উনিশ শতকের নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম দুই ব্যক্তিত্ব দ্বারকানাথ ও কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের সন্তান জ্যোতির্ময়ীর জন্ম ১২৯৬ বঙ্গাব্দের ১১ই মাঘ ইং ২৫শে জানুয়ারি ১৮৮৯ কলকাতায় ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রীটের বাড়িতে। দ্বারকানাথ বা কাদম্বিনী কেউই ভাবের ঘরে কাল কাটানো লোক ছিলেন না। খানিকটা একরোখা মেজাজে কাজের কাজ করতেই কেটে গেছে তাঁদের জীবন। দ্বারকানাথের মতো সমাজসংস্কারক ভারতবর্ষ খুব বেশি পায়নি। এক দুঃসাধ্য ব্রতের জোয়াল কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন সারা জীবন। কাজ কাজ আর কাজ, কেবলই কাজে ব্যস্ত, কথায়, বার্তায়, চলায়, বসায়, সব সময়ে তিনি অন্যমনস্ক, কি যেন কাজ বাকি আছে, সর্বদা কাজ খুঁজছেন, সর্বদা কাজ করছেন এক কথায় উৎসাহের আগ্নেয়গিরি, পরার্থ পরায়ণ। অন্যদিকে কাদম্বিনী; আধুনিক বাঙালি নারীর আর্কিটাইপ্, আশ্চর্য এই নারী মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে ভাগলপুর থেকে কলকাতায় এসে যে জীবনসংগ্রাম শুরু করেছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা চালিয়ে গিয়েছেন। অদম্য মনোভাব ও অক্লান্ত পরিশ্রমে সেযুগের নারীদের কাছে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দিতে পেরেছিলেন। একথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে তাঁর দেখানো পথ ধরেই আজকের নারী উচ্চশিক্ষার নানা ক্ষেত্রে স্বপ্রতিষ্ঠিত। ডাক্তারি পড়া কাদম্বিনীর কাছে সহজ ছিল না; ব্যাঙ্গ–বিদ্রূপ, নানান অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেও পাখির চোখ করেছিলেন চিকিৎসাবিদ্যাকে। মেডিক্যাল কলেজ থেকে কাদম্বিনী চিকিৎসা করার অনুমতি পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ইউরোপিয়ান মহিলা ডাক্তারদের দাপটে স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার ছিল না। তিনি বুঝেছিলেন প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে বিদেশী ডিগ্রি দরকার। ছোট ছোট পাঁচ সন্তান তার মধ্যে প্রভাতচন্দ্রের বয়স মাত্র দেড় বছর; তাদের রেখে ইংলণ্ড গেলেন আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি মাত্র তিন মাস পাঁচ দিন ক্লাস করে পরীক্ষা দিয়ে ১৮ই জুলাই ট্রিপল ডিপ্লোমা লাভ করলেন। এ যেন এলেন, দেখলেন, জয় করলেন, একেবারে ছক বাঁধা।
এঁদেরই সুযোগ্য সন্তান জ্যোতির্ময়ী গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতি আজ আমাদের কাছে আবছা। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত আছে তাঁর নাম আমরা জানি কিন্তু ঠিক কি কাজের সুত্রে তিনি তাঁর সমকালের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তা আমরা বিস্মৃত হয়েছি অনেকদিন। অথচ সাহিত্য জগতে বা নারীশিক্ষা, সমাজসেবামুলক কাজে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। শুধু অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন নয় সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কার এমন কি বাম রাজনীতিতেও তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
