জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
পঞ্চদশ কিস্তি
ঘরে এসে দেখলাম একটা হুলুস্থূলুস কান্ড চলছে। আমি হিমাংশুকে বললাম, দে কোথায় সই করতে হবে। হিমাংশু দেখিয়ে দিল, সই করে দিলাম। রেজিস্টার ম্যাডাম তার সাঙ্গপাঙ্গরা ঘরেই ছিলেন। সব কাজ ওখানেই হয়ে গেল।
সত্যি সব গল্পের মতই মনে হচ্ছে আমার কাছে।
ভাবিনি এত সহজে ওরা ব্যাপারটা মেনে নেবে।
না মানলে অবশ্য আমি মানতে বাধ্য করাতাম। সেই ডকুমেন্টসও আমি রেডি রেখেছিলাম।
নিজের জায়গায় বসলাম। মলের দিকে তাকিয়ে বললাম, মনে কিছু করবেন না মল সাহেব। গত পাঁচ বছরে ব-কলমে অনেক কামিয়েছেন। আমি তাতে হাত দিলাম না। খুব সামান্যই নিলাম আপনার কাছ থেকে। আমার ভাগটা এখানে এসে বুঝিয়ে দেবেন। আমি আপনার কাছে কোনওদিন যাব না। যদি যাই করেকুরে নেব। আপনি এখন আসুন। আজ থেকে আপনি আমাদের হাউসের ভালো বন্ধু।
আমার কাগজপত্র।
যেখান থেকে নিয়ে এসেছি। সেখানেই পৌঁছে দেব।
মল আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
আমার প্রচুর লস হলো।
আমি কিন্তু লাস্ট ফাইভইয়ার্সের ক্লেম করিনি। যাদের কাছ থেকে শেয়ারটা আমার নামে ট্রান্সফার করা হয়েছে। তারা কিছুই পায়নি।
আমি বুঝতে পারছি আপনি এখন অনেক কিছু করতে পারেন।
সবই যখন বোঝেন, তাহলে কাঁদুনি গেয়ে লাভ, আসুন আপনি, বাকিটা সেরে ফেলি।
মল গট গট করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।
আপনাদের টাকাটা?
সনাতনবাবু, কিংশুকবাবু, অরিন্দমবাবুর মুখের দিকে তাকালাম।
স্যার কিছু টাকা খরচ করে ফেলেছি, যেটা আছে সেটা কালকে দিয়ে দেব। কিংশুক বললো।
আপনারা সব ভালো ঘরের ছেলে পুলে এসব ঘোটালাতে জড়ালেন কেন?
সবার মাথা নত।
আপনাদের সঙ্গে মিত্রার বাড়িতে আমার প্রথম সাক্ষাতে এরকম একটা কিছু ঘটতে পারে তার ইংগিত দিয়েছিলাম।
কেউ আর মাথা তোলে না।
সনাতনবাবু আপনি বয়স্কমানুষ এ কি করলেন!
সনাতনবাবু কিছু বললেন না। মাথা নিচু করে বসে আছেন।
সুনিতদা।
তুই আর কিছু বলিস না অনি। এই কদিনে বাড়িতে, বাড়ির বাইরে, অফিসে অনেক কিছু শুনেছি আর বলিস না।
এইবার কাজটা কি ঠিক মতো হবে?
কথা দিচ্ছি। আমার এক্তিয়ারের বাইরে আমি কোনওদিন যাব না।
তোমার আর চম্পকদার নতুন কাগজের তাহলে কি হবে?
সবাই চুপচাপ।
বলো। এদের সকলের সামনে তোমাদের বলতে হবে।
তুই তো মলের কাছ থেকে সব লিখিয়ে নিলি।
এই মেয়েটাকে ঠকাতে তোমাদের ইচ্ছে হলো। যে তোমাকে নিজের আত্মীয় ভেবে সমস্ত দায়িত্ব দিয়েছিল। তার সম্বন্ধে নোংরা স্ক্যান্ডেল ছড়াতেও তোমাদের মুখে বাধেনি। আজও হাউসের চারপাশে কান পাতলে হাল্কা আওয়াজ শুনতে পাই।
চম্পকদা আপনি আমার পেছনে ফেউ লাগিয়েছিলেন!
দু-জনেই চুপচাপ।
কতোটাকা দেনার বোঝা চাপিয়ে রেখেছেন এই মেয়েটার ঘারে সেটা খেয়াল করেছেন?
আমার ভুল হয়েছে।
সাত খুন মাপ।
চম্পকদা এ্যাডের কমিশনটা কুড়ি কিংবা পঁচিশ নয় তের পার্সেন্ট, এটা ঠিক?
হ্যাঁ।
আমার কিন্তু কামিং ছয় মাসে তিনশো কোটি চাই। কোথা থেকে আসবে আমি জানি না।
আমি পারব না।
না পরলে আপনার সম্পত্তি লিখে দিতে হবে।
চুপচাপ।
আমি আপনাদের কামিং থ্রি মান্থের জন্য একশো কুড়ি কোটি টাকার এ্যাড দেব। বাকি একশো আশি কোটি আপনারা জোগাড় করতে পারবেন?
কেউ যেন চম্পকদার গালে একটা থাপ্পর মারল। মাথা তুললো চম্পকদা। ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে।
সনাতনবাবু চশমাটা চোখ থেকে খুলে আমার দিকে খালি চোখে তাকাল।
চেষ্টা করবো।
ফাইলটা খুলে পাঁচটা চিঠি এগিয়ে দিলাম।
এই নিন একশো কুড়ি কোটির ড্রিল।
চম্পকদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
এটা জেরক্স অরিজিন্যাল আমার পকেটে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
সবাই কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। অমিতাভদা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে সবার সামনে আমার কপালে চুমু খেল।
আমি দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে। হাসি হাসি মুখে প্রশান্তির ছোঁয়া।
এবার আপনারা সকলে মিলে আমায় শাস্তি দিতে পারেন।
আমি এই সাতদিনে অনেক অপরাধ করেছি। আজ স্বীকার করছি। এই সব কান্ড কারখানা করার জন্য, আমি এই হাউস থেকে দুটো জিনিস চুরি করেছি। একটা প্যাড। আর একটা স্ট্যাম্প। বাকি একটা ডিরেক্টরের স্ট্যাম্প আমি বানিয়ে নিয়েছিলাম। অন্যায় করেছি?
সবাই চুপচাপ।
হিমাংশুর দিকে তাকিয়ে বললাম, কাগজগুলো গুছিয়ে নিয়ে দাদার বাড়িতে পৌঁছে দিবি, আমি রাতে ভালো করে একবার দেখে নেব।
আমি বেরিয়ে চলে এলাম।
দাদা, মিত্রা, মল্লিকদা তিনজনে একসঙ্গে অনি বলে ডেকে উঠলো।
আমি পেছন ফিরে তাকালাম না।
তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম।
কে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কে তাকিয়ে নেই কোনও খেয়ালই করলাম না।
বড় রাস্তায় এসে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। সোজা চলে এলাম দামিনীমাসির কাছে।
ওপাড়ায় কম বেশি সবাই আমাকে চেনে। তাই কেউ বিরক্ত করে না। আমি ওপরের ঘরে এসে দেখলাম দামিনীমাসির ঘরে তালা। পাশের ঘর থেকে একটা মেয়ে বেরিয়ে এলো।
এপাড়ার মেয়েদের যেমন দেখতে হয়। এই দুপুর বেলাতেও সেজেগুজে অপেক্ষা করছে।
আমায় দেখতে পেয়ে আমায় কাছে এসে বললো, দাদা তুমি আমার ঘরে চলো। মাসি কাছাকাছি কোথাও গেছে। এখুনি চলে আসবে।
একটু ইতস্ততঃ করছিলাম।
তুমি চলো না। এখন কেউ আসবে না আমার কাছে। এলে ভাগিয়ে দেব।
মেয়েটি আমার হাতটা ধরে টানা টানি করছিল। ওর গলা শুনে পাশের ঘর থেকে আরও কয়েকটা মেয়ে বেরিয়ে এলো।
অনিদা তুমি! এই সময়! নিশ্চই কিছু একটা হয়েছে।
নারে, এমনি এসেছিলাম মাসির কাছে।
লক্ষী, মাসি না আসা পর্যন্ত তোর ঘরে নিয়ে গিয়ে বসা অনিদাকে। একজন বলে উঠলো।
কখন থেকে বলছি, কিছুতেই যাবে না। লক্ষী বলে মেয়েটা বলে উঠল।
ঠিক আছে চলো।
আমি লক্ষীর পেছন পেছন ওর ঘরে ঢুকলাম।
এই ঘরটা আগের থেক অনেক বেশি ডেকরেটেড। তার মানে লক্ষীর খরিদ্দারদের মালকরি ভালোই। দেখলাম এসিও লাগান আছে। এই ঘরটায় একসময় মেরিনা বলে একটা মেয়ে থাকত। উত্তর চব্বিশ পরগণার একটা অঝ্ঝড় গ্রাম থেকে তুলে আনা হয়েছিল। সেই নিয়ে অনেক ঘটনা। মাসি বেশ ভালোদামে কিনেছিল। ইসলামভাই এই মেয়েটির ঘরে প্রতিদিন আসত। সেখান থেকেই পরিচয়। তারপর মেয়েটি একদিন মার্ডার হয়ে গেল। কি করে হলো কেন হলো, সে অনেক ইতিহাস।
সেই কটা দিন ইসলামভাই পাগলের মতো হয়েগেছিল।
মেয়েটি ইসলামভাইকে ভালোবেসে ফেলেছিল। ইসলামভাইও মেরিনা ছাড়া অন্য কোনও মেয়ের ঘরে ঢুকত না।
আমি সময়ে অসময়ে বয়ের কাজ করতাম। মদ এনে দিতাম। তার সঙ্গে আনুসাঙ্গিক চাট।
তখন আমি সবে মাত্র সাংবাদিকতায় পাঠ নিচ্ছি। ইউনিভার্সিটিতে জার্নালিজম নিয়ে পড়ছি। হস্টেল জোটেনি টাকার অভাবে।
কলকাতার রাস্তাঘাট বিশেষ একটা চিন্তাম না। চেনা গন্ডির বাইরে খুব কমই পা রেখেছি। কম পয়সায় একটু থাকার আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে একদিন এই পাড়ায় চলে এসেছিলাম।
একটি মেয়ে আমাকে হাত ধরে ঘরে ঢুকিয়েছিল। তারপর যা হয়।
আমি চেঁচামিচি করতে দামিনীমাসি এসেছিল। আমার মুখটা দেখে দামিনীমাসির কি মনে হয়েছিল জানি না, আমাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলো কেন এসেছিলাম?
