| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কবিতা পরমেশ্বরী : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

Reporter
জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় / ১৯৬৪ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২২

বড়ো বর্ণময় জীবন। তখন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া সেইভাবে জাঁকিয়ে বসেনি। তখন প্রিন্ট মিডিয়ার রমরমা বাজার। আর আকাশবাণী। সবে কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছি। পারিবারিক অবস্থার কারণে খুঁটে খেতে শিখছি। পায়ে পায়ে একদিন আকাশবাণীতে গেলাম। যুববাণীতে কিছু প্রোগ্রাম পাওয়ার আশায়। প্রথম দিন যুববাণীর প্রযোজকের সঙ্গে কথা বলার পর আমাকে নিজের চিন্তাভাবনায় একটা লেখা নিয়ে আসতে বললেন। লিখলাম, নীল আকাশের সুখদুঃখ, কথিকা। রেকর্ডিং হলো, কিছু পয়সা পেলাম। মাসে দুটো প্রোগ্রাম পেতাম। একদিন প্রযোজক মহাশয় বললেন, তুই বেশ ভালো লিখিস, কবিতাদির সঙ্গে আলাপ আছে। বললাম, না। যুববাণীর ঘরটার ঠিক অপজিটের ঘরে কবিতাদি বসতেন। নিজেই আমাকে নিয়ে গিয়ে আলাপ করিয়ে দিলেন। দিদি আমাকে বসতে বললেন। প্রথম প্রশ্ন কী করো ? পড়াশুনো করি, সামান্য লেখালিখির চেষ্টা করি। কোথায় লেখো ? বাজার চলতি কিছু ম্যাগাজিনে ফিচার লিখি। বন্ধুদের কিছু লিটল ম্যাগাজিন আছে সেখানে লিখি। যুববাণীতে কথিকা লিখছি মাস খানেক। গোটা চারেক টিউশনি করি। এতে হয়ে যায় ? আমার পড়াশোনার খরচটা চালিয়ে নিয়ে বাড়িতে কিছুটা কন্ট্রিবিউট করি। কোন কলেজে পড়েছ ? স্কটিশ চার্চ কলেজ। দিদি আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। আমার কোনও লেখা পড়েছ ? কিছুক্ষণ দিদির মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। মাথা নিচু করে ঘাড় দুলিয়ে বলেছিলাম, না। মুচকি হেসেছিলেন। সেই সূত্রপাত। বেশ কয়েক বার যাওয়া আসার পর আমাকে নিজে সাইন করে একটা উপন্যাস দিয়েছিলেন ‘পৌরুষ’। সালটা মনে হয় ১৯৮৪-৮৫ হবে। তবে তার আগে দিদির বেশ কয়েকটা কবিতার বই জোগাড় করে পড়ে ফেলেছিলাম। ধীরে ধীরে কাছের মানুষ। তারপর দিদি যখন স্টেশন ডিরেক্টর তখন পর্যন্ত আমার যাওয়া-আসা ছিল। তবে দিদি কাজ দিয়েছিলেন। তারপর দেবদুলালদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানেও কিছু কাজ পেলাম। তবে অনেক পরে জেনেছিলাম, যারা জীবনযুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে হার না মানা মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, দিদি তাদের পাশে সবসময় আছেন।

