম থেকে বাসে দহিজুড়ি শিলদা। শিলদা থেকে ওঁড়গোদা তো কাছেই, হেেঁটই যাওয়া যায়।
এই তো কদিন আগেই এসেছে মঙলু। লেধাশুলিতে নেমে ভজু-ডিবরাদের সে আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দেয়—ওই দ্যাক ওদিকে খড়পপুর আর মেদিনপুর। আর এই দ্যাক এদিকে ঝাড়েকগ্রাম—
লোধাশুলিতে কিছুক্ষণ থেমে বাসটা সত্যি সত্যি মঙলুর আঙুল বরাবর দৌড়তে শুরু করে। একবাসেই ঝাড়গ্রাম পেরিয়ে দহিজুড়ি বিনপুর-শিলদা।
শিলদাতেই নেমে পড়ল মঙলুরা। বাসটা তো আরও যাবে—সেই বেলপাহাড়ি-ভুলাবেদা-বাঁশপাহাড়ী হয়ে ঝিলিমিলি। মঙলু আঙুল উঁচিয়ে পশ্চিমে দেখাল—ওই দ্যাক হালি মেঘের মতো কানাইসর পাহাড়।
মঙলু আরও দেখাল ভুজু-ডিবরাদের—সে কানাইসর পাহাড়ের অত উঁচুতে উঠেছে।
ভুজু ডিবরা পিথোরা বলল, বাস রে।
শিলদা থেকে ওঁড়গোদা দু মাইল আড়াই মাইল পথ। শিলদা বাঁকুড়া বাসরুট থেকে বড়জোর এক মাইল হেেঁটও যাওয়া যায়, ট্রেকারেও যাওয়া যায়, আবার বাসেও। ঝাড়গ্রাম থেকে ওঁড়গোদা আজকাল বাসও তো চলছে।
মঙলুরা হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাচ্ছে ধামসা মাদল চ্যাচ্চেড়ির আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ মানুষের গলার আওয়াজ।
বিজয়া দশমী, দূর্গাঠাকুরের ভাসান হচ্ছে আজ, আজ থেকে মেলাও শুরু হয়েছে। চলবে আজ কাল পরশু।
কুসুমগােঁয়র ওদিকে দাঁশায়ও শুরু হয়েছে। কেন যে সেরেঞে ‘হায় রে’ ‘হায় রে’ বলে শোকপ্রকাশ করা , সেদিন জবাব দিতে পারেনি কুসুমগােঁয়র লায়া কুলাই টুডু,। আজ এখন হাঁটতে হাঁটতেই লোকমুখে জবাবটা জেনে গেল মঙলু।
নাকি হুদুড় দূর্গা নামে সাঁওতালদের ‘সান্তভুমের’ এক আদিবাসী রাজা ছিল। রাজা খুব দয়ালু ছিল। প্রজাদের খুব ভালোবাসত। তাদের অনেক উপকার করত। এই নিয়ে প্রতিবেশী ‘দিকু’ রাজার খুব হিংসা ছিল। সে একদিন হুদুড় দূর্গার রাজ্য আক্রমন করল। আর রাজাকে মেরেও ফেলল।
ওই দিনটাই ছিল বিজয়া দশমী। অত্যাচারী ‘দিকু’ রাজা বেছে বেছে পুরুষদেরই আক্রমন করত, মেয়েদের গায়ে হাত দিত না। তাই দঁশায়ের দিন মেয়েদের শাড়ি পরে মেয়ে সেজে সাঁওতালরা ভুয়াঙ বাজিয়ে ‘হায় রে’ করে গান গেয়ে দঁশায়ের নাচ করে। নাচ তো নয় শোক পালন করে। শোক পালন তো নয় আদিবাসীদের একজোট হতে ডাক দেয় শপথ নেয়।
শপথ নেয় শপথ নেয়।
কার কাছে হে? মারাঙ বুরু ভৈরবের কাছে।
শিলদা ওঁড়গোদার ভৈরব, মারাঙ বুরু। সাঁওতালদের নাকি আদি বাসভুমি ‘সাতভুম’। শিলদা ঝাঁটিবনি এই সাতভুমেরই অধীন। শিলদা নামের একপ্রকার বাঘ দেখা যেত এই শিলদা ঝাঁটিবনিতে। তাই নাকি নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘শিলদা’।
শিলদা শিলদা।
ইতিহাসের ‘চুয়াড় বিদ্রোহে’র প্রধান ঘাঁটি ছিল এই শিলদা। ঝাঁটিবনি। এখনও আছে রানী কিশোরমনির রাজবাড়ির ভাঙা গড়। সিংহবাহিনী দেবালয়, দেবালয়ের সামনে সেই তমাল ও মাথাচুন গাছদুটি।
আর ওঁড়গোদা?
