| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মীরার দুপুর এক স্বতন্ত্র নারীর গল্প (প্রথম পর্ব) : পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়

Reporter
পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় / ৮৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘মীরার দুপুর’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৫৩-য়। উপন্যাসটির ভেতরের গল্পের সময় ১৯৫০। অর্থাৎ আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেকার এই উপন্যাস। আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেকার এই উপন্যাস। আজ এই একবিংশ শতকের প্রথম দশকের শেষে উপন্যাসটি আমরা কিভাবে পড়বো? এই প্রায় ছদশকে যে মধ্যবিত্ত জীবন এ উপন্যাসের গল্প তা সময়ের স্রোতে অনেক পাল্টেছে, ১৯৫০-এর যদি কেউ আকস্মিক এ সময়ে চলে আসেন তাহলে কলকাতা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের এই শ্রেণির লক্ষ্য-উপলক্ষ্য, জীবনচর্যা, মূল্যবোধ, মূল্যবোধহীনতা, পরিবার সবকিছু দেখে তার অচেনাই মনে হবে। ‘মীরার দুপুর’-এ দেড়-দুটাকার ভালো পর্দার কাপড় পাওয়া যায়, আস্ত পোনা-কাটাপোনা তিনটাকা-সাড়েতিনটাকা সের, কইমাছ চারটাকা, একটাকা সিকিতে দুটো ডিম ও দুটো সিগারেট পাওয়া যায়। আবার কলেজের অধ্যাপকদের দারিদ্র্য চোখে পড়ার মতো, অসুখ হলে স্ত্রীকে ঋণ করতে বেরোতে হয়, পঞ্চাশ টাকা ঋণ পেলেই অনেক কিছু কেনা যায়। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী তাঁর প্রত্যক্ষ বাস্তবের চিত্র এভাবেই উপন্যাসের শরীরে ছড়িয়ে রেখেছেন। উপন্যাসটি উপন্যাসের মতই নিজ সামর্থের ছবি বহন করে। এ এখনকার পাঠকের কাছে অচেনা দৈনন্দিন জগৎ, যারা খণ্ডিত বাংলায় জন্মেছে তাদের কাছে তো বটেই গত চল্লিশ বছরে মধ্যবিত্ত অস্তিত্ব দ্রুততালে পাল্টেছে। কিন্তু গভীর বাস্তবে কি? আমাদের এই অব-ঔপনিবেশিক মধ্যবিত্ত অস্তিত্বে পরিবর্তনের সচলতাও শেষ পর্যন্ত এক অপরিবর্তনের বদ্ধতায় আটকে যায়। মীরার দুপর-এর গল্প, এ সময়ের ফ্রেমে এমনভাবে বলা হয়েছে, এমন সব প্রশ্নকে উপন্যাসে সামনে আনা হয়েছে যে, খুচরো সাময়িকতা পেরিয়ে এ গল্প আজকের গল্প হয়ে ওঠে।

