সেই বামফ্রন্ট সরকারও নেই, নেই কমরেডদের সর্বব্যাপী আধিপত্যও। হারতে হারতে এখন এককালের দাপুটে দলের বিধানসভায় নেই কোনো প্রতিনিধি। কিন্তু রয়ে গেছে ইতিহাস। ২১ জুন ১৯৭৭ সালে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠনের ৪৫ বছর পূর্তি হয়ে গেল। এই সূত্রেই মনে আসে জ্যোতি বসুর নাম, আর সিপিএমের পরপর বুদ্ধিহীন সিদ্ধান্তের নানা কাহিনি।
প্রধানমন্ত্রী হবার প্রস্তাব পেয়েও না হতে পারার বিশ্বরেকর্ড কার? সম্ভবত জ্যোতি বসুর। সাড়ে চারবার তিনি এহেন সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু একদিনের জন্যও প্রধানমন্ত্রী হননি। ‘সাড়ে’ কেন বলছি? সেটাই বলব আজকে। বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছর পরে ফিরে দেখা যেতে পারে সেই অদ্ভুত ইতিহাসের দিকে।
কত বছর পার হয়ে গেল বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠার। মনে পড়ে ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ফেটে পড়ার কাহিনি। তার ফলশ্রুতিতেই ১৯৭৭ সালের লোকসভা ও তার পরে এ রাজ্য সহ নানা রাজ্যের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটে। এ রাজ্যে সেবার বিধানসভা ভোট হয়েছিল জুন মাসে। বামফ্রন্ট বিরাট গরিষ্ঠতা পায়। ১৯৭৭ সালের ২১ জুন প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। তারপর সাড়ে চার দশকে গঙ্গা তিস্তা দিয়ে কত জলই না গড়িয়ে গেছে। ভালোর তুলনায় ভালো না লাগার পাল্লা ভারী হয়ে যাবার পরিণতিতে রাজ্যবাসী বিদায় দিয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারকে। তারপর একটানা পতন চলছে তো চলছেই। কিন্তু বাম জমানার প্রথম কান্ডারি জ্যোতিবাবুর নানা কীর্তি থেকে গেছে অমলিন। আমাদের সাধারণ চর্চায় ১৯৯৬ সালের ঘটনা ও জ্যোতি বসুর ‘ঐতিহাসিক ভুল’ মন্তব্য বারবার সামনে এলেও আরও অনেক বার দেশের কান্ডারি হবার সুযোগ এসেছিল তাঁর সামনে। ইতিহাসের অন্তরঙ্গ চর্চায় সেসব কথা রয়ে গেছে।

১৯৮৯ – বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের সরকার
১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের নেতৃত্বে কেন্দ্রে সরকার হয়, বাইরে থেকে সমর্থন করেছিল বিজেপি ও বামেরা। পরের বছর, ১৯৯০-এর শেষ দিকে বিজেপি নেতা আদবানি রামমন্দির রথযাত্রা শুরু করেন, দেশ জুড়ে দাঙ্গা শুরু হয়, মাসখানেক পরে আদবানি বিহারে গ্রেফতার হন। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ-র সরকার থেকে বিজেপি সমর্থন তুলে নেয়, গরিষ্ঠতা হারিয়ে বিশ্বনাথ প্রতাপ সরকার পড়ে যায়। এহেন ডামাডোলে দেশের হাল ধরার জন্য রাজীব গান্ধি জ্যোতি বসুর কাছে প্রস্তাব পাঠান, এমনটাই জানিয়েছেন প্রাক্তন আমলা অরুণ প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, তাঁর লেখা বইয়ে। অরুণবাবু এ রাজ্যের ডিজিপি, পরে সিবিআই-এর ডিরেক্টর, কেন্দ্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের স্পেশাল সেক্রেটারি, তারও পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্তর উপদেষ্টা হয়েছিলেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনী Unknown Facets of Rajiv Gandhi, Jyoti Basu, Indrajit Gupta নামের বইয়ে লিখেছেন, একবার নয় অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’বার এমন প্রস্তাব করা হয়েছিল।

পরপর দু’বার প্রধানমন্ত্রী হবার প্রস্তাব
১৯৯০ সালের অক্টোবরে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের সরকার পড়ে গেলে কংগ্রেস সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা জানত, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার গড়া মুশকিল, প্রায় অসম্ভব। ফলে তারা এমন একজন নেতাকে খুঁজছিল, যাকে দেশের মানুষ শ্রদ্ধা করে। অরুণবাবু জানাচ্ছেন, রাজীব গান্ধির তালিকায় তিনজনের নাম ছিল, প্রথম জ্যোতি বসু, শেষ জন চন্দ্রশেখর। সেই অনুযায়ী রাজীব গান্ধি বিশ্বস্ত দূত মারফত প্রধানমন্ত্রী হবার প্রস্তাব পাঠান জ্যোতি বসুকে। জ্যোতি বসু সব শুনে বলেছিলেন, এই ব্যাপারে আমি দলে আলোচনা করব। কিন্তু সিপিএম নেতারা সে প্রস্তাব মানেননি, পত্রপাঠ নাকচ করে দেন। পরিণতিতে কংগ্রেসের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন চন্দ্রশেখর সিংহ। ৭ মাস পরে সামান্য অজুহাতে কংগ্রেস সমর্থন তুলে নেয়, চন্দ্রশেখর সরকার পড়ে যায় ৬ মার্চ ১৯৯১। রাজীব গান্ধি আবার জ্যোতি বসুকে খবর পাঠান, জানিয়েছেন অরুণ প্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু এবারও সিপিএম নেতাদের অধিকাংশ বেঁকে বসেন, গোঁড়া মার্কসবাদীরা দেশের বাস্তবতা বুঝতে পারেননি। ফলে সরকার গড়া হয় না, চলে আসে ১৯৯১ সালের লোকসভা ভোট।

নরসিংহ রাও জমানা
১৯৯১ সালে লোকসভা ভোট চলাকালীন রাজীব গান্ধি খুন হয়ে যান। জ্যোতি বসু তাঁর ‘যতদূর মনে পড়ে’ বইয়ে লিখেছেন,
‘২০ মে (১৯৯১) প্রথম দফার নির্বাচন সব শেষ হবার পরের দিনই রাজীব গান্ধি তামিলনাড়ুর পেরেমবুদুরে খুন হয়ে গেলেন। এলটিটিই জঙ্গিরা ওনাকে যেভাবে হত্যা করল তা এককথায় বীভৎস, ভয়াবহ ও নিন্দার যোগ্য। সারা দেশ শিউরে উঠেছিল ও ঘটনায়। একজন তরুণ রাজনীতিবিদের এরকম পরিণতি সারা দেশকেই দুঃখিত করেছিল। কিন্তু এর ফলে নির্বাচনের চরিত্র পাল্টে যায় এবং একই নির্বাচনকে দুটি নির্বাচনে পরিণত করে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে রাজীবের মৃত্যুর ফলে সহানুঊতির ঢেউ কংগ্রেস-আই এর পক্ষে যায়। রাজীব গান্ধি যদি মারা না যেতেন, তাহলে কংগ্রেস (আই) দল ২১৮টি আসন পেত না।’
সহানুভূতির হাওয়ায় কংগ্রেসের ভালো ফলের উপর সওয়ার হয়ে আরও কিছু দলের সমর্থন নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নরসিংহ রাও। নরসিংহ রাও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে পাঁচ বছর সরকার চালান। পাঁচ বছর পরে ১৯৯৬-এর ভোটে কংগ্রেসের ফল খারাপ হলে আবার জ্যোতি বসুর কাছে একই প্রস্তাব আসে।