একটা ব্যতিক্রমী চরিত্র কবিতা সিংহ। তাঁর নিজের কথায়, ‘আমার জীবনে দুটি সঞ্জীবনী কাহিনী আছে। তা আজও সব অভিজ্ঞতা ভেদ করে উঠে দাঁড়ায়। একটি সাহিত্যের। একটি জীবনের। ‘জাগরী’ উপন্যাসে ফাঁসীর আসামী বিলু শুধু একটি ছোট্ট চারার পাতা আর টসটসে শরীর দেখে বেঁচে থাকার প্রেরণা পেত। একথা ভুলতে পারি না। আর জীবনের সেই কাহিনীটি। ফরাসী বিপ্লবের পর ব্যারন তাঁর স্ত্রীকে ছটি মরচে পড়া আলপিন এক হীরের মালায় বাঁধিয়ে উপহার দিয়েছিলেন। স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলে তিনি এক চমকপ্রদ কাহিনী বলেন। তাকে বন্দী করে এক অন্ধকার সেল-এ নিক্ষিপ্ত করে বিপ্লবীরা। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি দেখেন অন্য বন্দীরা আত্মহত্যা করছেন কিংবা পাগল হয়ে যাচ্ছেন। ঐ ভয়ঙ্কর নিয়তির হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি তাঁর পকেট থেকে ছটি আলপিন বের করে ছুঁড়ে দেন অন্ধকারে। বছরের পর বছর ধরে অন্ধকারে শুধু তাদের ছুঁড়ে দেওয়া আর কুড়িয়ে আনার কাজে তিনি সময় কাটান। ওরাই তাঁকে বাঁচিয়ে দেয়। সুস্থ রাখে। আমার কাছে আমার লেখা ওই ছটি মরচেপড়া আলপিন। ওই ফাঁসীর সেলের পাশের চারাগাছ ওই সামান্য কটি উপকরণ আমাকে আত্ম-বিনাশ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। আর পাঠক সাধারণের কাছে ? সাগরবাবু, যদি হাতে সোনার কলম না থাকে তাহলে হাজার বিজ্ঞাপন, ঢক্কা নিনাদ, আর প্রকাশক সম্পাদকের আনুকূল্যেও কোন দায়িত্বের স্বর্গে আমার ঠাঁই কেউ করে দিতে পারবেন না। আর সোনার কলম থাকলে সব ব্যতিরেকেই সব হবে।’

দিদিকে নিয়ে সেই সময় কানাঘুষোয় অনেক কথা শুনেছি। ভালোর থেকে মন্দের দিকেই যার টান বেশি ছিল। কিন্তু কাছের মানুষের সম্বন্ধে কেউ কিছু বললে রাগ হতো। দিদিকে সাহস করে জিজ্ঞাসা করতে পারতাম না। তবে অনেক পরে বুঝেছিলাম দিদি মুখে কম কথা বলেন, সোনার কলমে লেখার মাধ্যমেই তার অন্তরের প্রকাশ। ‘আমি পৃথিবীর এমন একটা জায়গা থেকে কথা বলছি, সেখানে তোমাদের ওই ফেমিনিস্ট আন্দোলনকেও একটা অদরকারি বিলাস মনে হবে। আগে তো মানুষের পর্যায়ে আসুক মেয়েরা, অবলা পশুত্ব থেকে, আমি এমন একটা জায়গা থেকে কথা বলছি যেখানে মেয়েদের মুখের ভিতর সত্যিকার জিভ নেই, কনুয়ের পরে সত্যিকার হাত নেই, হাঁটুর পরে সত্যিকারের পা নেই। এমনকি মাথার খুলির মধ্যেও সত্যিকার মস্তিষ্ক নেই। আগে সেগুলোর ব্যবস্থা হোক, তারপর অন্য অধিকারের ব্যবস্থা হবে।’ রক্তাক্ত গম্বুজ (১৯৯৪) উপন্যাসে টিভি চ্যানেলের পদস্থ কর্মচারী দেবী মিত্রকে তাঁর বিদেশি বান্ধবী চিঠিতে লিখেছিলেন এই কথাগুলি। কবিতা সিংহ সেই ব্যতিক্রমী লেখিকা, কবি এবং সাংবাদিক। এই মুহূর্তে বিস্মৃতপ্রায় এক নাম।