আমি মাসিকে মিথ্যে কথা বলিনি। সব সত্যি বলেছিলাম।
আমি পড়াশুন করছি। কলেজের হস্টেল ছেড়ে দিতে হবে। মেয়েটিকে রাস্তায় দেখা হতে বললাম, আমায় একটা ঘর জোগাড় করে দিতে পারেন। ও নিয়ে এসে….।
সেইদিন থেকে দামিনীমাসি নিজের ঘরের এক কোনে থাকার জায়গা করে দিয়েছিল, প্রথম কয়মাস সেখানে ছিলাম। তারপর ছাদের ঘরে। যখন রোজগার করতে পারলাম। তখন দামিনীমাসিকে ভাড়া দিতাম। তাও সবটা নয়।
টিউশনি করে নিজের পেট, পড়াশুনার খরচ চালিয়েছি। কোনওদিন খাবার জুটতো কোনওদিন জুটতো না। সেই সময় এই পাড়ার বহুমেয়ের ছেলে-মেয়েদের আমি পড়াতাম। একসময় মাস্টার মশাই উপাধিতেও ভূষিত হয়ে পড়েছিলাম। মাস্টারের আড়ালে আমার সত্যি কারের নামটাই চাপা পড়েগেছিল।
তারপর একদিন অমিতাভদা স্থান দিলেন তাঁর বাড়িতে। না আমার কোনও অসুবিধে হয়নি। প্রথম প্রথম একটা সেকি ভাব ছিল, তারপর সব অভ্যাস হয়ে গেল।
সত্যি কথা বলতে কি এদের এখানে এলে আমার মধ্যে কোনওদিন সেক্স ভাবটাই জাগত না। কেন জাগত না বলতে পারবো না। আমি এপাড়ার গুড বয় হিসাবে পরিচিত ছিলাম।
কিরে, তুই এই সময়! দামিনীমাসি দরজার সামনে।
তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।
বুঝেছি, মক্কেলটা বলেছে বুঝি।
মাথা নাড়লাম।
লক্ষী কোথায় গেল?
কেন। একটি মেয়ে কাছে এগিয়ে এসে বললো।
ছেলেটাকে একা বসিয়ে দিয়ে কোথায় ঘষাতে গেছে।
ওই ঘরে আছে।
দেখলাম ছুটতে ছুটতে লক্ষী এলো।
খদ্দের এসেছিল?
না।
তাহলে?
মেয়েটি মাথা নিচু করে চুপচাপ।
ছেলটাকে একটু জলটল দিয়েছিস?
না। মানে!
খদ্দের নয় বলে।
দেখলে অনিদা দেখলে।
লক্ষী আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিনি বলো?
তুমি বৃথা রাগ করছো মাসি।
তুই থাম। সব সময় কুটকুটানি, দেব একদিন লঙ্কা ডলে বুঝবি। তোর বাবু এসেছিল?
না।
এলে আগে মুখ দিয়ে নোট নিবি। তারপর কাপর-চোপর খুলবি।
মাসি আমার দিকে তাকাল।
আয় অনি, এদের শেখাতে শেখাতে শেষ হয়ে গেলাম।
আমি লক্ষীর ঘর থেকে উঠে মাসির ঘরে এলাম।
কোথায় গেছিলে?
৯ নম্বরে।
কেন?
তোকে শুনতে হবে না।
ঠিক আছে বলতে হবে না।
খাটে বসে মাসিকে সব বললাম।
এবার তুই মালিক হলি। আমার ভীষণ ভালো লাগছে, তুই হচ্ছিস আসলে হীরে।
আমি মাসীকে প্রণাম করলাম।
থাক থাক।
তুমি খুশী।
খুশী কি রে। ওই কয় মাসে তুই এ পাড়ায় থেকে বয়ে যেতে পারতিস। যাস নি। তোর লক্ষে অবিচল ছিলি। তোকে সেই সময় আমি অনেক ভাবে বাজিয়েছি। তুই বাজিস নি। এবার আমার ছেলেটার একটু ব্যবস্থা করে দে।
বলো কি করতে হবে।
আর কতদিন মদ আনবে, যে কোনও একটা কাজ। কতো কাজ আছে তোর অফিসে।
তুমি ভজুকে ডাকো।
এখুনি!
হ্যাঁ। ওর জন্য কিছু করতে পারলে, আমারও ভালো লাগবে।
দামিনীমাসি গলা হাঁকরে লক্ষীকে একবার ডাকল। লক্ষী ছুটে চলে এলো। আঁচলের গিঁট খুলে লক্ষীকে একটা পাঁচশ টাকার নোট দিল।
মিষ্টি নিয়ে আয়। আমি আমার বাবুকে খাওয়াব। আমার বাবুকে দেখেছিস। তোদের বাবুর মতো নয়।
লক্ষী হাসছে, আমিও হাসলাম।
মাসি কম করে নিয়ে আসতে বলো।
কেনরে, তোর কি চিনি হয়েছে?
আমি হাসছি। তোমার সঙ্গে পারা যাবে না।
পারবি কি করে। ষোলো বছরে এসেছিলাম। এখন ছেচল্লিশ। দুদিন পর মরে যাব। তিরিশ বছর এই এঁদো গলিতে কাটিয়ে দিলাম।
মাসি লক্ষীর দিকে তাকাল।
লক্ষী ভজুকে দেখলে একবার পাঠিয়ে দিস।
লক্ষী কোমর দোলাতে দোলাতে চলেগেল।
তুই বোস, একবার রাউন্ড মেরে আসি।
যাও।
দামিনী মাসি কার ঘরে কে আছে দেখতে গেল। না হলে পয়সা মার যাবে।
ভজু, দামিনী মাসির ছেলে নয় এখানে কে বাচ্চা বিয়তে গিয়ে মারা গেছিল। দামিনীমাসি মানুষ করেছে। ভজু একটু এ্যাবনর্মাল বলে দামিনীমাসি নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। শুনেছিলাম দামিনীমাসির নাকি গোটা পনেরো ছেলে মেয়ে, কিন্তু একটাকেও আমি আজ পর্যন্ত চোখের দেখা দেখিনি।
দামিনীমাসিকেও সাহস করে কোনওদিন জিজ্ঞাসা করিনি। তখন সেই ভাবে প্রোটেকসন ছিল না বলে এতো ছেলে মেয়ে। এখন কতো প্রোটেকসন।
ঘরে ঢুকে ভজু আমাকে দেখে নাচানাচি শুরু করে দিল।
পয়সা দাও।
দেব, তুই আমার কাছে থাকবি।
ভজুর সে কি আনন্দ।
আমায় নিয়ে যাবে! আমি যাব। মা মারে জান। খেতে দেয় না।
ভজু আমার থেকে বছর তিনেকের ছোটো, একবার কঠিন রোগে ওর ব্রেনে চাপ পরলো তারপর থেকে ও এরকম। কিন্তু ও সব বোঝে।
এ তল্লাটে তুমি খাটতে পারলে খাবার পাবে। নাহলে তোমায় ক্রিমিকিটের মতো এক কোনায় মরে পরে থাকতে হবে। এখানে কেউ কারুর নয়। আমার কপাল ভালো। আমি এখানে টিঁকে গেছিলাম।
লক্ষী প্লেটে করে খাবার সাজিয়ে নিয়ে এল। প্রায় দশ রকমের মিষ্টি। পেছন পেছন মাসি ঢুকল, এই তো নাংয়ের মতো সাজিয়ে দিয়েছিস। এবার ঠিক আছে।
অনিদার সামনে একটু ভালো করে কথা বলতে পারো না। লক্ষী ঝাঁজিয়ে উঠলো।
মাসি হেসে লক্ষীর গাল টিপে দিল।
মাসি এতো খেতে পারব না। লক্ষী তুমি কাছে এসো।
লক্ষী কিছুতেই আসবে না।
আমি বলছি, মাসি তোমায় কিছু বলবে না। আমি লক্ষীকে দুটো ভজুকে দুটো মাসিকে দুটো দিয়ে নিজে খেলাম। আসার সময় মাসির হাতে তিনটে হাজার টাকার নোট গুঁজে দিলাম।
মাসির চোখ চকচক করে উঠল। লক্ষীকে দেখিয়ে বললো, দেখ গতর না দিয়ে ইনকাম, পারবি।
আমি মাসির দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি থামবে।
ভজুর কি করলি?