তৃতীয় ও সাড়ে-তৃতীয় প্রস্তাব
১৯৯৬-এ কোনো দল বা জোট অর্ধেকের বেশি আসন পায়নি। এই অবস্থায় কংগ্রেস সহ প্রায় সব বিজেপি বিরোধী শক্তি জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিল। কিন্তু সিপিএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটি দু’বার ভোটাভুটি করে সে প্রস্তাব ভেস্তে দিল। প্রথমবার এই সিদ্ধান্ত জানাতে গেলে বন্ধু দলেরা সিপিএমকে পুনর্বিবেচনা করতে বলে। ফলে পরের দিন সিপিএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটি আবার বৈঠকে বসে, কিন্তু জ্যোতি বসু, হরকিষেন সিংহ সুরজিত সহ বরিষ্ঠ নেতাদের যুক্তি অগ্রাহ্য করে সরকারে না যাবার মতই আঁকড়ে থাকে। কিছুদিন পরে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘ঐতিহাসিক ভুল’ করেছে দল। যাই হোক, বাধ্য হয়ে এইচ ডি দেবগৌড়াকে প্রধানমন্ত্রী বাছা হলো।
এই সময়েই ঘটে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। শপথ নেবার ঠিক আগে দেবগৌড়া এক চিঠি লেখেন জ্যোতি বসুকে। চিঠিতে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে জ্যোতি বসুকে হাল ধরার অনুরোধ করেন। কিন্তু দলে সংখ্যালঘু জ্যোতিবাবু তা নিয়ে অগ্রসর হতে চাননি। এ বিষয়ে বিশদ তথ্য ও দেবগৌড়ার চিঠিটি পাওয়া যায় সুরভি ব্যানার্জির লেখা Jyoti Basu – The Authorised Biography গ্রন্থে।

চতুর্থ প্রস্তাব
১৯৯৬ সালে শপথ নেওয়া দেবগৌড়া সরকার বেশিদিন টেকেনি। ১৯৯৭-এ আই কে গুজরাল প্রধানমন্ত্রী হন, ১৯৯৮-এর মার্চে সেটাও পড়ে যায়, লোকসভা নির্বাচন অনিবার্য হয়ে পড়ে। সে বছর লোকসভা ভোটে বিজেপি আগের থেকে ভালো ফল করে, প্রধানমন্ত্রী হন বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়ি। কিন্তু ১৩ মাস পরে এআইএডিএমকে সমর্থন তুলে নিলে সংসদে আস্থা ভোট হয়, মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে বাজপেয়ি সরকার পড়ে যায়। এই সময়ে, ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে তৃতীয় ফ্রন্টের দলগুলো, বিশেষ করে মুলায়ম সিংহ যাদব আবার জ্যোতি বসুর নাম উত্থাপন করেন। এবার কিন্তু সিপিএম রাজি হয়ে গেল। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, ১৯৯৮ সালে কলকাতার নজরুল মঞ্চে সিপিএমের সর্বভারতীয় সম্মেলন বা পার্টি কংগ্রেস হয়েছিল। সেই সম্মেলনেও ১৯৯৬ সালের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা ও পরে ভোটাভুটি হয়। ভোটে জ্যোতিবাবু, হরকিষেন সিংহ সুরজিত, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা হেরে যান, জেতেন প্রকাশ কারাতরা। এসব সিদ্ধান্ত ভুলে গিয়ে ১৯৯৯ সালে সিপিএম-এর রাজি হয়ে যাওয়াটাও বেশ বিস্ময়ের। তবে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে কংগ্রেস এবার বেঁকে বসল। জ্যোতিবাবুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া হলো না।
এর মাত্র দেড় বছর পরে তিনি মুখ্যমন্ত্রিত্বও ছেড়ে দেন, দিনটা ছিল ২০০০ সালের ৫ নভেম্বর। বাঙালির প্রধানমন্ত্রী হবার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে কি সেই খরা কাটবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আসন পাবেন? আগামী দু’বছর গঙ্গা যমুনা দিয়ে কত জলই না বইবে, রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু হয় কি?
Ami chai jate uni konodin PM na hon!!!