১৯৩৯ সালে জাপানের ফুকুশিমা থেকে ১৪০ মাইল দূরে একটি পাহাড়ি শহর মিহারুতে জন্ম হয় তাঁর। অল্প বয়সে সে পাহাড়কে ভালবেসে ফেলেছিল। পাহাড়-পর্বত নিয়ে স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছিল। ক্লাইম্বিংয়ে আগ্রহ থাকলেও, পরিবারের পক্ষে তার এই অভিজাত শখ পূরণের সামর্থ ছিল না। এমনিতেই সাত ভাইবোনের সংসারে অভাবের ছাপ সর্বত্র। খাবার জোটে তবে অতিকষ্টে। সবাই তাকে বোঝান, পাহাড় চড়া বড়লোকদের খেলা। অত পয়সা তাদের কই! বাড়ির লোকেরা বলেন, হয় পড়াশুনা করো, না হয় হাতের কাজে মন দাও। কিন্তু পাহাড় যে তাকে সারাদিন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। রোগা-পাতলা মেয়েটা আস্তে আস্তে যেন পালটে যায়। যত বড় হয় জেদি হয়ে ওঠে সে। একদিন ঠিক করে ফেলে পাহাড়ে সে যাবেই। বরফে ঢাকা সাদা পাহাড়। তার ওপর উঠে তাকিয়ে দেখবে নীচের পৃথিবীটাকে।
স্কুল শেষ করে শোয়া ওমেনস ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক হলেন সেই তিনি। সামান্য টাকা জোগাড় করতে পারলেই ছুটে যান পাহাড়ে। জাপানের কয়েকটি শৃঙ্গও আরোহণ করে ফেললেন কেবলমাত্র স্কি-পোল নিয়ে। সে যুগে বিভিন্ন দেশের পুরুষরাই সাধারণত পর্বতারোহণে আসতেন। তার ওপর একটা গরিব মেয়ের পাহাড়ে চড়ার দাপট তাই মেনে নিতে পারেনি জাপানের ধনী পুরুষ পর্বতারোহীরা। পদে পদে হেনস্থা হতে হয়েছিল তাঁকে।
তাঁর ইউনিভাসিটিতে ছেলে শিক্ষার্থীদের একটা গ্রুপ ছিল। সেখানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার, কিন্তু দেননি। ১৯৬৯ সালে গ্র্যাজুয়েশনের পরে তিনি লেডিস ক্লাইমবিং ক্লাব: জাপান (এলএলসি) প্রতিষ্ঠা করলেন। এই প্রতিষ্ঠানটির স্লোগান ছিল- চলো নিজেরাই একটা বিদেশি অভিযানে যাই। ওই ক্লাবটা তৈরি করার পিছনের কারণ তাঁর প্রতি পুরুষ পর্বতারোহীদের আচরণ।
এলএলসি’র অভিযানের জন্য দলের স্পন্সর খোঁজার দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর ওপর। অনেক চেষ্টা করেও পাচ্ছিলেন না। তাঁকে তখন প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে, এসব না করে মেয়েদের উচিত বিয়ে করা, সন্তান পালন করা। টাকা বাঁচাতে তারা রিসাইকেল গাড়ির সিট ব্যবহার করতেন ছোট ছোট ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ বানাতে। চায়না থেকে রাজহাঁসের পালক কিনেছিলেন, সেগুলো দিয়ে নিজেদের স্লিপিং ব্যাগ বানিয়েছিলেন তারা।
ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন জুনকো তাবেই। তিনি জানান, যখন তাঁর সন্তানের বয়স তিন বছর, ওই সময়ে জাপানের মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া বারণ ছিল। তারা ঘরে রান্না করবে আর স্বামী ও পরিবারের লোকেদের চা এগিয়ে দেবে- এই তাদের কাজ। জুনকো তাবেই স্বামী, সন্তান ফেলে ভিনদেশের পাহাড়চূড়ায় উঠতে যাবে শুনে ফুকুশিমা উপত্যকায় ঢি ঢি পড়ে গেল। সমস্যা হল পাড়া-প্রতিবেশীদের না হয় সামলানো গেল, কিন্তু এত ছোট্ট বাচ্চা রেখে কীভাবে পাহাড়ে যাবে জুনকো? সাহস জোগালেন স্বামী মাসানুভো তাবেই। তিনি নিজেও পাহাড়ে উঠতে পছন্দ করতেন। সেই স্বামীর ভরসায় বোনের কাছে বাচ্চাকে রেখে জুনকো তাবেই রওনা হয়েছিলেন এভারেস্ট প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে।