ভজু আমার কাছে থাকবে।
কবে নিয়ে যাবি।
তুমি আমাকে দিন পনের সময় দাও। ধরে নাও ভজু আজ থেকে আমার কাছে কাজ করছে।
সে কিরকম বাপু।
তুমি এটা নিয়ে ভাবছ কেন। আমি আগামী সপ্তাহে একবার আসবো। ফোন নম্বর রইলো।
ওরে ও লক্ষী, অনি শিবঠাকুর রে শিবঠাকুর। একটা পেন্নাম কর অন্ততঃ।
মেয়েটা আমাকে পেন্নাম করলো।
আমি ভজুকে বললাম, চল।
এখন।
না এখন না, নিচে চল, আগামী সপ্তাহে তোকে নিয়ে যাব।
তুমি মাকে বলে যাও, আমাকে যেন না মারে।
মাসি ভজুকে কাঁচা খিস্তি দিল। তোমায় পুজ করবে।
ওঃ মাসি।
সিঁড়ির দিকে পা বারালাম। মাসি ভজু পেছন পেছন এলো।
নামার সময় দেখলাম, অন্ততঃ কুড়ি জোড়া চোখ আমার দিকে জুল জুল করে চেয়ে আছে।
তুই এখন কোথায় যাবি?
একটু নিউটাউনের দিকে যাব।
কার কাছে?
একটা মেয়ের কাছে।
মাসি মুখ টিপে হাসলো।
হাসছে কেন?
হাসি পেল তাই।
সে তুমি যাই ভাবো।
আমি কি ভাববো। তোকে আমার যাচাই করা হয়ে গেছে।
যাও ওপরে যাও।
আবার কবে আসবি?
কয়েকটা কাজ আছে সেরে নিই। আগামী সপ্তাহে এসে ভজুকে নিয়ে যাব।
কোথায়?
দাদার বাড়িতে।
তাহলে খুব ভালো হয়।
তোমাকে আর ভজুর ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ও বড়োমা, ছোটোমার কাছে থাকবে। দুজনেই বাড়িতে সারাটা দিন একা থাকে।
মাসি আমার হাতটা ধরে ফেললো। মুখের দিকে তাকালাম। চোখটা ছল ছলে।
এরকম করলে আর আসবো না।
মাসি মাথা নিচু করে নিল।
এবার ওপরে যাও।
আমি রাস্তায় নেমে এলাম। মাসি আমার পাশে।
টিনাকে ফোন করলাম।
হ্যালো।
বলো অনিদা।
তুমি কোথায়?
বাড়িতে।
অফিসে যাও নি?
না।
শরীর খারাপ?
সব দিন অফিস যেতে ভালো লাগে না।
আসব নাকি?
সত্যি!
সত্যি না তো কি মিথ্যে?
চলে এসো।
আজ থেকে ক্লাস করাবে?
অবশ্যই।
ঠিক আছে যাচ্ছি।
মাসির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গলি থেকে রাজপথে এসে উঠলাম।
একটা ট্যাক্সি ধরলাম। খুব কম করে ঘণ্টা খানেক সময় লাগবে টিনার ওখানে যেতে। ট্যাক্সিতে উঠে প্রথমে বড়োমাকে ফোনে ধরলাম, ফোন ধরেই বড়োমা বললো, কিরে অনি! কি হয়েছে?
কি করছো?
খেতে বসবো।
এতো বেলায়!
আমায় কে বেড়ে দেবে বল। নিজেরটা নিজে বেড়ে নিতে হয়।
তোমার আমার একই অবস্থা।
তুই খেয়েছিস?
না এখনও জোটে নি।
চলে আয় একসঙ্গে খাব।
তুমি অনিকে এতো ভালোবাস কেন বলো তো?
অনি যে আমার পেটের ছেলে নয়।
জানো অনেক দিন পর আজ নিজেকে বেশ হাল্কা লাগছে।
জানি। তোর দাদা ফোন করে সব বললো।
কি বললো?
শুনতে ইচ্ছে করছে।
হুঁ।
চলে আয়।
এখন না, রাতে যাব।
তুই এখন কোথায়?
ট্যাক্সিতে, একটা কাজে যাচ্ছি।
শুধু কাজ, কাজ আর কাজ। তোর আর তোর দাদার কাজ একটা ম্যানিয়া।
মিত্রা ফোন করেছিল?
হ্যাঁ।
চুপচাপ।
কথা বোলছনা কেন?
তুই ওকে বাঁচিয়ে দিলি।
শুধু ওকে নয়। সমস্ত কাগজের স্টাফকে। এইবার বলো, এই সাতদিন তোমার সঙ্গে ঠিক মতো কথা বলিনি বলে তুমি এখন কষ্ট পাচ্ছ?
একবারে না।
তাহলে সাতখুন মাপ।
ওরে শয়তান। তুই ঘুরিয়ে কথা আদায় করছিস?
তোমার কাছ থেকে কথা আদায় করবো না তো কার কাছ থেকে আদায় করবো বলো।
চলে আয় না।
না, অনেক ঋণ করেছি বুঝলে, একে একে শোধ করতে হবে। রাতে যাব।
তখন তুই তোর দাদার সঙ্গে কথা বলিসনি।
ভালো লাগছিল না। বিশ্বাস করো, কারুর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছিল না।
তোর দাদা কষ্ট পেয়েছে।
রাতে গিয়ে সব ঠিক করে দেব।
রাতে কি খাবি?
তোমায় কিছু করতে হবে না। আমি কিনে নিয়ে যাব।
না কেনা-কিনির দরকার নেই, আমি রান্না করবো।
ছোটো কোথায়?
ব্যাঙ্কে গেছে।
আচ্ছা।
ফোনটা কেটে দিলাম, হিমাংশুকে একটা ফোন করলাম। ও বললো সব ঠিক আছে। কথায় কথায় বললো, মল তোর ওপর একটা রিভেঞ্জ নিতে পারে।
হাসতে হাসতে বললাম, ওর আর একটা ডকুমেন্টস আমার কাছে আছে, সেটা যদি শো করাই ওকে ভারতের পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যেতে হবে। তোকে কিছু বললে খবরটা ওর কানে পৌঁছে দিস।
কি বলছিস!
আমার শরীরে দয়া-মায়া একটু কম। ছোটো থেকে একা একা বড় হয়েছি। যাক শোন, তুই এবার এ্যাকাউন্টসে হাত দে।
কাজগুলো একটু গুছিয়ে নিই, আগামী সপ্তাহ থেকে হাত দেব।
আচ্ছা।
হিমাংশুকে রেখে সন্দীপকে ফোন করলাম।
হ্যালো।
বল খবর কি?
গুরু এত স্মুথ কাজ অনেক দিন পর দেখছি।
কেন?
কি বলবো বস, সবাই অমিতাভদার পার্মিশন ছাড়া কোনও কাজই করছে না।
তাই নাকি?
তুই বুড়োটাকে মেরে দিবি।
কেন?
এখনও দেখছি, চম্পকদা, সুনিতদা ম্যানেজমেন্টের সব দাদাকে ঘিরে বসে আছে।
গম্ভীর সব।
না-রে হাসাহাসি করছে। সেই আগের অবস্থা।
এনজয়কর।
সন্দীপ হেসে উঠলো। তুই কোথায়?
সোনাগাছিতে।
ভ্যাট।
একটু খোঁজ-খবর নে, জানতে পারবি।
আমার এই বুদ্ধিতে তোর গতিবিধি মাপা মুস্কিল।
হাসলাম। তোর চাকরি পাকা।
হ্যাঁ গুরু, তোমার দয়ায় টেনসন মুক্ত হলাম।
ঠিক আছে। রাখছি।
মিত্রাকে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ করলাম, আমি রাত আটটার মধ্যে অমিতাভদার বাড়ি ঢুকছি, অবশ্যই চলে আসবি।
ফোনটা স্যুইচ অফ করলাম।
টিনার হাউসিং-এর সামনে এসে ট্যাক্সিটাকে ছেড়ে দিলাম। ধীর পায়ে লিফট বক্সের সামনে এলাম। লিফট নিচেই ছিল আমি যথাস্থানে বোতাম টিপলাম। হুস করে ওপরে চলে এলাম।
শরীরটা কেমন যেন ছেড়ে দিয়েছে। এই সাতটাদিন আমার ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। ঝড়ে ডালপালা অক্ষত থাকলেও, তার একটা রেশ সারা শরীরে। এটা আমি বুঝতে পারছি।
টিনা দরজা খুলে আমার সামনে দাঁড়াল। একঝলক মুক্ত বাতাস আমার চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো। টিনাকে আজ কালো লাগছে না। বরং ওর চোখে মুখে রং ছড়িয়ে পরেছে। আমাকে দেখে ও একটু অবাক হলো। ওর চোখ তাই বলে। মুচকি হাসলো।
ভেতরে এসো।
আমি ভেতরে গেলাম। সোফার ওপর নিজেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।
টিনা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক পড়ছে না। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম।
তোমার কি শরীর খারাপ অনিদা!
না।
তাহলে এরকম দেখতে লাগছে তোমায়!
কই না তো!
না। কিরকম ঝোড়ো কাকের মতো লাগছে। অফিসের কোনও সমস্যা?
