ঢাকাইয়া সিনেমার ‘মিষ্টি মেয়ে’ কবরীর নাম ছিল মিনা পাল। পরবর্তীতে হন অভিনেত্রী কবরী সারোয়ার ওরফে সারাহ বেগম কবরী। গেল শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে কবরী ওপার বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা।
ষাটের দশকের গোঁড়াতে মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়সে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে কবরীর অভিনয় জীবন শুরু। একে একে ‘হীরামন’, ‘ময়নামতি’, ‘চোরাবালি’, ‘পারুলের সংসার’, ‘বিনিময়’, ‘আগন্তুক’ থেকে জহির রায়হানের উর্দু ছবি ‘বাহানা’, ঋত্বিক ঘটকের কালজয়ী ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতেও তাঁর অভিনয় সাক্ষর রাখেন এই বরেণ্য অভিনেত্রী।
কবরী বাংলাদেশের প্রায় দুশো ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার হাত ধরে ওপার বাংলায় অন্তত পাঁচ জন নায়কের অভিষেক ঘটেছে। দীর্ঘ দিন কবরী-রাজ্জাক জুটির রসায়ন বাংলাদেশের ছবির ইতিহাসে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিল। উল্লেখ করা যায় ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’, ‘পরিচয়’, ‘অধিকার’, ‘বেইমান’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘সোনালী আকাশ’, ‘অনির্বাণ’, ‘দীপ নেভে নাই’-সহ আরও বহু নাম।
ওপার বাংলার রূপালি পর্দা মাতানো কবরীর ভাষায়, ‘জীবন হচ্ছে একটি চলচ্চিত্র। জীবন কিন্তু স্থিরচিত্র নয়’। কবরী সেই জীবন-চলচ্চিত্রের বাঁকে বাঁকে নানা ঘটনার কথা নিজেই লিখেছেন তার আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘স্মৃতিটুকু থাক’ গ্রন্থে। ষাট আর সত্তরের দশকের অনেক তরুণের ‘স্বপ্ন’ কবরী মেয়েবেলায় স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে সাদা শাড়ি পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে ‘মাস্টারি’ করবেন। কিন্তু ‘লাইট-অ্যাকশন-কাটের’ আলো ঝলমলে জীবন তাকে নিয়ে যায় গ্ল্যামার দুনিয়ায়।
কিন্তু কবরী সেই জগতেই আটকে থাকেন নি। ওপার বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস বদলে দিয়েছিল একাত্তর। সত্তরের দশকে তারুণ্যের সেই দিনগুলোতে অভিনেত্রী কবরী কলকাতায় পউছে নিজের দেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ কবরী সারোয়ার ছিলেন চট্টগ্রামে। নিজের দুই সন্তানের নিরাপত্তার কারণে কবরী ভারতে আসার সিদ্ধান্ত নেন। টানা তিনদিন তিনরাত পায়ে হেঁটে রামগড়ের নারায়ণহাটে হাজিরহন। সেখানে কবরীর সঙ্গে দেখা হয় আর্মি ক্যাপ্টেন কাদেরের। দুই সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিশেহারা কবরীকে সেই সময় সাহাজ্য করেন ক্যাপ্টেন কাদের। কবরী ও তাঁর দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাপ্টেন সাব্রুম সীমান্ত পার করে আগরতলায় পৌঁছে দেন। কিন্তু আগরতলা থেকে ফেরার পথে শহীদ হন তিনি।

আগরতলায় খোলা আকাশের নীচে হাজার হাজার শরণার্থীদের পাশে কবরীও একটুখানি জায়গা করে নেন। তাঁকে শরণার্থী ক্যাম্পে দেখে সংবাদিক অনীল ভট্টাচার্য নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে কবরী দিন ১০-১২ থেকে চলে আসেন কলকাতায় দীপঙ্কর দে’র বাড়িতে। এরপর কবরী মুক্তিযুদ্ধের তহবিল গঠনের কাজ শুরু করেন। কলকাতায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হোসেন আলীর সহযোগিতায় নার্গীস, সুনীল দত্ত, ধর্মেন্দ্র, শত্রুঘ্ন সিনহা, অংশুমান রায়, সলিল চৌধুরী-সহ বহু খ্যাতনামা শিল্পীদের নিয়ে ‘জয় জোয়ান নাইট’ নামে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেন। এদের নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করেন কবরী। অনুষ্ঠান থেকে সংগৃহীত টাকা পাঠাতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধাদের। তার প্রধান লক্ষ্য ছিলো জনমত সৃষ্টি করা।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কবরী মুম্বাই যান। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ওপর সিনেমায় যেমন কাজ করেন পাশাপাশি বিভিন্ন সভা-সমিতিতে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের নির্যাতিত মানুষ ও তাদের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরেন। বোম্বেতে সবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গ্রাম-বাংলার সাধারণ মেয়েদের মতো ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি পরে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনা করেন। মুম্বাইয়ের সাপ্তাহিক পত্রিকা ব্লিটস-এ কবরীর সেই ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর সারা দুনিয়া বাংলাদেশে কি ঘটেছ তা জানতে আগ্রহী হয়ে পড়ে। মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে কবরী হায়াদরাবাদ ও পুনার স্কুল, কলেজ ও চার্চগুলোতে বক্ত্রিতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের ঘটনা তুলে ধরেন। সবাইকে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানান।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার শুরু হয় তাঁর অভিনয় জীবন। ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এ পারের মানুষও। ২০০৬ সালে মুক্তি পায় কবরীর পরিচালার প্রথম চলচ্চিত্র ‘আয়না’। কিন্তু পরের ছবি ‘এই তুমি সেই তুমি’-র কাজ শেষ করতে পারেন নি। অভিনেত্রী কবরী ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর নামে চুয়াডাঙ্গা শহরে একটি রাস্তা আছে। নাম ‘কবরী রোড’।
অসাধারণ।
এত কিছু সত্যি জানা ছিল না, অনেক অনেক ধন্যবাদ।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে তাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেম, কিন্তু সংগ্রামী যোদ্ধাকে জানা ছিল না। তাকে প্রনাম।
আপনাকে ধন্যবাদ।
ওঁর প্রতি শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে গেল, উনি শুধু রূপালী পর্দার অভিনেত্রী নন, একজন সত্যিকারের মানবী।
অসাধারণ এক অধ্যায় জানা গেল এই প্রতিবেদন থেকে।
এক কথায় অপূর্ব। যেমন জীবন তেমনি কথা।
এমন মানুষ ক’জন হয়। আন্তরিক প্রণাম।
কে প্রকৃত শিল্পী; সময় তার উত্তর দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি চিনেছিল কবরী সারোয়ার ওরফে সারাহ
বেগম কবরীকে। বাংলাদেশের আকাশ-মাটি যাকে চিরকাল স্মরণে রাখবে।
বাংলাদেশের হৃদয়ে লেখা আছে কবরী, বাংলাদেশের আকাশে কবরী মেঘ, মাটিতে সবুজ ক্ষেত।
ওনাকে আমার অন্তরের প্রণাম। শতাব্দীতে মাত্র একজনই কবরী সারোয়ার জন্মগ্রহণ করেন।