মারাঙ বুরু ভৈরবের ‘থান’। চারধারে ছড়ানো ছিটানো মাকড়া পাথর আর মাকড়া পাথর। নাকি তার তলায় চাপা পড়ে আছে সোনার ভৈরব।
‘শ্রীভৈরব সাড়া দেন গুড় গুড় রব
পরগনার ভুমিজল কেেঁপ ওঠে সব।’
মঙলু সনাতন পিথো ভুজু-ডিবরারা ‘পাতাবিঁধা’ মেলায় পৌঁছুল। মেলা তো নয়, পরব। কেউ বলে ‘পাঁতাবেদা’, কেউ বলে ‘পাটাবিঁধা’, কেউ আবার ‘পাতাবেঁদা’, কেউ কেউ ‘পাতাবিঁধা’।
যে যাই বলুক ‘পাতাবিঁধা’ পরব আদিবাসীদের, বিশেষ করে সাঁওতালদের এক বিশাল পরব বিশাল মেলা। তিনদিন মেলা। প্রথম একদিন যাও বা ‘দিকু’রা তার মানে অনাদিবাসীরা ঢুকতে পারে। শেষের দুদিন একদম না। সেকদিন কেবলমাত্র আদিবাসীদের।
আদিবাসীদের আদিবাসীদের।
মঙলুরা এতবড় মেলা আগে কখনও দেখেনি। যেদিকেই দেখছে শুধু লোক আর লোক, শুধু দোকান আর দোকান। কানাইসর পাহাড়পূজার মেলাতেও এত লোক আসেনি, এত দোকান বসেনি।
কী নেই? দোকানগুলোয় বিক্রি হচ্ছে রাজ্যের জিনিস। মাদল ধামসা, তিরিয়ো আড়বাঁশি, কেঁদরি, ভুয়াং, চ্যাচ্চেড়ি, ঘন্টি। এমনকি গরুর গলার ‘ঠরকা’ও।
কতরকম শিকড় বাকড়। শতমূলি, চুরবন, বাঘনখী, কানকুলি, মেঢ়ামারী, দধিগড়া, ঘৃতকুমারী, বহেড়া, চিহড়ের মূল, ফল ফুল। হাড়গিলের ঠোঁট, বাজপাখীর নখ, ঝিঁকরকাঁটা, ঘোড়ার ল্যাজের চুল।
বিক্রি হচ্ছে কুমিরের দাঁত, ভালুকের লোম, বাঘের গা-রগড়ানো গাছের ছাল, ময়ুরের পেখম। মঙলুরা ময়ুরের এক একটা পালক কিনে পাগড়িতে গুেঁজ নিল।
সেবার কানাইসর পাহাড়ের মেলায় ‘কপতি’ ধরার ফাঁস বানানোর ঘোড়ার ল্যাজের চুল কিনতে পারেনি। ‘পাতাবিঁধা’ মেলায় দেখামাত্র তা কিনে ফেলল মঙলু। মা যদুমনির জন্য কিনল কাঠের হাতা-খুন্তি, নুন কাঠুয়া আর লাউয়ের চাটু একটা।
লোহার ‘পাটন’ বাচছে ভুজু-ডিবরা। ‘পাটন’ মানে ধনুকের তীর। একগোছা কিনেও ফেলল। শিকারে বা দিশম সেঁদরায় কাজে লাগবে।
তারপর তারা ভৈরব মারাঙ বুরুকে দর্শন করল। ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজা দিল। কতলোক যে ‘মানসিক’ করা পাঁঠাছাগল ষাঁড়াখুকড় বলি দিচ্ছে। কত লোক যে এসেছে তাদের নতুন কেনা সাইকেল, মোটর সাইকেল, ট্রাক ট্যাক্সি স্কুটার ম্যাটাডর ট্রেকার নিয়ে ভোগ দিতে। ঝকঝকে নতুন গাড়িতে ‘ভৈরব থান’ এখন ছয়লাপ।
মঙলু একটা নতুন কেনা মোটর সাইকেলের আয়নায় মুখ দেখল। কত যে বড় লাগল তার মাথাটা। ঠিক যেন ভৈরব মারাঙ বুরুর মাথা।
‘ভৈরব মাড়ো’ বা ভৈরব থান বলতে কতকগুলো মাকড়া পাথরের গাদা। গাদার উপর পোড়ামাটির ‘কলসি মাথা’ ভৈরব। তার সাথে সাত সাতটা সহচর। তাদের মাথার উপর বহেড়া হরিতকী গাছের ছায়া। নীল আকাশের ছায়া।