গল্পটির কেন্দ্রবিন্দু মীরা ও তার জীবনের দ্বি-প্রহর। গল্পটা শুরু হচ্ছে মীরার স্বামীর চোখ দিয়ে মীরাকে দেখায়। “চশমা চোখে মীরাকে কত ছোট্টটি দেখায়। মনে হয় স্কুলে পড়ছে” আর চশমা না থাকলে মনে হয় “অনেক অভিজ্ঞতায় তনু মন জরানো পূর্ণবয়ষ্কা চতুরা এক নারী।” এই ভাবনায় হীরেণ যেমন থাকে তেমনি মীরাও। মীরার মনের যে বহুমাত্রিকতা, চেতন-অবচেতনের জটিল ঝালর তা হীরেণের সৃষ্টিতে পাই। চশমা পরা মীরা, না-পরা মীরা। চশমা পরা মীরার মুখের দিকে তাকিয়ে হীরেণের মনে হয়েছে, এই মুখে সেই অসহায়তা, সেই কোমলতার মধুমর্মর জেগে আছে। পুরষের কাছে নারীর সলজ্জ প্রার্থনা। সেবার স্নেহের অভিভাবকত্বের। আয়নায় নিজের হাসপাতাল প্রত্যাগত রুগীর প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে বুদ্ধিমতী মীরাকেই হীরেণ দেখে।

গল্পটি হীরেণ থেকে শুরু হয়েছে, শেষ হয়েছে হীরেণের আত্মহত্যায়। এর মাঝখানে মীরার পরিক্রমা, তার ভেতর-বাইরের নানামাত্রা আঁকা। গল্পটা আমরা বলতে চাইনা, আমরা দেখাতে চাই জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর সযত্ন নির্মাণ। প্রতিটি চরিত্রের চেহারা ও পোশাকের বর্ণনা তিনি দেন, যেমন ধরা যাক কাজের মেয়ে মালতী “লম্বা গড়ন। কালো রং। কালোপাড় ফর্সা একখানা কাপড় পরনে টান করে বাঁধা খোঁপায় মালতী কেনো মোরগ ফুল কি খয়েরি ট্যাসল হাতিয়েছে।” কিংবা আটিস্ট” লালট্রাউজার, ভায়োলেট পপলিনের হাওয়াই শার্ট গায়ে, হাওয়ায় উড়ে ক্রমশ কোঁকড়ানো লম্বা চুল, তেলহীন।” অমরেশ, পিঙ্গলচোখ, কোঁকড়ানো চুল, প্রশস্ত কাঁধ। হীরেণের চোখে মীরা উন্মুক্ত কৃপাণের মতো প্রখর ভ্রূযগল,,ফটিকের মতো স্বচ্ছ কালো চক্ষু ও বুদ্ধি মার্জিত পরিচ্ছন্ন একটি চিবুক।” কয়েকটি মানুষের ডায়ালগের ছকে উপন্যাসটি দাঁড়িয়ে, ওই সংলাপের মধ্যদিয়ে উপন্যাসিকের বীক্ষা নানামাত্রায় সামনে আসে। ‘মীরার দুপর’ আসলে গল্পর মধ্য দিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন তুলেছে যা সামাজিক দিক থেকে প্রাসঙ্গিক। একটি নারী তার অসুস্থ আপাতত উপার্জনহীন, রবীন্দ্রনাথ-রঁলা-বার্ণার্ডশ-টলস্টয় পড়া বুদ্ধিজীবী স্বামীকে সুস্থ করতে ও রাখতে চাইছে নানাভাবে, ঋণ করে, একজনের কাছে না পেলে অন্যজনের কাছে গিয়ে। চাইছে একটি চাকরি যাতে এই মর্যাদাহীন পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে পারে। আর অসুস্থ স্বামী সচেতন যে মীরা তাকে বাঁচাতে চাইছে, তাকে সুস্থ করতে চাইছে। কিন্তু এ বুদ্ধিজীবীও সংশয়ে দীর্ণ হয়, মীরার বাইরে যাওয়ায়, টাকা নিয়ে আসায় সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠে। মীরার অর্থাৎ তার স্ত্রীর আচরণকে বুঝেও সংশয় তিমিরে আচ্ছন্ন। হয়তো তার অক্ষমতা তাকে আর জটিল মনে অন্ধকারে নিয়ে যেতে থাকে। মীরার কর্মদক্ষতায় ঈর্ষাম্বিত হয়ে উঠতে থাকে। আর বোন বুলা থেকে শুরু করে বাইরের মানুষও মীরার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। হীরেণের মনে হয় বিয়ের পর থেকে মীরার কাজের আবরণে- নিজেকেই ঢেকে রাখতেই পছন্দ করেছে।