ছিল, মিটিয়ে দিয়েছি।
দাঁড়াও।
টিনা ভেতরের ঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর একগ্লাস এ্যাপেলজুস নিয়ে এল। এখন এসব রেডিমেড পাওয়া যায়।
টিনা হাসছে।
আগে এটা খাও।
আমি দ্বিধা করলাম না। ঘট ঘট করে সব টুকু খেয়ে নিলাম। আমার খাওয়া দেখে টিনা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। খাওয়া শেষ হতে টিনা গ্লাসটা আমার হাত থেকে নিল। সেন্টার টেবিলে রাখলো। আমার মুখো মুখি সোফায় বসলো।
কি হয়েছে অনিদা, আমায় বলো।
কিছু হয়নি।
তোমার চোখ-মুখ বলছে, তুমি বহুরাত ঘুমোও নি।
তা বলতে পার। একটা বড় কাজ ছিল। বলতে পারো একটা জট পেকে ছিল। জীবনে প্রথম মালিক হয়ে সেই জট ছাড়ালাম।
হেঁয়ালি রাখো।
হাসলাম। তোমার বাথরুমটা ব্যাবহার করতে পারব।
অবশ্যই।
আমি স্নান করবো।
ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
টিনা বাথরুমে গিয়ে ব্যবস্থা করে এলো।
কি খাবে বলো?
হাল্কা কিছু খাব।
লাইট করে নুডলস তৈরি করে দিই।
দাও।
আমি বাথরুমে গেলাম। গেঞ্জি প্যান্ট খুলে নেংটো হয়ে ভালো করে স্নান করলাম।
টিনার বাথরুমটা বেশ গোছান। ছোটো কিন্তু ছিমছাম সুন্দর।
চারিদিক সাদা। একটু দাগ পরলেই চোখে পরে যাবে। গায়ে জল ঢালতেই একটু শীত শীত করে উঠলো। বুঝলাম ভতরের রসদ কমে এসেছে।
দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম।
একি এটা পরলে কেন?
কেন!
তোমার জন্য একটা কাপর বার করে রেখেছি।
থাক।
মেয়েদের বলে পরবে না।
কাপরটা দেখলাম কোথায়?
ভেতরের ঘরে আছে।
চিরুনিটা দাও, অনেক দিন দেওয়া হয়নি। মনে হয় চুলগুলো জট পরে যাবে।
কতো দিন কাট নি?
মাস ছয়েক?
কেটো না।
কেন!
তোমাকে এই অবস্থায় বেশ ভালো লাগছে। কাটলে মুখটা ছোটো ছোটো লাগবে।
ভাবছি পনিটেল করবো।
এ-মা না না, একেবারে না। টিনা মুখ ভ্যাটকাল।
খাবার নিয়ে আসি?
নিয়ে এসো।
টিনা প্লেটে করে সাজিয়ে নিয়ে এলো। আমি অবাক হলাম। নুডুলসের সঙ্গে ডিম ভেজেছে ছোটো ছোটো পাঁপড় ভেজেছে।
এতো খাব না। তুমি একটা প্লেট নিয়ে এসো।
না তোমায় খেতে হবে।
একটা প্লেট নিয়ে এসো না।
আমার কথার মধ্যে মনে হয় ওজন ছিল, টিনা সোফা থেকে উঠে গিয়ে রান্নাঘর থেকে একটা প্লেট নিয়ে এলো।
দুটো ভাগ করো, সমান মাপে, যদি কম বেশি হয় কমটা আমি খাব।
উঃ তুমি পারও বটে।
টিনা আমার মুখো মুখি সোফায় বসে। খাবার ভাগ করলো। দুজনে একসঙ্গে খেলাম। টিনার সঙ্গে অনেক কথা হলো, সেই কলেজ লাইফ থেকে। ও শুনেত চাইল সেই দিনকার তাজ হোটেলের অসমাপ্ত কথা। আমি গল্পের ছলে ওকে বোললাম। ও হাসতে হাসতে সোফায় গড়িয়ে পরে।
তুমি এরকম দুষ্টু ছিলে।
দুষ্টু ঠিক নয়, বলতে পার ওটা বয়সের একটা ধর্ম। তখন নতুন ভাবে জগত সংসারকে চিনতে শিখছি। একটা লিডারশিপ পাওয়ার ইচ্ছে। সবার থাকে। আমারও ছিল। মনের মধ্যে সব সময় ‘নেতা হব’ এই বাসনা পোষণ করে রাখতাম।
তাই বলে এরকম হ্যারাসমেন্ট। যাক আমার ভাগ্যভালো, কালো বলে তোমার হাত থেকে রেহাই পেয়ে গেছি।
তুমি কালো বলে নিজেকে ছোটো করছো কেন।
নাগো অনিদা ঠিক বলছি।
কথা ঘোরানর চেষ্টা করলাম।
আচ্ছা টিনা তুমি যে পোষাকটা পরে আছো এটার নাম কি?
কেন!
এমনি ইচ্ছে হলো জিজ্ঞাসা করলাম।
তোমার সব জিজ্ঞাসার মধ্যে একটা কারন থাকে। খুব অড লুকিং লাগছে।
না বাড়িতে পরার জন্য ঠিক আছে।
সত্যি করে বলো না। এখন কিন্তু মেয়েরা এই পোষাক পরে বাইরেও বেরয়।
তোমার কথা হয়তো ঠিক, কিন্তু আমার চোখে পরে না।
ওপরেরটা সাধারণ টপ, নিচেরটাকে বলে হারেম প্যান্ট।
সেটা আবার কি?
বলতে পারব না, বাদশাহী আমলে হারেমে বাঁদীরা হয়তো এরকম পোষাক পরতো।
হাসলাম।
হাসলে কেন?
ওর দিকে মিট মিট করে তাকালাম।
উঃ তোমার মাথা বটে, কি ইঙ্গিত করছো বুঝতে পেরেছি। আমি এখুনি ছেড়ে ফেলছি।
না না, আমার কথায় ছেড়ো না। সবার পছন্দ সমান নয়।
খাওয়া শেষ হলো। টিনা প্লেটগুলো তুলে নিয়ে ভেতরে গেল।
শরীরটা এবার ছেড়ে দিয়েছে। ঘুমতে পারলে ভালো হতো। গোটা পাঁচেক বড় বড় হাই উঠলো। একবার ভাবলাম, টিনাকে বলি তোমার ভেতর ঘরের খাটটা একটু ছেড়ে দাও। একটু ঘুমোই।
তারপর ভাবলাম না বেশি বিরক্ত করা হয়ে যাবে। তার থেকে বরং এই সোফাটাই বেশ।
টিনা ভেতর থেকে বাইরে এলো।
কিগো তোমার চোখটা এরকম লাল কেন।
ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
চলো আমার খাটে শোবে চলো।
আমি টিনার দিকে একদৃষ্টে তাকালাম। ওকে দেখে খুব খুশি খুশি মনে হচ্ছে। দেবাশিস ঠিক কথা বলেছে। মেয়েটা তোকে ভীষণ ভালোবাসে। হয়তো ঠিক, কিন্তু সব ভালোবাসার পরিসমাপ্তি হয় না।
আমি দেবাশিসের মুখ থেকে প্রথম শুনেছিলাম, টিনা আমাকে কলেজ লাইফে ভালোবেসে ছিল। এখনও কি ও ভালোবাসে?
কি ভাবছো।
তোমাকে খেতে চাইলাম, তুমি খেতে দিলে। আবার শুতে চাইব হয়তো শুতেও দেবে। মানুষের চাহিদার শেষ নেই। ভুল করে যদি আর কিছু চেয়ে বসি, তখন কি করবে?
চেয়েই দেখনা দিতে পারি কিনা।
কথাটা বলেই টিনা মুখটা নিচু করে নিল।
চলো, তোমার খাটটা কয়েক ঘণ্টার জন্য একটু দখল করি।
উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মাথাটা কেমন ঘুরেগেল। টাল খেয়ে আবার সোফায় বসে পরলাম। টিনা আমার হাতটা ধরে ফেলল। অনিদা শরীর খারাপ লাগছে! ওর চোখে মুখে ভয়ের ছাপ।
না। ঠিক আছি।
আমি ওর পেছন পেছন, ওর বেডরুমে ঢুকলাম। খুব ছিমছাম ডবল বেডের একটা খাট। মাথার শিয়রে ছোটো টেবিলে কম্পিউটার। একটা চেয়ার একটা আলমাড়ি।
পায়ের দিকে একটা ওয়ার্ডব। একটা দেয়াল আলমাড়ি। অবাক হলাম এইটুকু ফল্যাটে দুটো বাথরুম। একটা এই ঘরের সঙ্গে আর একটা বসার ঘরের সঙ্গে। ডানদিকে ছোটো একটা ব্যালকনি। শরীর আর বইছে না। শুতে পারলে বাঁচি। টিনা খুব তারাতারি বিছানাটা গুছিয়ে দিয়ে একটা বালিস বার করে দিল।
প্যান্ট গেঞ্জিটা খুলে নেবে? আমার একটা কাপর দিই। অনেকটা ফ্রি লাগবে।
টিনার মুখের দিকে তাকালাম। হাসলাম।
লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আমার কথা শোনো।
টিনা আমার মনের কথা মনে হয় বুঝতে পারলো। আমি গেঞ্জি প্যান্ট খুলে ওর একটা কাপর পরলাম, ড্রয়ারটা খুললাম না। টিনা পাখাটা হাল্কা ভাবে চালিয়ে দিল।
তুমি শোও আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
টিনার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে হেসেফেললাম। সত্যি টিনা কি করে আমার মনের কথা পট পট করে বলে দিচ্ছে।
আমি দেরি করলাম না, বিছানায় শুয়ে পরলাম। টিনা আমার মাথার শিয়রে বসে ওর শরু শরু নরম আঙুল আমার মাথায় রাখল। যেন পায়রার গায়ে আলতো করে কেউ হাত বোলাচ্ছে।
টিনার গা থেকে একটা হাল্কা গন্ধ ভেসে আসছে। এটা কোনও সেন্টের গন্ধ নয়। এটা টিনার শরীরের নিজস্ব গন্ধ। আমার চোখে সারা রাজ্যের ঘুম, মিহি কুয়াশার মতো ঝড়ে পরছে। এরপর জানিনা কি হয়েছে।
হঠাৎ একটা বিশ্রী স্বপ্নে ঘুমটা ভেঙে গেল। কিছুতেই মনে করতে পারছিনা। কার যেন শ্মশান যাত্রা হচ্ছে। সারা শরীর অবশ। নড়াচড়া করতে পারছি না। মাথা ঘুরিয়ে চারদিক চাইলাম। ঘরে আমি একা। বারান্দার দরজাটা হাট করে খোলা।
বিকেলের নরম রোদ বিছানায় এসে পরেছে। আমার গায়ে ধব ধবে সাদা একটা বিছানার চাদর। প্রথমে সেন্স আসতেই নিজের কাপরটা দেখলাম। ঠিক ঠাক পরা আছে কিনা। যা ভেবেছি ঠিক তাই, গিঁট খুলে সে বিছানায় লোটাচ্ছে। ভাগ্যিস জাঙ্গিয়াটা পরা ছিল। তা না হলে কি কেলোর কীর্তিটাই না হতো।
কিন্তু টিনা গেল কোথায়! শুয়ে শুয়ে চাদর ঢাকা অবস্থাতেই আগে কোমরে কাপরটা বাঁধলাম। তারপর চাদর সরিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। টিনা টিনা বলে তিন-চারবার ডাকলাম। না কেউ কোথাও নেই। এইবার একটু ঘাবরে গেলাম। উঠে বসে রান্নাঘর বাথরুম সব দেখলাম। না টিনা কোথাও নেই।
তাহলে কি টিনা কোথাও গেল?
