কয়েক মাস ধরেই কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে কানাঘুষো চলছিল বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় পদত্যাগ করবেন এবং রাজনীতিতে যোগ দেবেন। রবিবার সেই জল্পনার অবসান তিনি নিজেই ঘটালেন। এমন ঘটনা এই প্রথম নয়, এর আগেও আদালত থেকে রাজনীতিতে এসেছেন অনেকে, যাদের মধ্যে আছেন এ এম থিপসে, বিজয় বহুগুণা, এম রামা জোয়েস, রাজিন্দর সাচার প্রমুখ। অন্যদিকে রাজনীতিকে বিদায় জানিয়ে বিচারকার্যের ভার নিয়েছেন অনেকে, এঁদের মধ্যে কে এস হেগড়ের কথা বলাই যায় যিনি রাজ্যসভায় ইস্তফা দিয়ে গুজরাত হাইকোর্টের বিচারপতি পদে যোগ দিয়েছিলেন, অবসরের পর ফের তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন। উদাহরণ অসংখ্য সেই তালিকা লম্বা করার অর্থ আসল বক্তব্য থেকে সরে যাওয়া।
অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় পদত্যাগ করছেন এই ঘোষণার পর থেকেই অবশ্য চর্চা শুরু হয়েছে, কোন রাজনৈতিক দলে তিনি যোগ দিচ্ছেন, তিনি কি লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট কোনও উত্তর তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে গত কয়েকমাস ধরে তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যে বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে রাজনীতির রণাঙ্গনে পা রাখার প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন তা অনেকেই জানেন। কেবল তাই নয়, তিনি আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। গত দু-তিন মাস ধরে তাঁর সঙ্গে বাম এবং গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আলাপ আলোচনা চলছিল সেটাও ভীষণ সত্যি। জানুয়ারি মাসে তিনি গোপনেই দু-এক জন বাম নেতার সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, তাঁকে বিজেপির হয়ে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিনি একদিকে যেমন নিজের ভোটযুদ্ধে লড়াইয়ের ইচ্ছের কথা জানান অন্যদিকে নিজের ওজনটাও বাড়িয়ে রাখেন। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে গোপন বৈঠক হয়।
বিচারপতি পদ ছেড়ে এবার ভোটের লড়াইয়ে যে নামতে চলে চলেছেন সে কথা বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলার পাশাপাশি তিনি এও জানান যে তাঁর রাজনীতিতে আসার প্রধান কারণ হল শাসকদল তৃণমূল। শাসকদলই তাঁকে বাধ্য করেছে রাজনীতিতে আসতে। তিনি তৃণমূল জামানাকে ‘চৌর্য সাম্রাজ্য’ বলে কটাক্ষও করেছেন। অতএব তিনি যে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেবেন না তা বলাই বাহুল্য। তাহলে কি বরাবর নিজেকে বামপন্থী বলে ব্যক্ত করা বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় সিপিএমে যোগ দিয়ে লোকসভার ভোটে প্রার্থী হচ্ছেন? এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক কারণ, তিনি খোলা এজলাসেই সিপিএম সাংসদ তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের উচ্ছসিত প্রশংসা করতেন। উল্লেখ্য, এজলাসে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত-র সঙ্গে বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের তুমুল তর্কের সময় অ্যাডভোকেট জেনারেল প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ‘আপনি বিজেপির হয়ে লোকসভা ভোটে লড়ছেন বলে আমাদের কাছে খবর আছে’। নিজেকে প্রকাশ্যে বামপন্থী মনোভাবাপন্ন বলা বিচারপতি এর উত্তরে জানিয়েছিলেন, ‘কেউ কখনও তাঁকে ভোটে দাঁড়ানোর জন্য যোগাযোগ করেনি।’ তাই অনেকেই ভাবতে পারেন, বিচারপতির পদ ছেড়ে তিনি কি আদৌ পদ্ম শিবিরে যোগ দিয়ে ভোটে লড়বেন। তা যদি নাও হয়, বাম মনোভাবাপন্ন অভিজিত যদি সিপিএম থাকে টিকিট নেন, তাতেও কি শুধু নিজের ক্যারিশমায় জয়ী হতে পারবেন? মনে হয় সেটাও অসম্ভব। কারণ, সিপিএমের টিকিটে দাঁড়িয়ে নিজেকে চ্যালেঞ্জ করাটা যে আদৌ ঠিক হবে না সেটা তিনি ভাল করেই জানেন।
অন্যদিকে কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী আগ বাড়িয়ে তাঁর হয়ে যতই গাল ভরা কথা বলুন না কেন, এ রাজ্যে তাঁদের অস্তিত্ব যে বিপন্ন তাও তিনি ভালই জানেন। তাছাড়া তিনি ক্ষমতায় থাকতে চান তাই ওই দলের হয়ে ভোটে লড়ে হারতে তিনি কেন রাজি হবেন। আবার তৃণমূলের চ্যালেঞ্জের জবাব দিতেই যখন তিনি রাজনীতিতে নামছেন এবং লোকসভা ভোটে প্রার্থী হচ্ছেন, তাহলে কেন দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা বা ডায়মন্ড হারবার আসন থেকে নির্বাচনে লড়বেন না? বিচারপতি হিসাবে সবসময় তাঁর সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তৃণমূল বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার, বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিষয়েই তিনি বারবার ক্ষুরধার সমালোচনা করেছিলেন, এমনকী আদালত অবমাননার দায়ে অভিষেককে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছিলেন। না এখানেও তিনি যে হালে পানি পাবেন না সেটা ভাল করেই জানেন। বরং এখন পর্যন্ত যা খবর, তিনি বুধবার বারাসতে মোদীর মঞ্চ থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রির কাছ থেকে গেরুয়া পতাকা হাতে তুলে নেবেন, রাজ্যের শাসকদল তাঁকে যে খোলা ময়দানে নেমে লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ করেছে সেই চ্যালেঞ্জ তিনি গ্রহণ করেবেন এবং তমলুক থেকেই তিনি বিজেপি প্রার্থী হবেন।
কথিত আছে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় WBCS অফিসার হিসেবে নিজের চাকুরি জীবন শুরু করেও দুর্নীতির সঙ্গে আপোস করবেন না বলে, সেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন, তখনও তিনি শিক্ষা সংক্রান্ত মামলাই বেশি লড়তেন। শেষে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতির কাজে যোগদান। তারপর থেকেই তিনি আলোচনার কেন্দ্রে। সাম্প্রতিক এ রাজ্যের নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগের ঘটনায় তাঁর একের পর এক রায়ে তোলপাড় হয় রাজ্য রাজনীতি। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রাম, প্রতিটি জায়গায়। বাংলার গর্ব বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় — কিছুদিন আগে বেহালার একটি অঞ্চলজুড়ে এই হোর্ডিং দেখা গিয়েছিল। এলাকার নাগরিকদের তরফে সেই হোর্ডিং দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। সেখানে এক যুবক তাঁকে বলেছিলেন, বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় একজন ভগবান। কিন্তু অবসরের কয়েক মাস বাকি থাকতেই তিনি ইস্তফা দিলেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই কারণ, বঙ্গে এমন নাটকীয় পটপরিবর্তন হামেশাই ঘটে।