আর আজ মীরা “পরনের ঝকঝকে বেগনি মাদ্রাজি শাড়ি ছেড়ে ফেললেও ও ছাড়লো চকচকে কালো শাটিনের ব্লাউজ। শুধু সায়া রক্তের মত লাল। সায়া আর জংলি ছিটের আধময়লা ব্রেসিয়ারে মীরাকে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্যেও যদিও শরীটাকে কেমন অদ্ভুত হিংস্র, অশ্লীল মনে হয় হীরেণের।” আর মীরাই এখন অনেকের কাছে এঞ্জেল। মীরার-হীরেণের ‘সম্পর্ক এভাবেই এগোতে থাকে এক অনিবার্য ভয়ঙ্করতার দিকে। এটাই গল্পে অনিবার্য হয়ে ওঠে। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী এই অনিবার্যতাকে উপন্যাসে নিয়ে আসেন হীরেণ-বুলা-আটিস্ট-বিপদবরণ, মীরা-অমরেশ-পুষ্প -ভোমরা-আটিস্ট-সংলাপের মধ্য দিয়ে, শেষ ঘটনার দিকে উপন্যাসটি যায়। নির্মাণের ছক একটা থাকে কিন্তু আকস্মিকতাও জীবনের মতই খাঁজে খাঁজে পাঠক অনুভব করে। আটিস্ট -ভোমরা বা রাতের যানে আটিস্টকে মীরার পকেটমার হিসাবে আবিষ্কার, শেষ ঘটনার অনুঘটক হিসাবে বিপদবরণের ভূমিকা -এ সবই আকস্মিক, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী তাঁর এই গল্পে দুটিকেই মেলান, তর্ক-বিতর্কর মত করেই সাজিয়ে দেন, চরিত্রগুলিকে। কলেজ জীবনে অমরেশের আকর্ষণ ছিঁড়ে মীরা বুদ্ধিজীবী চরিত্রের হীরেণকে বেছে নিয়েছিল। সেই নির্বাচন তার এখনকার জীবনের বাস্তবে যে ধাক্কা মারে তাতে সাধারণ প্রচলিত উপন্যাসের গল্পের উপাদান আছে, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী সেই উপাদানকে অন্যমাত্রা দিলেন। মীরার ক্রমবিবর্তন এ মাত্রায় এমন রূপ নিল যে শেষের ঘটনায় তার ঠান্ডা স্থির আচরণ- একটা বক্তব্যকেই প্রতিষ্ঠা করে।

বস্তুত মীরা, ১৯৫৩-য় প্রকাশিত উপন্যাসের চরিত্র, মীরা মাঝখানের পাঁচদশক পেরিয়েও আমাদের কাছে, আমাদের মধ্যবিত্ত আবহে নতুন ও অচেনা। চেনা একজন নারীকে এই যে, defamitrazize করে তোলা, সামাজিক গভীর প্রশ্নের উৎস করা এটাই ওপন্যাসিকের কৃতিত্ব। হীরেণ সম্পর্কে ঔপন্যাসিক বলেন “হীরেণের অমিত বুদ্ধি ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙগী,” তার মীরার সম্পর্কর ফাঁকগুলো হীরেণের অসুখ-অস্ত্রোপচারের পর স্পষ্ট হয়। যেমন “দেবদারু পাতার সহজ লাবন্য রৌদ্রে পুড়ে কালো হতে চললো।” মীরা রক্তের মতো লাল সায়া খুলে যখন আটপৌরে ঢাকাই বুটিদারে ও শরীর সজিয়ে ফেলে তখন হীরেণ দেখে শান্তশিষ্ট মীরা। “ঘরোয়া