একাদশ লোকসভা ভোটের কথা মনে পড়ছে। ১৯৯৬ সাল। ১৯৮৯ ও ১৯৯১-এর মতো ফের লোকসভা ত্রিশঙ্কু হলো। বিজেপি ১৬১ (২০.২৯ শতাংশ) ও কংগ্রেস ১৩৬ (২৮.২ শতাংশ) আসন পেল। কী হবে? ভি পি সিং, মুলায়ম, লালুপ্রসাদ, করুণানিধি প্রমুখ নেতারা বললেন একটানা ১৯ বছর ধরে একটা রাজ্যে কোয়ালিশন সরকার চালিয়ে দৃষ্টান্ত ও দক্ষতা দেখিয়েছেন জ্যোতি বসু। তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী করা হোক। বিরোধী নেতাদের এই প্রস্তাব নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৩ মে সিপিআইএম কেন্দ্রীয় কমিটি বৈঠকে বসে। বৈঠকে ভোটাভুটি হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বলেন, পার্টি কর্মসূচি অনুযায়ী দল কোনও অঙ্গরাজ্যের সরকারে যোগ দিতে পারে। কিন্তু বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্রের প্রতিভূ কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দিতে পারে না। এই যুক্তি দেখিয়ে জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রিত্বে বাধা দেয় সিপিআইএম। কেরল, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য না-এর পক্ষে ভোট দেন। সিদ্ধান্ত শুনে ভি পি সিং পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। পরদিন ফের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক বসে। কয়েকজন দিল্লি ছেড়ে বিমানে স্বরাজ্যে ফিরে গিয়েছিলেন। টেলিফোনে তাঁদের মতামত নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দিনের ভোটাভুটিতেও একই সিদ্ধান্ত হয়। সাধারণ সম্পাদক সুরজিৎ, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রমুখ সরকারে যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। জ্যোতি বসু দলের এই সিদ্ধান্তকে ৭ মাস পরেই ঐতিহাসিক ভুল বলেছিলেন। একটি ইংরেজি দৈনিকে ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত জ্যোতি বসুর সাক্ষাৎকারে তাঁর এই মন্তব্য জানা গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ পার্টিতে তখন শ্যামল চক্রবর্তী, গৌতম দেব, সমীর পুততুণ্ড প্রমুখ জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দেওয়া ভুল হয়েছে, সে কথা আগেই বলেছিলেন। কিন্তু জ্যোতি বসু কোনও উপদল গড়তে চাননি।
জ্যোতি বসু যদি সেদিন প্রধানমন্ত্রী হতেন তাহলে কী হতো? ২৪ বছর আগে জাতীয় রাজনীতির ছবিটা একটু খেয়াল করতে হবে। সিপিআইএম জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি না হওয়ায় ১৯ মে বাজপেয়ী সরকার গড়েন, ১৩ দিন সেই সরকার টিকেছিল। ১ জুন হারদানাহাল্লি ডড্ডেগৌড়া দেবেগৌড়া প্রধানমন্ত্রী হন। কংগ্রেস বাইরে থেকে সমর্থন করে। সেই সরকারে সিপিআই যোগ দিয়েছিল। লোকসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের দায়ে সে বছরের নভেম্বর মাসে পি ভি নরসিংহ রাওকে কংগ্রেস সভাপতির চেয়ার থেকে টানাহ্যাঁচড়া করে নামিয়ে দেওয়া হয়। সভাপতি হন সীতারাম কেশরী। ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে সীতারাম বলেন, কংগ্রেসের কথাকে দেবেগৌড়া গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তাঁকে সরাতে হবে। তখন সুরজিৎ প্রস্তাব করেন, ইন্দ্রকুমার গুজরালকে মেনে নিন। কংগ্রেস রাজি হয়। ২১ এপ্রিল গুজরাল শপথ নেন। ১৫ মাস পরে কংগ্রেস ফের একটা ছুতো তোলে। রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত হয়েছিল বিচারপতি মিলাপ চাঁদ জৈন কমিশন। সেই কমিশন কয়েকটি অন্তর্বর্তী রিপোর্ট দিয়েছিল। সেই রিপোর্টে শ্রীলঙ্কার এলটিটিইকে মদত দেওয়ার অভিযোগ ছিল ডিএমকের বিরুদ্ধে। ডিএমকের তিন মন্ত্রী গুজরাল সরকারে ছিল। ওই অজুহাত তুলে কংগ্রেস গুজরাল সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। তারিখ ২৮ নভেম্বর ১৯৯৭। মজার কথা হলো, জৈন কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্টে ডিএমকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল না। সেই রিপোর্ট সংসদে পেশ করেছিলেন এনডিএ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এল কে আদবানি। ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী চেন্নাইয়ে গিয়ে করুণানিধির সঙ্গে দেখা করেন, ডিএমকের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা চান, হয়ও। মনমোহন সিং সরকারে ডিএমকের মন্ত্রীরা ছিলেন। দেবেগৌড়া ও গুজরালের বিরুদ্ধে কংগ্রেস যে ছুতোয় সমর্থন তুলেছিল, তা কিন্তু জ্যোতি বসুর সরকারের বিরুদ্ধে পারত না বলে মনে হয়। কারণ, ব্যক্তিত্বের পার্থক্য। জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হলে তদানীন্তন কংগ্রেসের দ্বিতীয় স্থানাধিকারী ব্যক্তি প্রণব মুখোপাধ্যায় মনে হয় সীতারাম কেশরীকে আটকাতেন। কেউ বলতে পারেন বঙ্গজ-প্রীতি।
জ্যোতি বসুর সেই সরকারে ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, চতুরানন মিশ্র, মুলায়ম, লালুপ্রসাদ, রামবিলাস পাসওয়ান, মুরোসিলি মারান, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ হয়তো মন্ত্রী হতেন। প্রশ্ন হলো, সেই সরকার কী করত?
১) ভূমি সংস্কার আইন সারা দেশে জোরদারভাবে কার্যকর হতো।
২) রেল, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন কারখানা-সহ পাতালের কয়লা উত্তোলন থেকে আকাশের উড়োজাহাজের মালিকানা বেসরকারিকরণের প্রশ্নই উঠতো না।
৩) কুশলী জ্যোতি বসু হয়তো মনমোহন সিংকে ফের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর এবং প্রণব মুখোপাধ্যায়কে যোজনা কমিশনের ফের ডেপুটি চেয়ারম্যান করে দিতেন।
৪) সেই সরকার চালাতে স্টিয়ারিং কমিটিতে সীতারাম কেশরী ও প্রণব মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে নিতেন।
৫) বিদেশি ও আরও কিছু বেসরকারি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ হতো। বিজয় মালিয়া, নীরব মোদীর মতো ব্যাক্তিরা জনগণের টাকা চুরি করতে পারতো না।
৬) খনিজ তেলের সন্ধান ও উত্তোলনে ওএনজিসিকে জোরদার করা হতো।
৭) নেহরুর আমলে তৈরি রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতো।
৮) ওষুধ ব্যবসায় বিদেশি কোম্পানির রমরমা বন্ধ করতে আইডিপিএলকে জোরদার করতেন। সেক্ষেত্রে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর আমলে হাতি কমিশনের সুপারিশ টানতেন।
৯) দেশীয় শিল্পপতিরা চট, কাপড়, সিমেন্ট, গাড়ি তৈরি ইত্যাদি কারখানা চালাতে পারতেন। কিন্তু একইসঙ্গে বড়ো শিল্পপতিদের একচেটিয়া পুঁজির অবাধ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে এমআরটিপি আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতেন।
১০) কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের নতুন দিগন্ত খুলে যেত। মিনিমাম গভর্নমেন্ট ম্যাক্সিমাম গভর্ন্যান্স সত্যিকারের দেখা যেত। রাজ্যগুলি থেকে আয়কর ও কর্পোরেট কর বাবদ সংগৃহীত টাকার ৬০ শতাংশ রাজ্যগুলি পেত।
১১) তোতাপাখি সোনার খাঁচা থেকে মুক্তি পেত। দুর্নীতি বন্ধ হতো বলছি না, তবে বিরোধী নেতাদের সিবিআইয়ের ফাইল দেখিয়ে চাপ দেওয়ার খেলা জ্যোতি বসু করতেন না।
১২) বিপিএলের সংখ্যা কমতো। তবে বৈষম্য, বেকারি, দারিদ্র্য থাকতো না, এমন কথা কিন্তু বলছি না। তবে যা চলছে তার থেকে ভালো হতো। বামপন্থীরা হয়তো বহু রাজ্যে শক্তিবৃদ্ধি করতে পারতেন।
জ্যোতি বসু সেই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক ভুল বলার পরে ১৯৯৮ সালের ৫ থেকে ১১ অক্টোবর কলকাতা পার্টি কংগ্রেসে দলের সিদ্ধান্ত বিপুল ভোটে সমর্থিত হয়েছিল। এর পিছনে ছিল প্রকাশ কারাটের খেলা। কিন্তু মজার ব্যাপার ঘটলো ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে। জয়ললিতা বাজপেয়ী সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করায় আস্থা ভোটে সরকার ১ ভোটে হেরে গিয়েছিল। সে সময় রাজনৈতিক সঙ্কটে ফের জ্যোতি বসুর নাম ভেসে ওঠে। তখন কিন্তু সিপিআইএমের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজি হয়ে যান। কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর আপত্তিতে প্রস্তাবটি আর এগোয়নি। সেই শিক্ষা নিয়ে ২০০০ সালের আগস্টে তিরুবনন্তপুরমে অনুষ্ঠিত দলের বিশেষ প্লেনারি অধিবেশনে পার্টি কর্মসূচির ১১২ নম্বর ধারা সংশোধিত হয়। বলা হয়, সুযোগ এলে দল কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দিতে পারে।