ভৈরবের চোখদুটিতে কড়ি বসানো। তাই চক চক করে। হাত নেই। নাকি একটাই পা। তাও মাটির মধ্যে। চ্যাপটা নাক, বিশাল হাঁ মুখ। দাঁত নেই। মাথায় জটা। পেটটা কলসির মতো। কাপড় জড়ানো, আর সিঁদুরে সিঁদুরে ছয়লাপ। চারধারে গাদা করা বলির লোহু ছিটানো মাটির হাতিঘোড়া। হাতিঘোড়া আর হাতিঘোড়া।
মঙলু ভুজু-ডিবরা পিথো সনাতনরা মাটিতে শুয়ে পড়ে গড় করল। পুরোহিত ‘পাহানবাবা’ তাদের হাতে সিঁদুর মাখা ফুল বেলপাতা বাতাসা ভোগ দিল।
কে যেন জোরে জোরেই বলছিল—‘ঝোপঝাড়ের এই ভৈরবের মুর্তির নীচেয় পাথরে চাপা পড়ে আছে আরেক সোনার ভৈরব। আর আছে এক পাতালপথ, যে পথ চলে গেছে ওঁড়গোদা থেকে ধলভূমগড়ের ঘাটশিলাতক—’
মঙলুরা উঁকি মেরে দেখল—ভৈরবমাড়োর একধারে এক দাড়িওয়ালা সাধুবাবা এতকথা সাতকাহন করে বলছে। আর তার শিষ্যরা ঘিরে ধরে আছে তাকে। গলায় রুমাল নয় ‘উরমাল’ বেেঁধ মঙলুরাও দাঁড়িয়ে পড়ল।
শুনি তো কী বলছে।
‘ভুমির ভিতর থাকি করে ভীম রব।
যার নাম ভুমিপম্প সেই তো ভৈরব’।
ধলভুমগড়ের ঘাটশিলা। ঘাটশিলায় থাকে ওঁড়গোদার ভৈরবের ভৈরবী। নাম রংকিনী। রংকিনীর থানে দূর্গাপূজার মহাঅষ্ঠমী ও মহানবমীতে হয় ‘বিঁধা’ বা ‘বেঁদা’ পরব। আর দশমীতে ওঁড়গোদার ‘ভৈরব মাড়ো’তে হয় ‘পাতাবিঁধা’।
ঘাটশিলার পরব শেষে পাতাল পথে রংকিনী আসতে থাকে ওঁড়গোদার দিকে আর ওঁড়গোদার ভৈরব দশমীর দিন একপায়ে হেেঁট দুম দুম আওয়াজ করতে করতে যায় ঘাটশিলার দিকে।
পথেই মিলন। মিলন বলে মিলন মহামিলন। তার ভারেই থর থর করে কেেঁপ উঠে মেদিনী। গুম গুম করে ভুমিকম্প হয় শিলদা-সাঁতভুমে। ফোঁটা ফোঁটা ঘামও নাকি ঝরে পড়ে বাবা ভৈরবের গা থেকে। তালপাতার ‘বিচনি’ দিয়ে তখন বাতাস করতে হয় পাহান পুরোহিতকে।
ওই ওই ত শাঁখ বাজছে। শিলদা ওড়গোদা-পরিহাটি-কাপগাড়ী-নারায়নপুর-মোহনপুরের বউ-ঝি রা শাঁখ বাজাচ্ছে। তার মানে তার মানে মেদিনী টলছে। মেদিনী টলছে হে।
সাধুবাবা দু হাত তুলে উঠে দাঁড়াল। চিত্কার করে বলল‘জয় মা রংকিনী। জয় বাবা সোনার ভৈরব।’
মেলায় ভৈরব টাড়ে লোকজন দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। বাবা ভৈরব মা রংকিনীর নামে জয় জয়কার তুলল। এদিক থেকে ওদিকে দৌড়ে যেতে যেতে কেউ বলল দশ বত্সর বাদে ‘বসমাতার’ নীচে বাসুকিনাগ ‘করট’ ঘুরছে হে ‘করট’ ঘুরছে।
‘করট’ তার মানে আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরছে। অবশ্য কেউ কেউ বলল ভৈরব মাড়োর নীচে ঘুমিয়ে আছে আগুন পাহাড় আগ্নেয়গিরি। যে কোনো দিন ফেটে পড়ে আগুনের লাভা ছিটাবে। তার জন্যই মেদিনী কাঁপছে।
হকচকিয়ে গিয়েছিল মঙলু-ভুজু-ডিবরারা। এমনটা তো এর আগে কখনও দেখেনি তারা। তাই দৌড়ে গিয়ে উঁকি মারল ‘ভৈরব মাড়ো’য়। পাহানবাবা ফুলবাঁধা তালপাতার পাখা তখনও বিেঁচ চলেছে ভৈরবমারাঙ বুরুর গায়ে। তখনও বিেঁচ চলেছে।
ফের মাটিতে শুয়ে পড়ে ‘গড় জোহার’ করল মঙলুরা।
মাটির কাঁপন, সেই গুম গুম আওয়াজ আর কতক্ষণ। থেমেও গেল একসময়। সাধুবাবা হাত তুলে মঙলুদের ডাকছে, এ্যাই যে বাবারা। নিজের চোখেই দেখলে ত ওঁড়গোদার ভৈরব বাবার মহিমা। এবার রংকিনী মায়ের মহিমা শুনতে চাও ত এসো।
সুড় সুড় করে ভুজু-ডিবরা পিথো মঙলুরা ফের ঘিরে ধরল মাকড়া পাথরের উপর বসে থাকা সাধুবাবাকে। আটআনা একটাকা প্রনামীও দিল। ঘিরে ধরেছে শুধু কী মঙলুরা আরো কত শত শত চেলারা।
রংকিনী ধলভুম রাজার কুলদেবী। থাকে ঘাটশিলায়। ঘাটশিলার নাম হয়ে গেছে তাই রংকিনীভুম। সাধুবাবা হেঁয়ালি করে বলল—‘মল্লে বা শিখরে পা, সাক্ষাত্ দেখবি ত ধলভুমে যা।’ মানেটাও বলে দিল—মল্লভুমে আওয়াজ শোনা যেত। পায়ের ছাপ পড়ত শিখরভুমে। আর রংকিনীকে চোখের দেখা দেখা যেত ধলভুমে।
মল্লভুম শিখরভুম ধলভুম মানভুম সিংভুম—এসব নিয়েই সাঁতভুম। সাঁতভুমের সব জায়গাতেই রংকিনী আর রংকিনী।
ধলভুমের রাজা তাকে রাজপুতানা থেকে নিয়ে এসে আটকে রাখল প্রথমে মহুলিয়ায়, পরে ঘাটশিলায়। তার আগে দেবী ছিল মানভুমের পঞ্চকোটে। পঞ্চকোট রাজার সাথে তার একটা শর্ত ছিল—‘ভোগ’ হিসাবে প্রতিদিন একটা মানুষ চাই। মানুষ পেলে তাকে ঢেঁকিতে কুটে খেয়ে ফেলত রংকিনী।
একদিন পালা এসে গেল এক চাষার ছেলের। চাষি তো কেেঁদ কেটে আকুল—একমাত্র ছেলে তার। তাকেও খেয়ে ফেলবে রংকিনী। ‘গিরিহা’কে কাঁদতে দেখে তার গোরু বাগাল বলল, কেেঁদা না, তোমার ছেলের বদলে আমি যাব রংকিনীর কাছে।
যেমন বলা তেমন কাজ। বাগাল তো চলল রংকিনীর কাছে। সে কোঁচড়ের একদিকে ভরে নিয়ে গেল লোহার ছোলা, আরেক দিকে সত্যি ছোলা।
যেতে যেতে তার একটু দেরিই হল। ওদিকে দেরি দেখে রংকিনী তো রেগে লাল। হাঁ করে গিলতে এল বাগলাকে। বাগলা বলল আহা-হা। রাগছ কেন? আমাকে ত খাবেই তার আগে এই নাও দুটো ছোলা ভাজা খাও।
বলেই লোহার ছোলাগুলো রংকিনীকে দিল। আর নিজে মজাসে কুড়মুড় করে আসল ছোলাগুলো অনায়াসে চিবোতে লাগল। ওদিকে লোহার ছোলা খেতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে পড়েছে রংকিনী, তার প্রায় মরে যাবার দশা।
বাগাল তখন টিটকিরি মারল, দাঁত দিয়ে সামান্য ছোলাভাজা খেতে পার না, আর তুমি কিনা মানুষ চিবোবে? এই দেখ —আমি কেমন ছোলাভাজা চিবোচ্চি। কুড়মুড় কুড়মুড়।
ইস! রংকিনী ভাবল, না জানি আমার চেয়ে কত বড় বীর, লোকটা কেমন চিবোচ্চে অঝোরঝর। অঝোরঝর অঝোরঝর। ভয় পেয়ে মরি কী বাঁচি দৌড়াতে শুরু করল রংকিনী।
দৌড় দৌড়।
সুযোগ বুঝে চতুর বাগাল লেলিয়ে দিল সঙ্গে আনা দু দুটো কুকুরকে।
লে! লে! ধর ধর! নিজেও রংকিনীর সেই ঢেঁকি নিয়ে তাড়া করল রংকিনীকে।
আর যায় কোথায়। ভয়ে ত্রাসে রংকিনী পালাতে পথ পেল না। রংকিনী দৌড়ায়। বাগাল আর বাগালের কুকুর দুটোও পিছু ছাড়ে না।
অবশেষে ভয়ার্ত রংকিনী ছুটতে ছুটতে এক নদীর ধারে এসে কাপড় কাছতে থাকা এক ধোপাকে বলল আমাকে বাঁচাও। ধোপা তখন তাকে তার কাপড় কাচা পাটার নীচে লুকিয়ে রাখল।
ঢেঁকি হাতে আর দু দুটো কুকুর যেন চাঁওরা ভাঁওরা কে সাথে নিয়ে দুর্জয় গোরু বাগাল যখন এসে ধোপাকে জিজ্ঞাসা করল সে রংকিনীকে পালিয়ে যেতে দেখেছে কী না, তখন মিথ্যা বলতে ধোপার সত্যিই ভয় করল। সে তাই শিস দিয়ে পাটার তলাটা দেখিয়ে দিল।
বাগাল কিছুই বুঝতে পারল না। ঢেঁকি কাঁধে কুকুর নিয়ে ফিরে গেল গ্রামে। এদিকে প্রাণে বেঁচে রংকিনী ধোপাকে বলল, তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস, যা তোকে রাজা করে দিলাম ধলভুমের। তবে শিস মেরে ধরিয়ে দিতেও চেয়েছিলি, তাই অভিশাপ দিলাম কাপড় কেচে শিস না দিলে তোদের ক্ষতি হবে।
সেই থেকে দেবী ধলভুমে।
সাধুবাবা বলল, মানভুমে এখনও আছে সেই ‘বাগালিয়াবন’। তোমরা কেউ দেখতে চাও যদি ত আমার সাথে যেতে পারো। তো যা বলছিলাম, জিতুয়া অষ্টমী আর মহানবমীতে ধলভুমগড়ের ঘাটশিলায় যে ‘বিঁধাপরব’ শুরু হয় তা শেষ হয় ওঁড়গোদার ‘পাতাবিঁধা’ পরবে।
আগে তো ধলভুমের ‘বিঁধা পরবেগ্ মাচা বেঁধে রাজা আর রাজপুরোহিত দু দুটো ‘কাড়া’ মোষকে তির দিয়ে বিঁধত। তারপর তির বিঁধা কাড়া দুটোকে বলি দেয়া হত রংকিনীর থানে। এখন সে সব দিনকাল আর নেই, কাড়ার বদলে এখন বলি দেয়া হয় পাঁঠা ছাগল, হাঁস মুরগী, লাউ কুমড়া কাঁখুয়ার—
বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। ভৈরব মাড়োর অদূরে শালবনে পাহাড়ের পিছনে সূর্য দেপে বসে যাচ্ছে। ছাদহীন ভৈরবমাড়োর মাথার উপর বহেড়া হরিতকী গাছের শাখা প্রশাখায় টাঙানো টুনি বালবের মালা জ্বলতে শুরু করেছে,। একঝাঁক ঘরে ফেরা পাখি ভৈরব মাড়োর বহেড়া হরিতকী গাছের ডালে যাদের বাসা, তারা আলোর রোশনাই দেখে ঘরে এসেও ফিরে যাচ্ছে।
ভৈরব মারাঙ বুরুর মাথার উপর ফুল বেলপাতা পড়েই যাচ্ছে। সারারাত পড়বে। আরেকটু বাদে প্রায় আজকের রাত থেকেই মেলার দখল নিয়ে নেবে আদিবাসীরা। ‘দিুকু’ রা আর থাকবে না। তাহলেও আজ তো নয় কাল থেকে শুরু হবে আসল ‘পাতাবিঁধা’ মেলা। চলবে পরশু বিকেল অবধি।
সাধুবাবার চেলারা এবার ভুজু-ডিবরা পিথো সনাতন মঙলুদের হটিয়ে দিল। যাও বাবারা এবার আমরা একটু জপৃতপ করি। জপ-তপ তার মানেই নেশার আয়োজন। হুঁকা কলকে গাঁজা ভাঙ।
ভুজু-ডিবরারাও দৌড়ুল নেশাটােঁড়র দিকে। কতরকম নেশার দোকানপাট আর কতরকম নেশার চাট। কী নেই? চিপস ঝাল চানাচুর বাদাম আলুকাবলি চানামটর পেঁয়াজ নুন লংকা চপ-ফুলুরি বড় বড় পিঁয়াজি বরার মাংস খেড়িয়ার মাংস আঁতিভাজা চর্বিভাজা রক্তভাজা মেটুলি।
আর দেকানদারি করতে এসেছে কারা। সাজনী সেজে বেশির ভাগ মেয়েরা। বড়ও আছে ছোটও আছে, তার চেয়েও ছোট। চারধারে খালি ত কাঁসা-বাটির ঠুংঠাং। শালপাতা শালদোনার খসখসানি। হাঁড়িয়া মহুলের মদ জারিকেন জারিকেন। আসছে খালি হয়ে যাচ্ছে। টলছে, তবু জিগ্যেস করলে বলছে, নাই কই টলছি। তুই কি আমাকে মাতাল ভাবছিস।
ভুজু-ডিবরারাও হাঁড়িয়া খেল, খেল না মঙলু। মঙলুকে ওসব খেতে দিলে নিজে খায় না, তার কাড়াটাকে খাওয়ায়। এখানে তো কাড়াও নেই। মঙলুকে তাই কেউ দিলও না। ক্ষুজু-ডিবরারা মঙলুকে মরদ ভাবে না, ভাবে ‘কাড়াহপন’, মোষের বাচ্চা।
ভৈরব মাড়োর চারধার ঘিরে দোকানপাট। শুধু কী চারধার, ভৈরবটাঁড়ের পাশ দিয়ে যে পিচসড়ক চলে গেছে বাঁকুড়া তার ধারেও এখন জমজমাট দোকানপাট। বেশিরভাগই খাবারের দোকান।
মঙলু হাঁড়িয়া না খেয়ে ‘মাইতি সুইটস’ থেকে চারটা কদমা খেল। আর দুটো শনপাপড়ি। ততক্ষণে ভৈরব মারাঙ বুরুর সামনে শুরু হয়ে গেছে ‘ভুয়াঙ নাচ’। আদিবাসীদের চার পাঁচটা দল এসেছে এই একটু আগে। তারাই ভুয়াঙ নাচছে মেয়ে সেজে। সেই ‘হায় রে হায় রে। অকারেদ হো গুরু হো ভুয়াঙ জানাম লেন—’
একটু দুরে দাঁড়িয়ে কানাইসর পাহাড় পূজায় কেনা কেঁদরিটা বাজাচ্ছে মঙলু। আকাশে দশমীর চাঁদ। চােঁদর আলোর সাথে হিমের গুেঁড়া ঝরছে ঝুরঝুর । ভুজু-ডিবরা পিথো সনাতনরাও যে যার কেঁদরি আর তিরিয়ো নিয়ে নেমে পড়েছে।
কে কার দলের কে কোথা থেকে এসেছে তার কোনো বাছ বিচার নেই। রাত যত গভীর হয়েছে সব— সব মিলেমিশে একাকার। একাকার একাকার।
‘মোরেঁ গোটেঙ উল সকম
মিমিট লোটা ডাক
চিলকাও আমকান চোম বানচো
হরদম বিন্দি রিদিন জনোম।’
আমের পাঁচটা পল্লব
আর জলভরা একটা ঘটি
জানি না
তুমিই আমার উপর জল ছিটালে কিনা
জানি না
তুমিই আমাকে ভিজোলে কিনা।
আমের পাতা ডোবানো জল-ভরা ঘটি থেকে জল ছিটানোর মেলা শুরু হল পরের দিন বিকাল থেকেই। যা লোক এসেছিল এসেছিল, পরের দিন লোক তার তিনগুণ।
প্রায় সব জোড়ায় জোড়ায় এসেছে। এসেছে হাতে ঘড়ি পরা, হাতে ফোন ধরা ছোট জামা ছোট পেন্টুল পরা মেয়েরাও।
দেখে তো অবাক হয়ে গেল মঙলু। সাঁওতাল মেয়েরাও যে আ-এ বি-এ পড়ছে, জজ-ব্যারিস্টার হচ্ছে, তা কী আর জানা ছিল মঙলুর।
জানা ছিল না, জানা ছিল না।