মীরা হিংস্র মীরা সবুজ বেগনি মেরুণে ঢাকা উজ্জ্বল এঞ্জেল মীরা।” এই দুই মীরাকে হীরেণই দেখতে পায়- জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী মীরাকে এভাবেই উপন্যাসে বহুমাত্রিক বাস্তবে দাঁড় করান। মীরা চাকরি করায় হীরেণ ক্ষুব্দ, তপেশ লাহিড়ী কেমন লোক, যে মীরাকে চাকরি দেবে। অথচ চাকরির অপরিহার্যতা মানতে হয়, গৃহবন্দী হীরেণকে বাঁচাবার জন্যই তো মীরা বাইরে যাচ্ছে, চাকরি খুঁজছে। মীরার মনে হয় হীরেণ তাকে ঈর্ষা করছে। মীরা কার কাছ থেকে টাকা নেয়? পুরুষের ঈর্ষা, সন্দেহ হীরেণের বইপড়া অস্তিত্বেও প্রখর থাকে। তার বুদ্ধি ও স্বচ্ছতা হারিয়ে যায়। এ উপন্যাসে একটা বড়ো কোড চিহ্ন। তুমি আবার বেরচ্ছো?’ মীরা তখন “আটপৌরে ঢাকাই ছেড়ে গোলাপী সায়া পরতে ব্যস্ত। কাঁচুলি ঢাকলো সোনালী ছাইরঙা ব্লাইজে। সূক্ষ্ম লালপড়া বসানো হাতা।”

মীরা দাদার কাছ থেকে আর ধার পাবে না বুঝে শেষ পর্যন্ত যায় সেই অমরেশের কাছে। অমরেশ মীরাকে দেখে আহ্বান জানায়, এসো এসো, মরুর দেশে নীহারকণা। প্রচণ্ড স্বাস্খ্যবান, অ্যাথলিট সেই অমরেশ, এখন যেন একটু শুকনো। “অমরেশের পরনে ডোরাকাটা স্যালুয়া, গায়ে একটা রাগ জড়ানো।” একটু ইনফুয়েঞ্জার মত হয়েছে। ঘর বিশৃঙ্খল। মীরার স্বর কাঁপছে। অমরেশ, যাকে প্রত্যাখ্যান করেই মীরা হীরেণকে বিয়ে করে – আশ্চর্য সুন্দর হয়েছো বিয়ের পর। মীরা তার আসার কারণ জানায়-অমরেশ জানে না এত কথা, সে তো মীরার ঠিকানা জানত না। অমরেশের কথায় মীরা হাসে “পাহাড়ী ঝরণার ঝিরঝিরানির মতো।” একটি উপমায় বদলে যায় মীরা। মীরাকে টাকা দেয়-মীরার ঠিকানা না জানলেও অমরেশের ঠিকানা তো মীরা জানতো। মীরা মুখ নুইয়ে রাখে। বাইরে বেরোয় না মীরা? হারেম ছেড়ে বুঝি চক্রবর্তী বাইরে আসতে দেয় না? “দিচ্ছিলোনা, তবে ঈশ্বর তার এই সাধ পূরণ করে নি।’ মীরা একটা চাকরি চায়। অমরেশ আশ্বাস দেয়।

অতীত ফেরে কলেজের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে, কলেজের সবচেয়ে পণ্ডিত গুণী চক্রবতীর চিত্ত জয় করেছে। অমরেশ আসেনি বিয়ের সন্ধ্যায়। অমরেশের টাকায় মীরা অনেক কিছু কিনলো। নিজের জন্যও। বিয়ের পর থেকেই তো মীরা কর্জকরে সংসার চালাচ্ছে। টাকাটা কোথা থেকে এল? মীরা হীরেণকে সত্যটা বলবে না। “অমরেশ যেমন তার জীবনে সংগোপনে রয়েছে, তেমনি এই টাকাটাও গোপন থাক?” মীরা লক্ষ্য করেছে বিয়ের পর, আরও বেশি অসুখের পর হীরেণ ঈর্ষাম্বিতা। “শুধু কি ঈর্ষায় লোকের চোখের তারা আচমকা এত ধারালো হয়ে উঠে না, একদিকে সূক্ষ্ম প্রশ্ন অন্যদিকে সমবেদনার উচ্ছাস -বস্তুত হীরেণ যে সময়-সময় কী করে, কি রকম হয়ে ওঠে তার গলার সুর, চাউনি, মুখের হাবভাব তা সে নিজে বুঝতে পারছে না। মীরা বোঝে। স্ত্রীকে সন্দেহ করার জন্য মুহর্তে পুরষ এই হয়। এই হলো হীরেণ শেষ পর্যন্ত।” দেখা হয় পুষ্পার সঙ্গে বেথুনের সহপাঠী। মস্ত বড়লোকের মেয়ে। হীরেণকে আগেই সে একবার বলেছে, পুষ্প তাকে ধার দিয়েছে। সেই পুষ্প বিশালকায় বুইক গাড়িতে। সঙ্গে সুদর্শন তরুণ অনুপ “ভোমরা চিকন পাখার মতো নতুন গোঁফের রেখা, পরিচ্ছন্ন আবেশ চঞ্চল চোখ” পুষ্প বলে মীরাই বাকি খারাপ আছে, অধ্যাপকের সঙ্গে প্রেম করেছে, তাকে বিয়ে করেছে, গিন্নিবান্নি হয়ে এখন বাজার করছে। পুষ্পরও প্রশ্ন মিস্টার চক্রবর্তী বেশি বাইরে যাওয়া পছন্দ করেন না বুঝি। করতো না কিন্তু বাইরে যাচ্ছে। অকৃতজ্ঞ। পুষ্পও বলে, ভয়ংকর স্বার্থপর জীব ওরা। মীরা বস্খুর কাছে অকপট- বাড়িতে না থাকলেই দুর্ভাবনায় মরে। এত তাড়াতাড়ি যদি বিয়েটা না করতুম।” মীরার বিয়ে সম্পর্ক বিতৃষ্ণা এভাবে শুরু হয়।

বিপদবরণ আসে হীরেণের কাছে-মেটে রং-এ জামার ওপর নীল টাই। মীরা বাড়ি নেই। হীরেণের গৃহ ও গৃহসজ্জা দেখে বিপদ মুগ্ধ। বিপদ উকিল, প্র্যাকটিস অষ্টরম্ভা। হীরেণ বিপদ স্কুল কলেজের সহপাঠী। বিপদ সংকোচে মীরার চাকরির প্রসঙ্গ তোলে “একলার আয়ে কারুর দশদিনের বেশি চলছে না। মিডল ক্রাসটা একেবারে মরে যাবে।” ম্যাট্রিক পাশ বউকে সে ঢুকিয়ে দিতে চায় কোথাও-কিন্তু তিনবছরে দুটি এসে গেছে, আরও একটি আসছে। তাদের বস্খুযতিশঙ্কর পাইলট-অধ্যাপক-উকিলের চেয়ে অনেক বেশি উঠে গেছে। কিন্তু তার সুন্দরী বউ পালিয়েছে-বিপদ হেসে জানায়। হীরেণ বলে, শক্তহাতে ধরলে, এমন হতো না। কিছু না, বেরোবার যে সে বেরোবেই। বিপদ ঠিক গুলি করে মেরে ফেলতো। হীরেণের মিসেস কখন ফিরবে। বিপদ জানায় হীরেণ অনেক ভালো আছে। তার বউ খাওয়া-ঘুম আর ইয়ে দেবার জন্য সংসারে এসেছে। আর মিসেস চক্রবর্তী,স্মার্ট, বুঝেসুজে চলেন। মীরার সন্তান হলে কি পরিচর্যা করত, বিপদ চলে যাবার পরে হীরেণ ভাবে। না। মীরার পেটে কোনো শিশুই আসবে না। এটা মীরা চক্রবতীর ঘর। এঘরে ওষুধ, বড়ি, থার্মোমিটারের সঙ্গে দুরকমের ফুল। রুগীর মনকে প্রফুল্ল করতে। মালতী কি করছে। তোমার স্বামী আছে মালতী? আছে দাদাবাবু, সিঁথিতে দেখছো না। তোমার স্বামী কি করে। সিনেমা কোম্পানির দারোয়ান। তোমরা দুজনেই রোজগার করছো? না, স্বামী আমার রোজগারে খায় না। কি রকম? তোমরা লেখাপড়া জানা লোক গো মাজাঘষা মন। মুখখুর কীর্তি শুনলে হাসবে। মন হয়েছে বাবুর। গোঁয়ারের সঙ্গে বিয়ে হয়ে