বাথরুমে গিয়ে মুখ হাত ধুলাম। টিনার ঘরের ঘরিটার দিকে তাকালাম। শোয়া পাঁচটা বাজে। বেলটা বেজে উঠল। গিয়ে দেখলাম লক করা। আবার ঘরে এসে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখলাম বাইরের দরজার লক খোলার শব্দ। বরিয়ে এলাম। দেখলাম টিনা একটা ব্যাগ হাতে ঢুকছে। সেই ঘাঘরাটা পরা, দারুন উজ্জ্বল রং, ভীষণ সুন্দর দেখতে।
কি হলো ঘুম ভেঙেগেল।
কাপর খোলা অবস্থার কথাটা মনে পড়ে গেল। লজ্জায় আমার মাথা প্রায় পায়ে ঠেকে যাবার অবস্থা।
আমি তো ভাবলাম, তুমি রাত এগারটা বাজাবে। তাই এই ফাঁকে একটু বাজার সেরে নিলাম।
আমি টিনার দিকে তাকিয়ে হাসছি।
টিনা সেন্টার টেবিলে ব্যাগটা নামিয়ে রেখে বসলো।
সত্যি করে বলোতো অনিদা, তোমার কি হয়েছে?
আমি সোফায় বোসলাম। টিনা আমার মুখো-মুখি।
কেন!
মিত্রাদির নাম করে ওরকম চেঁচাচ্ছিলে কেন। অফিসে কি কোনও গন্ডগোল?
না সেরকম কিছু না।
ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে জড়িয়ে তুমি যা বলছিলে তাতে তাই মনে হচ্ছিল।
আমি টিনার দিকে তাকিয়ে আছি।
মল কে? কেন তাকে ছাড়বে না।
বুঝলাম আমার অবচেতন মন ঘুমের ঘোরে অনেক কিছু উল্টো-পাল্টা বকেছে।
তারপর জিতে গেছো। ব্যাপারটা কি?
আমি টিনার কথার কোন উত্তর দিলাম না।
সোফা থেকে উঠে এসে ভেতরের ঘরের খাটে শুয়ে পড়লাম।
টিনা আমার মাথার শিয়রে এসে বসলো। আমার মাথায় হাত রেখে বললো, তুমি কাউকে তোমার কথা বলতে পারো না। তাই না?
আমি টিনার মুখের দিকে তাকালাম। ও একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
বলো না, বললে একটু হাল্কা হবে।
না টিনা, সব বলা যায় না।
জানি।
তবু যদি তোমায় কোনও হেল্প করতে পারি, ভালো লাগবে।
তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে শুধু নিয়ে গেলাম।
যখন চাইবো সুদে আসলে মিটিয়ে দিও।
আমার সে ক্ষমতা নেই।
তোমার কতো ক্ষমতা আছে তা তুমি নিজেই জান না। দাঁড়াও তোমার জন্য একটু চা বানাই।
টিনা উঠে চলে গেল।
পাখাটা ধীর লয়ে মাথার ওপর ঘুরছে। আমি চোখটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ব্লেডটা দেখার চেষ্টা করলাম। খাট থেকে রোদটা বারান্দার এককোনে সরে গেছে। সূর্যটা এখন কমলারংয়ের থালার মতো। বোঝা যাচ্ছে বয়স হয়েছে। এবার ঝুপ করে ওই দিগন্তে মুখ ঢাকা দেবে।
এত কি ভাবো? টিনা চায়ের ট্রে হাতে ঘরে ঢুকলো।
টিনার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
কিছু জিজ্ঞাসা করলেই হাসিতে মুখ ভরিয়ে দাও। ওঠো।
আমি বালিসটা নিয়ে একটু ভেতর দিকে সরে শুলাম। টিনা ট্রেটা বিছানার ওপর রাখল। চা তার সঙ্গে কাঠিভাজা। খুব ভালো লাগলো খেতে। টিনা বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানতে চাইল আমার কথা। আমিও খুব সন্তর্পনে এরিয়ে গেলাম। একথা সেকথা বলে।
কখনও টিনা অভিমান ভরে আমার দিকে তাকিয়েছে। কখনও খিল খিল করে হেসে উঠেছে। চা পর্ব শেষ হতেই টিনা ট্রেটা রেখে এলো। আমি আবার বিছানায় এলিয়ে পরলাম। টিনা বারান্দার দরজাটা বন্ধ করলো।
এখানে প্রচুর মশা। বন্ধ না করলে রাতে শোয়া যায় না।
এতো উঁচুতে।
মশার আবার উঁচু নিচু।
টিনা আমার মাথার শিয়রে এসে বসলো।
আমার দিকে ঝুঁকে পরে বললো, বললে না।
আমি ওর দিকে তাকালাম, তুমি আমার কাছে কি চাইবে বললে, চাইলে না।
টিনা মুচকি মুচকি হাসছে। তোমার কাছে চাইবার সাহস নেই আমার।
কেন? পাস ফিরে টিনার হাতটা ধোরলাম।
অনিদা মেয়েরা মুখ ফুটে সব জিনিস চাইতে পারে না।
আমি টিনার চোখে চোখ রাখলাম। দেবাশিসের কথাটা মনে পড়ে গেল।
আমি চাইতে পারি, তুমি চাইতে পার না।
টিনা আমার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
আমি ওর থুতনিটা ধরে মুখটা তুললাম, বলো তুমি চাইলে আমি না করবো না।
টিনা আমার বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখ লুকলো। আমি ওর খোলা চুলে হাত রাখলাম। বুকটা ভিঁজে ভিঁজে ঠেকছে। আমার বুকে মুখ লুকিয়ে টিনা ফিস ফিস করে বললো, চাইতে তো ইচ্ছে করে। কিন্তু পরের জিনিস ছিনিয়ে নিই কি করে।
আমি বুকভরে নিঃশ্বাস নিলাম।
টিনার বাড়ি থেকে যখন বেরলাম, তখন সাতটা বাজে, টিনা নিচ পর্যন্ত এলো। আমি ট্যাক্সি ধরলাম। ফোনটা অন করতেই ম্যাসেজ মিসকলের ছড়াছড়ি। ম্যাসেজগুলো পড়লাম।
কয়েকটা ম্যাসেজ বাদ দিলে সবই ম্যাসেজ সেন্টার থেকে পাঠান। মিত্রার ম্যাসেজটা খুললাম। খুব ছোটো লেখা, “আমি কি তোর কেপ্ট, যখন ডাকবি চলে যেতে হবে’’।
একবার, দুবার, তিনবার পড়লাম। বুঝলাম কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। মিত্রা এই ধরনের কোনও ম্যাসেজ আমায় লিখতে পারে এটা ধারনা ছিল না।
অনেকক্ষণ ভাবলাম কেন মিত্রা এটা লিখলো? কোনও উত্তর পেলাম না। হয়তো প্রচন্ড রাগ, কিংবা অভিমান। এই দুটো হওয়া স্বাভাবিক। সমস্ত ঘটনা ও এখনও পুরোপুরি জানে না। এটা আমার একটা স্বভাব। আমি কাউকে কোনও কথা না বলে কাজ করি, আমার টেনসন আমার নিজের কাছে। কারুর ওপর চাপিয়ে দিতে চাই না।
টিনার বাড়ি থেকে যে মন নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম, সেই মনে কিছুটা হলেও দাগ লাগল। মল্লিকদাকে ফোনে ধরলাম।
কি বাপ, কোথায় হাওয়া খাচ্ছ।
বাইপাসে আছি, বাড়ির দিকে যাচ্ছি।
বলো কি অভিপ্রায়।
একটা সঠিক খবর দিতে পারবে?
