বাঙালি মেয়েদের ইতিহাস রচনার কাহিনি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শোনা গিয়েছে। তরু দত্ত, আরতি সাহা, বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে পুরাকালের জ্ঞানচর্চায় গার্গী, মৈত্রেয়ী, ঘোষা, অপালা, বিশ্ববারা প্রমুখর নাম অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিদের জানা। সেকাল থেকে একাল-বাঙালি মেয়েরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে চমক দেখিয়েছেন সকলেই। আধুনিককালে নামের সংখ্যা বেড়েছে বই কমেনি। পাশাপাশি নারীর অবমাননাও চলছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে। তবু সেইসব অন্ধকারকে পাশ কাটিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে বাঙালি মেয়েদের প্রতিনিধি হয়ে প্রথম আলো জ্বালিয়েছেন যিনি তার নাম কিন্তু প্রচারের আলোয় সেভাবে আসেনি আজও। আজ শুধু নয়, এই কৃতী বাঙালির সমকালীন সমাজও এতটাই উদাসীন ছিল যে তার জন্মসাল, জন্মতারিখটার স্পষ্ট উল্লেখ নেই কোথাও। তিনি নিজেও লিখে রেখে যাননি কোনও আত্মপরিচয় বা ডায়েরি। তার নাম কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। তার পিতা ছিলেন ব্রজকিশোর বসু। কাদম্বিনী ছিলেন আরেক পরিচয়ে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরির শাশুড়ি অর্থাৎ সুকুমার রায়ের দিদা। কাদম্বিনী জন্মতারিখ ১৮ জুলাই, ১৮৬১, কারও মতে, সেটা ১৮ জুলাই ১৮৬২, আবার কেউ বলছেন তারিখটা হল ৮ মে, ১৮৬১। তবে বিভিন্ন দিক বিচারে ১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই বেশি গ্রহণযোগ্য। অতএব তিনি রবীন্দ্রনাথের সমবয়সিনী। কাদম্বিনী প্রথম বাঙালি মহিলা ডাক্তার। তবে সমাজের রক্ষণশীলতার বাধা তাকে টপকাতে হয়েছে। কুসংস্কারমুক্তির ধ্বজাধারীরাও যে তার উত্থানকে খোলামনে মেনে নিতে পারেননি তাও বেশ বোঝা যায়। বোধহয় সেই কারণেই “রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ প্রসিদ্ধ গ্রন্থে ব্রাহ্ম মনীষী শিবনাথ শাস্ত্রী কাদম্বিনী নামমাত্র উল্লেখেই দায় সেরেছেন, তাও আবার বন্ধুবর দ্বারকানাথের পত্নী হিসাবে। অর্থাৎ কাদম্বিনীর নিজস্ব কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ায় তার দ্বিধা ছিল।
শুধু প্রথম বাঙালি ডাক্তার হওয়াই নয়, কাদম্বিনী প্রথম স্থানের অধিকারিণী আরও নানা কারণে। ১৮৮৩ সালে চন্দ্রমুখী বসুর সঙ্গে যৌথভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন কাদম্বিনী। শুধু এদেশে নয়, প্রায় দুনিয়াব্যাপী সমগ্র ব্রিটিশ উপনিবেশে এই দু’জনই প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট। মেডিক্যাল স্কুলে স্ত্রীরোগ বিষয়ে পড়ানোর দায়িত্ব পেলে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদিত বিখ্যাত “হিন্দু প্যাট্রিয়ট” মন্তব্য করেছিল, “এদেশে চিকিৎসাবিদ্যায় লেকচারারের মতো গুরুদায়িত্বশীল পদে একজন মহিলার নিয়োগ এই প্রথম।” বাংলার ইতিহাসে কাদম্বিনী প্রথম অসবর্ণ বিবাহের পাত্রী। ১৮৯০ সালে জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে সম্পূর্ণ ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন কাদম্বিনী তবে, কাদম্বিনী সফল ডাক্তারি জীবন এবং ঐতিহাসিক শিরোপা লাভের পিছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন কাদম্বিনীর স্বামী, ব্রাহ্ম নেতা ও সে যুগের একজন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তারই হাত ধরে কাদম্বিনী শুধু ডাক্তারি নয়, বহু সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হয়েছিলেন। দ্বারকানাথ প্রথমে ছিলেন কাদম্বিনীর শিক্ষক। তাদের “লাভ ম্যারেজ” তখনকার সমাজে একটা চমকপ্রদ ঘটনা। ১৮৮৩ সালে তাদের বিবাহ এবং তারপর স্বামীর প্রেরণাতেই কাদম্বিনী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। যদিও এই ‘অসম’ বিবাহের সময় দ্বারকানাথের (এটি তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ) বয়স ছিল প্রায় চল্লিশ এবং কাদম্বিনীর মাত্র বাইশ। সে আমলে দশের কমেই পাত্রী বিবাহযোগ্য বলে সমাজে বিবেচিত হয়। সেখানেও মস্তবড় ‘অঘটন’। তবে তাদের এই যুগলবন্দি নিজেদের এবং সমাজটাকেও আলোর দিশা দেখিয়েছেন।
জন্ম ভাগলপুরে, কিন্তু আবাল্য বাংলাতেই বড় হওয়া কাদম্বিনীকে “আধুনিক বঙ্গনারীর রোল মডেল” বলে অভিহিত করেছেন আলোচক সুনীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উনিশ শতকের রক্ষণশীল বাঙালি সমাজের এক মেয়ে একা জাহাজে চড়ে বিলেতযাত্রা করছেন ডাক্তারি পড়ার উদ্দেশ্যে। ঘরে রেখে যাচ্ছেন চারটি শিশুসন্তানকে। সেদিনের প্রেক্ষিতে এ ঘটনা ভাবা অসম্ভব। এও ভাবা অসম্ভব যে, সেকালের খাস কলকাতার বুকে সুকিয়া স্ট্রীটে বিলেত-ফেরত মহিলা ডাক্তার হিসাবে কাদম্বিনীর প্রাইভেট চেম্বার খোলার ঘটনাও।
১৮৮৬ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এলএসএস পরীক্ষায় পাস করেন কাদম্বিনী। ১৮৯২ সালে ইংল্যান্ড যাত্রা করেন। পরের বছর ৩২ বছর বয়সে ইংল্যান্ড থেকে এলআরসিপি, এফআরসিএস ও ডিএফএস ডিগ্রি পান। ওই বছরে ডাক্তারির ১৪ জন সফল ছাত্রছাত্রীর মধ্যে কাদম্বিনীই ছিলেন একমাত্র মহিলা। এও এক ইতিহাস। ১৮৯৫ সালে কাঠমান্ডু রাজপ্রাসাদে গিয়ে তিনি নেপালের রাজমাতার চিকিৎসা করেন। সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল লিখেছেন, “তিনি (রাজমাতা) অসূর্যম্পশ্যা– পুরুষ-চিকিৎসকের সম্মুখে উপস্থিত হবেন না। যদিও তিনি তিন কুড়ি বছর দুনিয়াদারি করে আসছেন।” রাজমাতা তখন মৃত্যুশয্যায়। এই সময় ‘জেনানা ডাক্তার’ কাদম্বিনীর ডাক পড়ল। প্রায় দু’বছর তিনি রাজপ্রাসাদে থেকে রাজমাতার চিকিৎসা করেন এবং রোগীকে সম্পূর্ণ আরোগ্য করে কলকাতায় ফেরেন। এই ঘটনায় কাদম্বিনীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। নেপালের রাজা জং বাহাদুর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রচুর অর্থ ছাড়াও বিশেষ উপহার দিয়েছিলেন রত্নখচিত দুর্মূল্য সব অঙ্গভূষণ। সঙ্গে হস্তিদন্ত, টাট্টুঘোড়া এবং প্রায় দু’কুইন্টাল ওজনের রুপোর বাসনপত্র। দেশে ফিরে কাদম্বিনী কলকাতার ইডেন ফিমেল হাসপাতালে আউটডোর ইনচার্জের চাকরিতে যোগ দেন বলে জানিয়েছেন তাঁর পুত্র প্রভাতচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়। কাদম্বিনীর সাফল্যকে বাঁকা চোখে দেখেছিল সমাজ। তাই বাংলার কোনও একটি কাগজে কাদম্বিনীর ধুমপানরত ছবি (কার্টুন) বেরিয়েছিল। তবে, এই কৃতী বঙ্গনারীর কৃতিত্বের আসল ইতিহাস সোনার অক্ষরে লেখা আছে এবং চিরকালই থাকবে। বাঙালির প্রেরণা হিসাবে তার নাম আজও স্মরণীয়।