তার মরণ হয়েছে। এমন বিয়ের কপালে লাথি মারি। আর আসবে মিনসে এই দোরে, আসুক, কাটারি দিয়ে নাক কান কেটে দেবো। আমার বয়স যায়নি। আমি মরো না। মালতীর কালো আঙুলে শাদা পাথর বসানো আংটি ঝলসে ওঠে। ললিত কলেরায় মৃতপ্রায়, কেউ নেই মালতী ট্যাক্সি ডেকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ফিরে এসে মালতী গোপাল স্যাকরার দোকানে গিয়ে কানপাশা বিক্রি করেচে, ললিত জেরা করে, কোন কিছু জানতে চাইল না, করল চরিত্র সম্বন্ধে সন্দেহ। মালতী ঘৃণায় উচ্চারণ করে পুরুষ!’ এর আগে বুঝি তুমি বাইরে যেতে না। ও যেতে দেবে বাইড়ে? না খাই, না খাবো তোকে বাইরে পাঠাচ্ছি না তুই আমার বুকের পায়রা ঘরের পরী। হীরেণ বোঝাতে চয়, বেশি ভালবাসত বউকে ললিত, মালতী মানে না। এই যে দিদিমণিরা বাইরে যাচ্ছে, চাকরি করছে গাঘেঁষে চলছে রাজ্যের পুরুষের সঙ্গে রাস্তার গাড়িতে, দাদাবাবুরা কেউ কি মনখারাপ করে বাড়িতে মুখভার করে বসে আছে? বললাম সব মীরা দিদিমণিকে। বসে, কোন দুঃখে তুই ললিতের কাছে যাবি। লেখাপড়া জানা মেয়ে তো, ভালো বুদ্ধি দিলে। এখন আছে মালতী কেশবের সঙ্গে হিঁদু বলে দুবার বিয়ে করতে পারে নি। রেশনের ট্রাক চালায়- দুজনে রোজগারে সুখে আছে। মালতীর এই সংলাপ আছে হীরেণ-মীরার সংলাপ। ললিতকে ছেড়ে মালতী ভালই করেছে, হীরেণ বলে, কিন্তু আসলে সেও তো ললিত। জ্যোতিরিন্দ্র বুদ্ধিজীবী-অধ্যাপক হীরেণ আর সিনেমার দারোয়ান ললিতকে এক স্তরেই দেখিয়ে দিলেন।

উপন্যাসের ভোমরার গল্প অন্য ছবি। “কার্জন পার্ক, শ্রাবণের আকাশ মেঘে-মেঘে কালো নীল হয়ে আছে।

হোয়াইটওয়ের ঘড়িতে চারটে বেজে পনেরো। একটু দূরে একঝাক সূর্যমুখী মাথা জাগিয়ে চেয়ে আছে মীরাদের দিকে। আর আলতো হাওয়ায় একটু একটু নড়ছে। সূর্যমুখীর জঙ্গলের ও-পাশ দিয়ে ঘড়ঘড় করে আর একটা ট্রাম চলে গেল।” এই আবহে ভোমরা ও মীরা। অনেকদিন পরে দেখা। ভোমরার স্বামী আটিস্ট মজুমদার। ভোমরা তাকে ছেড়ে চলে এসেছে। পশু ছোট্ট ভোমরাকে নিয়ে, ডলকে নিয়ে মজুমদার টায়ার্ড। সেকি কোন দীর্ঘাঙ্গির দেখা পেয়েছে-মীরা বলে অমানুষ লালসা। ভোমরা নীরব। স্তব্ধতা। দূরে সূর্যমুখীরা বাতাসে কাঁপছে। বেবি কার কাছে। আমারঃ মীরার স্মৃতিতে ভাসে কলেজের ভোমরা-যে স্ট্যাস্পের অ্যালবাম খুলে বসছে, নয়তো বিলিতি বা বাংলা উপন্যাস। পরীক্ষা না দিয়েই ওর বিয়ে হয়ে গেলো- বিলেত ফেরত এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে প্রেম ও পরিণয় আকস্মিক। খুকীর মত, ডল ভোমরা। ভোমরা এখন কাকাবাবুর আশ্রয়ে, তিনি আধুনিক-আধুনিকাদের মতিগতি