এই লেখক ১৯৯৬ সালের মে মাসে আজকাল পত্রিকায় সিপিআইএম কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। লিখেছিলাম, ক) পার্টি কর্মসূচির ধারা ভেঙে কী করে জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হবেন? খ) সেই সরকারের চরিত্র কী হবে? বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক না গণতান্ত্রিক? তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রে কমিউনিস্টরা বুর্জোয়া দলের সমর্থনে গণতান্ত্রিক সরকার গড়তে পারে? জনগণতান্ত্রিক ধাপের আগের ধাপ?
কে জ্যোতি বসু? আদি বাড়ি ঢাকার বারদি গ্রামে। জন্ম ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই। বাবা ডা. নিশিকান্ত বসু। মা হেমলতা বসু। লরেটো ও সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে পড়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি অনার্স পাশ করেন। নাম ছিল জ্যোতিরিন্দ্র বসু, ডাক নাম গনা। ১৯৩৫ সালে ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত যান। তখন সেখানে ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীরা গড়ে তুলেছিলেন লন্ডন মজলিস। জ্যোতি বসু তার প্রথম সম্পাদক। ১৯৩৮ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু লন্ডনে যান। জ্যেতিবাবু তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। নেতাজি জিজ্ঞেস করেছিলেন দেশে ফিরে কী করবে? জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির হোলটাইমার হবো। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি মার্ক্সবাদে দীক্ষিত হয়েছেন। নেতাজি তাঁকে বলেছিলেন, মনে রেখো পলিটিক্স ইজ নট এ বেড অব রোজেস।
১৯৪০ সালে ব্যারিস্টারি পাশ করে তিনি দেশে ফেরেন। মুজফফর আহমেদের নির্দেশে শ্রমিক ফ্রন্টে কাজ শুরু করেন। সিপিআই-এর সদস্য হয়ে নিজের যোগ্যতা দেখিয়ে দলের পলিটব্যুরোর সদস্য হন। ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত সিপিআই-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক ছিলেন। একই সঙ্গে বিধানসভার বিরোধী নেতাও ছিলেন। এই সময়টায় ছিল বাংলার গণ আন্দোলনের স্বর্ণযুগ।
১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে রেল শ্রমিক কেন্দ্র থেকে তিনি সিপিআই প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। তারপর স্বাধীন ভারতেও ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এবং ১৯৭৭ থেকে এপ্রিল ২০০১ পর্যন্ত তিনি বিধায়ক ছিলেন। এই সময়কালে ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারের তিনি উপ মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৭৭ সালের ২১ জুন তিনি বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। একটানা ৮,৫৪০ দিন মুখ্যমন্ত্রী থেকে রেকর্ড গড়েন। তারপর শারীরিক কারণে অবসর নেন ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর। অবসর গ্রহণের বিকেলে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তাঁকে দেওয়া সংবর্ধনা সভায় জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, শারীরিক কারণে মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়ছি, কিন্তু আজীবন মানুষের স্বার্থে রাজনীতি করে যাব। ২০০১ সালের মে মাসে বিধানসভা ভোটে ওই গরমে সকালে উত্তরবঙ্গ থেকে ফিরে বিকেলে আবার বাঁকুড়ায় যান নির্বাচনী প্রচারসভায়। এই হলেন জ্যোতি বসু। ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি প্রয়াত হন।
খুব ভালো লেখা