বলো।
মিত্রা কোথায় জান?
ফোন করো, পয়ে যাবে।
এর জন্য তোমায় ফোন করতে যাব কেন।
ঠিক। এতটা তলিয়ে দেখিনি। দাঁড়া দাদাকে জিজ্ঞাসা করি।
আমি ফোন করে জানতে চাইছি, এটা বলার দরকার নেই, সেটা কি বলে দিতে হবে?
একেবারেই না।
কিছুক্ষণ ফোন ধরে রইলাম।
শোন তুই বেরিয়ে যাবার আধ ঘণ্টার মধ্যেই মিত্র বেরিয়ে গেছে, দাদাকে বলে গেছে আজ রাতে আমাদের বাড়িতে যাবে না। কোথায় গেছে দাদা জিজ্ঞাসা করেনি।
কার গাড়ি নিয়ে গেছে। ইসমাইল না রবীন?
ইসমাইল অফিসে রয়েছে, রবীনকে নিয়েগেছে।
আচ্ছা।
মিত্রাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম, দেখলাম স্যুইচ অফ।
বড়োমাকে ফোন করলাম।
বলুন ছোটোসাহেব। বুঝলাম ছোটোমা ধরেছে।
এই সম্বোধনে কবে থেকে ভূষিত হলাম?
কেন মিত্রা বললো।
কখন!
তিনটে সাড়ে তিনটে হবে।
কি বললো?
সেটা ওর কাছ থেকে জেনে নাও। তুই কখন আসছিস?
ও কি আজ রাতে আসার কথা কিছু বলেছে।
আজ ওর অনেক কাজ, আসতে পারবে না।
বুঝেছি।
কি!
তুমি বুঝতে পারবে না। বড়োমাকে একবার দাও।
ধর।
কিরে অনি!
শোনো, চেঁচামিচি করবে না। আমার অনেক জ্বালা বুঝেছ।
আবার কি হলো!
সে অনেক কথা। কাল সকালে তোমায় গিয়ে বলবো।
রাতে আসবি না?
সুযোগ পাচ্ছি কোথায়।
কি হয়েছে বল?
বললাম তো কাল সকালে গিয়ে বলবো।
সেকিরে আমি যে গাদাখানেক রান্না করছি।
করো না। ফ্রিজে তুলে রাখো। কাল সকালে ঠিক পৌঁছে যাব।
তোকে নিয়ে মহা মুস্কিল।
তোমরা নিজেরাই তো আমায় মুস্কিলে ফেললে।
কেন!
আমাকে এসবের মধ্যে জড়ালে কেন?
চুপচাপ।
খাচ্ছিল তাঁতী তাঁত বুনে কাল হলো তার হেলে গরু কিনে।
হেলে গরু কে?
তুমিও জিজ্ঞাসা করছো?
তুই উপমা দিলি আমি জিজ্ঞাসা করলেই দোষ।
মিত্রা।
তার আবার কি হলো?
সে অনেক কথা।
আমি তোদের ব্যাপার স্যাপার কিছু বুঝিনা বাপু।
কাল বুঝবে। ট্রেনটার অনেক বগি বুঝলে, ডি-রেলড হয়ে গেছে। লাইনে তুলতে একটু সময় লাগবে।
তোর হেঁয়ালি আমার বোঝার সাধ্য নেই।
কাল সকালে গিয়ে বোঝাব।
আচ্ছা।
ফোনটা কেটে দিলাম। রবীনের ফোন নম্বর খুঁজলাম। আমার কাছে নেই। ইসমাইলের ফোন নম্বরও নেই।
মল্লিকদাকে আবার ফোন করলাম। বললাম দেখতো ধারে কাছে ইসমাইল আছে কিনা, থাকলে আমার ফোন নম্বরে ওকে একবার ফোন করতে বলো।
আচ্ছা।
কিছুক্ষণের মধ্যে ইসমাইল ফোন করলো, ভালো মন্দের খবর নিয়ে বললাম তুমি রবীনের ফোন নম্বর জানো?
হ্যাঁ দাদা জানি।
দাও।
ও রবীনের ফোন নম্বর দিল।
রবীনকে ফোনে ধরলাম। প্রথমে ও চিনতে পারেনি। তারপর পরিচয় দিতেই বললো হ্যাঁ দাদা।
তুই কোথায়?
পার্ক র্স্ট্রীটে।
ম্যাডাম কোথায়?
ক্লাবের ভেতরে।
কখন এসেছিস?
ঘণ্টা খানেক আগে।
ঘরির দিকে তাকালাম। আটটা বেজে গেছে।
দুপুরে বেরিয়ে কোথায় গেছিলি?
চুপচাপ।
কথা বলছিস না কেন?
ম্যাডাম বারন করেছে।
ঠিক আছে।
না না বলছি।
বল।
প্রথমে গেলাম নিউ মার্কেট, ওখান থেকে পেয়ারলেস ইন, তারপর এখানে।
সত্যি কথা বলছিস?
হ্যাঁ অনিদা।
ভেবে বল।
মাঝে সাহেবের কাছে গেছিলাম।
কে সাহেব!
ম্যাডামের হাজবেন্ড?
ও।
পেয়ারলেস ইনে কে কে ছিল?
ম্যাডাম আর সাহেব ছিল।
মিথ্যে কথা বলছিস?
মল সাহেব ছিল।
সাহেব কি কলকাতায়?
উনি কলকাতাতেই থাকেন। আর কোথায় থাকবেন?
কোথায় থাকে?
কেন তুমি জান না!
আমি তোর মতো। গ্রামের ছেলে, এতো খবর রেখে কাজ কি বলতো।
না অনিদা তুমি গ্রামের ছেলে হলে কি হবে, গিয়ে তো দেখলাম।
কোথায় থাকে বললিনা?
সিঁথির ওখানে।
তুই চিনিস?
অনেকদিন আগে একবার গেছিলাম।
কোথায় বলতো?
গোপাললাল ঠাকুর রোডে, একটা মন্দিরের পাশে।
সাহেবের এখানের চেম্বারটা কোথায়?
রক্সি সিনেমার পাশে।
নার্সিংহোমটা?
ওটা সাহেবের না।
তাহলে?
ওটা ম্যাডামের, আর একজন আছেন, চিনিনা।
আজ কি সাহেব ম্যাডামের বাড়িতে যাবেন?
না না।
কেন?
ম্যাডামের সঙ্গে সাহেবের ডিভোর্স হয়ে গেছে।
কবে!
গত সপ্তাহে।
তাহলে ম্যাডাম গেছিলেন?
বলতে পারব না।
আজ ম্যাডাম অনেকদিন পর ক্লাবে এলো তাই না?
হ্যাঁ, প্রায় দেড়মাস।
কি করে ক্লাবে?
কি আর বলবো অনিদা, তুমি তো সব জান।
এই দ্যাখো, আমি জানলে তোকে জিজ্ঞাসা করবো কেন।
তুমি ম্যাডামকে একটু বাঁচাও।
আমি বাঁচাবার কে। আমি তোর ম্যাডামের কাছে কাজ করি, এই যা।
তুমি ম্যাডামের সঙ্গে কলেজে পড়েছো।
সে তো বহুদিন হয়ে গেছে। একটু দাঁড়া।
ট্যাক্সিটাকে রুবির কাছে ছেড়ে দিলাম।
হ্যাঁ বল।
ম্যাডাম আজ বেহুঁস হয়ে ফিরবে।
কেন!
তুমি জানোনা, এখানে আসে কেন মানুষ।
শুধু মদ খেতে?
তা নয়তো কি। আজ আমার কপালে দুঃখ আছে।
কেন?
ম্যাডাম বেহুঁস হয়ে ফিরবে।
তুই কি করবি?
আমি মাসিকে বলেছি থাকার জন্য।
কেন মাসি কি রাতে থাকে না।
না। ওরা সব রাতে চলে যায়।
ম্যাডাম একা থাকে?
হ্যাঁ।
অতো বড় বাড়িতে একা!
তুমি জানতে না!
না। তুই?
আমি বাইরের বাগানে মালিদের কোয়ার্টারে থাকি।
রাতে আর কে থাকে?
দুজন মালি, দারোয়ান, আর আমি।
এই ভাবে কতদিন আছিস?
যেদিন থেকে আমি এলাম সেদিন থেকে।
তুই কতবছর আছিস?
ছ-বছর।
তোর ম্যাডামকে গাড়িতে কে তুলবে?
এখানে বারের মেয়েরা আছে ওরা তুলে দেবে ধরে ধরে, বাড়িতে মাসি।
ও। আজকে অফিসে কোনও গন্ডগোল হয়েছে?
কি মিটিং ছিল। তুমি তো ছিলে।
দুর ওই মিটিংয়ে থাকে নাকি কেউ। আমি রাগ করে চলে এসেছি।
সেইজন্য ম্যাডাম তোমায় খুঁজছিলেন। আমাকেও বললেন, তুই দেখেছিস। তুমি কোথায় অনিদা?
আমি বাইপাসে, বাস ধরবো বলে দাঁড়িয়ে আছি।
তোমায় ম্যাডাম খুব ভালোবাসে।
এটা আবার তোকে কে বললে?
আমি জানি। না হলে তোমার কথায় আমাদের গ্রামে যায়।
ঠিক আছে সাবধানে ম্যাডামকে বাড়ি নিয়ে যাস।
আচ্ছা।
মাথাটা কোনও কাজ করছে না। সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
মিত্রা আমার খুব ক্লোজ। কিন্তু আমি অনেক কিছু এখনও জানি না। মিত্রা আমার কাছে কি চায়। শুধু শরীর, না আরও কিছু। মায়ের চেনটা ওকে পড়াতে গেছিলাম। ও ফিরিয়ে দিয়েছিল। ওকে সেদিন বুঝতে দিইনি। তবে খটকা একটা আমার মনে লেগেছিল। সত্যি যদি মিত্রা আমাকে ভালোবাসে, তাহলে সেদিন ওটা ও নিল না কেন?
ও বলেছিলো মিঃ ব্যানার্জী একটা বাস্টার্ড। ওর জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে।
তাহলে আজ মিঃ ব্যানার্জীর কাছে ও গেল কেন? কিসের তাগিদে?
মিত্রা বলেছিল, মিঃ ব্যানার্জী এখানে থাকেন না।
রবীন যা বললো, তাতে মিঃ ব্যানার্জী কলকাতায় থাকেন।
নার্সিংহোমের মালিক কে?
মিত্রা বলেছিল, মিঃ ব্যানার্জী পঞ্চাশ শতাংশের মালিক ও পঞ্চাশ শতাংশের। কিন্তু রবিন উল্টো কথা বলছে।
একাকিত্ব মিত্রার বিগড়ে যাওয়ার একটা মূল কারণ। এছাড়া আর কোনও কারণ?
কলেজ লাইফে মিত্রাদের বাড়ি গেছি। ওদের পয়সা ছিল, কিন্তু কত পয়সা ছিল, যাতে মিত্রা এরকম একটা কাগজের পঁচাত্তর শতাংশের মালিক হয়ে যেতে পারে।
সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
এখন কি করবো? মিত্রার বাড়ি যাব, না বাড়ি ফিরে যাব। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম।
একটা উত্তরই আমার কাছে ভেসে আসছে। ও আমাকে এতো কোটি টাকার মালিক বানিয়েছে। অনেকে চেয়ে পায় না, আমি অনাহূতের মতো তা পেয়েছি। হয়তো এর মধ্যে দিয়ে ওর কিছু উদ্দেশ্য সিদ্ধ হতে পারে, তবু আমার কাছে এটা অনেক। এই কারনেই ওর পাশে আমার দাঁড়ান উচিত।
আমার ভেতর আমি বলে উঠলো, কি হে অনি তুমি কি শুধু টাকার জন্য আজ মিত্রার বাড়িতে যাওয়া মনস্থির করলে। নিজে নিজে হেসে ফেললাম।
আমি ওকে ভালোবাসি এটা ঠিক। কিন্তু মিত্রা? ভালোবাসার জন্যই যে আমাকে মালিক বানিয়েছে তা নয়। ওরও কিছু উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। ও জানে অনি খুব হার্ডি ছেলে। ওকে দিয়ে আমার বৈতরণী পার হয়ে যাওয়া যাবে।
আজ যেমন একটা বৈতরণী ও পার হয়ে গেল।
কি অনিবাবু, তোমার এতে কিছু লাভ হয়নি?
হেসেফেললাম। ধ্যুস নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করছি।
একটা ট্যাক্সি ধরলাম, সোজা চলে এলাম মিত্রার বাড়িতে। গেট দিয়ে ঢুকতেই দারোয়ান এগিয়ে এলো।
অনিবাবু, মা ফেরেন নি।
ভেতরে কে আছে?
বুড়িমাসি আছে।
গট গট করে ভেতরে চলে এলাম।
শুনশান। ভুতুরে বাড়ির মতো মনে হচ্ছে। চারিদিকে লাইট জ্বলে আছে, তবু কেমন অন্ধকার অন্ধকার। পোর্টিকোর নিচে এসে দাঁড়াতেই বুড়িমাসি এগিয়ে এলো।
তুমি কখন এলে?
এই তো এখুনি। মিত্রা কোথায়?
কোথায় আবার। যেখানে যাবার সেখানে গেছে।
বুড়ীমাসি গজ গজ করছে।
মেয়েটা এই করতে করতে একদিন শেষ হয়ে যাবে।
মাথা নিচু করলাম।
তুমি ওর বন্ধু একটু শোধরাতে পার না? বড়লোকের যত সব….।
আমি মাথা নিচু করে আছি।
ছোটো থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি, তাই ছেড়ে যেতে পারছি না।
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছি।
চা খাবে।
দাও।
বুড়িমাসি চলে গেল। আমি নিচের হলোঘরে সেন্টার টেবিলের চারধারে রাখা সোফার একটা দখল করে বসলাম। ঘড়ির দিকে তাকালাম দশটা বাজে।
বুড়িমাসি চা নিয়ে এলো।
মিত্রা কখন ফিরবে।
ঠিক আছে নাকি। একটা, দেড়টা, দুটো।
চায়ে চুমুক দিলাম।
এই মেয়েটা কতো ভালো ছিল। কত হাসিখুশি। এখন দেখো। মায়া পড়ে গেছে। আর কত্তাবাবুর জন্য রয়েছি, না হলে কবে ছেড়ে চলে যেতাম, ঝাঁটা মারো ওরকম কাজে।
তুমি রাগ করছো কেন। ওর হয়তো কোনও কাজ থাকতে পারে।
ছাই কাজ আছে, মদ গিলতে গেছে, আমাদের বস্তির গুলো ধেনো খায়, ওরা একটু দামি খায়।
তোমায় কে বললো?
ওই তো মর্কট রবীন। ওটাও একটা তেঁয়েটে।
কেন!
আর বলো কেন, ওপর থেকে মায়ের বোতোল চুরি করে এনে খায়।
তুমি কিছু বলো না?
অনেক আছে, একটু আধটু নিলে খতি নেই। কি করবে।
আমি বুড়ী মাসির দিকে তাকিয়ে।
বউটা মরে গেল। বাচ্চাটা দাদু-দিদার কাছে থাকে।
আবার বিয়ে করলো না কেন?
বিয়ে করলে এখানে ঝি-গুলোর সঙ্গে ফস্টি নস্টি করবে কি করে।
মিত্রা জানে না?
মা আমার সাক্ষাত দেবী। ওই একটু খারাপ রোগে ধরেছে, মদ খাওয়া।
হাসলাম।
তুমি ওর বন্ধু, পারো না এই রোগটা ছাড়াতে?
তুমি বললে, ছোটো থেকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছ। তুমিও তো বলতে পার।
বলে বলে থুতুতে আঁটা জম্মেছে, বরটাই ওকে সব্বনাশের পথে নিয়ে গেল।
সেটা আবার কে?
ওই যে গো ডাক্তার।
যাঃ, তুমি বাজে কথা বলছো, ডাক্তার ভালো মানুষ। মিত্রা আমাকে আলাপ করিয়ে দিয়েছে।
ভালো মানুষ। বুড়ীমসির চোখে মুখে শ্লেষ ঝড়ে পড়েছে।
নষ্ট চরিত্রি। একটা বউ থাকতে আর একটা বিয়ে করে। মা আমার লক্ষী প্রতিমে। তাও কদিন ঘর করেছিল। তারপর সব নিয়ে দিলে তাড়িয়ে।
আমি বাকরুদ্ধ। বুড়ীমাসির দিকে তাকিয়ে রয়েছি।
চায়ের কাপ কখন নিঃশেষ হয়ে গেছে বুঝিনি।
সে অবস্থা তুমি দেখনি। মা ঠাকরনের জন্য সব হয়েছে।
কেন!
মাঠাকরনের কেমন যেন দূর সম্পর্কের আত্মীয়। বড় ডাক্তার। বিদেশে থাকত। অনেক পয়সা। তাই বিয়ে দিয়েছিল। কত্তাবাবু কত বারন করেছিল। কে জানত দোজ বরে। ওর একটা মেম বউ আছে। যখন জানা জানি হলো। তখন ডাক্তার গুছিয়ে নিয়েছে। মা আমার একবার বিদেশ গেছলো, সেখানে সব নিজের চোখে দেখে এসেছে।
ডাক্তারের বয়স মনে হয় ওর থেকে একটু বেশি।
হবে না। লোভ, সম্পত্তি পাবে না। বাবুর একমাত্র মেয়ে অগাধ সম্পত্তি। সেই জন্য বুড়ো বয়েসে বউ থাকতে এখানে এসে একটা বিয়ে করলে।
এখন থাকে কোথায়?
সিঁথিতে।
মেমকে নিয়ে।
না না ওটাকে ছেড়ে দিয়েছে।
তাহলে মিত্রার সঙ্গে থাকতে পারে।
থাকবে কি করে। সে তো জজসাহেবের কাছে লিখে দিয়ে এসেছে। থাকবে না বলে।
মিত্রা যে মাথায় সিঁদুর দেয়।
মা এখনও বিশ্বাস করে ডাক্তার তার স্বামী। প্রথম বিয়ে। ভুলতে পারে না। তাছাড়া কি জান, গায়ে একবার হলুদ লাগলে আর কুমীরে ধরে না।
আমি চুপ।
তুমি দ্যাখো ওকে একটু ভালো করতে পারো কিনা।
আমি কি ভগবান।
আমি কি সেই কথা বললুম।
চুপ করে রইলাম।
তোমার দেশের বাড়িতে গেছিল। এসে কত গল্প করলো। সেই আগের মাকে যেন ফিরে পাচ্ছিলাম। আমাকে বললো তোমায় একবার নিয়ে যাবো বুড়ীমাসি। তা আমি বললুম বেশ, নিয়ে গেলে যাব খোন। বেশ কয়েক দিন ভালো ছিল। আবার শুরু করলে।
খুব ইচ্ছে করছিল বুড়ীমাসিকে নার্সিংহোমের কথাটা জিজ্ঞাসা করতে, কিন্তু বুড়ীমাসি যদি সন্দেহ করে। আমার মন মানে না। এই সুযোগ আর আসবে না। আমার ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো অনি এই সুযোগ তুই হাতছাড়া করিস না।
বুড়ীমাসি কাঁদছিল, কাপরের খুঁট দিয়ে চোখের কোল মুছছে।
আমি সোফা থেকে নিচে বুড়ীমাসির কাছে গিয়ে বসলাম, তুমি কাঁদছ কেন?