জন্ম কলকাতায় ভবানীপুরে, ১৬ অক্টোবর, ১৯৩১ সালে। কবিতা সিংহের মাতৃকুল আর পিতৃকুলে আসমান জমিন ফারাক। দুই পরিবারের দুটি পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। মামার বাড়ি ছিল সরল সাধাসিধে গ্রাম্য বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মিশ্রণ, আর বাবার বাড়ি অন্তঃসারশূন্য উন্নাসিক মনোভাব। সেখানে খুব স্বাভাবিকভাবেই ছিল অ্যালসেশিয়ান, গ্রেট ডেন, ডগ-শো, ড্রেসিং গাউন, মদ্যপান, টমাস মান। দেখনদারি জীবনযাত্রায় পশ্চিমি আদবকায়দা আর অন্দরমহলে অত্যন্ত সংকীর্ণ মনোভাব। প্রথম রজঃস্বলার পর কোনও মেয়েই কুমারী থাকেনি পরিবারে। ব্যতিক্রম কবিতা সিংহ। পাশে পেয়ে গেলেন মাকে। সেজন্যে তাঁর পিতৃকুল মৃত্যুর পরেও ক্ষমা করেনি তাঁর মাকে। সিংহ পরিবারে ছেলেদের জন্যে ছিল সেন্ট জেভিয়ার্স। আর মেয়েদের জন্যে বেলতলা গার্লস। এই বেলতলা গার্লস স্কুলেই পড়তেন কবিতা সিংহ। শৈশব থেকেই ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে অসমতার এই চিত্র দেখেই বড়ো হয়েছেন তিনি। তাঁর নানা রঙের সাহিত্যের একটা বড়ো জায়গা অধিকার করে আছে এই অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের বীজ বপন হয়েছিল সেই শৈশবেই। আর এ-বিষয়ে কবিতার ওপরে মায়ের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি, বাবার ওপর প্রবল অভিমান ছিল তাঁর। বাবার বিপুল প্রতাপ, সংকীর্ণ মানসিকতাকে কবিতা কোনওদিনই মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।

বেলতলা গার্লস থেকে স্কুলশিক্ষা শেষ করে কবিতা সিংহ ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু বাড়ির অমতে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে ১৯৫১-তে বিমল রায়চৌধুরীকে বিয়ে করায় পড়াশোনায় দাঁড়ি পড়ে যায়। স্বামী বিমল রায়চৌধুরী তখন পড়তেন স্কটিশ চার্চ কলেজে। দুজনেই বিএসসি পড়তেন। তাঁদের বিয়েতে বাড়ির মত না থাকায় দুজনকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কঠিন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়েছে। কুড়ি থেকে ঊনত্রিশ বছর—এই সময়টা অত্যন্ত কষ্টে কেটেছে কবিতা সিংহের। অভিজাত পরিবার, প্রাচুর্যের পরিবেশ ছেড়ে কবিতা চলে আসেন দারিদ্র্যের গনগনে আগুনে। এ-সময়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধ করতে-করতে চলতে হয়েছে তাঁকে।

বিয়ে করার ফলে পড়াশোনা বন্ধ। তখন খড়কুটোর মতো জীবন। বেঁচে থাকাটা তখন তাঁদের দুজনের কাছে প্রথম শর্ত। দেখতে দেখতে ন-টা বছর কোথা দিয়ে কেটে গেল দুজনে টেরই পেলেন না। বিয়ের সাত বছর বাদে স্বামীর উদ্যোগে আবার পড়াশোনা শুরু করেন কবিতা। বিমলবাবু নিজেও আবার পড়া শুরু করেন। দুজনই গ্র্যাজুয়েট হন। কবিতা সিংহ যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে বোটানিতে অনার্স নিয়ে বিএসসি পাশ করেন। অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তিনি। ডিস্টিংশন পেয়ে তিনি গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন। কবিতা সিংহের স্বামী বিমল রায়চৌধুরী (১৯৩০-৭৬) ছিলেন রংপুরের জমিদার মনীন্দ্র রায়চৌধুরীর ছেলে। তিনি কবিশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছদ্মনামে গল্প লিখতেন। তিনি ছিলেন গল্পকার এবং সম্পাদক। কবিতা সিংহের সাহিত্যরচনার পেছনে ছিল স্বামীর বিশেষ উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা।

