সালটা ১৯৪২। ভারতে উত্তাল চল্লিশের দশকের এক উল্লেখযোগ্য সময়। বিশ্ব রাজনীতিতে জার্মানি তখন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। একটির পর একটি দেশ তারা দখন করে চলেছে রাশিয়ার অভ্যন্তরে। মস্কো বিপন্ন।সুভাষচন্দ্র বসু তখন বার্লিনে। বেতার কেন্দ্র থেকে শোনা যাচ্ছে তাঁর উদার্থ আহ্বান। ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি প্রচার কার্য চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘আমি সুভাষ বলছি’ শোনামাত্র ভারতবাসীর শরীরে এক আশ্চর্য শিহরণ। তিনি বলছেন, ‘দিন আগত ওই। তোমরা এসো, জাগো, এবার আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শেষ আঘাত হানবো।’ সেই শেষ আঘাতের অস্ত্র কী? আজাদ হিন্দ বাহীনী। ১৯৪২ সালে পয়লা সেপ্টেম্বর যার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল রাসবিহারী বসুর হাত ধরে।

১৯১১ সালে দিল্লির বড়লাট হারডিঞ্জকে লক্ষ্য করে বোমা মেরে রাসবিহারী বসু ইংরেজদের চোখে ধুলো দিয়ে জাপানের টোকিও শহরে আশ্রয় নেন। তখন জাপান ও ব্রিটেন ছিল পরস্পর বন্ধু। ব্রিটিশ গুপ্তচরদের চোখ ফাঁকি দিতে তাঁকে অবর্ণনিয় দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল। তাঁকে ক্রমাগত বাসস্থান পাল্টাতে হয়েছে আত্মগোপনে থাকার জন্য। অবশেষে সেই ঐতিহাসিক দিনটি উপস্থিত হলো। ১৯৪১ সালের ৮ ডিসেম্বর। জাপান বিট্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। দেখা গেল, ভারতের ব্রিটিশ শাসক রাতারাতি জাপানের শত্রু হয়ে উঠেছে। নির্বাসিত রাসবিহারী বসু সবরকমের বাধা নিষেধ থেকে মুক্তি পেলেন। রাসবিহারী ছিলেন এক দূরদর্শী সমর নায়ক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দেশের বাইরে থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করতে হবে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে অনেক স্বাধীনচেতা, বিপ্লবী মনোভাবাপন্ন ভারতীয় জাপান, চিন, থাইল্যান্ড ও মালয়ে চলে গিয়েছিলেন। রাসবিহারী চেয়েছিলেন এইসব ভারতীয়দের মধ্যে সংহতি বোধ জাগিয়ে তুলতে। তিনি বিশ্বাস করতেন দেশের ভিতর থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠিত করা সম্ভব নয়। তিনি বুঝেছিলেন, পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে তার সুযোগ নিতে হবে এবং এইসব বিদেশি রাষ্ট্রর সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া ভারতের মুক্তি সংগ্রাম সফল হবে না।

এইসময় রাসবিহারী বসু ছাড়া অন্যান্য যাঁরা দেশের বাইরে থেকে দেশহৈতিশনার কাজে ব্যাপৃত ছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য থাইল্যান্ডে বাবা অমর সিং এবং সাংহাইয়ে বাবা ওসমান খান। অমর সিং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁকে ২২ বছরের জন্য সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি থাইল্যান্ডে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে এক বৈপ্লবিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। বাবা অমর সিং — এর নির্দেশেই ব্যাঙ্ককের শিখ ধর্মপ্রচারক প্রীতম সিং ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে গুপ্ত কার্যকলাপের মাধ্যমে মালয় ও ব্রহ্মে অবস্থিত ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। সিঙ্গাপুরে বিপ্লবী রাসবিহারী বসু প্রমুখ প্রবাসী ভারতীয়দের সাহায্য জাপানের হাতে বন্দী ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ বা ‘স্বাধীন ভারত সেনাবাহিনী’ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। সেই অনুসারে ক্যাপ্টেন মোহন সিং-এর নেতৃত্বে ১৯৪২ সালে ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপিত হয়েছিল আজাদ হিন্দ বাহিনী। ক্যাপ্টেন মোহন সিং এই ফৌজের জেনারেল অফিসার হন। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরে রাসবিহারী বসুর সভাপতিত্বে ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪২ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাপানিরা সিঙ্গাপুরে জেনারেল মোহন সিং — কে গ্রেফতার করলে রাসবিহারী বসু উপলব্ধি করেন এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে একমাত্র সুভাষচন্দ্র-ই হতে পারেন উদ্ধারকর্তা।

রাসবিহারী আজাদ হিন্দ বাহিনীর দায়িত্ব নেবার জন্য সুভাষচন্দ্রকে আমন্ত্রণ জানালে সুভাষ তা সাদরে গ্রহণ করে সিঙ্গাপুরে উপস্থিত হন ১৯৪৩ সালে। সিঙ্গাপুরে এসে ওই বছরের ২৫ আগস্ট তিনি আজাদ হিন্দ বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সেই সঙ্গে ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ-এর দায়িত্বও তিনি নেন। সুভাষচন্দ্রের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ও প্রভাবে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের সৈনিকরা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের এক চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এই বাহিনী গঠনের মধ্যে আমরা সুভাষচন্দ্রের অসাধারণ সামরিক দক্ষতার পরিচয় পাই। এক সুদক্ষ সেনানায়ক হিসেবে তিনি যেভাবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুক্তিকামী ভারতীয়দের নিয়ে সেনাবাহিনী গঠন করতে পেরেছিলেন তার অন্তরালে ছিল সুভাষের সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস এবং প্রচন্ড সাংগঠনিক শক্তি। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, সুভাষচন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার প্রকাশ হিসেবে জার্মানিতে প্রবাসী ভারতীয় সৈনিকরাই প্রথম সুভাষচন্দ্রকে ‘নেতাজি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসেবে সুভাষচন্দ্র তাঁর সেনাবাহিনীর সংখ্যাবৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। ভারতীয় নারীদের নিয়ে ‘ঝাঁসির রানি বাহিনী’ গড়ে তুলেছিলেন। এই বাহিনীর নেত্রী ছিলেন ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন। অন্যান্য বাহিনীর নাম দেখয়া হয়েছিল, ‘গান্ধি ব্রিগেড’, ‘নেহেরু ব্রিগেড’, ‘আজাদ ব্রিগেড’ প্রভৃতি।