আর পাঁচটা ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়েদের মতো জ্যোতির্ময়ীর শিক্ষাজীবনের শুরু ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে। ১৯০৫ সাল জ্যোতির্ময়ী ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয় থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে বেথুন কলেজে এফ.এ. ক্লাসে ভর্তি হলেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যখন আপামর বাঙালি প্রতিবাদে সোচ্চার, কাদম্বিনীও তখন সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে। ২৬-২৯ ডিসেম্বর ১৯০৬ দাদাভাই নৌরজির সভাপতিত্বে ২২ তম কংগ্রেস অধিবেশনের সময় বরোদার মহারানী নেতৃত্বে নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলন হয় বেথুন কলেজে। বেথুন কলেজের মেয়েরা ছিলেন সেই সম্মেলনের ভলান্টিয়ার এই ভলান্টিয়ার দলে পুণ্যলতা ছিলেন, ছিলেন জ্যোতির্ময়ী। ১৯০৬ সাল জ্যোতির্ময়ী এফ.এ. পরীক্ষায় স্কলারশিপ নিয়ে পাশ করলেন। ১৯০৯ সালে বি.এ. পরীক্ষায় বেথুন কলেজ থেকে একমাত্র উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থিনী জ্যোতির্ময়ী গঙ্গোপাধ্যায়।
জ্যোতির্ময়ী শিক্ষকতা করেছেন বহু জায়গায়। বেথুন স্কুল, কটক র্যাভেনশ কলেজ, সিলোন ওমেন্স কলেজ, জলন্ধরের আর্যকন্যা মহাবিদ্যালয়, বেথুন কলেজ, ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়, সিলোন বুদ্ধিস্ট কলেজ, দমদম কুমার আশুতোষ কলেজ প্রভৃতি জায়গায়। তাঁর কর্মজীবনে লেডি অবলা বসুর বিদ্যাসাগর বানীভবন সংগঠনের কাজেও তিনি সহায়তা করেছেন।
মা কাদম্বিনীর কাছে লোকসেবা ব্রতের যে প্রেরণা পেয়েছিলেন ছোট বেলাতেই, তার টানে অধ্যাপনা ছেড়ে যোগ দিলেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। ১৯১৭ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি অ্যানি বেসান্তের সভাপতিত্বে যে অধিবেশনে হয় তাতে নারী স্বেচ্ছাসেবিকা-বাহিনী তৈরি করেন জ্যোতির্ময়ী। জ্যোতির্ময়ীর নেতৃত্বে এদেশের নারী স্বাধীনতার দাবীতে প্রথম প্রকাশ্য রাজপথে। ১৯২০সালে লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন নারী স্বেচ্ছাসেবিকা-বাহিনীর সর্বাধিনায়িকা নির্বাচিত হলেন জ্যোতির্ময়ী। ১৯২১ সালে কামিনী রায়ের নেতৃত্বে ‘বঙ্গীয় নারী সমাজ’ গঠিত হয় মেয়েদের নির্বাচনী অধিকার আদায়ের জন্য। কাদম্বিনী ও জ্যোতির্ময়ী এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯২৯ সালে অসহযোগ আন্দোলন যখন পুরোদমে, জ্যোতির্ময়ী দ্বিতীয় দফায় কলম্বো বুদ্ধিস্ট গার্লস কলেজের অধ্যক্ষা। দেশের ডাক উপেক্ষা করতে পারলেন না। কলকাতায় ফিরে দেশবন্ধু-ভগ্নী ঊর্মিলা দেবীকে সভানেত্রী করে গঠন করলেন নারী-সত্যাগ্রহ সমিতি। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন হেমপ্রভা দাশগুপ্ত, মোহিনী দেবী, আশোকলতা দাশ, শান্তি দাশ, বিমলপ্রতিভা দেবী প্রমুখ। ১৯৩০ সালের ১৩ এপ্রিল লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে ঊর্মিলা দেবী আহত হলে ২১শে জুন জ্যোতির্ময়ী ইন্দুমতী গোয়েঙ্কা, মোহিনী দেবী, শান্তি দাশের সঙ্গে বড়বাজারে বিদেশি কাপড়ের দোকানের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে গ্রেফতার হলেন।
বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত পরিসর তাঁর কর্মক্ষেত্র হলেও তা ছিল সকল মানুষের অন্তরে। তমলুকের নরঘাটে ১৪৪ ধারা অমান্য করে কয়েক হাজার মানুষের জমায়েত হয়েছিল তাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য, তা ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে শ্রোতাদের ঘিরে রাখেন কৃষক রমণীরা। তাঁদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ চলতে থাকে আর চলতে থাকে জ্যোতির্ময়ীর বিদ্রোহী বক্তৃতা। মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্রোহী কৃষক নারী পুরুষের উপর পুলিশের বর্বরতার এক আশ্চর্য দলিল তাঁর লেখা ‘the day of crucifixion’. ১৯৩১ সালের ২৬শে