তবে হ্যাঁ কুসুমগােঁয়র পাশের গাঁ ডাঙাসাহির জগত্ টুডু যে একবার ‘মনতিরি’ হয়েছিল—সেটুকু মঙলুর জানা ছিল। লেখা পড়া তো মঙলু করেনি। তাদের মধ্যে ওই পিথোই যা চার পাঁচ কেলাস পড়েছে।
বইএর দোকানে খুব বই ঘাঁটছিল পিথো। একআধটা কিনেছেও। কতসব বইএর দোকান, আর কতসব বইয়ের নাম। পিথো কিনেছে ‘খেরওয়াল বংশা ধরম পুঁথি’। ‘খেরওয়াল সাঁওতারে রতন’ নামের একটা বই দেখিয়ে মঙলুকে পিথো বলল, তোকে নিয়ে আমিও একটা লিখব নাম দেব ‘খেরওয়াল সাঁওতারে মঙলু’।
মঙলু খুব খুশি। একবার ‘অ’ ‘আ’ ‘ক’ ‘খ’ এর মতো সে শিখতে গিয়েছিল ‘অলচিকি’। খুব কঠিন, সে পারেনি। লেখাপড়া না পারুক, সে পারে খুব ভালো ‘তিরিয়ো’ বা আড়বাঁশি বাজাতে। তার বাঁশি যে শোনে সেই মোহিত হয়ে যায়।
হাত ধরে টানাটানি করছিল ভুজু ডিবরা, সনাতনরা। তর সইছিল না, তাদের তারা এবার নাচবে। ধামসা-মাদল-কেঁদরি তো বেজেই চলেছে। ‘ভৈরব মাড়ে’কে ঘিরেই চারধারে নাচ হচ্ছে। দঙ,লাগড়েঁ, বাহান্ধ—সব রকমই।
মাঝে মাঝেই দুজন দুজন করে এদিক ওদিক ছিটকে পড়ছে। একজন নারী একজন পুরুষ। মশ্তলু তাদের বাঁদনা বা সহরায় পরবে গোঠটাঁড়ে দেখেছে।—নাচতে নাচতে একজন আরেকজনকে জোর করে ‘সিঁদুর ঘসতে’। যাকে বলে ‘ইতুত্ সিঁদুর বাপলা’।
একজন আরেকজনের মধ্যে ভাব ভালোবাসা হল, মেয়েটির বাড়ির লোক সহজে মেনে নিচ্ছে না। তখন কোনো মেলায় পরবে নাচগানের আসরে ছেলেটি জোর করেই মেয়েটির সিঁথিতে সিঁদুর ঘসে দেয়। মেয়েটিও বাধা দেয় না। একেই বলে ‘ইতুত্ সিঁদুর বাপলা’। কুসুম গাঁয়েই এরকম কত দেখেছে মঙলু।
ওঁড়গোদার ‘পাতাবিঁধা’ মেলায় যেন তা আকছার হচ্ছে। মঙলুদের দলটার ভিতর আর সকলেরই বিয়েসাদি হয়ে গেছে। কেবলমাত্র বিয়ে হয়নি মঙলুর। পিথো বলল, লেগে থাক মঙলু, তোরই একটা চানস আছে। তুই তো ‘ভাঙুয়া কাডা’।
মঙলু শোনে আর হাসে।
তার এখনও তেমন ‘উমর’ হয়নি। বাপ শুকচাঁদ মা যদুমনি শুনলে কী ভাববে। তবে হ্যাঁ বিয়ে না হোক কথা তো চলতে পারে।
একাদশীর সূর্যও ডুবে গেল। চাঁদের আলো আজ আরেকটু গাঢ় হল। ‘পাতা বিঁধা’ মেলায়ও ঢল নামল।
ঢল তো নয়, ঢেউ। মানুষের ঢেউ মাদল ধামসার ঢেউ লাগড়েঁ দঙ লবয়ের ঢেউ, হাততালি আর ‘কুলকুলির’ ঢেউ যেন একটার পর একটা আছড়ে পড়ল।
তার মধ্যেও ভিড় বাড়ছে হাঁড়িয়া মহুলের দোকানে। মাঝবয়সি মহিলা দোকানদার, রংচঙে শাড়ি পরা যুবতি দোকানদারের শরীর টলোমলো, হাত কাঁপছে। সাথে আসা নাতি নাতনিরা ছেলে মেয়েরা কোনোমতে সামাল দিচ্ছে।
গিলাস ভাঙছে। হাত থেকে থুপ করে পড়ে যাচ্ছে মহুল ভরতি জারিকেন। সামাল সামাল হে। বেসুরো লাগছে পাঁড় মাতালের গলা—‘অকাতে ব্যাঙ চলা কা না’। লুকিয়ে চুরিয়ে কী ঢুকে পড়েছে দুএকজন ‘দিকু’ও?
তার মধ্যেও ভিড় বাড়ছে পাথরের থালা বাটি প্রদীপ ধুপদানি শীল নোড়ার দোকানে। ভিড় বাড়ছে কাঠের হাতা খুন্তি বারকোশ বেলুন চাকির দোকানে। ভিড় বাড়ছে ঝুটা গয়না আয়না কাঁকই রঙিন চুড়ি, ধ্যাবড়া করে লাল নীল সবুজ রংয়ে গোলাপফুল আঁকা টিনের বাকস পেটরার দোকানে। অনেক তো কেনাকাটা হল, এবার একখা ‘ছোটুমটু’ বাসক কিনলেই তার মধ্যে সবকিছু ভরে ফেলা যায়।
মঙলুরাও কিনেছে। মা যদুমনির জন্য মঙলুই কিনেছে। তার মধ্যেই ভুজু-ডিবরা-পিথো -সনাতনদের সব কিছু কেনাকাটাই ধরেছে। ধরার পরেও এখনও একটু ফাঁক আছে। এখনও তারা কিছু জিনিস কিনবে। এই যেমন—এক পালি তাস, এক ছড়া ঘুঙুর, মঙলুর মোষের জন্য ‘ঘাগর’—
মাঝরাত গড়িয়ে গেল। দোকানদারদের হ্যাসাক হ্যারিকেন কুপি গ্যাসলাইটের আলোয় যেন কালি পড়ল। কালো ধোঁয়া উগরাচ্ছে। যেন ফিকে হয়ে আসছে চােঁদর আলোও। ভৈরব টােঁড় আলো দিতে দিতে চাঁদও যেন ক্ষয়ে যাচ্ছে।
আসলে সব আলোই শুষে নিচ্ছে হাড়দা ওদলচুয়া দহিজুড়ি বিনপুর শিলদা মোটগোদা বেলপাহাড়ি শুঁড়পুরা সিজুয়া কাঁটাপাহাড়ী রারাঘাটি ভুলাবেদা সিয়াড়বেদা ঢাকাডোবা লোধাশুলি চন্দ্রি চর্চিতা জামশোলা ধুমশাই তপসিয়া ভুড়ুরবনি ডেবরা সবং বালিচক জকপুর মাদপুর জামবনি বলডিয়া গিধনি ধেড়ুয়া পরিহাটী ধড়সা দুবরাজপুর, আরও দুর দুর গ্রাম থেকে আসা আদিবাসী যুবক যুবতিরা।
কুসুমপুরের ভুজু-ডিবরা পিথো সনাতন মঙলুরা।
অদূরে শালবনে আঁধার ঘন হচ্ছে। শালগাছের ডালপালাগুলো যেন বড় বেশি নড়ছে।
মঙলুর ঘুম পেয়েছে। পরপর দুরাত ‘উজাগর’। ভিড়ের ভিতর ভৈরব টােঁড়র মাকড়া পাথরের উপরই মা যদুমনির জন্য কেনা বাসকটা মাথা সিথান করে ঘুমিয়ে পড়ল মঙলু।
ঘুম ভাঙল কার যেন ডাকে, কার যেন হাতের ছোঁয়ায়। ঘুম ভেঙে চোখ খুলে দেখল—কুটীঘাট-চর্চিতা থেকে আসা আদিবাসী দলটার সবচেয়ে ছোট কিশোরী মেয়েটা তাকে ডাকছে।
উঠো ‘পাতাবিঁধা’ মেলায় এসে ঘুমাতে নাই। কোমরে দেখছি বাঁশিও গোঁজা আছে। বাজাও আমি নাচি।
‘গাডা নাড়ে নাড়ে তে তিরিয়ো বদন রে নালম নরং’—
ওরে বদন নদীর ধারে ধারে বাঁশি বাজাস না—
তাহলে এখন? খবর তো দিতেই হয় মঙলুর বাপ শুকচাঁদকে মা যদুমনিকে।
প্রথম প্রকাশ শারদ সংখ্যা ১৪১৬