ছয় বছর বয়স থেকেই কবিতা সিংহ কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁর মা অন্নপূর্ণা সিংহ, কবিতার থেকে বয়সে মাত্র ১৫ বছরের বড়ো। মার অনুপ্রেরণাতেই তাঁর কবিতা লেখা আর ছবি আঁকতে শেখা। ১৯৪৬ সালে ১৫ বছর বয়সে নেশন পত্রিকায় প্রথম কবিতা সিংহের কবিতা প্রকাশিত হয়। সেটি ছিল ইংরেজি কবিতা। ষোলো বছর বয়সে আনন্দবাজার পত্রিকায় কবিতা সিংহ লেখেন ‘আর্ট ও নারী’। বিজ্ঞাপনে নারী শরীরের ব্যবহার নিয়ে তিনি লিখেছিলেন এই লেখাটি। এর বেশ কয়েক বছর পরে তেইশ থেকে পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত এক বিখ্যাত ইংরেজি চলচ্চিত্র সাপ্তাহিক সিনে অ্যাডভান্সের মেয়েদের পাতা সম্পাদনা করতেন তিনি। তখন তাঁর কাজ ছিল উঠতি চিত্রতারকাদের গ্ল্যামারাস ফটোগ্রাফ সমেত প্রতি সপ্তাহে একটি করে চটকদার রচনা লেখা। তবে এরও আগে অমৃতবাজার পত্রিকায় কলমচি হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। অমিতাভ চৌধুরী (নিরপেক্ষ) কবিতা সিংহকে আলাপ করিয়ে দেন অমৃতবাজার পত্রিকার উইলিয়াম ওয়াকারের সঙ্গে। প্রায় চার বছর ওই পত্রিকার পাতায় ‘কবিতা’ ছদ্মনামে ‘অ্যাজ আই সি ইট’ নামে একটি কলাম লিখতেন কবিতা সিংহ এবং অন্যান্য রিপোর্টিংও করতেন, বিচিত্র কর্মমুখর জীবন ছিল কবিতার। কী করেননি কবিতা, তখন তাঁর একটাই ধ্যানজ্ঞান স্ট্রাগেল ফর এক্সিটেন্স। টিউশনি, শিক্ষকতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা, বিজ্ঞাপনের কপি লেখা। কুড়ি থেকে তিরিশ বছর বয়সের দৈনন্দিন অভ্যাস ছিল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টিউশনি, চাকরি, রাতের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। টিকে থাকার জন্য জীবনের যুদ্ধে অনবরত লড়তে-লড়তে এগিয়েছেন তিনি। সন্তান গর্ভে নিয়ে তাঁকে নাচের স্কুলে মাস্টারি করতে হয়েছে। বিজ্ঞাপনের কপি লিখতে হয়েছে। খবরের কাগজের জন্য ফ্রিল্যান্স রিপোর্টিং, সিনেমার শুটিং, চিত্রতারকার সাক্ষাৎকার, সরকারি অফিসে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্কের চাকরি, মফস্বলের স্কুলে মাস্টারি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অফিসের সাব-এডিটারি—বিভিন্ন ধরনের পেশার মধ্যে দিয়ে কেটেছে কবিতা সিংহের এই সময়টা। সাংবাদিকতার জন্য তাঁকে যেতে হয়েছে গ্রামে, বস্তিতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে, গঙ্গাসাগরে, জাম্বো দ্বীপে, আবার বিলাসব্যসনে মত্ত সমাজের ওপরতলায়।

নবনীতা দেব সেন কবিতা সিংহের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেছেন, ‘কফি হাউসের দরজায় দীপশিখার মতো উজ্জ্বল এবং সহজ সুন্দরী কবিতা সিংহকে সেই প্রথম দেখার মুহূর্ত থেকেই যে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখেছিলুম সে চোখ কখনো বদলায়নি। অবাক হয়ে শুনেছিলুম, বিমল রায়চৌধুরীর স্ত্রীর নাম কবিতা সিংহ। সেই পঞ্চাশের দশকে এমনটি হতো না। কিন্তু কবিতা সিংহ যে সব দিক থেকেই একমেবাদ্বিতীয়ম, বাংলা সাহিত্যে তাঁর কোনও তুলনা নেই। আজকের নারীবাদিনীদের চেয়ে অনেক ক্রোশ বেশি পথ হাঁটতে হয়েছিল তাঁকে। আর এগিয়েছিলেন যোজন যোজন বেশি। জীবন তাঁর সরল ছিল না। না ঘরে, না কর্মক্ষেত্রে। হবে কী করে, কবিতাদি যে রণরঙ্গিনী!’

‘কি নেবে দেহের থেকে? মাংস মেদ বাসা?

প্রাগৈতিহাসিক অগ্নি? পোড়া মাংসের ঘ্রাণ, রক্ত-পানীয়

নখ দাঁত চুল কিংবা অন্নপাত্র দিব্য করোটি?

অথবা কি নিষ্কাশন করে নেবে প্রতিভা ও মেশিনের মিশ্র কুশলতা?