জানুয়ারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য কলকাতায় গড়ের মাঠে এলে কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের নির্দেশে অশ্বারোহী সার্জেন্টরা সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে ফেলে ব্যাটন দিয়ে আঘাত করতে থাকে। খবর পেয়ে জ্যোতির্ময়ী ও কয়েকজন নারী সত্যাগ্রহী অশ্বারোহী বাহিনী ভেদ করে গিয়ে সুভাষচন্দ্রকে আড়াল করে দাঁড়ালেন আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য। জ্যোতির্ময়ী গ্রেপ্তার হলেন, ছ’মাসের সশ্রম কারাদণ্ড হল। ১৯৩২ সালে এক প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেবার জন্য দ্বিতীয় বার কারারুদ্ধ হলেন।
কংগ্রেসের প্রথম সারির নেত্রী হলেও জাতীয়তাবাদী গণ্ডির বাইরে তাঁর একটা নারীবাদী রাজনীতির জায়গা ছিল। বিশ্বাস করতেন সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কারে। আসলে এঁরা তো দ্বারকানাথ-কাদম্বিনীর সন্তান, তাই নিম্নবর্গের মানুষের সম্পর্কে উচ্চশ্রেণীর মানুষের (যাঁরা তখন অনেকেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে) চিন্তাধারার সঙ্গে নিজেদের চিন্তাধারাকে অনেক সময়ই মেলাতে পারতেন না। কংগ্রেসের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে কমিউনিস্ট দলের শাখা সংগঠন ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’র সঙ্গে জ্যোতির্ময়ী অনায়াসে যুক্ত হতে পেরেছিলেন তার কারণ সংগঠনটি নিম্নবর্গের মহিলাদের আত্মনির্ভর ও অধিকার সচেতন করে তোলার উদ্দেশ্য কাজ করছিল। ১৯৪৪এর শেষ দিকে জ্যোতির্ময়ী আবার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে। ২১শে নভেম্বর ১৯৪৫ সাল,আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবিতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশন ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র কংগ্রেসের শোভাযাত্রায় পুলিশ গুলি চালালে কিশোর ছাত্র রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় নিহত হন ও বহু ছাত্র আহত হয়। সারা রাত ধর্মতলার রাস্তায় ছাত্রদের মাঝে বসে রইলেন জ্যোতির্ময়ী। পরের দিন শহীদ রামেশ্বরের শবদেহ নিয়ে শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, পথ মধ্যে একটি মিলিটারি ট্রাক তাঁর গাড়ীকে ধাক্কা দিলে মাথায় সাংঘাতিক আঘাত পান ও পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় একে ‘আকস্মিক দুর্ঘটনা’ বললেও, প্রভাতচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ উদ্ধৃত করলে এই ‘দুর্ঘটনা’র তত্ত্ব মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। “…prabhat chandra’s el-der sister martyr jyotirmoyee ganguly was also a congress leader. She was murdered by the foreign soldiers in a willful motor accident at the time of i.n.a. movement…”
খুবই ভালো লাগলো পড়তে । একদমই অজানা একটি তথ্য জানলাম । ধন্যবাদ ।
কত মহিমান্বিত মানুষের আত্মত্যাগ আমাদের জীবনকে স্বাধীনতা, চিন্তায়, উপভোগে পরিপূর্ণতা দান করেছে অবাক হয়ে ভাবি। আভূমি প্রণাম।
সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ।
In my childhood I have witnessed my octogenerian grandfather weeping for her cousin sister – Jyotirmoyee Gangopadhyay – brutally killed by the British Army. On the night of 21 November of 1945, she went to the house of Sarad Babu (Bose) several times to bring him to lead the student movement in protest against the INA Trials. She failed and was liquidated the next day.