জানো মা আমার সাতদিন ঠিকমতো খেতে পারেনা, শুতে পারেনা। অফিসে নাকি গন্ডগোল কাকে নিয়ে।
অফিসে গন্ডগোল, কই জানি না!
তুমি জানবে কি করে। ওই মিনসের একটা ভাগ্নে ওখানে আছে। সেই-ই গন্ডগোল করেছে। মা আমার বার বার তার কাছে গেছিল, বলেছে আমার দ্বারা কিছু হবে না।
তোমাকে অফিসের কথা সব বলে?
বলে। যখন মন ভালো থাকে।
তুমি ওর কাছে রাতে থাকতে পারো।
থাকি তো, আমার সংসার আছে। সেখানে সাতটা পোষ্য।
ডাক্তারের নার্সিংহোম আছে, আরও টাকার কি দরকার।
রাখো তোমার নার্সিংহোম। ওটা ডাক্তারের ছেলের নামে, সে বিদেশে থাকে, ডাক্তার দেখাশোনা করে। সে বলেছে মাকে বিয়ে করবে।
ডাক্তারের ছেলে!
হ্যাঁগো প্রথম পক্ষের সেই মেমসাহেবের ছেলে।
মিত্রা কি বলে।
আমরা মেয়ে মানুষেরা তা পারি, সম্পর্কে ছেলের সঙ্গে বিয়ে করতে। যতই ছাড়াছাড়ি হোক।
ডাক্তার কি বলে?
তার তো ভারি মজা, সম্পত্তি পাবে। সম্পত্তি নয়তো বিষ।
এই বাড়িটা কাদের? এটা মিত্রাদের নয়, আমি তো ওই বাড়িতে গেছিলাম।
আনন্দ চ্যাটার্জী লেনে।
হ্যাঁ।
ওটা বড়বাবু নিয়েছেন, বাবুকে কাগজের ভাগ দিয়েছেন, আর এটা মা ঠাকরনের বাপের বাড়ির ভাগ। সেই নিয়েই তো মাঠাকরনের এত দেমাক।
তোমার বাড়িটা যেন এখানে কোথায়?
মদনমোহন তলা, হেঁটেগেলে দশ মিনিট।
তুমি বাড়ি যাও না?
যাইতো। সকাল সকাল আসি, মার দেখাশোনা করি। তারপর মা বেরিয়েগেলে চলে যাই আবার বৈকালের দিকে আসি। রাত পর্যন্ত থেকে চলে যাই।
আমার সম্বন্ধে মিত্রা তোমায় কিছু বলেনি।
খারাপ কিছু বললে, তোমায় এতো কথা বলি।
বাইরের গেটে হর্ন বেজে উঠলো। বুড়ীমাসি উঠে দাঁড়াল।
নাও, এলেন রাজ্য জয় করে।
ঘড়ির দিকে তাকালাম, সাড়ে বারোটা বাজে।
আমি সোফায় বসলাম।
বুড়ীমাসি পোর্টিকোর দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ি এসে দাঁড়াল। মুখ বারিয়ে দেখলাম পেছনের সিটে মিত্রা হেলে পড়ে আছে। নিঃসার দেহ। রবীন দরজা খুলে দিল।
এসো ধরে নিয়ে যেতে হবে।
আজকে দেখি একেবারে ঘুমিয়ে পড়েছে। বুড়ীমাসি বললো।
তুমি এসো তো।
তুই ঠেলা মারিস কেনরে মুখপোড়া।
বুড়িমাসি ঘরের দিকে আসছে, আসতে আসতেই বললো ও অনি এসো তো বাবা।
আমি উঠে দাঁড়ালাম, রবীন আমাকে দেখে চমকে উঠলো।
ও বুঝতে পারেনি আমি এইসময় এখানে থাকতে পারি। আমি বুড়ীমাসিকে বললাম, তুমি ওপরে গিয়ে মিত্রার ঘরের দরজাটা খোলো। কারুর দরকার পরবে না। আমি নিয়ে যাচ্ছি।
হয়তো আমার কন্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল বুড়ীমাসি আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর শুর শুর করে ওপরে উঠে গেল।
আমি আসতে রবীন সরে দাঁড়াল। ওর মুখ থম থমে। মাথা নিচু করে আছে।
রবীনকে বললাম, তুই ওপাশের দরজাটা খোল।
রবীন খুলে দাঁড়াল।
আমি মিত্রার বগলের তলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে টেনে বারকরে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। আমার বুকের কাছে ওর মুখ। ভক ভক করে গন্ধ বেরচ্ছে। ওকে আঁকুড় করে ধরে ওপরে নিয়ে এসে বিছানায় শোয়ালাম। পায়ের জুতো খুললাম। বুকের কাপর ঠিক ঠাক করে বুড়ীমাসির দিকে তাকালাম।
একটা কাজ করতে পারবে।
বলো।
রান্নাঘরে তেঁতুল আছে।
আছে। অনেক পুরনো। কি করবে?
নিয়ে এসো। একটা চামচে নিয়ে আসবে একটু বড়ো দেখে, আর একটা বাটি।
বুড়ীমাসি চলেগেল। আমি বাথরুমে গেলাম। বালতি মগ আর টাওয়েল নিয়ে এলাম। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বার করলাম।
মিত্রার হাতে চিমটি কাটলাম। না কোনও সার নেই।
ওর গালে আস্তে আস্তে থাপ্পর মারলাম। মরার মতো পড়ে আছে। সম্পূর্ণ বেহুঁশ।
হাতদুটো দু-পাশে ছড়ানো। কাপরটা হাঁটুর ওপর উঠে গেছিল আমি টেনে নামালাম।
বুড়ীমাসি ঘরে ঢুকলো। আমার কান্ডকারখানা দেখে অবাক। চোখেমুখে তার ছাপ স্পষ্ট।
আমি বাটিতে তেঁতুল রেখে ঠান্ডা জল দিয়ে ভালো করে চটকে নিলাম। জলটা বাটিতে রেখে, তেঁতুলটা বুড়ীমাসির হাতে দিয়ে বললাম ধরো। আমাকে চামচেটা দাও। বুড়ীমাসি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চামচেটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।
আমি বালতিটা এগিয়ে নিলাম। মগটা বালতি থেকে নামিয়ে রাখলাম। মিত্রার মাথার শিয়রে বসে ওর মাথাকে আল গোছে কোলে তুলে নিলাম।
গালে চাপ দিতেই মিত্রা হাঁ করলো।
আমি বুড়ীমাসির দিকে তাকিয়ে বললাম, বাটিটা এগিয়ে দাও, বুড়ীমাসি আমার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছে। বাটিটা এগিয়ে দিল। আমি চামচে করে জিভটা টেনে ধরে ওকে তেঁতুল জল খাওয়ালাম।
মিনিট-খানেকের মধ্যে রি-এ্যাকসন শুরু হলো। হর হর করে বমি করতে শুরু করলো। বুড়ীমাসি নাকে কাপর চাপা দিয়েছে। আমি বালতিটা ওর মুখের কাছে ধরে আছি। কিছুক্ষণ পর বমি বন্ধ হলো। আমার প্যান্টেও ছিটকে পড়েছে। কিছুটা মাটিতেও ছিটকে পরলো।
আবার একটু তেঁতুল জল গুললাম। খাওয়ালাম। আবার বমি।
বাথরুমে গিয়ে বালতি পরিষ্কার করে, ঠান্ডা গরম জল মিশিয়ে নিয়ে এলাম।
বুড়ীমাসিকে বললাম, ওর কাপর খুলে একটু গাটা মুছিয়ে দেবে, আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।
বুড়ীমাসি আমার দিকে অবাক চোখে তাকাল।
তুমি দাও, তুমি রুগীর সেবা করছো। এতে পাপ হয় না।
আমাকে ওর রাতের পোষাকটা এনে দাও।
বুড়ীমাসি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি যতটা সম্ভব ঢাকা ঢুকি দিয়ে ওর সারা শরীর স্পঞ্জ করে দিলাম, কাপর খুলিয়ে ওকে নাইট গাউন পরিয়ে দিলাম। ঠিক ভাবে শুইয়ে দিয়ে গায়ে একটা পাতলা চাদর টেনে দিলাম। ঘরটা ভালো করে মুছে, বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে এলাম। বুড়ীমাসি মিত্রার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
বুড়ীমাসি আমার দিকে স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকাল।
আমি যাই মাসি।
এত রাতে কোথায় যাবে!
কাজ আছে।
তোমাকে যেতে হবে না।
না মাসি। আমাকে যেতে হবে। তুমি এক কাজ করো, ঘণ্টা খানেক বাদে ও উঠে পরবে, কিছু খেতে চাইলে গরম দুধ দিও কয়েকটা বিস্কুট, আর কিছু দিও না।
চলে যাবে? বুড়ীমাসির চোখে করুণ মিনতি।
হ্যাঁ।
(আবার আগামীকাল)