বুঝতে পারেন না। চৌরঙ্গির আকাশে বিজ্ঞাপনের রক্ত-ঝড় বইছিলো, ভোমরা একদৃষ্টে চেয়ে। উহলস ফোর্ড, ডিল্যুক্স। এক সেকেন্ডে তিনটে গাড়ি ও পাঁচটা সিগারেটের নাম পড়লে মীরা।” ১৯৫০-৫৩র কলকাতা। বিজ্ঞাপনের। ভোমরাও ভাবে, একটা বাচ্চা নিয়ে ঠেকে গেছে, নইলে একটা চাকরি সে করতে পারতো না। পাঠক ভাবতে পারে, এ মালতীর মতন। ভোমরার সঙ্গে দেখা হবার পর মীরা তার কর্তব্যর জ্বলন বোধ করে, হীরেণকে অনুকম্প করতে তাকে। ভোমরার দুঃখ এসেছে একভাবে, মীরার দুঃখ এসেছে আর একবাবে। ইউনিভাসিটির ঝকমকে রত্ন হাইলি ইনটেলেকচুয়াল আধুনিক হীরেণ চক্রবর্তী সন্দেহে শীর্ণ- মীরা তাকে অনুকম্পা করে। ভোমরা কাঁদে, কিন্তু মীরা হুল ফোটাবে। হীরেণ কি করবে। কান্নাপায়, ঘৃণা হয়। সে হারেম বিলাসিনী-আজ আর নয়, ইচ্ছে মত রাত করে বাড়ি ফিরবে।

হীরেণের ঘরে অযাচিত আগন্তুক-আটিস্ট। এই বেহায়া নির্লজ্জ মানুষটিকে দেখে হীরেণ চমকায়। “মিসেস এখনো ফেরেননি বুঝি? “আপনার ঝি-কি চলে গেছে।” -না গেলে একটা দেশলাই ওকে দিয়ে আনিয়ে রাখতাম। আটিস্ট শিস দেয় সুন্দর। পাশের ফ্ল্যাটে একলা থাকে। জেনেশুনেই মীরা এ বাড়িতে এসেছে। “মীরার এক একটা রুচির পরিচয় পেয়ে হীরেণ স্তব্ধ, বিমূঢ়। সেই এঞ্জেল মীরা, নীল মেরুনে মোড়া পালিশ ঝকঝকে মীরা।” মীরা বোঝায় আটিস্ট নিয়ে তাদের আপত্তি তোলা অশোভন। মেয়ে সম্পর্কে শিল্পী উৎসাহী। সে হীরেণকে তার স্টুডিওয় আমন্ত্রণ জানায়। যায়, ছবি দেখে, হাত পা চুল ও মুখ বসানো লম্বা একটা থার্মোমিটার। আটিস্ট যেমন দেখেছে তেমন এঁকেছে। উদ্ধত লাল রং-আর সিলিণ্ডারের মধ্যে নীল রক্তের শিরার মতো পারদের রেখা একশ দশ ডিগ্রী উঠেছে। “সাত টেম্পারেচার: স্ক্যাণ্ডাল শোনাবার জন্য স্কাউন্ড্রেল ওইসব ছবি এঁকেছে। তিনবোনের ছবি, সুন্দর মুখ, কিন্তু রাতদিন পোকাঝরত, কোন শান্তি পায়নি এমন সুশ্রী চেহারা, ভেতরটা এমন বীভৎস-হীরেণ বিশ্বাস করতে চায় না। মজুমদার চিরকাল আটিস্ট ছিল না, ছিল ইঞ্জিনিয়ার। একেবারে গৃহী। তার স্ত্রী, একজন আ্যাম্বিশাস ওম্যান। একদিন বিলিয়ার্ড খেলা সেরে বাড়ি এসে দেখে দরজায় ডিবচ পান্না সিস্থিয়ায় গাড়ি। চারফুট আটশ আটের শরীরে এত অ্যাম্বিশান। আর আর বন্ধুর স্ত্রীদের মত ডল বোকা ছিল না। সে নিজের পথ বেছে নিয়েছে। মজুমদারের বিলেত যাবার দরখাস্ত স্যাংশন করায় সিন্দিয়াকে দিয়ে। বেতন সোয়া চারশ থেকে চোদ্দশ। মজুমদার কিক্ড হার আউট। হীরেণ কি মীরার গল্পই দেখে মজুমদারের গল্পে? (আগামীকাল শেষ পর্ব)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev