আকণ্ঠ সুরাপানে ছিল তাঁর অফুরান আনন্দ। সেই আনন্দে তিনি মগ্ন হতেন তাঁর শিল্পকর্মে। মানুষটার ভেতরে অন্য যে মানুষটার বাস, সেই মানুষটাই তখন তাঁকে নিয়ে যেত এক কল্পলোকে — যেখানে তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁর হাত দিয়ে গড়িয়ে নিত নানান শিল্পকলা। দারিদ্র্য সম্বল করে জন্মেছিলেন বাঁকুড়ার অখ্যাত যুগীপাড়া গ্রামের ক্ষৌরকার পিতা চণ্ডীচরণের ঘরে, কিন্তু জীবন কেটেছে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-সান্নিধ্যে। সেটা সম্ভব হয়েছিল প্রবাসী, মর্ডান রিভিউয়ের যশস্বী সম্পাদক-সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে। রামকিঙ্করের ছবি আঁকার প্রেমে পড়েছিলেন রামানন্দ। পাকা জহুরি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের চিনে নিতে ভুল হয়নি নবীন প্রতিভাকে। তাই রামানন্দ একদিন যুগীপাড়া থেকে রামকিঙ্করকে এনে হাজির করলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে! রামকিঙ্করের বয়স তখন ১৯। সালটা ১৯২৫। কার মূর্তি গড়ছেন জানতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ। রামকিঙ্কর বলেছিলেন, ‘‘আমি ওটাকে জ্ঞান দিয়ে বুঝতে পারি নে। স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে ওই মূর্তি আমার কাছে এসেছিল।’’ শান্তিনিকেতনে এসে রামকিঙ্কর ভর্তি হলেন বিশ্বভারতীর কলাভবনে। নন্দলালের অপত্যস্নেহে বড়ো হয়ে উঠলেন রামকিঙ্কর। রবীন্দ্রনাথ বললেন, তোর গড়া পুতুল দিয়ে গোটা শান্তিনিকেতনটা সাজিয়ে দে। সেই থেকে আমৃত্যু (২ অগস্ট, ১৯৮০) দীর্ঘ ৫৫ বছর রামকিঙ্করের বসবাস শান্তিনিকেতনে।
এটা আমার শোনা কথা। আমার এক বৃদ্ধ লেখক বন্ধু (আনন্দগোপাল সেনগুপ্ত) কথায় কথায় গল্পের ছলে আমাকে একদিন বলেছিল। এ ও বলেছিল পারলে নিজের জীবনে ইমপ্লিমেন্ট করিস। দেখবি কাজ হবে।
শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজকে তাঁর ঘনিষ্ঠরা কিঙ্করদা বলে ডাকতো। অনেকে আবার পাগল শিল্পী বলেও ডাকতো।
কিঙ্করদা একটু খ্যাপাটে ধরণের মানুষ ছিলেন।
একবার ছাত্রদের স্কাল্পচারের পরীক্ষা হচ্ছে। যে যার মডেল বানাচ্ছে। পরীক্ষা একেবারে শেষের দিকে। কিঙ্করদা ঢুকলেন। পরীক্ষক ঘুরে ঘুরে দেখছেন। একটি ছাত্র ঘোড়া বানিয়েছে।
কিঙ্করদা ঘুরতে ঘুরতে সেখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টে ঘোড়াটাকে দেখার পর। কি খেয়াল হলো, ধ্যুস এটা একটা ঘোড়া হয়েছে, দিলেন ঘোড়ার পেছনে এক ধাক্কা।
কাঁচা মাটির পুতুল সে গেলো বেঁকে। ছাত্রটি কান্নায় ভেঙে পরলো। পাগল স্যার এ কি করলো। পরীক্ষার শেষ মুহূর্ত, অ্যাতো সময় নেই আবার নতুন করে সে বানাতে পারে।
ছাত্রটির কান্না আর থামে না।
আমি পরীক্ষায় ফেল করে যাব। আমার একবছর নষ্ট হয়ে গেল।
অন্যান্য ছাত্ররাও তাকে সাপোর্ট করলো। সে এক হই হই ব্যাপার তখন বিশ্বভারতীতে।
কিঙ্করদা কিন্তু ঘটনার পর আর এক মুহূর্ত ওখানে থাকেন নি।
গট গট করে হলের বাইরে চলেগেছেন।
ভবঘুরে মানুষ, একটা ঘড় থাকলেও তার নিজের থাকার ঠিকানা নেই। সব সময় নিজের কাজে ব্যস্ত। জানেনও না এই রকম একটা ঘটনা ঘটে গেছে।
কিঙ্করদা মাঝে মাঝে বিশ্বভারতীতে আসেন, ছাত্রদের কি ভাবে পুতুল গড়তে হয় দেখান, আবার চলে যান। নিজের খেয়ালে নিজে চলেন।
একচ্যুয়েলি কিঙ্করদাও ওদের মাস্টারমশাই ছিলেন। কিন্তু পাগল মাস্টার।
যথা সময়ে রেজাল্ট বেরোল। দেখা গেলো বাঁকা ঘোড়া বানানো ছেলে ফার্স্ট হয়েছে।
হ্যাঁ, কোনও ম্যানিপুলেট নয়। তখনকার দিনে এসব ছিলও না।
সত্যি ছেলেটি ফার্স্ট।
আবার বিশ্বভারতীতে হই হই পরে গেল। এ কি করে হলো। এটা কি সম্ভব। ফেল করবে যে ছেলে, সে কিনা ফার্স্ট!
সেই ছাত্রটি ও অন্যান্য ছাত্ররা দল বেঁধে কিঙ্করদার কাছে এলো।
তখন তিনি তাঁর মাটির পুতুল তৈরি করার মধ্যে নিমগ্ন। ধ্যানমগ্ন ঋষি।
ওই সময় কে স্যারকে গিয়ে ব্যাপারটা বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
সবাই চুপ চাপ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে, নিজেদের মধ্যে ফিস ফাস করছে।
হঠাৎ কিঙ্করদার খেয়াল হলো একদল ছেলে-মেয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে।
ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে সেই নির্মল হাসি। ভেতরে ডাকলেন।
সেই ছেলেটি প্রথমে এগিয়ে গেল। স্যারকে নীচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। দেখাদেখি সবাই প্রণাম করলো।
কিঙ্করদার মুখে শিশু সুলভ হাসি। কিরে সব পাশ করেছিস।
স্যার আমি ফার্স্ট হয়েছি।
সেকিরে! তাই! আমি ভাবলাম তুই ফেল করবি কেন, তোকে পাশ করিয়ে দিলাম, তুই একেবারে ফার্স্ট!
এবার সবাই চেপে ধরলো, স্যার ওর ভাঙা ঘোড়া কি করে ফার্স্ট হলো।
কিঙ্করদার মুখে আবার সেই শিশু সুলভ অনাবিল হাসি।
তোদের চোখটা এখনও তৈরি হয়নি, বুঝলি। তোরা না দেখা জিনিষ গল্প শুনে শুনে তার একটা অবয়ব মনে মনে তৈরি করে নিস। তারপর তাকে তোদের মতো গড়ে তুলিস। শিব গড়তে, বাঁদর হয়।
আমি তোদের পুতুলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম।
ও ঘোড়াটা মন্দ তৈরি করেনি। বেশ ভালো তৈরি করেছিল, তা আমি দেখলাম ঘোড়াটা দৌড়চ্ছে ঠিক, কিন্তু তাতে কোনও গতি নেই, সে দিকে ওর কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই। গতি বিহনে ঘোড়াটা যে কোনও সময়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে, দিলাম এক ধাক্কা, ওমনি ঘোড়াটা টাট্টু ঘোড়ার মতো দৌড়তে শুরু করলো।
এমন মনকাড়া অনুভূতি আর কোথাও খোঁজে পাইনা।