এভারেস্ট অভিযানের জন্য তিল তিল করে তৈরি হন জুনকো। কিন্তু তখনও জোগাড় হয়নি স্লিপিং ব্যাগ, ওয়াটারপ্রুফ গ্লাভস, ট্রাউজার আর ব্যাকপ্যাক। চিন থেকে সস্তায় হাঁসের পালক কিনে নিজেই সেলাই করে তৈরি করে নিলেন স্লিপিংব্যাগ। পুরনো পর্দার কাপড় কেটে তৈরি করলেন ট্রাউজার।

কিন্তু তাতেও সব সমস্যার সমাধান হল না। নতুন সমস্যা গ্লাভস আর ব্যাকপ্যাক নিয়ে। সেগুলো কেনার টাকাও যে নেই হাতে। কিন্তু হাল ছাড়ার মানুষ নন জুনকো। প্রতিবেশীর বাতিল গাড়ির সিট-কভারের রেক্সিন দিয়ে তৈরি করে নিলেন জলনিরোধক ব্যাগ আর দস্তানা। হাতের কাজের শিক্ষা এতদিনে কাজে এল। এভারেস্টের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় এই নিয়ে যুদ্ধে নামবেন জুনকো। যা আজকের যুগে অকল্পনীয়।
দীর্ঘ ট্রেনিংয়ের পর, ১৯৭৫ সালে কাঠমান্ডু দিয়ে জুনকো তাবেই ও তাঁর দলের অভিযান শুরু হয়। তাবেই ছিলেন দলের ডেপুটি লিডার। ১৯৫৩ সালে স্যার অ্যাডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নরগে যে পথে এভারেস্টে ওঠেন তারা সেই পথই অনুসরণ করেন। মে মাসের শুরুর দিকে তারা যখন মাটি থেকে ৬,৩০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প করেন, একটা বরফ ধ্বস তাদের ক্যাম্প তছনছ করে দেয়। দলের গাইড এবং মেয়েরা বরফের নীচে চাপা পড়ে যায়।
তাবেই ঠিক ৬ মিনিটের জন্যে অজ্ঞান ছিলেন, ততক্ষণে তার শেরপা গাইড তাঁকে বরফের নিচ থেকে বের করে আনেন। বরফ ধ্বসের ১২ দিন পর, ১৯৭৫-এর ১৬ মে শেরপা আন শেরিং’কে সঙ্গে নিয়ে জুনকো তাবেই পৃথিবীর প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়া জয় করেন।
তখন এভারেস্টের নীচে থেকে ওপর পর্যন্ত দড়ি ফিক্সড করে রাখার ব্যাপার ছিল না। আইসফল ডাক্তাররাও ছিলেন না অ্যালুমিনিয়ামের মই নিয়ে। স্যাটেলাইটের পাঠানো ওয়েদার রিপোর্ট ছিল না। এভারেস্টের ক্যাম্পে ক্যাম্পে এজেন্সির ফাইভ-স্টার আতিথেয়তা ছিল না। কিন্তু তা স্বত্বেও সব বাধা পেরিয়ে জুনকো তাবেই ১৯৭৫ সালের ১৬ মে ৩৫ বছর বয়সে বিশ্বের প্রথম মহিলা পর্বতারোহী হিসাবে এভারেস্টে পা রেখেছিলেন। ১৯৯২-এর মধ্যে সপ্তশৃঙ্গ জয় করেন তিনি। তাঁর প্রথম পর্বত আরোহন ছিল মাউন্ট নাসু। শেষবার মাউন্ট ফুজিতে উঠেছিলেন ২০১১ সালে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৭৭ বছর বয়সে জাপানের টোকিওতে ২০১৬ সালের অক্টোবারে মৃত্যু হয় তাঁর।
জুনকো তাবেই-এর সংগ্রামের কথা জানলামীই লেখাটি পড়ে, অসংখ্য ধন্যবাদ পেজফোরকে এবং লেখককে।
এতো শুধু শৃঙ্গ জয় নয়, জীবনযুদ্ধ জয়, ইতিহাস সৃষ্টি…
অজানা তথ্য,সমৃদ্ধ করলো।
চমৎকার একটি বিষয়কে অতি চমৎকার করে উপস্থাপন, সত্যি ভাল লেখা।
আকালেও স্বপ্ন দেখা যায়, চাইলে তাকে সত্যি করাও সম্ভব-প্রমাণ করেছেন জুনকো তাবেই। সুন্দর লেখা।