আজ প্রয়াত নেতা জ্যোতি বসুর ১০৯তম জন্মদিন। জন্ম ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই। আদি বাড়ি ঢাকার বারদি গ্রামে। বাবা ডা. নিশিকান্ত বসু। মা হেমলতা বসু। অভিজাত পরিবারের সন্তান। বাবার চেয়ে মামার বাড়ির অবস্থা ছিল আরো স্বচ্ছল। ছোটো বেলায় লরেটো ও সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে পড়েছেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি অনার্স পাশ করেন। ভালো নাম ছিল জ্যোতিরিন্দ্র নাথ বসু, ডাক নাম গনা। ১৯৩৫ সালে ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত যান। তখন সেখানে ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীরা গড়ে তুলেছিলেন লন্ডন মজলিস। জ্যোতি বসু তার প্রথম সম্পাদক। ১৯৩৮ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু লন্ডনে যান। জ্যেতিবাবু তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। নেতাজি জিজ্ঞেস করেছিলেন দেশে ফিরে কী করবে? জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির হোলটাইমার হবো। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি মার্ক্সবাদে দীক্ষিত হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক দীক্ষা গুরু ছিলেন গ্রেট বিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির হ্যারি পলিট, বেন বার্ডলে, রজনী পাম দত্ত। নেতাজি তাঁকে বলেছিলেন, মনে রেখো পলিটিক্স ইজ নট এ বেড অব রোজেস। একান্ত সাক্ষাৎকারে এই লেখককে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, সারাজীবনে তিনি হাড়ে হাড়ে নেতাজীর এই কথা টের পেয়েছেন।
১৯৪০ সালে ব্যারিস্টারি পাশ করে তিনি দেশে ফেরেন। কলকাতা হাইকোর্টের বারে নামও লেখান, দুটি মামলা বিনা পারিশ্রমিকে লড়েনও। মুজফফর আহমেদের নির্দেশে শ্রমিক ফ্রন্টে কাজ শুরু করেন। সিপিআই-এর মেম্বার হন। তকন পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পূরণ চাঁদ যোশী। নিজের যোগ্যতা দেখিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে যান। ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত সিপিআই-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক ছিলেন। একই সঙ্গে বিধানসভার বিরোধী নেতাও ছিলেন। এই সময়টায় ছিল বাংলার গণ আন্দোলনের স্বর্ণযুগ। ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ মালিকানাধীন ট্রাম কম্পানী ১ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধি করে এই জুলাই মাসেই। তাঁর বিরুদ্ধে হয়েছিল তুমুল আন্দোলন। ১৯৫৪ সালে শিক্ষক আন্দোলন। ১৯৫৬ সালে বাংলা-বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব বিরোধী আন্দোলন। ১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলন ইত্যাদি।
১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে রেল শ্রমিক কেন্দ্র থেকে তিনি সিপিআই প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। তারপর স্বাধীন ভারতেও ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এবং ১৯৭৭ থেকে এপ্রিল ২০০১ পর্যন্ত তিনি বিধায়ক ছিলেন। এই সময়কালে ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারের তিনি উপ মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৭৭ সালের ২১ জুন তিনি বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। একটানা ৮,৫৪০ দিন মুখ্যমন্ত্রী থেকে রেকর্ড গড়েন। একটানা এতদিন কোয়ালিশন সরকার চালানোর যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখানোয় ১৯৯৬ সালে লোকসভা ভোটের পর দেশের বিরোধী নেতারা তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন কিন্তু দল কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দিতে সম্মত না হওয়ায় জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন নি। তারপর শারীরিক কারণে অবসর নেন ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর। অবসর গ্রহণ করলেও তিনি বলেছিলেন, শারীরিক কারণে মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়ছি, কিন্তু আজীবন মানুষের স্বার্থে রাজনীতি করে যাব। সে কথা তিনি রেখেছিলেন। ২০০১ সালের মে মাসে বিধানসভা ভোটে ওই গরমে সকালে উত্তরবঙ্গ থেকে ফিরে বিকেলে আবার বাঁকুড়ায় যান নির্বাচনী প্রচারসভায়। এই হলেন জ্যোতি বসু। ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি প্রয়াত হন।