অথবা জাদুর টুপি যেভাবে ওড়ায় লক্ষ কুন্দ পায়রা

সেভাবে দেহের থেকে চাড় দিয়ে ক্রমাগত খুলে নেবে শিশু।’

একটু থিতু হন ষাটের দশকে। আকাশবাণীতে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে যোগ দেন কবিতা। তাঁর জীবনের এই বিচিত্র ধরনের অভিজ্ঞতা উঠে আসে তাঁর লেখার ভেতরে। তবে এই জীবনসংগ্রামের সময়টা কবিতার কাছে ছিল তাঁর ‘জীবনের সেরা কাল’। কারণ এই সময়টা তাঁর কাছে নিজেকে যাচাই করার, অন্যকে যাচাই করার সময়। এই কালপর্বেই কবিতা সিংহ লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। এ-সময়েই গল্প-উপন্যাস লিখতে শুরু করেছেন তিনি। ১৯৬৫-তে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে বাংলা কথিকা বিভাগের সহকারী প্রযোজিকা হিসেবে তিনি যোগ দেন। তিনি বলেছেন,  ‘লেখালেখিতে আমি সচেতনভাবেই বলুন বা অচেতনভাবেই বলুন বক্তব্যে বিশ্বাস করি। লেখার আনন্দে লেখা। আর্টস ফর আর্টস সেক্ ঠিক আছে। যিনি সেজন্যই লেখেন তাঁরও বলার কিছু থাকে। লেখালেখির ব্যাপারে আরও বিশ্বাস করি বাস্তবের এক কেন্দ্রবিন্দুকে। হয়ত আমার লেখা যখন পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে সেই বিন্দুটিকে সেভাবে দেখা যায় না। কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাই। আমি তো জানি কি থেকে কি হয়ে উঠেছে…’

‘না, আমি হবো না মোম

আমাকে জ্বালিয়ে ঘরে তুমি লিখবে না।

হবো না শিমূল শস্য সোনালী নরম

বালিশের কবোষ্ণ গরম।

কবিতা লেখার পরে বুকে শুয়ে ঘুমোতে দেব না।

আমার কবন্ধ দেহ ভোগ করে তুমি তৃপ্ত মুখ;

জানলে না কাটামুখ—ঘোরে এক বাসন্তী-অসুখ

লোনা জল ঝাপসা করে চুপিসারে চোখের ঝিনুক!’

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েরা নিতান্ত পণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। মেয়েদের মোমের মতো নরম, পেলবরূপে দেখা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য। পুরুষ এখানে মেয়েদের দেখে কামনার দৃষ্টিতে, ভোগের বিষয় হিসেবে। মেয়েরা শুধুমাত্র কতকগুলো অঙ্গের সমষ্টি। তাদের কামনা-বাসনা থাকতে নেই। অধিকার নেই নিজের ইচ্ছা জানানোর, নিজের চাহিদা প্রকাশ করার। চিরকালই মেয়েরা ‘সেক্স অবজেক্ট’। এই মিথকে ভেঙেছেন কবিতা সিংহ। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন একটি মেয়েরও অধিকার আছে নিজের মতো করে পুরুষকে উপভোগ করার, যৌনতাকে উদ্‌যাপন করার। কিন্তু সমাজ তাকে সেই স্বীকৃতি দেয় না। তাই অনেক সময় পুরুষের সঙ্গে মিলনের মুহূর্তেও একা হয়ে যায় তারা। এভাবেই আমাদের সমাজে বহু মেয়ের প্রেমহীন যান্ত্রিক জীবন কেটে যায়। তাই তাঁর ‘পাপপুণ্য পেরিয়ে’ (১৯৬৪) উপন্যাসে বাসনা বলে, ‘মেয়েদের পুরুষরা নিজেদের ব্যবসায়ে কিভাবে ব্যবহার করে এ নিয়ে ধোঁয়া উঠছে এমন প্রবন্ধ লিখেছিলাম ষোল বছর বয়সে। এখন আমি হচ্ছি মেয়েদের এক্সপ্লয়েট করার ষড়যন্ত্রের অন্যতম অংশীদার। আমি নিজের মাংস নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি। নিজের মাংস।’ কবিতা সিংহের লেখক জীবন ও ব্যক্তিগত জীবন কোথাও যেন এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্পের মুখবন্ধে সমরেশ বসু লিখেছেন—‘ক্রোধ যে কেবলমাত্র একটা ভঙ্গিমাত্র না, ক্রুদ্ধ যুবতীদের কথা লিখতে গেলে যে কেবল বিকৃত অভিব্যক্তি প্রকাশের দ্বারা ফুঁসে ওঠা বোঝায় না, মাত্রাহীন অশ্রাব্য এবং ভুলে ভরা শব্দ ও বাক্য বিন্যাসের অযথা জটিলতার প্রশ্রয় দেওয়া না, বাংলা গল্পের নতুন চরিত্রদের আমাদের সামনে উপস্থিত করতে গিয়ে, তিনি, অনায়াসেই পাঠকদের তা বুঝিয়ে দেন। স্বাভাবিক। কারণ, ক্রোধের গভীরে যে অপমান, লাঞ্ছনা, বেদনা অন্তর্নিহিত রয়েছে, সেই মর্মান্তিক সত্য সন্ধানই তাঁকে কথাশিল্পী করে তুলেছে।’

বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার জগতে কিছুটা ব্রাত্যই রয়ে গেছেন কবিতা সিংহ। তাঁর নিজের ভাষায়—‘নিজের কথা বলতে গিয়ে বৈষ্ণবী বিনয় করা আমার স্বভাববিরুদ্ধ। অমনোযোগী, পল্লবগ্রাহী এবং শ্রদ্ধাহীন পাঠককে আমি তৃণ জ্ঞান করি। কারণ বাংলাদেশ আমাকে স্বীকার করে নেবার আগে… একবারে আমার আবেদন মঞ্জুর করেনি। বারবার অন্যায়ভাবে বাজিয়ে নিয়েছে।… অনেকেরই ধারণা কবিতা সিংহ, ছদ্মনামে কোনো পুরুষ, কুদর্শন বা স্বামীপরিত্যক্তা কিংবা বিধবা, কারণ তাদের চেতন বা অবচেতন মনে কাজ করে যাচ্ছে যে, এইসব গুণাবলীসম্পন্ন অসাধারণ মহিলারাই মাত্র সাহিত্যকে অবলম্বন করে থাকেন। কেউ কেউ বলেন আমার স্বামী বিমল রায়চৌধুরী নাকি আমার সব লেখা লিখে দেন।’ এই আক্ষেপ তাঁকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

কবিতা সিংহকে বাংলার নারীবাদী রচনার অন্যতম স্রষ্টা বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তাঁর মাধ্যমেই আধুনিক কবিতায়ও নারীবাদের সূচনা হলেও তিনি নিজে কখনও ‘মহিলা কবি’ হতে চাননি। কবি হতে চেয়েছিলেন। তিনি মূলত কবি হলেও একজন অত্যন্ত শক্তিশালী গল্পকার ও ঔপন্যাসিকও ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এই উপমহাদেশের অন্যতম পথিকৃৎ নারী-সাংবাদিক। সাংবাদিকতায় পুরুষের পাশাপাশি উচ্চপদে সেই সময় মেয়েরা প্রায় ছিলেন-ই না বলা চলে। সেই হিসেবে সমগ্র বাংলায় কবিতা সিংহকে প্রথম প্রজন্মের পেশাদার নারী সাংবাদিক বলা চলে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে নববইয়ের দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত তিনি বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন আকাশবাণীর সঙ্গে। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের প্রথম মহিলা অধিকর্তা হন কবিতা। রেডিও সূত্রেই প্রথমবার বিদেশ যাত্রা করেন তিনি। বেতারে উচ্চতর কুশলতার জন্য ১৯৭৯-তে তিনি পূর্ব জার্মানিতে গিয়েছিলেন। ১৯৮১-তে আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখক ওয়ার্কশপের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। পশ্চিম জার্মানির ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট বুক ফেয়ারে’ ভারত উৎসবের সময় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন কবিতা সিংহ। পরে বহুবার আমেরিকায় যান কবিতা। তাঁর ছোটো মেয়ে পরমেশ্বরী আমেরিকার বস্টনে থাকেন। ছোটো মেয়ের কাছে বস্টনেই ১৯৯৮-এর ১৭ অক্টোবর মৃত্যু হয় কবিতা সিংহের। তিনি ছিলেন তিন সন্তানের জননী। দুই মেয়ে রাজেশ্বরী ও পরমেশ্বরী এবং ছেলে কনাদ রায়চৌধুরী।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev